kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ

মামুনুর রশীদ

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ

হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ

কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,

সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ

জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে।

সুকান্ত কবিতায় কেন একদিকে হিমালয়, অন্যদিকে সুন্দরবনকে চিহ্নিত করলেন? হয়তো সেই সময়ে কাকদ্বীপের রক্তক্ষয়ী গণ-আন্দোলন এই কিশোর কবির মনে একটা গভীর ছাপ ফেলেছিল।

কিন্তু বিষয়টা তো তা-ই—বাংলাদেশের সীমান্তের শেষটাই তো সুন্দরবন, অসংখ্য ম্যানগ্রোভ, নানা রকমের গাছগাছালি ও বন্য প্রাণী নিয়ে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। বঙ্গোপসাগর থেকে প্রবল জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় যখন আঘাত হানে তখন তার প্রথম ঝাপটাটা যায় সুন্দরবনের ওপর। সুন্দরবন কী প্রবল শক্তি নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, বাঁচায় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে। দেশভাগের সময় র্যাডক্লিফ এক প্রবল নিষ্ঠুরতায় সুন্দরবনটাকেও ভাগ করে ফেলেছে। তার পরও সুন্দরবন সারা পৃথিবীকে আকৃষ্ট করেছে, স্থান করে নিয়েছে World Heritage-এর মধ্যে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় সুন্দরবন মুক্তিযোদ্ধাদের একটা করিডর হিসেবেও কাজ করত। একেবারেই বাল্যকাল থেকে সবারই আগ্রহ থাকে—সুন্দরবন কেমন? সেই আবাল্যের আগ্রহ থেকেই একদা সুন্দরবনের ওপর কৌতূহলটা প্রবল হয়ে উঠল। দেখলাম, কল্পনার চেয়েও সে অনেক বিচিত্র, প্রকৃতির এক বিস্ময়। হাজার হাজার খাল, দুই পাশে ঘন বন। শতবর্ষী বৃক্ষরাজির ঘন বনের ভেতর বসবাস বহু বিচিত্র প্রাণিকুলের। পৃথিবীর অন্যতম ব্যাঘ্র প্রজাতি রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং চিত্রা হরিণের পদচিহ্নে ধন্য সুন্দরবন। গত শতাব্দীর শেষের দিকে সংবাদ আসে—রয়েল বেঙ্গল টাইগার কমে যাচ্ছে। কোনো স্বাভাবিক মৃত্যুর কারণে নয়, বনরক্ষক ও অসাধু প্রাণী ব্যবসায়ীদের কারণে। ওই যে হাজার হাজার খাল যেখানে, চারবার জোয়ার-ভাটা হচ্ছে, সেখানেও আছে উন্নত প্রজাতির কুমির আর বহু ধরনের মত্স্যসম্পদ। এসব রক্ষায় নিয়োজিত আছে বন বিভাগ। বন বিভাগের এই রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনে অবশ্যই ব্যবস্থা অপ্রতুল। তাই বন্য প্রাণীরাই রক্ষা করে আসছে এই বিশাল সম্পদ। এই বিপুল সম্পদের রক্ষাব্যবস্থা দেখে একদা শঙ্কিত হয়েছিলাম। মধুপুর পাহাড় ও বনভূমি দেখেছি বাল্যকালে এক সুগভীর অন্ধকারাচ্ছন্ন, যা প্রাণিসম্পদে ভরপুর। একই জীবনে মাত্র যৌবনে এসে দেখলাম তা শূন্য হয়ে গেছে। সমতলভূমিতে খাঁ খাঁ করছে। যে মধুপুরের ভেতর দিয়ে পঞ্চাশের দশকে একটি বাস অতিক্রম করত ভয়ে জানালা-দরজা বন্ধ করে, সেই পথের দুই ধার ফাঁকা। উধাও হয়েছে হাতি, বাঘ, বন্য শূকর, বানরসহ নানা ধরনের প্রাণী। সুন্দরবন সেই রকম ফাঁকা হয়নি—এটা সুসংবাদ। কিন্তু বন্য প্রাণী ও গাছগাছালি কমেছে। মত্স্যসম্পদ নানা ধরনের দুর্ঘটনায় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। সুন্দরবনের বন-বনানী গড়ে উঠেছে একেবারেই প্রাকৃতিক নিয়মে। ধ্বংসও হয় প্রাকৃতিক কারণেই। ইটের ভাটার বিপজ্জনক ধোঁয়া, কলকারখানার বর্জ্য বিপুলভাবে এই ধ্বংসে ইন্ধন জোগায়। সম্প্রতি রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ সেই বিপর্যয়ের মুখে নিয়ে আসবে। বিদ্যুৎ আমাদের প্রয়োজন। লেনিন বিপ্লবের পর বলেছিলেন, এখন বিপ্লব মানে পাওয়ার, পলিটিক্যাল পাওয়ার নয়, Electrical Power—মানে বিদ্যুৎ। রাশিয়ায় বিদ্যুতায়ন তখন জরুরি বিষয়। বাংলাদেশেও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। তার জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রয়োজন। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে গিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশে বিপর্যয় ঘটেছে। জলবিদ্যুৎ নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্রণী চীন এখন ভুল বুঝতে পেরেছে। পাকিস্তান আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্লাবিত করে, মানুষজন-প্রাণিকুলকে ধ্বংসের মুখোমুখি করে কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল। সেখান থেকে তৈরি বিদ্যুৎ আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? বরং এক চিরস্থায়ী রাজনৈতিক সমস্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। চীন ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ করছে। তাতে ভারত-বাংলাদেশ সবাই আক্রান্ত হয়ে পড়বে। ভারত রীতিমতো শঙ্কিত। আবার ভারত সরকারই তার দেশে পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প করে বহু মানুষকে গৃহহীন করেছে। সেখানে সরকারের সঙ্গে ওই জনগোষ্ঠীর এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। ভারত সরকার সেই আমলে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছিল, যখন পূর্ব পাকিস্তান ছিল এবং এই বাঁধ দিয়ে পশ্চিমাঞ্চলে পাকিস্তানের দেওয়া বাঁধগুলোর পানি আদায়ের জন্য একটা চাপ সৃষ্টি করার মানসে। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার পর এই বাঁধের কার্যকারিতা থাকার কথা নয়। তবু আছে এবং দরকষাকষি নিয়েই আছে। এই বাঁধের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিহারসহ পশ্চিমবঙ্গও আক্রান্ত হচ্ছে। প্রযুক্তিতে উন্নত দেশ জাপান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপর্যয় ঠেকাতে পারেনি। একটি জনপদ প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছে।

পৃথিবীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। সেই জ্ঞানই আজকের দিনে সবাই কাজে লাগাচ্ছে।

সুন্দরবনের বনরাজি এখনো নিবিড়। এপ্রিল থেকে নভেম্বরের মধ্যে সুন্দরবনের তাপমাত্রা থাকে অসহনীয়। এই তাপমাত্রার সঙ্গে যদি মাত্র বারো কিলোমিটার দূরের তাপ যুক্ত হয়, তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়াবে? দিনের পর দিন, বছরের পর বছর তাপ নিঃসরণ ও কয়লার বর্জ্য—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা অনুমান করা যায় এখনই। কেউ কেউ বলছেন, তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুন্দরবনে যে বিপুল পরিমাণ তেল পানিতে মিশে আছে, তার জন্য কী ব্যবস্থা নিতে পেরেছে কর্তৃপক্ষ? তাই প্রকৃতির ওপর বিষয়টি ছেড়ে দিয়ে দূরে কোথাও, নিরাপদ স্থানে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সরিয়ে নিলে কী হবে? সুন্দরবন বাঁচবে, বাঁচবে সুন্দরবনের বনজ সম্পদ, প্রাণিকুল আর বাঁচবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষ, যার মধ্যে আছে বাওয়ালি, মৌয়াল ও ছোট ছোট মত্স্যজীবী।

লেনিন ও তাঁর পরে স্তালিনও ভেবেছেন, বিদ্যুৎ একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মানবকল্যাণের জন্য প্রাথমিক ও জরুরি পদক্ষেপ। রাশিয়ার উন্নয়নের চাবিকাঠি বিদ্যুৎ। বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে চলেছে শিল্পায়নের দিকে, তাতে তার বিদ্যুৎ লাগবেই এবং বর্তমান সরকার খুব জরুরিভাবেই বিষয়টি গ্রহণ করেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের বিবেচনাও জরুরি।

এই গ্রহ রক্ষার জন্য আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পরিবেশ। পশ্চিমা বিশ্ব প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট করে, যুদ্ধ বাধিয়ে বায়ুমণ্ডলকে ধ্বংস করেছে—এখানেও তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। চীনে ব্যাপক শিল্পায়ন হচ্ছে; কিন্তু পেইচিং শহরে মুক্ত বায়ু কিনে নাকে লাগিয়ে মানুষ বাঁচতে চেষ্টা করছে। দিল্লিতে গাড়ি-ঘোড়া বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। আমাদের সৌভাগ্য যে এ দেশের তরুণরা পরিবেশ সচেতন হচ্ছে। সুন্দরবন রক্ষা আজ মুখ্য; কিন্তু আরো কাজ আছে। নদী রক্ষা, জলাভূমি রক্ষা, বনভূমি রক্ষা—এসব বিষয় নিয়েও মানুষ সচেতন হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পরিবেশ রক্ষায় নিয়োজিত এই দেশপ্রেমিকদের আন্দোলনে বাধা দেওয়া হচ্ছে প্রবলভাবে। সারা বিশ্বেই আজ পরিবেশবাদীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীটাকে বাঁচানোর এই লড়াইকে নিজ পথে চলতে দেওয়া উচিত। দমন-পীড়ন করে এই আন্দোলন ঠেকানো যাবে না। কারণ এখানে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের কোনো ক্ষমতা বা রাজনীতির উচ্চাভিলাষ নেই, নিছক দেশপ্রেমের জন্যই তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়ছেন।

বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাম্রাজ্যবাদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করছেন নিজস্ব অর্থায়নে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছেন, তাঁদের শত তদবির সত্ত্বেও। তাই এই কাজটি করা তাঁর জন্য কঠিন কোনো কাজ নয়। সুন্দরবন যদি সুরক্ষা পায়, তবে অনাগত কালের মানুষ স্মরণ করবে তাঁদের পূর্বপুরুষদের, যাঁরা একটি চমৎকার উপহার দিয়ে গেছেন তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে। সুকান্তের কবিতা দিয়েই শেষ করি—

সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী

অবাক তাকিয়ে রয় :

জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার

তবু মাথা নোয়াবার নয়।

 

লেখক : নাট্যজন

mamunur530@gmail.com


মন্তব্য