kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পবিত্র কোরআনের আলো

সমাজ উন্নয়নে নাগরিকের দায়িত্ব

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সমাজ উন্নয়নে নাগরিকের দায়িত্ব

১১৭. তোমার প্রতিপালক এমন নন যে তিনি অন্যায়ভাবে জনপদগুলো ধ্বংস করে দেবেন, অথচ সেখানকার জনগণ সত্কর্মশীল (সমাজ সংস্কারে নিয়োজিত)। [সুরা হুদ, আয়াত : ১১৭ (প্রথম পর্ব)]

তাফসির : আগের আয়াতে বলা হয়েছিল, বিবেকবানরা যথাযথ দায়িত্ব পালন না করলে সমাজের ধ্বংস অনিবার্য।

আগের বহু জাতি এ জন্য ধ্বংস হয়েছিল যে তাদের শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেননি। আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ অকারণেই কোনো জাতিকে ধ্বংস করেন না। আল্লাহর নিয়ম হচ্ছে, তিনি শুধু জালিম ব্যক্তি, সমাজ ও সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে দেন। কিন্তু যে সমাজে ইনসাফ ও ন্যায়নীতি বিদ্যমান, যেখানে মানুষ একে অন্যকে ভালোবাসে, পরস্পর পরস্পরের মঙ্গল চিন্তা করে, সেই সমাজকে আল্লাহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন। এমন সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন দেশপ্রেম, দেশের নাগরিকদের দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব। দেশের রূপ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ সংরক্ষণে একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) অহেতুক গাছপালা কর্তন, জনগণের চলার পথে প্রবহমান পানিতে মলমূত্র ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। বনায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘কেয়ামত হয়ে যাবে, এটা যদি আগেভাগে অনুমান করতে পারো, তাহলেও হাতে রক্ষিত গাছের চারা রোপণ করে দাও। ’

জাতীয় অখণ্ডতা ও স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেওয়া নফল ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াব। ‘আত-তারগিব ওয়াত তারহিব’ নামক গ্রন্থে মহানবী (সা.)-এর একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সেখানে তিনি বলেন, ‘লাইলাতুল কদরের চেয়ে আরো একটি পুণ্যময় রাতের খবর তোমাদের দেব কি?’ সাহাবায়ে কেরাম জবাব দেন, ‘বলুন ইয়া রাসুলুল্লাহ!’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘কোনো সৈনিক রাতে এমন কোনো কঠিন ভীতিপ্রদ চৌকিতে দাঁড়িয়ে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে শত্রুর উদ্ধত অস্ত্রের আঘাতে তার বক্ষ বিদীর্ণ হতে পারে এবং জীবনে আর স্ত্রী-সন্তানের মুখ দেখার সুযোগ নাও আসতে পারে—সে রজনী লাইলাতুল কদরের চেয়েও বেশি বরকতপূর্ণ। ’

বৈদেশিক আগ্রাসী শক্তির উদ্ধত থাবা গুঁড়িয়ে দিতে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও সর্বস্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হয়। এ দায়িত্ব ও ঔচিত্যবোধ থেকে মহানবী (সা.) মদিনা প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রায় ২৭টি যুদ্ধে সশরীরে অংশ নেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। এসব যুদ্ধ ‘গাজওয়া’ নামে খ্যাত।

ক্ষুদ্র স্বার্থ ও ব্যক্তিগত কল্যাণের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় স্বার্থ ও সামষ্টিক কল্যাণ যখন নাগরিকের মনে বড় হয়ে ওঠে তখন জ্বলে ওঠে দেশাত্মবোধের অনির্বাণ শিখা। ধর্ম, দেশ ও জাতি যখন বহিঃশত্রুর আগ্রাসনের শিকার হয় তখন গোটা জাতির দেশপ্রেম জেগে ওঠে, তারা প্রতিরোধ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রাণ উৎসর্গ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না।

দেশপ্রেমিক নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক। প্রধান কর্তব্য হচ্ছে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা। রাষ্ট্রের সংবিধান, প্রচলিত আইন ও বিধি মেনে চলা। রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস ‘কর’ আদায়ে সচেষ্ট থাকা। নাগরিকের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করা। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সহযোগিতার মনোভাব। ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা, নিজস্ব কৃষ্টি ও মূল্যবোধ চর্চা, সন্ত্রাস ও অন্যায় প্রতিরোধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব ইত্যাদি। এক কথায় সৎপথে জীবন পরিচালিত করে সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা নাগরিকের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য