kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


‘আমাদের ছাড়া আমাদের বিষয়ে কিছু নয়’

শাহনাজ মুন্নী

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



 ‘আমাদের ছাড়া আমাদের বিষয়ে কিছু নয়’

‘আমার ছোট বাচ্চাকে নিয়ে আমি গেলাম হাসপাতালে টিকা দিতে। বসে থাকতে হলো অনেকক্ষণ।

সেই সময় বাচ্চাকে যে একটু বুকের দুধ খাওয়াব, সেই আড়ালটা কোথাও পেলাম না। আমি চাই আমাদের হাসপাতালে একটা ব্রেস্টফিডিং কর্নার থাকুক। ’ কথাগুলো ময়মনসিংহে গণশুনানিতে অংশ নেওয়া এক ভুক্তভোগী মায়ের। হাসপাতালের পরিচালক প্রতিশ্রুতি দিলেন খুব শিগগির হাসপাতালে ব্রেস্টফিডিং কর্নার করা হবে। পরের বছর আবার যখন ময়মনসিংহে গণশুনানির পরবর্তী অবস্থা জানার জন্য সভা হলো তখন দেখা গেল, ওই হাসপাতালে ব্রেস্টফিডিং কর্নার করা হয়েছে।  

সবখানেই যে এ রকম সাফল্য পাওয়া গেছে তা হয়তো নয়, তবে সিটিজেন হিয়ারিং বা এই গণশুনানি জনগণ ও সরকারকে একসঙ্গে আরো কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেছে, যাতে নারী ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকার সাধারণ জনগণের চিন্তাভাবনা কী তা জানতে পারে। তাদের কথা শোনে এবং সেভাবে কাজ করে। এর ফলে সরকারের কাজকর্মকে একটা জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য খাতে কাজ করা মানুষেরা।

প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। সে সময় বিভিন্ন দেশে প্রায় ১০০টি সিটিজেন হিয়ারিং বা নাগরিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন বয়স, পেশা ও মতের মানুষ এই সিটিজেন হিয়ারিং বা গণশুনানিতে অংশ নেয়। এ সময় তারা তাদের নেতানেত্রীদের ও স্বাস্থ্য খাতে দায়বদ্ধ মানুষদের কাছে প্রশ্ন করে, তাদের নিজেদের মতামত জানায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্ধারিত দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। এভাবেই তারা চেষ্টা করে স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহির ক্ষেত্রটি নিশ্চিত করতে।   

বাংলাদেশেও হোয়াইট রিবন অ্যালায়েন্স এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ—খুলনা, ময়মনসিংহ, জয়পুরহাট, কক্সবাজার ও পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় মোট ছয়টি সিটিজেন হিয়ারিং বা নাগরিক শুনানির আয়োজন করে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সিভিল সার্জন, সরকারি কর্মকর্তা, এনজিও, সিভিল সোসাইটির সদস্য, শিক্ষক, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতাসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ এই সিটিজেন হিয়ারিং বা নাগরিক শুনানিতে অংশ নেয়। পরবর্তী সময়ে এসব গণশুনানিতে পাওয়া সুপারিশগুলো একসঙ্গে করে ঢাকায় একটি জাতীয় শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং সুপারিশগুলো জাতীয়ভাবে তুলে ধরা হয়, যার কয়েকটি হলো—

১. কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আরো বেশি কঠোর মনিটরিং সিস্টেমের মধ্যে আনতে হবে। জনগণ মনে করে, সম্পদের অপ্রতুলতা ও দুর্বল জবাবদিহি মাঝেমধ্যে এলাকাবাসীকে কমিউনিটি ক্লিনিকে যেতে নিরুৎসাহ করে।

২. সপ্তাহে অন্তত এক দিন যেন একজন কোয়ালিফায়েড ডক্টর কমিউনিটি ক্লিনিকে বসেন সে ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. যেসব কমিউনিটি ক্লিনিক বর্তমানে আছে, সেসবের উন্নয়নের দিকে সরকারের আরো দৃষ্টি দেওয়া দরকার।

৪. স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জবাবদিহি আরো বাড়ানোর সুপারিশ আসে।

৫. আঞ্চলিক ও জেলাভিত্তিক হাসপাতালগুলোতে দক্ষ পেশাজীবীদের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি প্রক্রিয়া আরো জোরদার করা এবং হাসপাতালগুলোকে শিশুবান্ধব, নারীবান্ধব করা। ব্রেস্টফিডিং স্পেস এবং অপুষ্টিতে জর্জরিত শিশুদের জন্য আলাদা কর্নার করা।

৬. যেহেতু বিপুলসংখ্যক নারী গার্মেন্টকর্মী আছেন, তাই তাঁদের সন্তানদের জন্য স্পেশাল ডে কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা রাখা উচিত।

৭. পুষ্টি, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিষয়গুলো স্কুল ও মাদ্রাসার কারিকুলামে রাখার কথা বলা হয়েছে। কারণ শিক্ষকরা স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা ও পুষ্টিসংক্রান্ত বিষয়ে শিশুদের জানাতে ভূমিকা রাখতে পারেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা পার্বত্য অঞ্চলে বাস করে, তাদের জন্য এবং উপকূলীয় এলাকা ও চরাঞ্চলে বাস করা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কর্মসূচির পরিকল্পনা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

৮. গরিব মানুষের জন্য হেলথ কার্ডের ব্যবস্থা করা যায় কি না, যাতে তারা বিনা পয়সায় চিকিৎসা পেতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য বীমার প্রসঙ্গটি এখানে উল্লেখ করা যায়।

৯. প্রত্যেক নারী ও শিশুর জন্য চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা বিনা মূল্যে থাকতে হবে। মন্ত্রণালয় এবং এনজিওগুলোর মধ্যে কাজের সমন্বয় থাকতে হবে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক ইস্যুগুলোতে। হেলথ সার্ভিস গ্রহণকারী, চিকিৎসক, গবেষক, সরকার ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি ও  মিডিয়ার মাধ্যমে একটা জবাবদিহির প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে।

১০. হেলথ সেক্টরে কাজ করা এনজিওগুলোর জবাবদিহির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

১১. বাল্যবিয়ে নারী ও শিশুস্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এ কারণে বাল্যবিয়ের হার কমাতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বার্থ রেজিস্ট্রেশন ও একটি ন্যাশনাল ডাটাবেইস তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।

১২. প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বিশ্বাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য বিষয়ে আলোচনা করার সুপারিশ করা হয়।

১৩. ই-হেলথ কেয়ার সার্ভিসের প্রবর্তন করা।

১৪. স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অনিয়ম পাওয়া গেলে সেসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

১৫. স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ করার বিষয়ে তুলনামূলক স্টাডি থাকা দরকার। নাগরিকদের কাছে তথ্যগুলো যাতে সহজে যায় বা সহজে যাতে তারা তথ্য পেতে পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।

১৬. স্বাস্থ্য খাতে এসডিজি টার্গেট বাস্তবায়ন করতে সংসদকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিতে হবে। স্বাস্থ্যবিষয়ক পার্লামেন্টারি কমিটিগুলোকে এবং সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আরো জবাবদিহির আওতায় আনতে একই রকম গণশুনানির আয়োজন করা যেতে পারে।

১৭. সংসদ সদস্য বা আইন প্রণেতারা হেলথ সেক্টরে বাজেট বাড়ানোর ব্যাপারে সুপারিশ করতে পারেন।

১৮. খাদ্য নিরাপত্তা ও ভালো খাবার নিশ্চিত করতে হবে। সেসব খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যা মা ও শিশুস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।            

১৯. স্বাস্থ্যসেবা খাতে লোকবল বাড়ানো ও জনগণের প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে।

সিটিজেন হিয়ারিংয়ের কিছু লক্ষ্য ছিল। সেগুলো হলো—প্রথমত, নারী, শিশু ও নবজাতকের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় জনগণের করা সুপারিশগুলো সরকারের কাছে পৌঁছানো, যাতে এগুলো জাতীয়ভাবে বিশ্বনেতাদের কাছে উপস্থাপন করা হয়।

একই সঙ্গে জাতীয় নীতিনির্ধারণেও এই সুপারিশগুলো কিভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেটি নির্ধারণ করা।

দ্বিতীয়ত, জাতীয় জবাবদিহিপ্রক্রিয়ায় কিভাবে নারী, শিশু ও নবজাতকের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের কাজকর্মের সঙ্গে সিভিল সোসাইটি ও নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেটি নির্ধারণ করা।

তৃতীয়ত, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জবাবদিহিপ্রক্রিয়ার মধ্যে কিভাবে নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যায় সে বিষয়ে একটি পরিষ্কার পথনির্দেশনা তৈরি করা।  

এটা সবাই স্বীকার করেন, বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে নারী ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এর কারণ, এ খাতে নীতিনির্ধারকরা দৃষ্টি দিয়েছেন এবং এ খাতে বিনিয়োগও বাড়ানো হয়েছে। এর পেছনে আরো যে নিয়ামকটি কাজ করেছে, সেটা হলো জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা বা মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল—সংক্ষেপে এমডিজি।

এমডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারী ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে গত বছরগুলোতে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এর পরও এমডিজির অসমাপ্ত কাজগুলো পূরণের জন্য জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং সব ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে গ্লোবাল সিটিজেন হিয়ারিংয়ের উদ্যোক্তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। একই সঙ্গে এসডিজির ক্ষেত্রে সাফল্য আনতে নীতিনির্ধারণপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা। আর এ ক্ষেত্রে সিভিল সোসাইটি ও মিডিয়া ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তাঁদের বিশ্বাস।  

 

লেখক : সাংবাদিক

shahnazmunnibd@gmail.com


মন্তব্য