kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রতিক্রিয়া ► জাহানারা নুরী

‘রাজনীতিতে বাঙালি চরিত্র’

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দৈনিক কালের কণ্ঠে গত ১২ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের উপসম্পাদকীয় ‘রাজনীতিতে বাঙালি চরিত্র’ নিয়ে কিছু বলতে চাই।

ইংরেজ কলোনি ও পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যত প্রচেষ্টা লেগেছিল, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি’ তার চেয়ে কম প্রয়াসে ‘সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রগতিশীল ধারায় উত্তীর্ণ’ হবে ভাবা যায় না—আপনার এ কথার সঙ্গে সহমত পোষণ করে, স্যার বলতে চাই, এখানেই একজন বুদ্ধিজীবীর দায় শেষ হয়ে যায় না।

একটা সময় আপনি ও ড. আহমদ শরীফ আমাদের শিখিয়েছেন ‘হিতবাদী ও কল্যাণকামী’ বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা। আমরা জেনেছি, তাঁদের কাজ হচ্ছে ‘সমাজ, রাজনীতি ও আর্থিক ক্ষেত্রে বিপদ-সম্পদ, লাভ-ক্ষতি, আনন্দ-যন্ত্রণা ও বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দিশা দেওয়া ও সতর্কবাণী উচ্চারণ করা। ’ তাঁর কাছে কোনো দিকের দিশা পেলাম না।

তিনি যখন মধ্যবিত্তের অদক্ষ রাজনীতির দায় গোটা বাঙালি জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে দেন, হকচকিয়ে যাই। তাঁর ভাষায় ‘শুধু হীন স্বার্থান্বেষীরাই রাজনীতিতে যায়’ যদি ধরেও নিই, ‘বাংলা ভাষার লেখকরা’ হিন্দু-মুসলমান সমাজ-সংস্কারকরা ও পরবর্তীকালে চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান তার ঊর্ধ্বে একেকটি নজির স্থাপন করেন। এই মহারথীদের গড়ে ওঠার পেছনেও জনগণের প্রত্যক্ষ কিংবা অপ্রত্যক্ষ ভূমিকাকে নস্যাৎ করে দেওয়া যায় না। বাঙালির যে কগনিটিভ চরিত্র প্রভূত নেতিবাচক বলা হয়, তা সত্ত্বেও যদি এ জাতি বাঘা বাঘা নেতা জন্ম দিয়ে থাকে এবং জাতীয় জীবনে ওই নেতারা যদি আপনার ভাষায় ‘বাংলার জনসাধারণের শক্তি ও সম্ভাবনার ওপর সম্পূর্ণ আস্থাশীল’ থাকেন, যার ফলে জাতির কিছু বৃহৎ অর্জনও সঞ্চিত হয়, তবে এই সাধারণ জনতাকে  নিজেদের নেতৃত্ব সৃষ্টিতে অনীহ বলা যায় না। নেতাদের কৃতকর্মের, অপারগতার ও ক্ষেত্রবিশেষে জাতির আশার গুড়ে বালি দেওয়ার দায় সাধারণ জনতার ওপর চাপানোও যৌক্তিক হয় না। কেন, সে বিষয়টি বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা ও শ্রেণি সমাজের বাস্তবতার যুক্তিসংগত ব্যবচ্ছেদের পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

আপনি নিশ্চয়ই একমত হবেন যে কোনো জাতির নিজস্ব সত্তা সম্পর্কিত যৌথ চেতনাটি জাতির সব নাগরিকের অন্তর্গত আশার সারাৎসার হবেই, এমনটি ধরে নেওয়া যায় না।

যেমন বহু দেশে দেখা যায়, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ওই একক চেতনাটি শূন্য খোসা মাত্র ছিল না, বরং তার ভেতর সর্বসাধারণের জন্য সর্বজনহিতকর এক রাষ্ট্রের আশা ছিল। যে আশায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের পত্তন ঘটানো হয়, বাংলাদেশের স্বাধিকার কামনাটি ছিল তার বিপ্রতীপ। এমন নয় যে সে আশা প্রত্যেক মানুষের মনে এক শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেছে; কিন্তু কমবেশি তা শ্রেণি-নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে প্রকাশিত হয়। বাঙালি সদ্য অর্জিত রাষ্ট্রে তার অখণ্ড জাতিরূপের মূলগত ধরনটিকে পূর্ণভাবে চেনার একটি সুসংবদ্ধ প্রক্রিয়ার পথে পা দিয়েছিল। প্রয়োজন ছিল সেই অন্তর্নিহিত ভাবনা পূর্ণভাবে চেনার প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত এবং জাতির ঐক্যকে সুসংহত ও স্থায়ী করার উপযোগী রাজনৈতিক, সামাজিক পদক্ষেপ। বিশ্ব ইতিহাসে শাসক মধ্যবিত্তের সঙ্গে লড়াইয়ের পথ ধরেই ধর্ম মধ্যযুগীয় ইতিহাসের কাল থেকে সমসাময়িককালে অবস্থান গ্রহণ করার ফলে রাষ্ট্র ও সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের স্থান তৈরি হয়। আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস না থাকায় তা জাতীয় জীবনে স্থায়ীরূপ লাভ করতে ব্যর্থ হয়।

রাজনীতি শিক্ষাপ্রক্রিয়ার ও সভ্যতা নির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে আদর্শে স্বাধীন জাতির জন্ম, চর্চার মাধ্যমে তার আরো উন্নয়ন, শিক্ষা, প্রচার, প্রসার কাম্য। পরাধীন দেশে জাতির শিক্ষা শুধু বিরোধিতায় ও দ্রোহে নিবদ্ধ থাকে। স্বাধীন দেশে পিছিয়ে থাকা জাতি তার ঐক্যের সূত্রটির পূর্ণরূপ সংগঠন, সম্মিলন, ধারণের স্বার্থে এর প্রয়োগ পদ্ধতির বিস্তৃত ও প্রাসঙ্গিক নিরীক্ষা, আলোচনা, পর্যবেক্ষণ ও আত্মসমীক্ষার পথ ধরে চলবে—এটাই স্বাভাবিক।

এ তো ঐতিহাসিক সত্য, যে মধ্যবিত্ত স্বাধীন বাংলার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তা এক অনুন্নত মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তাদের সে অর্থে কোনো অর্থনৈতিক ক্ষমতা ছিল না। মাত্র ২৪ বছর আগেকার প্রভু ইংরেজের তৈরি কলকাতাকেন্দ্রিক ‘কলোনির মধ্য শ্রেণি’ তো নয়ই, তারা এমনকি বিগত বছরের পাঞ্জাবি অধ্যুষিত পাকিস্তানি ক্রম বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্থান দখল করার সমমানেরও ছিল না। তাদের মনস্তত্ত্বের গভীরে ছিল আত্মপ্রেম ও নিজের মধ্য অবস্থান গোছানোর প্রত্যাশা। পাকিস্তানি মধ্যবিত্ত যে ‘জায়গাটা’ খালি করে গেছে, স্বাধীন দেশে সে স্থান সহজেই তাদের থাকবে ভেবে নিয়েছিল তারা। বাস্তবে নিজেদেরই সঙ্গে যখন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হলো, কোণঠাসা মরিয়া মধ্যবিত্তকে দেখা যায় ওই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে আত্মবিক্রয়ে প্রস্তুত; পূববর্তী কলোনির শাসকদের ও ভেতর-বাইরের নানা শক্তির কাছে নমনীয়।

মধ্যবিত্তের উৎসাহটা ছিল নিজের অবস্থান ধরে রেখে, তার দেখা কলোনির মধ্যবিত্তের পথ অনুসরণ করে বুর্জোয়া মধ্যবিত্তের র‌্যাকেটে স্থান লাভ করায়। তার দৃষ্টিভঙ্গি বেনিয়ার, শিল্প নেতৃত্বের নয়। ঔপনিবেশিক বা প্রায়-ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় তার পক্ষে পুঁজি সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। সমাজতত্ত্বের বিচারে তা ঘটাও অসম্ভব ছিল। সে তার ঐতিহাসিক পেশাগত দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে স্বীয় দুর্বলতার ইতিহাস অস্বীকার করে; ইতিহাসের উত্তরাধিকার ধারণ করে না এবং বুর্জোয়া হতে গিয়ে নিজেকে পুঁজিবাদেরই আরেক পুঁজিতে পরিণত করে। ফলে ‘জনসাধারণ’, যারা দেশের আসল পুঁজি—তাদের অধীনে দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে যাওয়ার সদিচ্ছা এ মধ্যবিত্তের বা তার সৃষ্ট শাসকের বা নেতৃত্বের মধ্যে দুর্বল।  

স্বাধীনতার পর মধ্যবিত্ত পুঁজিবঞ্চিত হলে, স্বাধীনতার আসল কাজ জাতির উন্নয়নমূলক বিপ্লবে অংশগ্রহণে অনীহ ও ক্রমে সামাজিকবোধ ও চেতনায় বদ্ধ হতে শুরু করে। নিজ বুদ্ধিবৃত্তিকে স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে দিতেও তার অনিচ্ছা। অথচ কলোনির অধীন থাকাকালে তারা নিজের বিকাশে তীব্রভাবে, বিদ্রোহাত্মকভাবে কলোনির বিরুদ্ধে লেগে ছিল।

মধ্যবিত্তের এই চরিত্র স্বাধীন দেশের মানুষের চরিত্র নয়। সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা তাদের কারিগরি অর্থনীতিতে টেনে নেয়, যেখানে তার দৃষ্টিভঙ্গি সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে জাতীয় অর্থনীতিতে লোকাল প্রোডাক্ট বলতে কৃষির বাইরে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, জনতা যার শ্রমিক। জনসাধারণের পক্ষে কিছু করা হবে, এ-জাতীয় লম্বা লম্বা বক্তৃতা দেওয়া হলেও যেহেতু শিল্প স্থাপনের যোগ্যতা তার ছিল না, জনসাধারণকে ‘জাতীয় মর্যাদায় অটল’ থাকার কথা বোঝানো ছাড়া আর কী-ই বা এই মধ্যবিত্তের করার থাকতে পারে? তবে ‘গণ’কে যখন তারা জাতীয় মর্যাদা বুঝিয়ে চলেছে, নিজের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে নানা অনৈতিক পথে। সমাজের রাজনৈতিকীকরণ চলছে তারই স্বার্থে। জাতীয় মর্যাদা তো আর জনসাধারণের হাতে অর্থ এনে দেয় না। জনগণ তাদের ওপর আস্থা রেখে যেই তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও জনসাধারণের শ্রম শুষে নিয়ে নবীন দেশের মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত হওয়ার পথ ধরেছে। ক্রমে বন্ধ্যত্ব হয়ে পড়ছে তার নিজের বিকাশও। প্রথম তিন দশকে মধ্যবিত্তের যে বিকাশ তা শ্লথ; অনৈতিক উচ্চবিত্ত শ্রেণিভুক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মধ্যবিত্তেরই একাংশ নিম্নবিত্তে পরিণত হচ্ছে। দরিদ্রের সংখ্যাবৃদ্ধি চিন্তার বিষয়।

মধ্যবিত্ত দেশের, সমাজের ও চিন্তার ক্ষমতা হাতে রেখেছিল; কিন্তু নতুন কালের দেশ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, চেতনা, চিন্তা ও সংস্কৃতির উন্নয়ন তার হাতে বিকাশ লাভ করেনি, বরং তার ফাটলের পথ ধরে ধর্মভিত্তিক বিভেদ, জনসাধারণকে প্রবঞ্চনা করে যেসব শক্তি, তাদের ফাঁদ বিস্তৃত হয়েছে। সাধারণের চেতনাগত ঐক্য জিম্মি হয়েছে অগণতান্ত্রিক ক্ষমতাবলয়ে।

বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার আলোচনায় এ বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের শ্রেণি ও ধর্মবিদ্বেষ, জাতপাতের সংকীর্ণতাভিত্তিক রাজনীতি, এর সামাজিকীকরণ, ঘনায়মান সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্ব ও অদূরদর্শী উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার ব্যবচ্ছেদ অত্যন্ত জরুরি মনে করি আজ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

jahanara.nuri@gmail.com


মন্তব্য