kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিশেষ সাক্ষাৎকার ► ড. মো. শামছুল হক

পরিবহন খাতে যোগাযোগ বিজ্ঞান কাজে লাগাতে হবে

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পরিবহন খাতে যোগাযোগ বিজ্ঞান কাজে লাগাতে হবে

অধ্যাপক ড. মো. শামছুল হক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে এমএসসি ডিগ্রি নিয়ে যুক্তরাজ্যের সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবহন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর পিএইচডি করেন। বর্তমানে তিনি বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে কর্মরত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্মের মধ্যে রয়েছে গলিভিত্তিক মিশ্র ট্রাফিক অপারেশন, ট্রাফিক সংকেত, পথচারী, পরিবহনের পরিবেশগত প্রভাব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), দুর্ঘটনার তদন্ত, রোড সেফটি ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশের সড়ক, ফ্লাইওভার, অদলবদল, ইনল্যান্ড  কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ইত্যাদিসহ পুরকৌশল পরামর্শ ও নির্মাণ প্রকল্পের নানা কাজে তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। দেশের সার্বিক যোগাযোগ সমস্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, গণপরিবহনসহ এ খাতের সমস্যা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে তাঁর কথা হয়। কথা বলেছেন শারমিনুর নাহার

 

কালের কণ্ঠ : মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনা। সমাধান কোথায়?

মো. শামছুল হক : যোগাযোগব্যবস্থা আমাদের একটি জাতীয় সমস্যা। একটি বিষয়কে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে গেলে এর সঙ্গে বহুমাত্রিক সমস্যা চলে আসে। তাই শুধু সরলীকরণ করে এ সমস্যার সমাধান করা যায় না। আমরা যদি টেকসই উন্নয়ন করতে চাই, তাহলে শুধু সড়কপথ নয়, রেলপথ, নৌপথ, বিমানপথসহ সার্বিক যোগাযোগ খাত নিয়ে ভাবতে হবে। সব নিয়ে একত্রে চিন্তা করলেই শুধু ভারসাম্যপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। আজকে যখন সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে তখন শুধু সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিভাবে করা যায়, এটা ভাবলে চলবে না। আমাদের সমস্যার একটু গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। নৌপথে যে সাশ্রয় ও বিপুল সম্ভাবনা ছিল সেটা আমরা নষ্ট করে ফেলেছি।

শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা বিশ্বেই মানুষ বাড়ছে, যানজট বাড়ছে, যানবাহন বাড়ছে। পৃথিবীর সব দেশেই মানুষ এগোচ্ছে। অর্থনীতি বাড়লেই মানুষের গতি বাড়ে। ফলে মানুষ বেশি যানবাহন ব্যবহার করে। ফলে চলন্ত গাড়ির সঙ্গে থেমে থাকা গাড়ির সংঘর্ষ, যান্ত্রিক গাড়ির সঙ্গে অযান্ত্রিক গাড়ির সংঘর্ষ বাড়ে। এ জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক একটি সামগ্রিক পরিবহনব্যবস্থার সমাধানের কথা ভাবতে হয়। প্রথমত, তাত্ক্ষণিক সমাধান। দ্বিতীয়ত, টেকসই সুদূরপ্রসারী সমাধান। আমরা যদি শুধু যানজটমুক্ত সড়কের কথা ভেবে বিনিয়োগ বাড়াই, তাতে কিন্তু যানজটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন রেল, নৌ ও সড়ক—এই তিন বিভাগের মধ্যে একটি সমন্বয়ের ভূমিকা রাখা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাউকে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।

কালের কণ্ঠ : বর্তমানে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বড় অংশ যোগাযোগ খাত। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে সার্বিক যোগাযোগ খাতের কতখানি উন্নতি হবে?

মো. শামছুল হক : দেখুন, সরকারের মেগা প্রজেক্ট হচ্ছে বিনিয়োগ অনুযায়ী। কিন্তু এর উপযোগিতা কী? এটার কি কাঙ্ক্ষিত সুফল আমরা পাব বা পাচ্ছি? নাকি বিষয়টা সরলীকরণ হয়ে যাচ্ছে। ধরা যাক, সদরঘাটের টার্মিনালকে এক কিলোমিটার লম্বা করে ফেলা হলো। কিন্তু সরদঘাটের যাত্রীরা লঞ্চে ওঠার জন্য কোন পরিবহনব্যবস্থায় আসবে? এখানে কোনো বাস ঢুকতে পারবে কি না?  সিএনজিচালিত কোনো অটোরিকশা স্ট্যান্ড, কোনো ট্যাক্সিস্ট্যান্ড আছে কি না  কিছুই ভাবা হলো না। মালপত্র নিয়ে মানুষ কিভাবে বাসা থেকে আসবে; আবার লঞ্চ থেকে নেমে কিভাবে মালামাল, শিশু, বৃদ্ধ নিয়ে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছবে—এসবের কোনোটাই ভাবলাম না। দেখা গেল, বাস থেকে নামলাম ভিক্টোরিয়া পার্কে। বৃষ্টির দিনে এখান থেকে ঘাট পর্যন্ত এতটা পথ কিভাবে যাব সেটা ভাবলাম না। কিন্তু হয়তো আমরা উল্লাস করলাম যে সদরঘাট টার্মিনালকে এক কিলোমিটার করেছি। জায়গা বাড়ালাম; কিন্তু মানুষ এ সেবা নিতে পারল না। ফলে এটা সমন্বিত হলো না। ‘ডোর টু ডোর’ সুবিধা বলে যে সেবাটা চালু আছে সেটাও দিতে ব্যর্থ হলাম। এটি আসলে পরিকল্পিত উন্নয়ন নয়। মেগা প্রজেক্টের মধ্যে আছে বিমানবন্দরে টার্মিনাল বাড়ানো, রানওয়ে বাড়ানো। কিন্তু বিদেশিরা প্রথমে এসেই বিমানবন্দর থেকে যানজটে পড়ে। কোনো এক্সপ্রেসওয়ে নেই এখানে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটা চরিত্র থাকে; তার একটি বিশাল বাউন্ডারি রাস্তা থাকে, এমআরটি থাকে, একটা ট্রেন সার্ভিস থাকে, ট্যাক্সি তো থাকেই। কারণ এটা বিমানবন্দরের সেবা। এখানে যাত্রীদের অনেকে অসময়ে রাত ৩টা বা ৪টায় এসে পড়লে, দেশে কোনো দুর্ঘটনা হলো ইত্যাদিসহ নানা কিছু থাকে। ফলে সেবার পথটা থাকে বহুমুখী। সে যেন তার জন্য যেটা সুবিধাজনক সেটা ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু আমরা শুধু টার্মিনাল আর রানওয়ের উন্নতিতে চোখ রাখছি। এতে যাত্রীরা শুধু ভোগান্তির সেবাই পাবে। তাই সমন্বয়হীনতা কোনো কাজই সফলতা বয়ে আনতে দেবে না।

কালের কণ্ঠ : এবার সড়কপথের উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষকে সেই দীর্ঘ যানজটেই পড়তে হলো। আবার সারা বছরের হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনা কমলেও ঈদে দুর্ঘটনা বাড়ে। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

মো. শামছুল হক : দেখুন, ওই যে বললাম, দুইভাবে সমাধান করতে হবে। একটা তাত্ক্ষণিক, অন্যটা দীর্ঘমেয়াদি। আমাদের প্রায় সব সমাধান হয়ে যাচ্ছে তাত্ক্ষণিক। এবার চন্দ্রার মোড়ে জ্যাম বেশি হয়েছে। সুতরাং এটাকে প্রশস্ত করো। পরে আরেকটা মোড়ে দুর্ঘটনা ঘটছে, সুতরাং এখানে ডিভাইডার দিয়ে দাও। রাস্তায় বাস নেই, তাহলে কিছু নতুন বাসের রুট পারমিট দাও। কিন্তু এসব করার ফলে আমরা কী করলাম? সমস্যা আরো বাড়ালাম। গাড়ি বেশি নামালাম; কিন্তু ভেবে দেখলাম না সেই অধিক বাস চলার মতো রাস্তার সামর্থ্য আছে কি না। উল্টো একজন আরেকজনের মধ্যে নাক ঢুকিয়ে বসে থাকল, কেউই আর এগোতে পারল না। যানজটের জন্য রাস্তা প্রশস্ত করা হলো; কিন্তু আশপাশের হাটবাজার সরানো হলো না। সেই একই বিশৃঙ্খলা। সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে আজকে আমরা অনেকে চালককে দায়ী করছি। কিন্তু চালক তো হলো উপসর্গ। এর মূল কারণ পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল, ভুল ছিল। এখানে মানুষ বৃদ্ধির সঙ্গে কৌশলগত বিনিয়োগ কী হবে, সেটা নিয়ে কোনো সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জোগান বেশি থাকলে সেই চাহিদা কিভাবে পূরণ করা হবে, তা ভাবা হয়নি। আমাদের পুরো পরিবহন সেক্টরের কোনো ডাটা নেই। কোনো বিষয়কে পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে হলে তার তথ্য-উপাত্ত খুব দরকার। ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার ডায়াগনসিস ছাড়া তো ওষুধ দেন না। আগে প্যাথলজিক্যাল টেস্ট, পরে রোগের চিকিৎসা শুরু। কিন্তু আমরা পরিবহনের সমস্যা সমাধানে কোনো তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করি না। ফলে সমস্যা থেকেই যায়। আমাদের কী পরিমাণ গাড়ি প্রয়োজন, কী ধরনের গাড়ি প্রয়োজন, কত গাড়িকে রেজিস্ট্রেশন দেবে, রাস্তায় ভূমি ব্যবহারের ঘনত্ব কী হবে, একটা সড়কের ধারণক্ষমতা কতটুকু—এসবের কোনোটাই আমরা জানি না।

কালের কণ্ঠ : আমাদের মহাসড়ক কি মহাসড়কের চরিত্র ধরে রাখতে পারে? মহাসড়কে চলা যানবাহনের ধরন কি দুর্ঘটনার কারণ বলে মনে করেন?

মো. শামছুল হক : ভালো প্রশ্ন। প্রথমে আসি মহাসড়কের চরিত্র নিয়ে। আমরা চার লেনের রাস্তা করছি; কিন্তু সরল একটা প্রশ্নের উত্তর কখনো খুঁজি না—এই চার লেনে কি রিকশা আসতে পারবে; নসিমন, করিমন আসতে পারবে? যদি উত্তর হয় পারবে, তাহলে কিভাবে পারবে? তাদের চলাচলের জন্য আলাদা লেন করে দিতে হবে। প্রথমে ভাবতে হবে, তার অর্থনৈতিক চাহিদা আছে বলেই কিন্তু সে আসছে। যিনি এটা ব্যবহার করছেন তাঁর প্রয়োজন বাস্তবে যা আছে তা দিয়ে পূরণ হচ্ছে না। সুতরাং এক কথায় বলা যায়, এসব ছোট যানের চাহিদা আছে। এখন এই চাহিদাকে কিভাবে পূরণ করা যাবে। খুব সহজ উত্তর, তাকে আলাদা লেন করে দাও। সেখানে যদি তার চাহিদা পূরণ হয়, তাহলে সে কেন বড় লেনে আসবে? আর এটা তো জানা যে দ্রুতগতির যানের সঙ্গে স্বল্পগতির যানের সংঘর্ষ হবে। মহাসড়ক বললেই একটা মান বোঝায়। বলা যায়, পাঁচ তারা হোটেলের মতো। পাঁচ তারা হোটেল একটা স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেন করে। নির্দিষ্ট জামাকাপড় পরে যেতে হয়। এ জন্যই তো স্টারগুলো দেওয়া হয়। মহাসড়ক একটা স্ট্যান্ডার্ড। কে এখানে থাকবে, তার গতি কত হবে, তার যানবাহনের ফিটনেস কেমন হবে, সে কোন দিক দিয়ে প্রবেশ করবে ইত্যাদি বিষয় মহাসড়কে মেনে চলতে হবে। আর সেসব মেনেই আমাদের মহাসড়ক তৈরি করতে হবে। আমি হুট করে দুই লেনকে চার লেন করে দিলাম, টানা ডিভাইডার দিয়ে দিলাম। কিন্তু এর পরও গতির পার্থক্য থেকে যাবে। ফলে অবধারিতভাবে দুর্ঘটনা ঘটবে বা ঘটছে। হঠাৎ ২০ কিলোমিটার গতির একটি গাড়ির পেছনে যদি ১০০ কিলোমিটার গতির একটা গাড়ি চলে আসে, তাহলে আচমকা চাপ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। জার্মানিতে কোনো স্পিড লিমিট নেই। কারণ বিজ্ঞান শিখে ফেলেছে আমি যদি সবাইকে সমান গতিতে রাখতে পারি, তাহলে কোনো দিন দুর্ঘটনা ঘটবে না।

সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণার তথ্য-উপাত্তের দিকে তাকালে দেখা যায়, পুরো ২২ হাজার কিলোমিটার মহাসড়কের মাত্র ৪ শতাংশ জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটে। যদি একটি স্থানে বছরে তিনের অধিক দুর্ঘটনা ঘটে, সেটাকে ‘ব্ল্যাক স্পট’ বলে চিহ্নিত করা হয়। এত যে দুর্ঘটনা, এগুলো মাত্র ৪ শতাংশ জায়গায়। বাকি ৯৬ শতাংশ জায়গায় কিন্তু ব্ল্যাক স্পট নেই। এটা স্বাভাবিক যে এখানে কোনো না কোনো ত্রুটি রয়েছে। সেটা নির্মাণ ত্রুটি হতে পারে, রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটি হতে পারে। সরেজমিনে গিয়ে আমরা টাঙ্গাইলের বেড়া ও স্বপ্নার মোড়ে এমন চিত্র পাই। স্বপ্না হলেন একজন স্কুল শিক্ষক। মোড়ের পাশেই একটি স্কুল। তিনি বাচ্চাদের রাস্তা পার করে দিতেন। পরে তিনিও সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। ওই মোড়েই তাঁর কবর। আমরা দেখলাম, এখানে মোড় ঘোরার সময় চালকদের দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। এপার থেকে যিনি আসছেন তিনি ও ওপার থেকে যিনি আসছেন তিনি পরস্পর কেউ কাউকে দেখতে পান না। এখন পর্যন্ত ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ১১টি বাঁকে ট্রিটমেন্ট করা হয়েছে। এসব ট্রিটমেন্ট করার পর এখন চালকরা বলেন, আর দুর্ঘটনা ঘটে না। এ জাতির দুর্ভাগ্য যে আমাদের শিখতে অনেক দেরি হয়ে যায়। এত মানুষ মারা যাওয়ার পর আমাদের বোধোদয় হয়। আরো দুই বছর আগে করলে হয়তো আরো মৃত্যু এড়ানো যেত।

কালের কণ্ঠ : পরিকল্পনামন্ত্রী ও যোগাযোগমন্ত্রী দুজনই বলেছেন ব্ল্যাক স্পট ট্রিটমেন্ট করা হবে।

মো. শামছুল হক : হ্যাঁ, এগুলো আমাদের আশাবাদের জায়গা। সরকার কাজ করছে; কিন্তু পাশাপাশি সার্বিক বিজ্ঞানভিত্তিক কাজের পরিকল্পনা করতে হবে। বিশ্বে যোগাযোগ বিজ্ঞান অনেক দূরে চলে গেছে। আমাদের সেসব বিষয় আয়ত্ত করতে হবে। তাদের উদাহরণ কাজে লাগাতে হবে।

কালের কণ্ঠ : এবার পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাট পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ থাকায় ঈদের সময় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। ফেরিঘাটের সমস্যা নিরসনে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে?

মো. শামছুল হক : তিনটি ঘাট একসঙ্গে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে চাপ বেড়েছে। খুব দ্রুত যে সিদ্ধান্ত নিয়ে দুটি নতুন ঘাট করা হবে, তা হয় না। ফলে সমস্যা বাড়ছে। যেখানে পানির চাপ কম সেটা দেখে নতুন ঘাট তৈরি করলেই হয়ে যায়।

কালের কণ্ঠ : অনেকে যানজট ও পরিবহন সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেন, এটা কি কোনো ভূমিকা রাখতে পারে?

মো. শামছুল হক : একটা উদাহরণ দিই, মালয়েশিয়ার পুত্রজায়া (দ্বিতীয় রাজধানী), এটা সাত হাজার একর। আমরাও একটি নতুন শহর করছি পূর্বাচল, সাড়ে ছয় হাজার একর। কিন্তু নতুন এই উপশহরে কী করছি—প্লট আর প্লট। যাকে প্লট দিচ্ছে সে কোটিপতি হয়ে যাচ্ছে। আমাদেরও উন্নয়ন হচ্ছে; কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের উন্নয়ন হচ্ছে। মাহাথির ব্যক্তিবিশেষের উন্নয়ন করেননি। সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়ন করেছেন। দেশের সার্বিক উন্নয়ন হলে মানুষ এমনিতেই প্লট কিনতে পারবে। আমাদের এত সুন্দর ঢাকা সরানোর হয়তো একটা জায়গা ছিল; কিন্তু তাকেও কাজে লাগানো গেল না। বলা যায় ক্যাথেডার দিয়ে যেভাবে প্রতিদিন রোগীকে বাঁচিয়ে রাখে, তেমনি প্রতিদিন ছেঁচে ছেঁচে ঢাকাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। সব রাস্তা উত্তর-দক্ষিণে, পূর্ব-পশ্চিমে কোনো রাস্তা আসেনি। বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল দক্ষিণে; কিন্তু আবাসিক এলাকা উত্তরে। পরিকল্পনাকারীরা বলেন, মতিঝিল মানে হলো সেন্ট্রাল বিজনেস ‘হাব’। এটা হলে তো এর আশপাশেই আবাসিক এলাকা থাকার কথা। কাজ করে মানুষ রাস্তা ছেড়ে দেবে। কিন্তু এখন পুরো দুই ঘণ্টা রাস্তায় থাকতে হয়। ফলে একটা ভারসাম্যহীনতার রাজধানীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা। রাজধানী হবে স্টেডিয়ামের মতো। শুধু ঢাকা নয়, সব জেলা থেকে, বিদেশ থেকে এখানে মানুষ আসবে। স্টেডিয়ামে যেমন খুব অল্প সময়ের মধ্যে মানুষ আসে আবার অল্প সময়ের মধ্যে চলে যায়। প্রতিটি ডিরেকশনে একটা করে গেট থাকে। রাজধানী হবে এমন, রেডিয়াম রোড আগে তৈরি করে তার মাঝখানে রিং রোড দেব। ইনার রিং রোড, আউটার রিং রোড, মিডল রিং রোড। তাহলে যে যেদিক থেকেই আসুক না কেন, কোথাও বাধা পেলেই সে অন্য পথে যাবে। ফলে নতুন করে ভাবতে হবে।

কালের কণ্ঠ : সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের তাগিদে এখন যোগাযোগব্যবস্থা কিভাবে উন্নত করা যাবে?

মো. শামছুল হক : আমাদের অর্থনীতি অনেক বড় হতে যাচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুতের যে বিপুল বিনিয়োগ, ব্যক্তিগতভাবে এটাকে খুব বড় করে দেখি। বিদ্যুৎ বাড়লে অনেক নতুন নতুন কাজ হবে। কিন্তু সব কাজ শেষে তাকে কিন্তু সড়কে নামতে হবে, রেলে নামতে হবে। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ইপিজেডের (বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল) সুবিধাগুলো যদি পেতে চাই, তাহলে ভিত্তি বা মূল অবকাঠামো হলো যোগাযোগব্যবস্থা। এটিকে বিশৃঙ্খল, অপরিকল্পিত রেখে আমি সার্বিক বা দ্রুতগতির উন্নতি করতে পারব না। প্রতিটি বিনিয়োগে কিছু না কিছু উন্নতি হয়। কিন্তু একেবারে চূড়ান্ত মাত্রায় যদি তাকে ব্যবহার করতে চাই, তাহলে সুষ্ঠু, টেকনিক্যাল, পেশাদারি, সমন্বিত ও অভিভাবক সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান দরকার। যিনি রেল নিয়ে আছেন তিনি শুধু রেলের কথাই চিন্তা করবেন না। সুতরাং তিনটি বা চারটি প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত করে উন্নয়ন করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অনেক দুর্বলতা থাকবে; কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে উন্নত করার দায়বদ্ধ করে গড়ে তোলার সংস্কৃতি লালন করতে হবে।

কালের কণ্ঠ : আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মো. শামছুল হক : কালের কণ্ঠকেও ধন্যবাদ।


মন্তব্য