kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য বহির্বিশ্বের কাছে বিস্ময়

মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য বহির্বিশ্বের কাছে বিস্ময়

দেশের কৃষিজমি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও ধানসহ খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ চমক সৃষ্টি করেছে। একসময় মান্ধাতার আমলের পদ্ধতিতে এ দেশে চাষাবাদ হতো।

সে পশ্চাত্পদতা কাটিয়ে কৃষিতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লেগেছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের কৃষকরা এখন ব্যবহার করছে কলের লাঙল ও ট্রাক্টর। ধান মাড়াইয়েও ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। উন্নতমানের বীজ, সার ও সেচ বাংলাদেশের কৃষির অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। বাড়তি জনসংখ্যার প্রয়োজনে এ সময়ে বাসস্থান, স্কুল-কলেজ, হাটবাজার, কল-কারখানা ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে চাষাবাদের জমি ব্যবহার বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এ সময়ে শুধু চালের উৎপাদন বেড়েছে ৩.১৬ গুণ। একই সময়ে গমের উৎপাদন বেড়েছে ১২.২৫ গুণ। ভুট্টা উৎপাদন ৭৫৭ গুণ। আলুর উৎপাদন বেড়েছে ১০.১১ গুণ।

একদিকে জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাওয়া, অন্যদিকে জনপ্রতি খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও হেক্টরপ্রতি ধানের উৎপাদন তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ধান রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। ধান উৎপাদনে দেশের পরিশ্রমী কৃষকদের কৃতিত্ব যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধিক ফলনশীল বিভিন্ন জাতের ধানও অবদান রাখছে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও কৃষি খাতের উন্নয়নে জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রতিবছর বাড়ছে। সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও কৃষি খাতের উন্নয়নে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে গত আট বছরের ব্যবধানে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়েছে ৩০.৪৮ শতাংশ। সব জাতের ধান, গম ও ভুট্টার উৎপাদনে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। আর খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়ায় দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ওয়েবসাইটে ২০১৩ সালের উৎপাদনের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের ২০টি দেশের তালিকা। তাতে পাঁচ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করে বাংলাদেশকে বিশ্বের দশম বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে দুনিয়ার সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন। চীনের খাদ্য উৎপাদনে ৫৫ কোটি ১১ লাখ মেট্রিক টন। ৪৩ কোটি ৬৫ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদনকারী যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দ্বিতীয়, ২৯ কোটি ৩৯ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন করে ভারত তৃতীয়, ১০ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদনকারী ব্রাজিল চতুর্থ, রাশিয়ার স্থান পঞ্চম ৯ কোটি তিন লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন করে এ দেশটি। ষষ্ঠ স্থানে আট কোটি ৯৭ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদনকারী ইন্দোনেশিয়া, সপ্তম স্থানে ছয় কোটি ৭৫ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদনকারী ফ্রান্স, অষ্টম স্থানে কানাডা, যে দেশের উৎপাদন ছয় কোটি ৬৩ লাখ মেট্রিক টন ও নবম স্থানে ইউক্রেন, ২০১৩ সালে যে দেশটির খাদ্য উৎপাদন ছিল ছয় কোটি ৩১ লাখ মেট্রিক টন। বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত। সামান্য কিছু খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি হলেও একইভাবে বিদেশে খাদ্য রপ্তানিও করে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার আগে দেশের লোকসংখ্যা ছিল সাত কোটি। ৪৪ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেলেও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে অন্তত তিন গুণ। যে দেশের মানুষ বহু বছর ধরে অর্ধাহারে-অনাহারে কাটাত, সে দেশে খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ স্বাধীনতার পর প্রায় দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জনে সহায়তা করেছে। বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতিও এ কৃতিত্বের অন্যতম দাবিদার।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন হয়েছিল ২৮৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩১১.২১ লাখ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৩২৮.৯৬ লাখ মেট্রিক টন, ২০০৯-১০ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৩৪১.১৩ লাখ মেট্রিক টন, ২০১০-১১ অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ৩৬০.৬৫ লাখ মেট্রিক টন, ২০১১-১২ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৩৬১.৮২ লাখ মেট্রিক টন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ৩৭২.৬৬ লাখ মেট্রিক টন। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে খাদ্যশস্য উৎপাদেনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৭৭.৮২ লাখ মেট্রিক টন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন হয়েছে ৩৭৭.৮২ লাখ মেট্রিক টন। যা আগের অর্থবছরের (২০১২-১৩) চেয়ে ৫.১৬ মেট্রিক টন বেশি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে দুই লাখ ৭৮ হাজার ২০০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বেশি উৎপাদিত হয়েছে। তবে ওই অর্থবছরে দেশে খাদ্যশস্যের চাহিদা ছিল তিন কোটি ৫৮ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে চালের চাহিদা ছিল তিন কোটি ১৭ মেট্রিক টন ও গম ৪১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে মোট উৎপাদন হয়েছে তিন কোটি ৬০ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল উৎপাদিত হয়েছে তিন কোটি ৪৭ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন এবং গম ১৩ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে আউশ ধান উৎপাদন হয়েছে ২৩.২৬ লাখ মেট্রিক  টন, আট বছর আগে যার উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৫.১২ লাখ মেট্রিক টন।

অন্যদিকে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে আমন ধান উৎপাদন হয়েছে ১০৮.৪১ লাখ মেট্রিক টন, যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২১.৮২ লাখ মেট্রিক টন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০.২৩ লাখ মেট্রিক টনে।

বর্তমানে দেশের মোট ৭৫ শতাংশ জমিতে ব্রি ধানের চাষ হয় এবং এ থেকে দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৮৫ শতাংশ আসে। ১৯৭০-৭১ সালে দেশে মোট উৎপাদিত ধানের পরিমাণ ছিল এক কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। গত এক যুগে রীতিমতো ঘটে গেছে সবজি বিপ্লব। একসময় ভালো স্বাদের সবজির জন্য শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। টমেটো, লাউ, কপি বা নানা পদের শাক শীতকাল ছাড়া বাজারে মিলতই না। গ্রীষ্মকাল ছিল সবজির আকালের সময়। গত এক যুগে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন প্রায় সারা বছরই ২০ থেকে ২৫ জাতের সবজি খেতে পারছে দেশের মানুষ। কৃষকরা সারা বছরই নানা ধরনের সবজি চাষ করছেন। গত এক দশকে বাংলাদেশে সবজির আবাদি জমির পরিমাণ ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই হার বিশ্বে সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও)।

বিশ্বে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদনবিষয়ক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। এফএওর বৈশ্বিক পরিসংখ্যান প্রতিবেদন বলছে, ফল উৎপাদনের দিক থেকে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল বিশ্বের পর্যায়ক্রমে শীর্ষস্থানে রয়েছে। আর মোট ফল উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে ২৮তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে দুই বছর ধরে বাংলাদেশের ফলের উৎপাদন বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ থেকে দ্রুতগতিতে বাড়ছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন। এফএওর হিসাবে সমুদ্রে মাছ আহরণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২৫তম। তবে ভারত ও মিয়ানমারের কাছ থেকে সমুদ্রজয়ের পর বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের মত্স্য আহরণ কয়েক গুণ বাড়বে বলে সংস্থাটি মনে করছে। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।

বিশ্বের অন্যতম খাদ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়ারও সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। কৃষিতে আরো আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নতমানের বীজ ব্যবহার নিশ্চিত করে উৎপাদন দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে আমাদের সরকার কাজ করে যাচ্ছে। খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য বহির্বিশ্বের কাছে বিস্ময় বলে বিবেচিত হবে এবং বাংলাদেশ কৃষিতে রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে—এমনই আমার বিশ্বাস।

লেখক : আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সাবেক মন্ত্রী, বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়


মন্তব্য