kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পবিত্র কোরআনের আলো

নাগরিকরা দায়িত্ববান হলে সমাজ অবশ্যই এগিয়ে যাবে

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নাগরিকরা দায়িত্ববান হলে সমাজ অবশ্যই এগিয়ে যাবে

১১৭. তোমার প্রতিপালক এমন নন যে তিনি অন্যায়ভাবে জনপদগুলো ধ্বংস করে দেবেন, অথচ সেখানকার জনগণ সত্কর্মশীল (সমাজ সংস্কারে নিয়োজিত)। [সুরা হুদ, আয়াত : ১১৭ (তৃতীয় পর্ব)]

তাফসির : এর আগে দুই পর্বে এ আয়াতের তাফসির উল্লেখ করা হয়েছিল।

প্রথম পর্বে নাগরিকের দায়িত্ব ও দ্বিতীয় পর্বে সমাজ সংস্কার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। এ পর্বে আয়াতের আরেকটি দিক নিয়ে আলোচনা করা হবে। সে বিষয়টি হলো, কোনো কোনো তাফসিরবিদ এ আয়াতের ভিন্ন একটি অর্থ দাঁড় করিয়েছেন। আরবি ব্যাকরণের রীতি মেনেই তাঁরা এ অর্থ গ্রহণ করেছেন। তাঁদের মতে, এ আয়াতের অর্থ হলো—আল্লাহ এমন নন যে কোনো জনপদের অধিবাসীরা ন্যায়নিষ্ঠ ও দায়িত্ববান হওয়া সত্ত্বেও কেবল কুফর ও শিরকের কারণে তাদের ধ্বংস করে দেবেন। অর্থাৎ সেসব তাফসিরবিদের মতে, আয়াতে জুলুম মানে কুফর ও শিরক। আর সত্কর্মশীল বলতে এমন লোকদের কথা বলা হয়েছে, যারা কাফির হওয়া সত্ত্বেও ভালো কাজ করে, নীতি-আদর্শ ধরে রাখে। এ অর্থ অনুযায়ী আলোচ্য আয়াত থেকে দুটি বিষয় জানা যায়—প্রথমত, শুধু কাফির-মুশরিক হওয়ার কারণে কোনো জাতির ওপর আজাব অবতীর্ণ হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা অন্যায়, অনাচার ও পৃথিবীতে নৈরাজ্য সৃষ্টি না করে। যেমন—শোয়াইব (আ.)-এর জাতি ওজনে কম দিত। লুত (আ.)-এর জাতি জঘন্য যৌন অপকর্মে লিপ্ত ছিল। নুহ, ঈসা ও মুসা (আ.)-এর জাতি নিজেদের নবীদের বিভিন্নভাবে কষ্ট দিয়েছে, অপমান করেছে। তাই তাদের ওপর আজাব এসেছে।

দ্বিতীয়ত, কাফির-মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও যে সমাজের মানুষ নৈতিক গুণাবলির অধিকারী, যাদের লেনদেন, আচার-ব্যবহার ভালো, নাগরিক হিসেবে যারা দায়িত্ববান, সমাজের কল্যাণে যারা নিবেদিত, তাদের সমাজের অগ্রযাত্রা কেউ রোধ করতে পারে না। এসব গুণাবলির কারণে আল্লাহ সে সমাজকে টিকিয়ে রাখেন। (তাফসিরে মা’আরেফুল কোরআন অবলম্বনে)

বলা হয়ে থাকে, ‘আল্লাহ তাআলা অমুসলিম সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখেন ন্যায়বিচারের মাধ্যমে, আর মুসলিম সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেন অত্যাচারের কারণে। ’ তাই ইসলাম সব সময় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকো এবং আল্লাহর জন্য সত্যের সাক্ষী হিসেবে নিজেকে পেশ করো। যদি এ কাজ তোমার নিজের মা-বাবার কিংবা নিজের আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও হয় (তবুও তোমরা তা পালন করবে)। সে ব্যক্তি ধনী হোক কিংবা গরিব, আল্লাহ উভয়ের ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুসরণ  কোরো না। যদি তোমরা পেঁচানো কথা বলো কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তাহলে জেনে রেখো, তোমরা যা কিছুই করো না কেন, আল্লাহ তা যথার্থ খবর রাখেন। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)

সামাজিক ন্যায়বিচার ইসলামী সমাজব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। সামাজিক শৃঙ্খলা নিরাপত্তা বিধানের পূর্বশর্ত। যে সমাজে মানুষ ন্যায়বিচার পায় না, সে সমাজে অত্যাচারীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আইনি কাঠামো ভেঙে পড়ে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। পক্ষান্তরে সমাজে যখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। মানুষ আইনের সুফল ভোগ করে। প্রকৃত মুসলমান নিজের স্বার্থের চেয়ে অন্যের স্বার্থ বড় করে দেখে। সাহাবায়ে কেরামের জীবন প্রণালী তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁরা নিজেদের অভাব-অনটন সত্ত্বেও অন্যের সাহায্যে এগিয়ে গিয়েছেন।

যখন রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, সাম্যের নীতি বাস্তবায়িত হয় তখন সমাজে বিরাজ করে শান্তি ও স্থিতিশীলতা। সমাজে তখন অন্যায় ও অত্যাচারের ভয় থাকে না। থাকে না কোনো নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির শঙ্কাও।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য