kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আগামী নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগ বিএনপির রাজনীতি

এ কে এম শাহনাওয়াজ

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আগামী নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগ বিএনপির রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতি সুস্থ ব্যাকরণের নিয়ম মেনে কখনো চলেনি। শুধু বাংলাদেশ কেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে শত্রু সম্পর্কই বজায় থাকে।

কথায়-আচরণে শালীন-সৌন্দর্য কাজ করে না। ‘গণতন্ত্রের শিখণ্ডী’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় ট্রাম্প ও হিলারি যে ভাষায় কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন, তা অনেক সময়েই শালীনতার সংজ্ঞা অতিক্রম করছে। তবে আমেরিকার জনগণের মানসিক গড়ন কেমন ঠিক বলতে পারব না। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অনেক সময়ই সূক্ষ্ম বিচারক। রাজনৈতিক কৌশলে ভুল চাল খেলতে গিয়ে বিএনপি এখন বেশ কোণঠাসা অবস্থায়। প্রধান প্রতিপক্ষ সরকারে থাকা আওয়ামী লীগ বেশ আটঘাট বেঁধেই চেপে ধরেছে। একটি আদর্শিক জনকল্যাণকামী দল হলে জনগণের সমর্থন নিয়ে বিএনপি সংকট অতিক্রম করে ঘুরে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু তেমন আস্থার জায়গায় বিএনপি নিজেকে নিয়ে আসতে পারেনি। তার পরও বর্তমান বাস্তবতায় ঘুরে দাঁড়াতে হলে জনগণের সমর্থন নিয়েই শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। অন্ধকার পথে পালাবদল ঘটানোর চেষ্টা তো কম হলো না। শিক্ষা হয়ে থাকলে বোঝা উচিত লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ধীরে চলা নীতিতেই হাঁটতে হবে। তাই এখন নেতৃত্বের এমন বক্তব্য দেওয়া চলবে না, যাতে সাধারণ মানুষের সমবেদনা হারাতে হয় বিএনপির। গত্বাঁধা বুলিতে না থেকে ভাষ্যে ও কর্তব্যে পরিবর্তন আনা এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ যে খুব গণতান্ত্রিক পন্থায় এখন হাঁটছে তেমন বলা যাবে না। তবে দেশোন্নয়নমূলক কয়েকটি প্রকল্পে বেশ সাফল্য অর্জন করে স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থনের অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে।

এ সময়ের বাস্তবতায় ‘গণতন্ত্র গেল গেল’ বলে জনসমর্থন নিতে পারবেন না বিএনপি নেতারা। আমাদের বড় দুই দল যে ধারার গণতন্ত্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষকে পরিচিত করিয়েছে, সে গণতন্ত্রের প্রতি কোনো আকর্ষণ থাকার কথা নয়। দুই দলেই দুই দলীয় প্রধান সব কিছুর নিয়ন্ত্রক। সুতরাং সেখানে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ কর্মী, সমর্থক ও নেতানেত্রীর ভালো লাগা-মন্দ লাগার কোনো ভূমিকা নেই। এই বাস্তবতায় আবার দুই দলই অভিন্ন ধৈর্যের সঙ্গে গণতন্ত্র-জপমালা জপে যাচ্ছে। তাই গণতন্ত্রের বুলি সাধারণ মানুষকে ছুঁয়ে যাবে না।

‘গণতন্ত্র’ বা ‘ডেমোক্রেসি’ একটি অবিভাজ্য শব্দ। এর আগে বা পরে কোনো শব্দ জুড়ে দিলে বুঝতে হবে প্রকৃত অর্থে ওখানে গণতন্ত্র আর অবশিষ্ট নেই। উদাহরণ হিসেবে আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের কথা বলা যেতে পারে। গণতন্ত্রের আগে ‘মৌলিক’ ও ডেমোক্রেসির আগে ‘বেসিক’ ঝুলিয়ে দিয়ে তিনি যা বানিয়েছিলেন তাকে আর যা-ই বলা যাক না কেন, অন্তত গণতন্ত্র বলা যাবে না। আমাদের দেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে এগিয়ে থাকা বড় দলগুলোর নেতানেত্রীদের দলীয় রাজনীতির বাস্তব ছবি ও ক্ষমতায় গেলে দলপ্রীতির পরাকাষ্ঠা দেখলে মনে হয় তাঁদের উচ্চারিত গণতন্ত্রের সামনে বা পেছনে প্রচ্ছন্নভাবে আরো কিছু আগাছা ঝুলে আছে। তাই এসব দল বিরোধী অবস্থানে থাকলে বা ক্ষমতায় গেলে একমাত্র বক্তৃতা-বিবৃতিতেই গণতন্ত্রের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। ভাণ্ডারে গণতন্ত্র নেই বলে কণ্ঠে এত গণতন্ত্রের ফুলঝুরি। প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দুই প্রধান দলের সাধনা পুরোটাই গোষ্ঠীতন্ত্র।

একটি গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতি হওয়ার কথা জনকল্যাণমুখী। বিভিন্ন মত, পথ ও আদর্শের রাজনৈতিক দল থাকবে। তারা তাদের কর্মসূচি-কর্মভূমিকার মাধ্যমে জনমত গঠন করবে, জনসমর্থন অর্জন করবে। সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন হবে। নির্বাচনের ফলাফলের ধারাবাহিকতায় একটি দল বা জোট অথবা ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার গঠিত হবে। অপর প্রধান দল সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে। সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাই যারা সরকার গঠন করে ও যারা প্রধান বিরোধী দলের আসন অলংকৃত করে; উভয়েই সমান গুরুত্বপূর্ণ ও সমান সম্মানিত। এ ক্ষেত্রে মানতেই হয়, উভয়ের পেছনে জনসমর্থন রয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে যারা সরকার গঠন করেছে, সংখ্যায় বেশি মানুষ তাদের পক্ষে রায় দিয়েছে। আবার প্রধান বিরোধী দলে যারা থাকে তারাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশের জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের পক্ষে সমর্থন দিয়েছে। অর্থাৎ জনমতকে সম্মান জানানোর মানসিকতা থাকলে উভয় পক্ষকেই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে হবে।

এসব তো তত্ত্বের কথা, যুক্তির কথা, নিয়মের কথা। ক্ষমতার রাজনীতির বাংলাদেশ স্টাইলে এর বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না। ক্ষমতাপ্রাপ্তির রাজনীতি আর গণতান্ত্রিক পন্থা বা পদ্ধতির পথ বেয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাপ্রাপ্তি দুটি এক কথা নয়। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন মোটামুটি দ্বিধাবিভক্ত। এক ভাগে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য ধারণ করা দল ও দল-সমন্বয়, ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত দলগুলো থেকে বেরিয়ে আসা নতুন সংগঠন, ভুঁইফোঁড় কোনো দল—যারা অভিন্ন ইস্যুতে প্রথম ভাগের রাজনৈতিক ঐক্যের অংশীদার হতে চাইছে, তারা। অন্য ভাগে রয়েছে দীর্ঘ ক্ষমতাভোগী ভুঁইফোঁড় অথচ দেশজুড়ে অবস্থান তৈরি করা রাজনৈতিক দল ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকদের দলের জোট। বাস্তব বিশ্লেষণে সচেতন সবাই মানবেন দুই পক্ষের বড় দুই রাজনৈতিক দলই ক্ষমতাপ্রাপ্তির রাজনীতিতে বিশ্বাসী। প্রকৃত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এগিয়ে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত গণরায়ের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের জন্য যে ত্যাগ, ধৈর্য, নিঃস্বার্থ জনকল্যাণমুখী কাজে আত্মনিয়োগ প্রয়োজন, সে প্রণোদনা তারা নিজেদের মধ্যে অনুভব করে না। ফলে যেকোনো উপায়ে ক্ষমতার মোক্ষে পৌঁছতে নানা কলাকৌশল নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এমন অবস্থায় ভোটার কিভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন? এ কারণে একেবারে দলের অন্ধভক্ত যাঁরা নন এবং যাঁরা দল নিয়ন্ত্রণে থাকেন না, তেমন ভোটার ‘পুরো ভালো’ পাবেন না জেনে ‘মন্দের ভালো’র খোঁজ করেন। এমন প্রার্থী খুঁজে ফেরেন কখনো দলীয় বিবেচনায় আবার কখনো ব্যক্তি বিবেচনায়।

এসব এখন আর লিখে বোঝাতে হবে না। সাধারণ মানুষ কঠিন অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝতে পারছে। এখন জনমতের চেয়ে টিকে থাকা আর শক্তিমান থাকা যেন নির্ভর করছে রাজনৈতিক শক্তি আর কৌশলের ওপর। এ সময়ে কৌশলে অনেকটা পরাস্ত বিএনপি নেতৃত্ব ঘরের আগুন না নিভিয়ে যে ভাষা ও শব্দে সরকার ও সরকারি দলের সমালোচনা করে যাচ্ছে, তাতে আদৌ দলীয় কোনো লাভ হচ্ছে কি না এটিই হচ্ছে বিবেচনার বিষয়। এই তো ঈদের পরদিন নিজ এলাকায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল গত্বাঁধা সুরে ও শব্দে যেভাবে কথা বলছিলেন, তাতে হঠাৎ আকাশ থেকে পড়া কেউ ভাবতে পারেন সত্যি তো সরকারের এ খুবই অন্যায়। বিরোধী দলকে শান্তিতে রাজনীতি করতে দিচ্ছে না। স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে গণতন্ত্র হরণ করছে। একমাত্র বিএনপি ক্ষমতায় এলে মির্জা ফখরুলরা এসব অন্যায় থেকে দেশবাসী আর রাজনীতিকে উদ্ধার করবেন। এ সময় আকাশ থেকে পড়া নয়, মাটিতে থাকা সাধারণ মানুষ তো বটেই, বিএনপির সাধারণ সমর্থকও লজ্জা পাবে। ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপির অতীত আচরণ কি ফটোপ্লেটে ভাস্বর হবে না!

হাজারটা উদাহরণ দেওয়া যাবে। কিন্তু অতটা জায়গা পাব কোথায়! শুধু ২০০৬ সালের নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন বিএনপির দিকে তাকাই। এই যে বিএনপি নেতারা একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলছেন সে পর্বে তাঁদের আচরণ কেমন ছিল? নিজ সমর্থিত মানুষ যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হতে পারেন, তাই হুট করে বিচারপতিদের চাকরির বয়সসীমা দুই বছর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আবার সংবিধান লঙ্ঘন করে দলীয় রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বানাতে দ্বিধা করেননি।

এখন নির্বাচন কমিশন নিয়ে নানা কথা বলছেন বিএনপি নেতারা; অথচ তখন বহু বিতর্কে জড়িয়ে পড়া, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা অপচয় করে ভুয়া ভোটার তালিকার প্রণেতা সিইসি আজিজকে স্বপদে বহাল রাখতে গলদঘর্ম হয়েছিল বিএনপি। তা ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে উত্তরা ষড়যন্ত্র তো সে সময়েরই ঘটনা।

বিএনপি নেতৃত্বকে যদি প্রশ্ন করা হয়, কী করে বুঝব দলে গণতান্ত্রিক আচরণ আছে? তাদের দলে কি দলীয় সংবিধানমাফিক সম্মেলন হয়? নেতাকর্মীর ভোটে কি নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়? নানা দল থেকে ডিগবাজি খেয়ে আসা বয়সী নেতাদের ঘাড় টপকে তাঁদের ‘জুনিয়র’ করে দিয়ে রাজনীতিতে নবাগত শুধু দলের ‘স্থায়ী প্রধান নেত্রী’র পুত্র হওয়ার সুবাদে ও ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করতে তারেক রহমান কিভাবে হয়ে যেতে পেরেছিলেন ‘সিনিয়র’ যুগ্ম মহাসচিব? কোন গণতান্ত্রিক আচরণে তা সম্ভব হয়েছিল? ক্ষমতায় থেকে দলীয় দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন বিএনপির ক্ষমতাবানরা। গণরায়ের বিষয়টি আমলে না এনে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিবার ও দলতন্ত্রের হাতে কুক্ষিগত করার জন্য সব ধরনের ছক কাটা সম্পন্ন কি করেননি? তাহলে এর কী জবাব দেবেন তাঁরা? এই বিএনপি নেতৃত্ব যদি আজ সাধারণ মানুষকে বোকা বানানোর অপচেষ্টায় মুখে গণতন্ত্রের জিকির তোলে, তাহলে তো সমবেদনার চেয়ে সাধারণ মানুষের করুণাই পাবে বেশি।

সাধারণ মানুষ সত্যি অত বোকা নয়। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের চাপ আর বিএনপি নেতাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে কপটতার কারণেই নিজ দলীয় কর্মী-সমর্থকরা আস্থা রাখতে পারছে না। গ্রামগঞ্জে তো দূরের কথা, শহরেও দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটছে না। দুই দিন আগেই টিভিতে দেখলাম, বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীরা কোটারি তৈরি করা নেতাদের দুষছে। বলছে, দলীয় কার্যালয়ে নেতারা আসছেন না। বেগম জিয়ার সঙ্গে সাধারণ নেতাকর্মীদের দূরত্ব তৈরি করা হচ্ছে। কিছুসংখ্যক চিহ্নিত নেতা নিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সব বৈঠক হচ্ছে গুলশান কার্যালয়ে।

অমন বাস্তবতায় বিএনপিকে যদি ঘুরেই দাঁড়াতে হয়, তবে পুরনো বক্তব্যে মির্জা ফখরুলদের কণ্ঠশীলন করলে চলবে না। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে স্বৈরাচারী আর গণতন্ত্র হত্যাকারী হিসেবে বলার আগে অতীতে একই কৃতকর্মের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে—ভুল স্বীকার করতে হবে। জনগণকে কথায় ও কাজে নিশ্চিত করতে হবে যে বিএনপি এখন সত্যিকার গণতান্ত্রিক আচরণ করার শপথ নিয়েছে। জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই-ই হবে রূপান্তরিত বিএনপির একমাত্র লক্ষ্য। ভাষ্যে ও আচরণে জন-আস্থা তৈরি না করতে পারলে চোরাবালিতে ছোটার দুর্দশায়ই পড়তে হবে দলটিকে।

 

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com


মন্তব্য