kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কারিগরি প্রশিক্ষণে বেকারত্ব সমাধান

ড. মো. জসীম উদ্দিন ও ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বর্তমানে দেশে প্রায় ১০ কোটি ৫৬ লাখ কর্মক্ষম মানুষ রয়েছে, যাদের অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৫। এ অবস্থা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

এ চিত্র পৃথিবীর অনেক দেশে প্রায় বিরল। এই বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো বেকার; যেখানে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। দেশে বেকারত্বের এ হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, বিশ্বে বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় ১২তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, গত এক দশকে বেকারত্ব বেড়েছে ১.৬ শতাংশ। অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার কমেছে ২ শতাংশ। প্রতিবছর ২৭ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে ঢুকছে। অথচ সরকারি বা বেসরকারিভাবে কাজ পাচ্ছে মাত্র এক লাখ ৮৯ হাজার মানুষ। ফলে দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এই বেকার জনশক্তি। এ থেকে মুক্তির একটি অন্যতম উপায় হতে পারে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। ২০১০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতিতে কারিগরি শিক্ষার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

উন্নত বিশ্বে কারিগরি শিক্ষার হার ৬০ শতাংশ, যা বাংলাদেশে প্রায় ৮ শতাংশের মতো। এ থেকে উত্তরণে সরকার আগামী ২০২০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে; যা একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে ধারণা করা হয়। এ লক্ষ্যে সরকার এর মধ্যেই দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে ‘সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ বা টিটিসি স্থাপন প্রায় সম্পন্ন করেছে এবং প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কারিগরি স্কুল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত কিংবা প্রশিক্ষিতদের শুধু দেশে নয়; দেশের  বাইরেও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। আমাদের দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিদেশে থাকে; যাদের অধিকাংশই অদক্ষ শ্রমিক। কিন্তু তারাই আবার রেমিট্যান্স অর্জনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক শুধু দক্ষতার অভাবে নিম্নমানের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। তারা যদি বাজার চাহিদাভিত্তিক কোনো ট্রেডে প্রশিক্ষিত হতো, তাহলে তিন থেকে চার গুণ বেশি উপার্জন করার সুযোগ পেত। কিন্তু এই অদক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৫৭টি দেশে জনশক্তি রপ্তানি করলেও স্থায়ীভাবে বৈদেশিক শ্রমবাজার তৈরি করতে পেরেছে এ পর্যন্ত মাত্র ১৪টি দেশে। এসব দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, লেবানন, জর্দান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই, মরিশাস ও ইরাক। কিন্তু এসব দেশে রপ্তানীকৃত অধিকাংশ মানুষ অদক্ষ বা আধা দক্ষ হওয়ায় প্রত্যাশিত মাত্রায় বৈদেশিক রেমিট্যান্স দেশে আসছে না। এ ক্ষেত্রে কারিগরি প্রশিক্ষণ হতে পারে একটি কার্যকর কৌশল। তবে শুধু সরকারের পক্ষে এ দেশের বেকার ও অদক্ষ মানুষকে শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষিত করে তোলা সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার একটি সমন্বিত উদ্যোগ। আর এ উদ্যোগে প্রতিনিয়ত সহযোগিতা করে যাচ্ছে যেসব প্রতিষ্ঠান তার মধ্যে অন্যতম পিকেএসএফ। কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯০ সালে ‘পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন’ (পিকেএসএফ) প্রতিষ্ঠা করে।

বাংলাদেশ সরকার ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ‘স্কিল ফর এমপ্লয়মেন্ট প্রোগ্রাম’-এর আওতায় দেশের নিম্ন আয়ের পরিবারের দুই লাখ ৬০ হাজার সদস্যকে তিন মাস ও ছয় মাসমেয়াদি বিভিন্ন ট্রেডে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে; এর মধ্যেই মার্চ ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৫৫৮ জন প্রশিক্ষণার্থী বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে এবং ১২ হাজার ৫৭৬ জন চাকরি পেয়েছে (তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমীক্ষা-১৬)। সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পিকেএসএফ এসইআইপি প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১০ হাজার বেকার তরুণকে বাজার চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে ১৩টি ট্রেডে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের পরিকল্পনা করেছে। জুলাই ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুই হাজার ৭১২ জন তরুণকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। তা ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ‘উজ্জীবিত’ প্রকল্পের আওতায় এক হাজার অতি দরিদ্র পরিবারের বেকার তরুণদের পর্যায়ক্রমে কারিগরি বা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করার পরিকল্পনা নিয়ে এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রশিক্ষণার্থীর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পিকেএসএফ সব সময় সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে কর্মক্ষম প্রতিবন্ধী যুবক-যুবতী ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার প্রদান করে আসছে। কোনো দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের মূল সোপান হলো যুবশক্তি। সেই যুবশক্তিকে সঠিক পথে পরিচালনার ওপর নির্ভর করছে দেশের অগ্রযাত্রা।

লেখকদ্বয় : উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পিকেএসএফ প্রশিক্ষণ ও প্রতিবন্ধিতা বিশেষজ্ঞ, কলাম লেখক


মন্তব্য