kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নির্বাচন কমিশন আইন করা হোক

বদিউল আলম মজুমদার

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নির্বাচন কমিশন আইন করা হোক

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হবে। ফলে এখনো হাতে প্রায় পাঁচ মাস সময় আছে।

আমরা এখনই নতুন নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ ও নির্বাচন কমিশনের বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছি। এটা অত্যন্ত ইতিবাচক বলেই মনে হয়।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য নির্বাচন কমিশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই যাঁরা নির্বাচন কমিশনে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন তাঁদের যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, সাহসিকতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁদের যোগ্যতার প্রতিফলন নির্বাচনের ওপর পড়বে। তাঁরা নিরপেক্ষ ও সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করতে পারলে নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হবে। ফলে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কারা নিয়োগ পাচ্ছেন সেটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সংবিধানের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে,  ‘(১) [প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া] বাংলাদেশে একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন। ’

আরো বলা হয়েছে; ‘(২) একাধিক নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া নির্বাচন কমিশন গঠিত হইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাহার সভাপতিরূপে কার্য করিবেন। (৩) এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে কোন নির্বাচন কমিশনারের পদের মেয়াদ তাঁহার কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরকাল হইবে এবং (ক) প্রধান নির্বাচন কমিশনার-পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, এমন কোন ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগলাভের যোগ্য হইবেন না; (খ) অন্য কোন নির্বাচন কমিশনার অনুরূপ পদে কর্মাবসানের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনাররূপে নিয়োগলাভের যোগ্য হইবেন, তবে অন্য কোনভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগলাভের যোগ্য হইবেন না। ’ এ ছাড়া  ‘(৪) নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন; (৫) সংসদ কর্তৃক প্রণীত যে কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের কর্মের শর্তাবলী রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ হইবে; তবে শর্ত থাকে যে, সুপ্রীম কোর্টের বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত কোন নির্বাচন কমিশনার অপসারিত হইবেন না। (৬) কোন নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করিয়া স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন। ’

অন্য সব বিষয়ের পাশাপাশি সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারকে নিয়োগ দান করা হবে। এখানে খুব গুরুত্বের সঙ্গে যেটা বলতে চাই, যা আমি আগেও বিভিন্ন সময় বলেছি বা লিখেছি যে আজ স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও নির্বাচন কমিশনসংক্রান্ত এ আইন হয়নি। গতবার এটি একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়। এবারও তা করা হলে এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। এটা আমাদের কাছে বোধগম্য নয় আজ এত দিন পরও কেন নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদানের ব্যাপারে একটি আইন প্রণীত হয়নি? কোনো সরকারই কেন এ কাজটি করেনি? এর আগের নির্বাচন কমিশনার এ লক্ষ্যে দেড় পৃষ্ঠার আইনের একটি খসড়া প্রস্তাবনা রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন করেন। কিন্তু এটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি। আমরা সরকারের কাছে পুনরায় বলতে চাই, এবারের সংসদ অধিবেশনে এই আইনটি করা ব্যাপারে আলোচনা উঠুক এবং নির্বাচন কমিশন আইন পাস হোক।

এরই মধ্যে আইনমন্ত্রী বলেছেন যে এর আগে যেভাবে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, এবারও সেই প্রক্রিয়ায় কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে। গতবার রাষ্ট্রপতি ২৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করে আইন প্রণয়ন বা একটি প্রজ্ঞাপন জারি করার সুপারিশ করেছিলেন। যেই সুপারিশের মাধ্যমে পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি করার কথা বলা হয়েছিল। এরপর মন্ত্রিপরিষদ ১১ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে রাষ্ট্রপতির সুপারিশ অগ্রাহ্য করে চারজন সদস্য নিয়ে একটি অনুসন্ধান কমিটি করেছিল। পরে ২১ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই চারজন ব্যক্তির নাম ঘোষণা করা হয়। এই চারজন ব্যক্তি ছিলেন ১. সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি, ২. হাইকোর্টের একজন বিচারপতি, ৩. সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান, ৪. মহা হিসাব নিরীক্ষক। এই কমিটি প্রথমেই রাষ্ট্রপতির আদেশের পাঁচজনের স্থলে চারজন নিয়ে কমিটি করে তাঁরই আদেশ অমান্য করেছিল। কমিটির মধ্যে প্রথম থেকেই ছিল ‘শর্ষেয় ভূত’, যা আমি সে সময় একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলাম।

আমরা এই অনুসন্ধান কমিটির কার্যকারিতা গত ২০১২ সাল থেকে দেখে আসছি। এই কমিশন আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কিভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে, তা আমরা স্থানীয় নির্বাচনগুলোয় দেখেছি। সহিংসতা, খুনোখুনি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোট কারচুপি—কী হয়নি এই কমিশনের অধীনে নির্বাচনে? তারা পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের যে সহিংসতা, অনিয়ম দেখিয়েছে, তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এর আগের হুদা কমিশন যতটুকু সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে এসেছিল, এবারের কমিশন তার প্রায় সবটুকু নষ্ট করেছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের যে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী ভূমিকা রাখার কথা, তা তারা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

বস্তুত এভাবে অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে কমিশনার নিয়োগ দেওয়া ও প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমে নিয়োগ দেওয়া (আগে যেভাবে নিয়োগ দেওয়া হতো)—এ দুটির মধ্যে আদতে কোনো গুণগত পার্থক্য নেই। বরং দুই ক্ষেত্রেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ অনুযায়ীই রাষ্ট্রপতিকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হলেও সঠিক ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ না পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি কারণ দেখা যায়। প্রথমত, প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের যোগ্যতা, অযোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেওয়া হয় না। পক্ষান্তরে আইনের উদ্দেশ্যই হবে কারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার হবেন তার যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া। আইনের অনুপস্থিতিতে যে কেউই প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ অনুযায়ী কমিশনে নিয়োগ পেতে পারেন। এ জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনের একটি আইন করার গুরুত্ব সর্বতোভাবে অনুধাবন করছি। দ্বিতীয়ত, অনুসন্ধান কমিটি যদি নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত না হয়, তাহলেও অতীতে যা হয়েছে তারই পুনরাবৃত্তি ঘটতে বাধ্য। তাই অনুসন্ধান কমিটি গঠনের ব্যাপারে আমরা নতুন করে ভাবার অনুরোধ করব। সাবেক নির্বাচন কমিশনার আবু হেনা যেমনটা মত ব্যক্ত করেছেন যে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে কমিটিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে যুক্ত করা, আমরাও সেই মত সমর্থন করি। এই লক্ষ্যে আমরা অনুসন্ধান কমিটিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব করছি। সুস্পষ্টভাবে অনুসন্ধান কমিটির জন্য আমরা এই পাঁচজন ব্যক্তির প্রস্তাব করছি; যাঁরা হবেন ১. আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের একজন প্রতিনিধি, ২. বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট থেকে একজন প্রতিনিধি, ৩. একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ৪. একজন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি, ৫. প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের দেওয়া একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি, যিনি কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। আর অবশ্যই প্রত্যাশা থাকবে পাঁচজন প্রতিনিধির মধ্যে একজন নারী হবেন। তৃতীয়ত, অতীতে অনুসন্ধান কমিটিগুলো স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করেনি। এই কমিটির কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে, যেন একজন সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে যে কেউ প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও যেকোনো কমিশনারের জন্য নাম প্রস্তাব করতে পারেন। কমিটি যাঁদের নাম সুপারিশ করবে, কোন যুক্তিতে তাঁদের নাম সুপারিশ করেছে, তা যেন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। এ জন্য পাবলিক হিয়ারিং বা ‘গণশুনানির’ ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। সেখানে যেকোনো নাগরিক এসে যেন নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন। অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমেই যদি নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে এই কমিটি যেন পক্ষপাতহীনভাবে কাজ করতে পারে। এটা নিয়ে যেন শুরু থেকেই প্রশ্ন উত্থাপিত না হয়।

আমাদের একটি সঠিক নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত জরুরি। কারণ গণতান্ত্রিক কাঠামোয় নির্বাচন হলো প্রধান বিষয়। একমাত্র স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করা যায়, জনগণের ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠা করা যায়। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের জন্য নির্বাচন কমিশন আইন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করি, সরকারি দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল সুষুম, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে নির্বাচন কমিশন আইন, নির্বাচন কমিশন গঠন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়, বিশেষত প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতার দিকে বিশেষ নজর রাখবে। নির্বাচন কমিশন আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করবে এবং আইনটি করার দাবি উত্থাপন করবে।

লেখক : সম্পাদক, সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)


মন্তব্য