kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জাতীয় কাউন্সিলই হোক নেতৃত্ব নির্বাচনের ভিত্তি

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জাতীয় কাউন্সিলই হোক নেতৃত্ব নির্বাচনের ভিত্তি

আগামী ২২ ও ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল। এরই মধ্যে দলটির বয়স ৬৭ বছর পার হয়েছে।

দীর্ঘ সময়ে দলটি নানা অনুকূল ও প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক অর্জন রয়েছে দলের। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকের সংখ্যা অনেক বেশি। বিশেষ করে একটানা সাড়ে সাত বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকায় দলটির পরিপক্বতা বেড়েছে যথেষ্ট। অন্যদিকে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশাও বেড়েছে দলটির কাছে। সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগপ্রধানের বৈশ্বিক খেতাব অর্জন, সাফল্য ও অসামান্য ভূমিকায় দলের উচ্চতার পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে দেশের ভাবমূর্তি। আওয়ামী লীগের নাম-পরিচয় এখন শুধু দেশে নয়, বিদেশেও উজ্জ্বল। এসব কারণেই দলীয় নেতাকর্মীদের বাইরে আপামর জনসাধারণের একটি বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে দলের কাউন্সিলের দিকে। বিশেষ করে গঠনতন্ত্র ও নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না সেদিকে সবারই নজর। আসন্ন ২০১৯ সালের নির্বাচনের কারণেও কাউন্সিলটি গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণত বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় দলের কাউন্সিল এবং সরকারি দলে থাকা অবস্থায় কাউন্সিলের গুরুত্ব সম্পূর্ণ আলাদা। আসন্ন এই কাউন্সিলে দলের যে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে, সেই নেতৃত্বের হাতেই অর্পিত হবে সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি ও রণকৌশল। সংগত কারণেই আওয়ামী লীগের আসন্ন জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে দুটি কথা লেখার চেষ্টা করছি।

দলের প্রধানের অসামান্য ভাবমূর্তি, সরকার পরিচালনায় দলীয় দক্ষতার স্বাক্ষর প্রভৃতি মিলিয়ে দলের জাতীয় কাউন্সিলে নেতা নির্বাচনের বিষয়টি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য ও চিন্তাযোগ্য। দলের প্রধান কে হবেন এমন চিন্তার অবকাশ নেই। কারণ একজন সফল বিশ্বমানের নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রধান দেশরত্ন শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। এ কারণে এ পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অচিন্তনীয়। উল্লেখ্য, গত ২ তারিখের সংবাদ সম্মেলনে প্রসঙ্গ কথায় আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের প্রধানের পদে না থাকার উদার দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেন। তবে তাঁর নেতৃত্ব দল এবং দেশের জন্য প্রয়োজন রয়েছে, এমন বোধটি সবারই ন্যায্যভাবে রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাধারণ সম্পাদক, প্রেসিডিয়াম সদস্য, যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক। সাধারণত সবার দৃষ্টি এসব পদের দিকে। গণমাধ্যম বিশ্লেষণে কে হচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক এমন প্রশ্নটি বেশি চোখে পড়ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই অন্যান্য পদের দিকেও দলের নেতাকর্মীদের দৃষ্টি রয়েছে। আমি বরাবরই দেখেছি এবং এর আগে এ বিষয়ে লিখেছি যে তত্ত্বগতভাবে নেতা নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক যোগ্যতা, দক্ষতা, অবদান, ব্যক্তিগত ইমেজ, কাজকর্মে স্বচ্ছতা, পারিবারিক ঐতিহ্য, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, দলের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা, দলের অভ্যন্তরীণ, জাতীয় ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের সমন্বয়েই দলের কাউন্সিলে নেতা নির্বাচনের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উল্লিখিত নির্দেশকগুলোর আওতায় না পড়লে উপমহাদেশের বৃহৎ এই দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া অত্যন্ত কঠিন। আবার তেমনটি হওয়াও উচিত নয়।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যাত্রায় আওয়ামী লীগের যে পরিপক্বতা এসেছে, তা থেকে অনুমান করতে কষ্ট হবে না যে আগামী দিনে দলের জন্য যথাযথ নেতৃত্বই নির্বাচিত হবে। দলে এমন কোনো নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা ঠিক হবে না, যার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কালিমাযুক্ত। কিংবা দলে হাইব্রিড হিসেবে পরিচিত। সবার প্রত্যাশা অনুযায়ী দলে ত্যাগী নেতাদের বিশেষ স্থান তৈরি হওয়ার যথাযথ ন্যায্যতা রয়েছে। সবারই ধারণা, আওয়ামী লীগের আসন্ন জাতীয় কাউন্সিল হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য মাইলফলক। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ দলের জাতীয় সম্মেলন নিয়ে বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবারের সম্মেলন হবে ভিন্ন ধাঁচের। দলের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরার পাশাপাশি থাকবে নানা চমক। বিভিন্ন সূত্র থেকে অনুমান করা যাচ্ছে, আগামী সম্মেলনের মূল টার্গেট দলকে সর্বাত্মক গোছানো। এ কারণে আসন্ন কাউন্সিলে জাতীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে আঞ্চলিক বিষয়টিও বিশেষ নজরে আসবে।

নেতা নির্বাচনের মাপকাঠি বিবেচনায় অনেক আঞ্চলিক পর্যায়ের নেতা হলেও জাতীয় নেতৃত্বের যোগ্যতা, দক্ষতা কিংবা ইমেজ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ না করলেই নয় যে রাজশাহী অঞ্চলের নেতা এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, যিনি বর্তমানে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সদস্য। নেতা নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য মাপকাঠির কোনোটিতেই তিনি পিছিয়ে নেই। অবশ্য জাতীয় কাউন্সিলের সময় নির্ধারণের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার বিষয়ে খায়রুজ্জামানের নাম শোনা যাচ্ছে। গণমাধ্যমে যাঁদের নাম প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের অনেকেই খুব যৌক্তিকভাবে পদাসীন হওয়ার মতো। উল্লেখ্য, পূর্বোল্লিখিত রাজনৈতিক যোগ্যতা, দক্ষতা, অবদান, ব্যক্তিগত ইমেজ, কাজকর্মে স্বচ্ছতা, পারিবারিক ঐতিহ্য, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, দলের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা, দলের জাতীয় ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের সমন্বয় প্রভৃতির মাপকাঠিতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের অবস্থান স্পষ্ট। অত্যন্ত ক্লিন ইমেজের এই নেতা দীর্ঘদিন থেকে দলের শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তৃণমূল পর্যায়ে দলের নেতৃত্ব বিবেচনা করলে জাতীয় চার নেতার অন্যতম ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা কামরুজ্জামানের ছেলে খায়রুজ্জামানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার প্রোফাইল নিয়ে নতুন করে ভাবনার কিছু নেই। কিন্তু বিভিন্ন অজানা কারণে রাজশাহীবাসীর প্রাণের নেতা হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন কেন্দ্রে সদস্য পদ অলংকৃত করে আছেন।

গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি, নেতা নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি বিবেচনায় রেখেই দলীয় পদ-পদবিতে উল্লেখযোগ্য রদবদলের সম্ভাবনা রয়েছে এবারের কাউন্সিলে। দলের নেতাদের বিগত দিনের কর্মকাণ্ড চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই জাতীয় কাউন্সিলে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবেন।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতার তৃণমূলের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। অনেক পুরনো আদর্শবান ও পরীক্ষিত নেতারা এখনো দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। অনেক হাইব্রিড এখন পদে আছেন। আওয়ামী লীগের আসল, পরীক্ষিত ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসীদের মধ্যে অনেকেই যথাযথ ন্যায্যতার বাইরে রয়েছেন। আগামী জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে এসব ত্যাগী ও পরীক্ষিতের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার যৌক্তিকতা রয়েছে। তা না হলে সুযোগসন্ধানী, সুবিধাবাদী ও অন্য দল থেকে আওয়ামী লীগে আসা তথাকথিত হাইব্রিড নেতাদেরই একসময় দলের ভেতরে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার আশঙ্কা থেকে যাবে। কাজেই এখনই সময় যথাযথ মাপকাঠিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করা।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com


মন্তব্য