kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হক চাচার দুটি অন্তিম স্বপ্ন পূরণ হলো না

শাইখ সিরাজ

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



হক চাচার দুটি অন্তিম স্বপ্ন পূরণ হলো না

আমার জন্ম ১৯৫৪ সালে। সে হিসাবে এখন বয়স ৬২ পেরিয়ে ৬৩ বছরে পড়েছে।

পঞ্চাশের দশকের ঢাকা আর আজকের ঢাকার মধ্যে তফাত আকাশপাতাল। তখন সন্ধ্যা নামলেই ঢাকা পরিণত হতো এক নিভৃত পল্লীতে। বিশেষ করে আমাদের খিলগাঁও গাছগাছালিতে পূর্ণ একটি এলাকা হিসেবে গ্রামের অনুভবটাই ছিল বেশি। বাল্যবেলার স্মৃতি খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে কোথাও বিয়ে হলে মাইকে কলের গান বাজত। বিয়ের অনুষ্ঠান হতো দিনের বেলায়। আগের রাতে দূর থেকে ভেসে আসত গান। বিয়েবাড়ির আনন্দ-আয়োজন ছড়িয়ে যেত সারা এলাকায়। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাজতে থাকত গান। এটিই ছিল সে সময়ে আদি ঢাকাইয়াদের আচার-অনুষ্ঠানের ধরন। সবখানে বিদ্যুৎ ছিল না। অনেক দূরে দূরে আলো জ্বলত। রাতে যখন ঘুমাতাম, দূর থেকে আলো-আঁধারি ভেদ করে ভেসে আসত গান ‘নিঝুম সন্ধ্যায়, ক্লান্ত পাখিরা বুঝিবা পথ ভুলে যায়’, ভেসে আসত ‘এমন মজা হয় না, গায়ে সোনার গয়না, বুবুমণির বিয়ে হবে, বাজবে কত বাজনা’র মতো গানগুলো। এই গানগুলো তখন খুব টানত। রাতে শুয়ে দূরের ভেসে আসা এসব গান শুনে শুনেই মুখস্থ হয়ে যেত। গানগুলোর কথা, সুর এত সুন্দর যে সেই সময়কার গানগুলো এখনো মনে দাগ কেটে আছে। কে লিখেছে, কে গেয়েছে, কোন সিনেমার গান—এসব প্রশ্নের ধার ধারতাম না। গান শুনতাম ভালো লাগত। মনের ভেতরটা কেমন করে উঠত। কৈশোরে যখন সিনেমার প্রতি কৌতূহল জাগতে লাগল, রেডিও শুনি, শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যখন একটু একটু করে মিশতে শুরু করেছি তখন আস্তে আস্তে জানছি, ‘নিঝুম সন্ধ্যায় ক্লান্ত পাখিরা’ গানটি গেয়েছেন লতা মুঙ্গেশকর। ‘এমন মজা হয় না, গায়ে সোনার গয়না’ জানলাম গানটি একটি সিনেমার গান। ‘সুতরাং’ ছবির গান। ছবিটি পরিচালনা করেছেন সুভাষ দত্ত, নায়িকা কবরীর এটি প্রথম ছবি।

স্কুলের শেষ দিকে যখন আমরা একটু পাকনা হয়ে উঠছি, রীতিমতো বন্ধুরা মিলে সিনেমা হলে যাওয়া শুরু করেছি। ষাটের দশকের শেষ দিকের কথা। সেই তারুণ্য ছুঁই ছুঁই বয়সে সিনেমা দেখে দেখে নিজেকে সিনেমারই একজন হিসেবে ভাবতে শুরু করেছি। যারা অভিনয় করে, যারা গান গায়, যারা চলচ্চিত্র বানায়, গান লেখে তাদেরই মতো একজন। যা দেখি তার মধ্যেই ঢুকে পড়ে মন। সংস্কৃতির সব কিছুর প্রতি ভালো লাগা বাড়তে থাকে। একসময় বন্ধু হিসেবে ফরিদুর রেজা সাগরকে পেলাম। বেশ ঘনিষ্ঠতা হলো। সাগর সে সময় পুরোপুরি টেলিভিশনজগতের মানুষ। ছাত্র হলেও টেলিভিশনের সঙ্গে ওর নানা রকমের কাজ। নানা ব্যস্ততা। দেখেই ভালো লাগত। সাগরের বাবা ফজলুল হক নামকরা পরিচালক ও চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকার সম্পাদক, মা রাবেয়া খাতুন বিখ্যাত লেখক, কথাসাহিত্যিক। সব দিক দিয়েই সাগর সবার দৃষ্টি কাড়ে। কলেজ পেরিয়ে যখন আমরা পড়াশোনার ফাঁকে ‘খাবারদাবার’ নামের হোটেল চালাতে গেলাম তখনই একদিন সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে পরিচয়। তিনি সাগরের মা-বাবার বন্ধু। সাগরের প্রিয় ‘হক চাচা’। আমিও শুরু থেকেই ‘হক চাচা’ হিসেবেই পরিচয় করে নিলাম। সৈয়দ হক হয়ে উঠলেন আমার প্রিয় ‘হক চাচা’। পরিচয় হওয়ার পর এই হক চাচার পরিচয়টি যেন দিনে দিনে আমার কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করল। সেই যে ছোটবেলায় ঘুমাতে গেলে দূর থেকে মাইকে ভেসে আসত কলের গান ‘এমন মজা হয় না, গায়ে সোনার গয়না...’ সেই গানটির মতো আমার বহু চেনাজানা গানের রচয়িতা সৈয়দ শামসুল হক। তার আগে সেই ছোটবেলা থেকে এই মানুষটিকে জানতাম শুধু একজন কবি হিসেবে। ‘কবি’ বলতেই অন্য রকম এক অবয়ব চোখের সামনে ভাসত। পাঞ্জাবি পরা, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ অন্য রকম এক ভাবুক মানুষ। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক তেমন কবি নন। তিনি জিন্স প্যান্ট, জিন্স শার্ট, হাতে চেইন, ব্রেসলেট, গলায় চেইন, পায়ে বুট জুতার এক অন্য রকম মানুষ। আমার বন্ধু ইমদাদুল হক মিলনও সে সময় ছিল সৈয়দ হকের মতো। জিন্স প্যান্ট, শার্ট একেবারে ফিটফাট। খদ্দরের পায়জামা-পাঞ্জাবির লেখক সেও নয়। ভাবতাম এসব কেমন কবি-লেখক?

বাংলাদেশ টেলিভিশনে মাঝেমধ্যে দেখাসাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় হয়েছে সৈয়দ হকের সঙ্গে। আমরা নিজেরা যখন টেলিভিশন করতে এলাম অর্থাৎ চ্যানেল আই যখন শুরু হচ্ছে তখন তিনি হয়ে উঠলেন আমাদের আত্মার আত্মীয়। প্রতিদিন তাঁর সঙ্গে টেলিভিশন চ্যানেল নিয়ে কর্মপরিকল্পনার মধ্য দিয়ে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগল। তিনি আমাদের নতুন এই উদ্যোগে একজন সবচেয়ে কাছের অভিভাবক হয়ে উঠলেন। গণমাধ্যমের বিভিন্ন শাখায় সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসা সৈয়দ হক আমাদের সামনে মেলে ধরলেন তাঁর অভিজ্ঞতার অনেক কিছু। আমরা প্রতিনিয়ত তাঁর কাছ থেকে গ্রহণ করতে থাকলাম ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তা। আমি সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিভিশনে কাজ করেছি। সাগর তার চেয়েও লম্বা সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে কাজ করে আসা একজন। কিন্তু নিজেরা নিজেদের প্রতিষ্ঠান গড়তে এসে সৈয়দ হককে পাশে পেলাম সত্যিকারের একজন শিক্ষকের মতো। আমাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তিনি গণমাধ্যমের কন্টেন্ট নির্মাণের বিশেষ কিছু দিক, বিশেষ করে গণমাধ্যমের শিষ্টাচারের বিষয়গুলো নতুনভাবে চিনিয়ে দিলেন। মনে পড়ে, হক চাচার সঙ্গে আমি পরিচালক হিসেবে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছিলাম। তার একটির কথা বিশেষভাবে বলতেই হয় ‘এবং সৈয়দ শামসুল হক’, যেটি সংবাদপত্রভিত্তিক সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান। সে সময়টায় আমাদের চ্যানেল আইয়ের সম্প্রচার সরাসরি বাংলাদেশ থেকে শুরু হয়নি। তিন-চার দিন আগে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠানের টেপ পাঠিয়ে দিতে হতো। এক সপ্তাহের সংবাদপত্রের রিভিউ নিয়ে অনুষ্ঠানটি হতো। কখনো এ অনুষ্ঠানে চিত্র ধারণ করেছি, ডেস্কে বসে সৈয়দ হক পত্রিকাগুলোর পর্যালোচনা করেছেন, আমি তন্ময় হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকেছি। একসময় বিদ্যুতের মতো আমার মনে পড়ে গেল, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ও তার পরবর্তী সময়ে আমার প্রিয় বিবিসি বাংলা বিভাগে আমি এই কণ্ঠ শুনেছি। আমি তখন নিয়মিত শুনতাম ‘বিবিসি লন্ডন থেকে সৈয়দ শামসুল হক বলছি’। মনে পড়ে তার আগে-পরে বিবিসিতে কাজ করেছেন শ্যামল লোদ, কমল বোস, সেরাজুর রহমান, শফিক রেহমান, তালেয়া রেহমান, নূরুল ইসলাম, মানসী বড়ুয়া—এই মানুষগুলো। মানসী বড়ুয়া এখনো কাজ করছেন। এই তো কিছুদিন আগে লন্ডনে বিবিসি বাংলা বিভাগে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখাও হয়। পরিপূর্ণ তারুণ্য নিয়ে অনেক কিছু জেনেবুঝে টেলিভিশন করতে এসেও সৈয়দ শামসুল হকের কাছে আমাদের অনেক কিছু শেখার ছিল। এই শেখা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যেমন, ব্যক্তিগতভাবেও। স্পষ্ট মনে আছে, তিনিই শিখিয়েছিলেন ‘শ’ ‘স’ ও ‘ষ’-এর সঠিক উচ্চারণ। তিনটি অক্ষর উচ্চারণের সময় মাইক্রোফোনের কোন অংশে কিভাবে মুখের বাতাস লাগবে তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন দারুণ কৌশলে। একটি ছোট্ট কাগজ ছিঁড়ে মুখের সামনে নিয়ে ‘শ’ উচ্চারণ করে দেখাতেন, কাগজ নড়লে উচ্চারণ একরকম, না নড়লে আরেক রকম। এত বছরের টেলিভিশনে আমাদের কেউ কিছু হাতেকলমে শেখায়নি। নিজে থেকেই শিখেছি। পরে কোনো কোনো জিনিস পদ্ধতিগতভাবে শিখিয়েছেন সৈয়দ হক। আমি যখন চ্যানেল আইয়ে সংবাদ উপস্থাপক ও অনুষ্ঠান উপস্থাপক ছেলেমেয়েদের নানা বিষয়ে গাইড করছি, আমিও সেই বিষয়গুলো শিখিয়েছি।

দিনে দিনে সৈয়দ হক সম্পর্কে যত জেনেছি ততই অভিভূত হয়েছি। সব সময়ই চলচ্চিত্রের গানের অনুরক্ত আমি। ষাট ও সত্তরের দশকের যেসব গান আমার প্রাণে গেঁথে আছে, যেমন সুতরাং ছবির ‘তুমি আসবে বলে’, ‘এই যে আকাশ, এই যে বাতাস’, একই অঙ্গে এত রূপ ছবির ‘জানি না সে হৃদয়ে কখন এসেছে/প্রাণের মাঝে দোলা দিয়েছে’, আয়না অবশিষ্ট ছবির ‘যার ছায়া পড়েছে, মনের আয়নাতে, ওগো তুমি নও’, ময়নামতি ছবির ‘অনেক সাধের ময়না আমার’, ‘ডেকো না আমারে তুমি’, বড় ভালো লোক ছিল ছবির ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, আশীর্বাদ ছবির ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’ এই গানগুলো সত্যি কালজয়ী গান। বাংলা চলচ্চিত্রের এই গানগুলো সবারই প্রাণে দোলা লাগায়। কিন্তু পাঠক সত্যি কথা বলতে, আমি যেমন দীর্ঘদিন টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত থেকেও জানতে পারিনি বা জানার প্রয়োজন মনে করিনি এই বিখ্যাত গানগুলোর রচয়িতা সৈয়দ শামসুল হক। এ কথা এ দেশের অনেক মানুষই জানে না। এমন অসংখ্য বিখ্যাত কবিতা, উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধের স্রষ্টা সৈয়দ শামসুল হক। আবার একাধারে সাংবাদিক, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক তিনি। এ দেশের চলচ্চিত্রের সূচনাপর্বে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। ষাটের দশকে অধুনা সাপ্তাহিক ‘চিত্রালী’র সহসম্পাদক হিসেবে কাজ করেন তিনি। পরে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে। এখানেও অর্জন করেন সর্বোচ্চ সাফল্য। ১৯৬৬ সালে তিনি উর্দুতে একটি ছবি পরিচালনা পর্যন্ত করেন ‘ফির মিলেঙ্গি হাম দোনো’। একজন মানুষের এত কাজ! আমাদের চলচ্চিত্রের এক অনবদ্য চিত্রনাট্যকার তিনি। ‘মাটির পাহাড়’, ‘ময়নামতি’, ‘বড় ভালো লোক ছিল’, ‘তোমার আমার ঠিকানা’, ‘নতুন দীগন্ত’, ‘কখগঘঙ’ এই চলচ্চিত্রগুলোর কোনোটির চিত্রনাট্য, কোনোটির সংলাপ রচনা, কোনোটির সংগীত রচয়িতা হিসেবে কাজ করেছেন সৈয়দ হক। সে কারণেই তো তিনি সব্যসাচী। যখন ‘নুরলদিনের সারাজীবন’ কাব্যনাট্য শুনি তখন সত্যি গায়ের রোম শিউরে ওঠে। যখন শুনি ‘আমার পরিচয়’ কবিতা, তখন মনে হয় বাঙালির এই পরিচয় আজও পর্যন্ত কেউ এত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেননি। বিশেষভাবে মনে পড়ে যে পঙিক্তগুলো :

এসেছি বাঙালি ক্ষুদিরাম আর সূর্যসেনের থেকে

এসেছি বাঙালি জয়নুল আর অবন ঠাকুর থেকে।

এসেছি বাঙালি রাষ্ট্রভাষার লাল রাজপথ থেকে

এসেছি বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর থেকে।

আমি যে এসেছি জয়বাংলার বজ্রকণ্ঠ থেকে

আমি যে এসেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে।

এসেছি আমার পেছনে হাজার চরণচিহ্ন ফেলে

শুধাও আমাকে “এতদূর তুমি কোন প্রেরণায় এলে?

তবে তুমি বুঝি বাঙালি জাতির ইতিহাস শোনো নাই—

‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। ”

সৈয়দ শামসুল হক বাংলার এক সার্থক লেখক। সাহিত্যের সব শাখায় তাঁর সরব বিচরণ। টানা প্রায় ৫০-৬০ বছর ধরে বাংলার সাংস্কৃতিক বিকাশের পথে তাঁর অবিরত পথচলা। তিনি একজন মাত্র ব্যক্তি। কিন্তু তাঁর কাজ ও বিচরণক্ষেত্র আমাদের বারবার অভিভূত করে, মুগ্ধ করে। তাঁর কাব্যনাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘আয়নাবিবির পালা’, ‘এক মুঠো জন্মভূমি’সহ অসংখ্য লেখনী এ দেশের জীবন ও সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।

আমার কাজের জায়গাটিতে আমি সৈয়দ হককে নানাভাবে আবিষ্কার করেছি। তাঁর অনেক কিছুই আমাকে আকৃষ্ট করেছে। আবার আমার কাজটিকেও নিবিড়ভাবে তিনি মূল্যায়ন করেন। একবার আমার অনুষ্ঠান হৃদয়ে মাটি ও মানুষ-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ পর্বটি ব্যতিক্রমভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হলো। মনে হলো, বিশেষ অনুষ্ঠানটি আমি নিজে উপস্থাপন না করে অন্য কেউ উপস্থাপন করলে সেটি নানা দিক থেকেই অর্থবহ হবে। কিন্তু উপস্থাপক কে হতে পারেন? ভাবতে ভাবতে কিছুটা জড়তা নিয়েই সৈয়দ হককে জানালাম। আমি জানি তিনি রুচির ব্যাপারে চুলচেরা। অনুষ্ঠানকে ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে তাঁর তুলনা নেই। তিনি নিজস্ব বিবেচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ দিয়ে যদি কোনো সিদ্ধান্ত বা মতামতে না পৌঁছেন, তাহলে কারো সাধ্য নেই তাঁকে একটি বিষয় চাপিয়ে দেয়। আমার প্রস্তাবটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন। ব্যাপক উৎসাহ নিয়েই বললেন, ‘তুমি যে ভেবেছ, এমন একটি বিষয় হতে পারে, এটিই বড় কথা। আমি অবশ্যই করব। ’ আমি বললাম, চাচা স্টুডিওতে নয়, গ্রামে যেতে হবে আমার সঙ্গে। তিনি অনুষ্ঠানটির চমৎকার উপস্থাপনা করলেন। মাঠে গিয়ে রীতিমতো অনুষ্ঠানটি নির্মাণের মূল দায়িত্বই নিয়ে নিলেন। কিভাবে করলে ভালো হয়, নিজের মতো করে সব কিছু সাজিয়ে নিলেন। ভেতর থেকে প্রাণ দিয়ে উপস্থাপনা করলেন। একদম নির্ভুল, প্রাঞ্জল ও উন্নত ভাষার বুনোনে ঠাসা সেই উপস্থাপনা। যখন অনুষ্ঠানটির ধারা বর্ণনার জন্য আরেক দিন তাঁকে স্টুডিওতে ডাকলাম, সেখানেও দেখলাম ধারা বর্ণনা দেওয়ার আগে তিনি প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে পাণ্ডুলিপিটি নিজের মতো করে আত্মস্থ করে নিলেন। কণ্ঠটি বারবার শানিয়ে নিলেন। নিজের মন ও মননের মধ্যে বাক্যগুলোকে গেঁথে নিলেন গভীরভাবে। এই বিষয়গুলোই গণমাধ্যমের প্রতি একজন কর্মী বা শিল্পীর দায়বদ্ধতা। এত বিষয়কে গভীরভাবে ধারণ করেন, পালন করেন বলেই তো তিনি সৈয়দ শামসুল হক।

আমার জন্মদিনের সময় একবার একটি সংকলন প্রকাশিত হলো। আমাকে নিয়ে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের লেখার সংকলন ‘সান অব দ্য সয়েল’। ওই সংকলনের জন্য হক চাচাও লিখলেন। এখানেও তিনি তাঁর স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখলেন। সবাই লিখলেন বড় বড় গদ্য, আর তিনি লিখলেন একটি চতুর্দশপদী কবিতা। শিরোনাম ‘তার জন্মদিনের জন্যে সনেট’। সেটির শেষ ছয়টি পঙিক্ত এ রকম :

‘যেন কারো জন্মদিন আজ এই সবুজ প্রান্তরে

যেন আজ ভোরে এক স্বপ্নময় কণ্ঠের উৎসব,

যেন তারই মুখখানি ঘিরে ওই পাখিসব ওড়ে,

যেন সে গাইছে বসে মাঠে মাঠে সবুজের স্তব।

ভোরের প্রথম আলো তারই জন্যে জন্মদিনে আজ—

যিনি এই মাটি আর মানুষের শাইখ সিরাজ। ’

সত্যি এ এক বিরল সম্ভাষণ। বিরাট উপহার ছিল আমার জন্য। বাংলা ভাষার অন্যতম শক্তিমান লেখকের কাছ থেকে পাওয়া এই উপহারের তুলনা হয় না।

গত বছরের কথা। ষাট-সত্তরের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের গাওয়া চলচ্চিত্রের গানগুলো নিয়ে এক অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলো। অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে আসবেন উত্তমের নায়িকা সুপ্রিয়া দেবী। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি অনবদ্য সংগীতসন্ধ্যার আয়োজন। উত্তমের গানে-বাদ্যে মনোমুগ্ধকর ওই আয়োজনের কথা ভাবতেই মাথায় এলো অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক হবেন সৈয়দ শামসুল হক। চিন্তা অনুযায়ী জানানো হলো চাচাকে। তিনি সাগ্রহে রাজি হলেন। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, অনুষ্ঠানটির যেমন উপস্থাপনা আমাদের স্বপ্নের মধ্যে ছিল, ঠিক তেমনটিই নিজের ভেতর থেকে (কোনো পাণ্ডুলিপি ছাড়া) উপস্থাপনা করলেন সৈয়দ হক। আমাদের পরিকল্পনা, উদ্যোগ, শ্রম শতভাগ সার্থক হলো।

কয়েক মাস আগে আমাদেরই এক অনুষ্ঠানে হক চাচা এসেছিলেন। বক্তব্য দেওয়ার পর আমাকে আলাদা করে বললেন, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। সরাসরি এখান থেকে এয়ারপোর্টে যাব লন্ডনের উদ্দেশে, ডাক্তার দেখাতে। লন্ডনে থাকাকালে চাচার সঙ্গে দু-একবার আমার টেলিফোনেও কথা হয়। বললেন, ডাক্তার দেখানো হয়েছে। ডাক্তার বলছেন, ফুসফুসে একটি কালো দাগ লক্ষ করছেন। আরো কয় দিন পর ফোন করলাম। চিকিৎসা চলছে। চাচা বলছিলেন, ডাক্তার জানিয়েছেন ‘জীবনঘাতী ক্যান্সার’-এর কথা। এর মধ্যে একদিন হঠাৎ প্রথম আলোয় সৈয়দ শামসুল হক ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর একটি অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকার পড়লাম। সাক্ষাৎকারটির আয়োজক লন্ডনের একটি প্রতিষ্ঠান। সেখান থেকে সংগ্রহ করেই প্রথম আলো ছেপেছে। সাক্ষাৎকারটি পড়ে মনটা খুব খারাপ হলো। মনে হলো, জীবনের গোধূলি লগ্নে এসে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির দুই দিকপাল জীবনের যেসব কথা তুলে ধরেছেন তা সত্যি অন্য এক বাস্তবতার সন্ধান দেয়। সাক্ষাৎকারটি আমাকে খুব টানল। আমি প্রথম আলোর আনিসুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। বললাম, সাক্ষাৎকারটির ভিডিওটি কিভাবে পেতে পারি? আনিসের সহযোগিতায় লন্ডনের সেই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পেয়ে সাক্ষাৎকারটি আমরা আনতে সক্ষম হলাম। সাক্ষাৎকারটি চ্যানেল আইয়ে দুইবার প্রচারিত হলো।

হক চাচা দেশকে ভালোবেসে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে এলেন। দেশেই চিকিৎসা করাবেন। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি এসে উঠলেন ইউনাইটেড হাসপাতালে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী একদিন তাঁকে দেখতে গেলেন। চিকিৎসার সব ভার প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করলেন। প্রধানমন্ত্রীর তাত্ক্ষণিক এই ঘোষণা ও উদ্যোগ সত্যি আশাজাগানিয়া। সরকারপ্রধান হিসেবে দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির এক দিকপালের জন্য উচিত কাজটিই করলেন। একদিন ফোনে কথা হলো চাচার সঙ্গে। বুঝলাম, তিনি কিছু একটা বলতে চান। আমি ক্যামেরাসহ চাচার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির এমন কীর্তিমান মানুষটি হাসপাতালের ছোট্ট একটি শয্যায়। তাঁর কর্মময় জীবনের বিশালতার কাছে এই রুগ্ণ শরীরে হাসপাতালে শয্যাশায়ী মানুষটি একেবারেই বেমানান। চাচা আমার হাতটি ধরে কাছে টেনে নিলেন। ক্যামেরায় কিছু কথা বললেন, যে কথাগুলো তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলেছিলেন। চাচা বললেন, ‘আমি বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী দেখে যেতে চাই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ দেখে যেতে চাই। এ দুটি বিশেষ দিন দেখার বড় সাধ আমার। ’ একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের এ এক অন্য রকম চাওয়া। এই বাংলাদেশটাই যেন বিখ্যাত এই মানুষটির মূল জীবনীশক্তি। যতটা সময় এ দেশের মাটিতে, এ দেশের পরিবেশে এই জীবিত শরীরখানি থাকে সেটুকুতেই দেশটাকে আরেকটু বেশি করে পাওয়া। তাঁর সেই স্বপ্ন দুটি পূরণ হলো না। কিন্তু তিনি থেকে যাবেন আমাদের মধ্যে দেশের অগণিত কাব্যপ্রেমী, সাহিত্য-অনুরাগী মানুষের আত্মবিশ্বাসের জায়গা হয়ে। আমার আর সাগরের অভিভাবক হয়ে।

 

লেখক : পরিচালক ও বার্তাপ্রধান, চ্যানেল আই


মন্তব্য