kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পবিত্র কোরআনের আলো

বিবেকবানরা দায়িত্ব পালন না করলে সমাজের ধ্বংস অনিবার্য

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বিবেকবানরা দায়িত্ব পালন না করলে সমাজের ধ্বংস অনিবার্য

১১৬. তোমাদের আগের জাতিগুলোর মধ্যে এমন সজ্জন (বিবেকবান) কেউ ছিল না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে বাধা দিত। তবে মুষ্টিমেয় লোক ছিল, যাদের আমি তাদের মধ্য থেকে রক্ষা করেছি।

পাপীরা তো যার মধ্যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পেত, তারই অনুসরণ করত (ভোগবিলাসে মত্ত ছিল)। আর তারা ছিল অপরাধী। (সুরা : হুদ, আয়াত : ১১৬)

তাফসির : আগের আয়াতগুলোতে মুসলমানদের তাদের বিশ্বাস ও নীতির ওপর অবিচল থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যথাযথভাবে ইবাদত-বন্দেগি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। আলোচ্য আয়াতে সমাজের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত ব্যক্তিদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে তাঁরা হলেন জাতির বিবেক। তাঁদের উচিত সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সুসংগঠিত করা। আয়াতে এটাও বলা হয়েছে যে সব সময়ই সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিজেদের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সচেষ্ট ছিল। সমাজকে পরিশুদ্ধ করার কাজে তারা তত্পর ছিল। কিন্তু পার্থিব ভোগবিলাসিতা যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, তাদের পক্ষে জুলুম ও অপরাধের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয় না। আশ্চর্য হলো, সব যুগের বেশির ভাগ মানুষ অর্থবিত্ত ও ভোগবিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিয়েছে। সমাজের শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীরা অর্থবিত্তের কাছে নিজেদের বিবেক বিক্রি করে দিয়েছে। সমাজের সংকটকালেও তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে ক্রমান্বয়ে সমাজ অবক্ষয় ও অধঃপতনের দিকে ধাবিত হতে থাকে।

কোনো জাতির আর্থসামাজিক উন্নতি ও সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষা। মানুষের ওপর আল্লাহর যত নিয়ামত ও অনুগ্রহ রয়েছে, শিক্ষার নিয়ামতকে পবিত্র কোরআনে সবার ওপর স্থান দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘দয়াময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে। তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে। ’ (সুরা : আর রাহমান, আয়াত : ১-৪)

বিশ্বমানবতার মুক্তির উদ্দেশ্যে উচ্চারিত ইসলামের প্রথম আহ্বান হলো, ‘পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো, তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান দান করেছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানত না। ’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ১-৫)

শিক্ষিত মানুষ সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। শিক্ষার আলোয় যিনি নিজেকে আলোকিত করেছেন, সবাই তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। ইসলামও তাঁকে সম্মানের আসনে সমাসীন করেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। ’ (সুরা : মুজাদালা, আয়াত : ১১)

কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে যে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো, নিজেও সৎ ও সত্যের পথে চলা, সমাজকেও সৎ ও সত্যের পথে পরিচালিত করা। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের সবার একসঙ্গে অভিযানে বের হওয়া সংগত নয়। তাদের প্রতিটি দলের একটি অংশ বের হয় না কেন, যাতে তারা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান অনুশীলন করতে পারে। আর যাতে তারা স্বজাতিকে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে। আশা করা যায়, এতে তারা সতর্ক হবে। ’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১২২)

সমাজে বিজ্ঞ ও শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বেশি। মানুষকে সঠিক পথের দিশা তাঁরাই দিতে পারেন যাঁরা নিজেদের জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করতে সক্ষম হয়েছেন। সমাজের বিজ্ঞ ও শিক্ষিত মানুষ যদি তাঁদের এই মহান দায়িত্বের ব্যাপারে অবহেলা করেন, তাহলে সমাজের বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই অবহেলার কারণে অতীতে অনেক জাতি ধ্বংস হয়েছে।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য