kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নিরপেক্ষ ইসি খোঁজা

এ কে এম শাহনাওয়াজ

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নিরপেক্ষ ইসি খোঁজা

এ দেশের সাধারণ মানুষ, যারা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিকদের দেখেছে জনগণের নাম ভাঙিয়ে দলতন্ত্রকে পরিপুষ্ট  করতে, ক্ষমতা দখলের বা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য উগ্র ও কূটকৌশলী লড়াই করতে দেখেছে, সাধারণ মানুষের কলজে খুবলে নিয়ে নিজেদের অভীষ্ট অর্জন করতে দেখেছে, তাদের কাছে অপেক্ষাকৃত সুস্থির চলমান সময়ে নির্বাচন নিয়ে তেমন তাপ-উত্তাপ নেই। এর সত্যতা জানার জন্য গণভোটের দরকার পড়ে না।

নিজেদের চারপাশে অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে তাকালেই বোঝা যাবে। হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে বা বাসে-ট্রেনে কান পাতলেই শোনা যাবে। রাজনৈতিক আলোচনাবিলাসী এ দেশের সাধারণ মানুষও নির্বাচন প্রশ্নে এখন তেমন চনমনে হয়ে উঠছে না।

নির্বাচনের হালকা উত্তাপ এখন দৃশ্যমান রাজনীতি অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে আর মৌসুমি বিশ্লেষক তথাকথিত সুধীসমাজের মানুষের অবয়বে। মধ্যাহ্নের না হলেও প্রায়-মধ্যাহ্নের উত্তাপ এখন ছড়াতে পারতেন বিএনপি নেতারা। তেমন উপাদান হাত বাড়ালে পাওয়াও যেত। কিন্তু ভাঙা কোমরে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না দলটি। তাই অমন কুঁজো অবস্থার চেঁচামেচি সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে না। এই তো কিছুদিন আগেই বিএনপির মহাসচিব বলছিলেন মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়, তারা ‘অবৈধ’ সরকারকে সরিয়ে এখনই নির্বাচন দাবি করেন। শূন্য দালানে শব্দ করলে প্রতিধ্বনি হয়। কিন্তু দলটির এতই করুণ দশা যে এসব বক্তব্য সামান্য প্রতিধ্বনিও তুলল না। ফলে সুর পাল্টে এখন আগামী নির্বাচনের বাস্তবতা মেনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন নিয়ে কথা তুলছে। অভিন্ন আবেদন জানাচ্ছেন জাতীয় পার্টিসহ ছোটখাটো রাজনৈতিক দল আর যথারীতি ‘সুধীসমাজে’র চিহ্নিত প্রাজ্ঞ মানুষরা। সবাই রাজনৈতিক দলগুলো, সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক ইত্যাদি নানা ঘরানার মানুষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ সাহসী ইসি নিয়োগের দাবি তুলছেন। নিঃসন্দেহে অমন দাবি সাধারণ দৃষ্টিতে যৌক্তিক। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আলোচনায় যুক্ত থাকার জন্য যে পক্ষগুলোর তালিকা দেওয়া হচ্ছে তারা নিরপেক্ষ কি না! সাধারণ বিচারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো পক্ষের প্রতি সবাই ঝুঁকে থাকে। প্রকৃত অর্থে এরা কেউই সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা একত্র হয়ে একজন নিরপেক্ষ ইসি কেমন করে খুঁজে বের করবে তা আমার বোধগম্য নয়। অতীতে এমন নিরপেক্ষ ইসি বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান খোঁজা হয়েছে। নির্বাচনে হেরে গেলে হারু পক্ষের কাছে ইসি বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান ভিলেন হয়ে যান। সূক্ষ্ম বা সূ্থ্থল কারচুপির অভিযোগ ওঠে।

খালেদা জিয়ার সেই সুপরিচিত মন্তব্য আংশিক আমিও বিশ্বাস করি। ‘পাগল ও শিশু’ ছাড়া তিনি কাউকে নিরপেক্ষ মানেন না। এখন তাঁর দল আবার কোন পাগল বা শিশু খুঁজতে যাচ্ছে, যার ওপর ভর করে নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দেবে? আমি খালেদা জিয়ার বক্তব্যের এইটুকু মানি যে ফেরেশতা ছাড়া সুস্থ মানুষ কেউ নিরপেক্ষ হতে পারেন না। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেই কেউ নিরপেক্ষ হয়ে যান না। ধরে নিই, এমন রাজনৈতিক দল বিযুক্ত জ্ঞানী সজ্জন সৎ মানুষকে সার্চ কমিটি সবার মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে যোগ্য বিবেচনায় ইসি বানাল। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ চেতনার মানুষ। ইসির আসনে বসেও মানুষটির মনে কি একটুও কষ্ট ছুঁয়ে যাবে না যুদ্ধাপরাধী বাংলাদেশবিরোধী জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতি করতে দেখে—নির্বাচন করতে দেখে! জামায়াতের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে বিএনপির প্রতিও কি তাঁর মন খারাপ হতে পারে না! এমন বাস্তবতায় কারো শতভাগ নিরপেক্ষ হওয়া কঠিন। আবার আওয়ামী লীগ বা বিএনপির রাজনীতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থকও নিজের ব্যক্তিত্ব, সততা ও দৃঢ় চিত্ততার কারণে ইসির দায়িত্বে এলে অর্পিত দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে পালন করতে পারেন। অন্যদিকে বিরোধী দল দুর্বল হলে জনমত তৈরি না করতে পারলে সরকারপক্ষ যদি ইসিকে প্রভাবিত করতে চায়, তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হতে পারে।

খালেদা জিয়ার মতো আমি নিশ্চিত নই যে পাগল ও শিশু নিরপেক্ষ। একজন শিশুকে সারা দিন আদর করে দেখে রাখলেন খালা। সন্ধ্যায় অফিস থেকে মা ফেরার পর দৌড়ে গিয়ে মায়ের আঁচলে মুখ লুকাল। এখন খালাকে চিনতেই পারে না। পাগল তো মানসিক ভারসাম্যহীন। তার আবার পক্ষ-নিরপেক্ষ কী!

এরপর নির্ধারিত ‘সবার’ সঙ্গে আলোচনা করে ইসি নির্বাচনের এক ধরনের গুরুত্ব রয়েছে। অমন হলে অন্তত শুরুতেই নির্বাচন বর্জন ধরনের সুর তুলতে পারবে না বিরোধীপক্ষ। কিন্তু নির্বাচনে হেরে গেলে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ধরনের নানা হট্টগোল পাকানোর অবকাশ তো থাকবেই। দীর্ঘদিনের চর্চায় আমাদের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি দাঁড়িয়েছে, তাতে দুর্বলের ওপর সবলের পীড়ন থাকবেই। কোন দৃঢ়চেতা সাহসী ইসি খুঁজে পাওয়া যাবে, যিনি প্রবল সরকারপক্ষের ইচ্ছাকে একেবারে অস্বীকার করতে পারবেন!

আমাদের রাজনৈতিক দল ও নেতানেত্রীরা সবাই তো একেকটি পক্ষ। তথাকথিত সুধীসমাজের প্রতিনিধি নির্বাচন যদি সার্চ কমিটির মাধ্যমে করা না যায়, তাহলে প্রতিদিন বক্তৃতা-বিবৃতি দেওয়া চিহ্নিত প্রাজ্ঞজনদেরই পাব। তাঁদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জাতি নিঃসন্দেহ নয়। পত্রপত্রিকায় তাঁদের লেখা পড়ে ও টেলিভিশন টক শোতে তাঁদের অনেকের কথা শুনলে প্রকৃত চরিত্র চিহ্নিত করা কঠিন নয়। সুতরাং তাঁরা সম্মিলিতভাবে মাটি খুঁড়ে কোন নিরপেক্ষ ইসি খুঁজে আনবেন তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।

যতই যৌক্তিক দাবি থাক, চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ও রাজনীতির মাঠে শক্ত অবস্থানে থাকার কারণে চরিত্র অনুযায়ী আওয়ামী লীগের এই বিষয়ে খুব কেয়ার করার কথা নয়। অবস্থানগত সুবিধা ও নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের কারণে কোনো পক্ষকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করবে না। প্রকৃত গণতান্ত্রিক চেতনা নিয়ে কোনো পক্ষই পথ হাঁটছে না এ দেশে। জনগণ থাকে বক্তৃতার ভাষায়। এমন যদি হতো বিরোধী দল অত্যন্ত জনপ্রিয়, ‘গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য’ বিরোধী নেতাদের ডাকে সাধারণ মানুষ পথে এসে দাঁড়াবে, তবে নিশ্চয় নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপন করতেন। যাঁরা এখন সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে চান, তাঁদেরও তো নিকট অতীতে একইভাবে গণতন্ত্র লাঞ্ছিত করতে দেখা গেছে।

আওয়ামী লীগ জানে যতই চেঁচামেচি করুক, এবার বিএনপির নির্বাচনে না আসার সুযোগ নেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়ার ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেনি। বিএনপির মিত্ররাও এতটা সবল নয় যে তাকে শক্তি জোগাতে পারবে। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি সরকারের পেছনেই হাঁটবে। চিহ্নিত ‘সুধীসমাজে’র প্রতিনিধিদের আগেও ধর্তব্যে রাখেনি। এখনো রাখবে বলে মনে হয় না। কারণ তাঁদের অনেকের মধ্যে যে সুবিধাবাদ কাজ করে, তাতে করে নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করাটা আওয়ামী লীগ নেতাদের জন্য খুব কঠিন নয়।

আমার এই কথাগুলো হতাশার প্রকাশ বলে মনে হতে পারে। আমি নিজেও অস্বীকার করব না। যে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অনৈতিকতা কাজ করছে, তাতে হতাশ না হওয়ার মতো মানসিক দৃঢ়তা কয়জনের থাকতে পারে! তবু কঠিন বাস্তবতা সামনে রেখেই আমাকে এ কথাগুলো লিখতে হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে করণীয় কী? বিজ্ঞজনরা নিশ্চয়ই একটি পথ খুঁজে পাবেন। তবে আমি বলব, এ অবস্থায় সরকার ও বিরোধীপক্ষ—উভয়েরই করণীয় রয়েছে। বিএনপি ও এর অনুগামী বিরোধীপক্ষকে অসহায়ের আস্ফাালনের মতো প্রতিদিন বক্তৃতা-বিবৃতি না দিয়ে জনমত তৈরির জন্য পথে নামতে হবে। যেহেতু জনগণের কাছে অতীত কাণ্ডের জন্য তারা দুধে ধোয়া তুলসীপাতা নয়, তাই অতীতের ভুল স্বীকার করেই জন-আস্থায় আসতে হবে। যে জনগণকে শুধু বক্তৃতায় ব্যবহার করে তাদের কাছেই ফিরতে হবে। মানুষ কেমন বিএনপি দেখতে চায় সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। সেভাবেই নিজেদের পরিশুদ্ধ করতে হবে।

সরকারপক্ষ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকেও স্বর্গসুখ চিরন্তন এই মরীচিকায় না থেকে মাটির পৃথিবীতে নামতে হবে। আত্মম্ভরিতার মোড়কে নিজেদের আটকে না রেখে মানুষের মুখোমুখি হতে হবে। অতি দলপ্রীতিতে থাকায় ও সুশাসনের পথে না হাঁটায় মানুষের মনে কিন্তু সুপ্ত ক্ষোভ বিরাজমান। মানুষের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ায় সরকার কিছুটা গুডবুকে আছে। এ থেকে আওয়ামী লীগ নেতারা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হতে পারেন। বিরোধীপক্ষ যতই কণ্ঠশীলন করুক, আওয়ামী লীগ সরকার নিজের হিসাবমতোই শেষ পর্যন্ত ইসি গঠন করবে। তবে নিজ ভবিষ্যৎ ভেবেই এ সুসময়কে ইতিবাচক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত। সততার সঙ্গে গণতন্ত্রের পথে হাঁটার এখনই সুবর্ণ সুযোগ আওয়ামী লীগের। এ দলেরই বরং সার্চ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তা করতে হলে দলীয় বৃত্তে বন্দি না থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ চিন্তার আদর্শবান মেধাবী বন্ধু অনেক আছেন, যাঁদের আওয়ামী লীগ ছাড়া ভোট দেওয়ার সুযোগ আর কোথাও নেই তাঁদের কাছে টানতে হবে। আওয়ামী লীগকে জনঘনিষ্ঠ করায় তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। এমন অবস্থা সৃষ্টি করতে পারলে আওয়ামী লীগ মুক্তচিন্তার নিষ্ঠাবান মানুষদের নিয়ে ইসি গঠনের কৃতিত্ব দেখাতে পারে। অন্ধকার নয়, আলোকিত পথেই সদম্ভে নির্বাচনের পথ পেরোতে পারবে। আর এ পথে হাঁটতে পারলে আওয়ামী লীগের পালকে আরো একটি হীরণ্ময় ঔজ্জ্বল্য যুক্ত হতে পারে। এমন অবস্থা সৃষ্টি করতে পারলে নষ্ট রাজনীতির চর্চা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কমে যাবে। সব দলকেই ক্ষমতায় আসতে হলে জনমনতুষ্টির কথাই ভাবতে হবে। এভাবেই তো গণতন্ত্র ফিরে আসে। আর এই ফেরানোর কাজটা যদি আওয়ামী লীগের উদ্যোগে হয়, তবে তা দলটির জন্য কম প্রাপ্তির হবে না।

 

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

 


মন্তব্য