kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাকিস্তান এখন সার্কের ‘বিষফোড়া’

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিরোধপূর্ণ এলাকায় যখন ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক (নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা) চলছিল গত বুধবার—একই দিন পাকিস্তানের পশ্চিমের বেলুচিস্তান প্রদেশসংলগ্ন সীমান্ত থেকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে মর্টার সেল ছুড়ছিল ইরানের বর্ডার গার্ড সেনারা। এতে একজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাকিস্তানকে সতর্ক করার এক মাসের মধ্যে এই মর্টার হামলা। ইরানের অভিযোগ, পাকিস্তান তার দেশে সুন্নি জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যারা পরে ইরানের বিভিন্ন এলাকায় নাশকতা করছে। গত বছর এ অভিযোগে ছয়জন পাকিস্তানি জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে ইরান।

একই দিনে দুই দেশের পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে হামলার ঘটনায় বোঝা যায়, কালের পরিক্রমায় পাকিস্তান বর্ডার দূরের ও কাছের প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তান সার্কের জন্যও এখন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। সার্কভুক্ত অন্তত তিনটি দেশ—বাংলাদেশ, ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে এখন চরম শীতল সম্পর্ক যাচ্ছে পাকিস্তানের। বিশ্লেষকদের মতে, এ জন্য পাকিস্তানই দায়ী। এখন ভুক্তভোগী দেশগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে পাকিস্তানকে সার্ক থেকে বাদ দেওয়ার আওয়াজও উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, উপমহাদেশে জঙ্গি তৈরি, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন করে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় লিপ্ত পাকিস্তান। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও পাকিস্তান সব সময় হস্তক্ষেপ করে আসছে। এ দেশে জঙ্গি বিস্তারেও পাকিস্তানের ব্যাপক ভূমিকা যে রয়েছে তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক আগে থেকেই বলে আসছে।

ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাংবাদিক রাজীব শর্মার মতে, দেরিতে হলেও ভারত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ঘটনাটি গত ১৮ সেপ্টেম্বর জঙ্গিরা কাশ্মীরের উরি এলাকায় এক সেনা ছাউনিতে হামলার পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে মনে করছেন তিনি। উরির ঘটনায় ভারতের ১৯ সেনা সদস্য নিহত হয়। এ ঘটনায় স্পষ্টই পাকিস্তানকে দোষারোপ করে ভারত। এর আগেও ভারতে গত ১০ বছরে ১০টির বেশি জঙ্গি হামলা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ সিএনএনের কাছে বলেছেন, ভারতের এই হামলা ছিল বিনা প্ররোচনায়, যা নগ্ন আগ্রাসনের শামিল। কিন্তু ডিপ্লোম্যাটিক কথা বলে নওয়াজ শরিফ যতই আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা পাওয়ার চেষ্টা করুন; তিনি ক্ষমতায় থাকার সময়গুলোয়ই ভারত ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোয় সবচেয়ে বেশি হস্তক্ষেপ করে আসছে পাকিস্তান। প্রতিবেশী এই দুই দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি নষ্টে সব সময়ই সচেষ্ট রয়েছে পাকিস্তান। বিশেষ করে ভারতের জম্মু কাশ্মীরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলা করতে তাঁর দেশের তত্পরতা চোখে পড়ার মতো। একইভাবে বাংলাদেশের  অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো তো পাকিস্তানের পুরনো স্বভাব। একসময় যারা বাংলাদেশকে স্বীকারই করত না সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে পাকিস্তানের অবস্থান তো স্পষ্টই। বাংলাদেশের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকেও পরোক্ষভাবে মদদ দিয়ে আসছে পাকিস্তান। প্রতিবেশী এ দুই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা অস্থিতিশীল করতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সকে (আইএসআই) ব্যবহার করে আসছে। তারা জঙ্গি তৈরি ও তাদের অর্থ-অস্ত্র দিয়ে দেশ দুটিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় লিপ্ত। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের জম্মু কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় এক সেনা শিবিরে হামলাও ছিল এরই ধারাবাহিকতার অংশ।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘ইউরেশিয়া রিভিউ’ নামে নিরাপত্তা বিশ্লেষণবিষয়ক জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৯৭২ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো আইএসআইকে দিয়ে পাশের দেশগুলোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর থেকে বাংলাদেশে আইএসআইয়ের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয় এবং এই নেটওয়ার্কই ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার পাশাপাশি ভারতবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম কাজ ছিল প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। একই সঙ্গে জঙ্গি তৈরিতে অর্থায়ন ও মদদ দিয়ে দেশ দুটির মধ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজমান রাখা। দেশগুলোয় ইসলামী মৌলবাদ বিকশিত করতে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন—সবই করেছে পাকিস্তান। ১৯৯১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে হারাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ কোটি রুপি দিয়েছিল আইএসআই। আর বিএনপির ঘনিষ্ঠ সহচর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তো পাকিস্তানের নিবিড় সম্পর্ক সেই ১৯৭১ সাল থেকেই। দেশকে মেধাশূন্য করতে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে পাকিস্তান। কথিত আছে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকেও পাকাপোক্তভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল আইএসআই। শুধু জঙ্গি দিয়ে নয়, পাকিস্তান সুকৌশলে এ দেশে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতেও সচেষ্ট।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অন্য একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার ষড়যন্ত্র কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের উচিত বিষয়টি স্পষ্ট করা এবং তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া। তিনি বলেছেন, ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আসা উচিত। তাঁর মতে, এভাবে পরস্পর গোলাগুলি করতে করতে যদি যুদ্ধ বেধে যায়, তাতে বাংলাদেশও ভুক্তভোগী হতে পারে। ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ। কাজেই দুটি দেশকেই সংযত থাকার পরামর্শ দেওয়া উচিত বাংলাদেশের।

লেখক : সাংবাদিক


মন্তব্য