kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রামপাল বিতর্ক : কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

আবুল হাসান রুবেল   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



গত ৫ সেপ্টেম্বর একটি পত্রিকায় রামপালবিষয়ক একটি সাক্ষাৎকারভিত্তিক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ‘আনসার টু সাম কন্ট্রোভার্সিস’ শিরোনামে। ঋণের গ্যারান্টার থেকে শুরু করে সব প্রশ্নে শেষ কথাটি সরকারি কর্মকর্তাদের হওয়ায় তা অনেক ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।

সেগুলো পরীক্ষা করে প্রকৃত চিত্র উপস্থাপনের জন্যই এ লেখা।

প্রথমত, রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কম্পানি মারফত। এ প্রকল্পে বাংলাদেশ ১৫ শতাংশ ও ভারত ১৫ শতাংশ বিনিয়োগ করবে। বাকি ৭০ শতাংশ ঋণ করা হবে। এই ঋণের গ্যারান্টার হবে বাংলাদেশ। অর্থাৎ কোনো কারণে প্রকল্প বাতিল হলে বা ঋণের কিস্তি দিতে কম্পানি ব্যর্থ হলে তার দায় নেবে বাংলাদেশ। এ প্রকল্পের লাভ ৫০ শতাংশ করে ভাগ হবে। এ ছাড়া ঠিকাদারি কাজ, কয়লা সরবরাহ ব্যবসা ইত্যাদিও পাবে ভারত। এর আগে কেবল সরকারি প্রকল্পেই বাংলাদেশ এ রকম সর্ভেন্টি দিত। এর ব্যাখ্যায় সরকারি কর্মকর্তারা যা বলছেন তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকল্প বাংলাদেশে হবে বলে বাংলাদেশকেই সর্ভেন্টি দিতে হবে, এমন কোনো ব্যাপার আসলে নেই। বরং মালিকানা-লাভ সবই যেহেতু ভাগাভাগির, কাজেই এটাও যৌথভাবে হওয়াই যুক্তিযুক্ত। উপরন্তু এখানে কয়লা আনার ঠিকাদারি, অন্যান্য ব্যবসার ঠিকাদারি, এমনকি নিম্নমানের কয়লা বেচার সুযোগ সবই পাচ্ছে ভারত। বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে বাংলাদেশ, অতএব তারই দায় নেওয়া উচিত। বাংলাদেশ কিন্তু বিনা মূল্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে না, বরং বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে নেবে। কাজেই এ যুক্তি অবান্তর। বিভিন্ন দেশ বা সংস্থা ঋণ দিতে রাজি হয়নি শুধু সর্ভেন্টির অভাবে, তথ্যটাও সত্য নয়। অনেকে এটা দিতে রাজি হয়নি, এতে সুন্দরবনের ওপর বিরূপ প্রভাব বিবেচনায়। এ সত্যকে আড়াল করা হয়েছে। আর এরপর অন্যান্য চুক্তিতেও বাংলাদেশের গ্যারান্টার হওয়াটা একটা ভুলের লেজ ধরে আরো ভুল করে যাওয়া এবং এক ভুলকে অন্য ভুল দিয়ে সিদ্ধ করারই ধ্রুপদী উদাহরণ।

দ্বিতীয়ত, ১.৪৯ বিলিয়নের প্রকল্পে কোনো ঝুঁকি না নিয়েই এনটিপিসির মুনাফার দীর্ঘমেয়াদি ভাগীদার হওয়া ও অর্ধেক নিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উত্তর সবচেয়ে হাস্যকর। তাঁরা বলেছেন, এটা বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে তাদের দেওয়া হচ্ছে। যখন দুই পক্ষ একটি ব্যবসায়িক চুক্তি করে তখন সবাই চেষ্টা করে নিজের পক্ষে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নিতে। এ রকম বন্ধুত্বের যুক্তি বোধ হয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেই অনন্য। এরপর তারা যুক্ত করেছেন এনটিপিসির কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা ও সেই অভিজ্ঞতা থেকে শেখার প্রশ্ন। এনটিপিসি অভিজ্ঞ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এনটিপিসির অভিজ্ঞতাটা কী রকম সেটাও জানা থাকা জরুরি। ভারতের এনটিপিসি কম্পানি সবচেয়ে দূষণকারী কম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভারতের সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের গবেষণা অনুসারে এনটিপিসির বরদপুর বিদ্যুেকন্দ্র ছিল গবেষণা চালানো বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দূষণ সৃষ্টিকারী। গবেষণা চালানো ৪২টি বিদ্যুেকন্দ্রের মধ্যে ছয়টি ছিল এনটিপিসির—যাদের সর্বোচ্চ অর্জিত নম্বর ছিল ২৮, যেখানে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৮০। এ রকম দূষণের চ্যাম্পিয়ন কম্পানিকে সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুেকন্দ্র করতে দিয়ে তারপর তার কাছ থেকে দূষণহীন বিদ্যুেকন্দ্র আশা করাটা রাজাকারের কাছে দেশপ্রেম শিক্ষার মতোই।

তৃতীয়ত, উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে ৮-৮.৮৫ টাকা, যা দেশে কয়লাভিত্তিক অন্যান্য বিদ্যুেকন্দ্রের দ্বিগুণেরও বেশি। যেমন পুরনো মেঘনা ঘাটের বিদ্যুেকন্দ্রে বিদ্যুতের দাম ২.৩ টাকা, ওরিয়ন বা এস আলম গ্রুপের বিদ্যুেকন্দ্রের বিদ্যুতের দাম ৩.৫ টাকা। এমনকি ভারত থেকে এখন যে দামে (৫.৫-৬ টাকা) বিদ্যুৎ আমদানি করা হয় তার চেয়েও বেশি। এ বিদ্যুেকন্দ্রের বিদ্যুতের দাম যখন ধরা হয় তখন দূষণরোধে ব্যবস্থা, কয়লার মান, সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ইত্যাদি ধরা হয়েছে ইআইএ অনুযায়ী। সরকারপক্ষের লোকজন দাবি করছে, নাগরিকদের প্রতিবাদের কারণে সরকার এখন দূষণরোধে নতুন নতুন ব্যবস্থা নিচ্ছে। যেমন এফজিডি ব্যবহার করছে, এসসিআর ব্যবহার করবে, মার্কারি দূর করার ব্যবস্থা করবে ইত্যাদি। এসসিআর করলে মোট খরচের ২ শতাংশ বাড়বে, এফজিডি করলে ১২ শতাংশ বাড়বে আর মার্কারি দূর করার প্রযুক্তি চালু করলে বয়লারপ্রতি তার স্থাপনা খরচ ৬.২ মিলিয়ন ডলার আর পরিচালনা ব্যয় ছয় লাখ ৭৪ হাজার ডলার পড়বে প্রতিবছর। ফলে সরকারপক্ষের বিভিন্ন ব্যক্তি যেসব কথা বলেছেন, তা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে তো এসব খরচ যোগ করার পর বিদ্যুতের দাম আরো বাড়ার কথা। সে ক্ষেত্রে উদ্ধৃত কর্মকর্তা কিসের ভিত্তিতে বলছেন যে দাম কমবে?

চতুর্থত, ইআইএতে বলা আছে, ড্রেজিং করতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়েছে ড্রেজিং নিয়মিতই করা হয়, কয়লার জাহাজ আসতে হলে ড্রেজিং করতে হবে, সেটা এ পর্যন্ত সবাই বলছেন। কিন্তু উদ্ধৃত কর্মকর্তা কিসের ভিত্তিতে ড্রেজিং না করেও কয়লা আনা সম্ভব বলছেন সেটা পরিষ্কার নয়। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুসারে এখানে কয়লা পরিবহনের জন্য ড্রেজিং করতে হবে, যার ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ সুন্দরবনের ভেতরে। এ অঞ্চলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ইরাবতি ও গাঙ্গেয় ডলফিন, নোনা পানির কুমিরসহ অন্যান্য বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির বসবাস। ড্রেজিংয়ের ফলে এদের বসবাস প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

পঞ্চমত, এনটিপিসি ১২ থেকে ১৪ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করে প্রতিবছর। এটাকে আনা-নেওয়া করার সময় দুর্ঘটনা না ঘটার গ্যারান্টি হিসেবে যেভাবে বলা হয়েছে তাতে বলতেই হয়, ‘বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’ তত্ত্বেই তার আস্থা শতভাগ। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে বছরে কয়লা লাগবে ৪৭ লাখ মেট্রিক টন। এই কয়লা বড় যেসব জাহাজে আসবে সেগুলোকে সমুদ্রের ভেতর থেকেই নোঙর করে ছোট ছোট জাহাজে বা লাইটার জাহাজে করে আক্রাম পয়েন্ট থেকে রামপালে নিয়ে আসতে হবে। একটি বড় জাহাজে কয়লা আসবে ৪৭ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ এ রকম ১০০টি বড় জাহাজে কয়লা নিয়ে আসতে হবে, যেগুলো খালি করতে আবার প্রায় চার হাজার লাইটার জাহাজ লাগবে। সেই চার হাজার জাহাজ আবার রামপালে এই কয়লা আনলোড করবে।

এই বিপুলসংখ্যক জাহাজ চলাচলের ফলে তেল, কয়লা, ধোঁয়ার মাধ্যমে দূষণ হবে। এরপর আসে কয়লা লোড-আনলোড করার সময় দূষণের প্রশ্ন। এই কয়লা লোড-আনলোড করার সময় বাতাসে কার্বনের কণা ছড়িয়ে পড়ে, পানি দূষিত হয় বিপুল পরিমাণে। কয়লার কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ হার কমাবে। এ ছাড়া আছে এই জাহাজগুলোর শব্দ-আলো। সুন্দরবনের নীরব পরিবেশে এগুলো বন্য প্রাণীর জন্য বড় অসুবিধার কারণ হবে। ফলে নানাভাবে এই প্রভাব কমিয়ে দেখানোর যে চেষ্টা আগে থেকেই জারি আছে রিপোর্টে উদ্ধৃত কর্মকর্তা তার চেয়ে নতুন কিছু বলেননি এ ক্ষেত্রে।

ষষ্ঠত, ফ্লাই অ্যাশ ও মার্কারির ব্যাপারে উদ্ধৃত কর্মকর্তা যা বলেছেন, এরই মধ্যে সরকারি বিভিন্ন ব্যক্তি যা বলেছেন তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে যেসব কথা বলেছেন তার সঙ্গেও মেলে না। যেমন প্রধানমন্ত্রী এফজিডি দিয়ে মার্কারি দূর করার কথা বলেছেন, তিনি বলছেন ইএসপি দিয়ে করার কথা। আসলে ইএসপি অন্যান্য ক্ষুদ্র কণা কমালেও মার্কারি দূর করতে তেমন কার্যকর নয়।   এমনকি এফজিডিও মার্কারি দূর করতে খুব কার্যকর নয়। এফজিডি, এসসিআর ইত্যাদি প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা কম্পানির প্রচারপত্রে বলা হয়েছে অথচ ইআইএতে নেই; সেগুলোর কথাও এই কর্মকর্তা উল্লেখ না করার কারণ আসলে কী? তাহলে কি সেগুলো শুধু বিজ্ঞাপন, বাস্তবে ব্যবহার করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই? আর ছাই বিষয়ে চাহিদার কথাটার পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ এখনো পর্যন্ত কেউই দেখাননি। ছাই সব বিক্রি হয়ে যাওয়ার কথাটা আসলে কোনো দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বরং বড় পুকুরিয়ার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ছাই বিক্রি হয়নি। কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই বিষাক্ত এবং অন্যত্র ব্যবহারও নিরাপদ নয়। সিমেন্ট কম্পানিগুলোকেও আপনারা দেখবেন ফ্লাই অ্যাশবিহীন সিমেন্টের বিজ্ঞাপন দিতে।

আসলে এসব কথার আড়ালে ভয়ংকর ফাঁকি আছে। রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রে দৈনিক ১৪২ টন সালফার অক্সাইড, ৮৫ টন নাইট্রোজেন অক্সাইড ও বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড উত্পন্ন হবে। সালফার ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড বাতাসের অন্যান্য উপাদান ও পানির সঙ্গে মিশে এসিড রেইন  তৈরি করবে, যা সরাসরি গাছের ক্ষতি করবে, আবার মাটির পুষ্টিগুণ নষ্ট করেও ক্ষতি করবে। কার্বন ডাই-অক্সাইড বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি করবে, যার রয়েছে বহুমাত্রিক প্রভাব। এটা ফ্লাই অ্যাশ ও বটম অ্যাশের জন্ম দেবে, যার ভেতরে বহু বিষাক্ত ভারী ধাতু মিশে থাকে। এখান থেকে যে বিপুল পরিমাণ মার্কারি উৎপাদিত হবে তা বিরাট এলাকা দূষিত করতে সক্ষম। মার্কারির বিষক্রিয়া ভয়ংকর, এটা খাদ্যশৃঙ্খলের যতই ওপরের দিকে উঠতে থাকে তার ঘনত্বও বাড়তে থাকে। কয়লায় যে মিথাইল মার্কারি ও মার্কারি ক্লোরাইড থাকে তা মানুষের ক্যান্সারের কারণ।

কম্পানি নাইট্রোজেন অক্সাইড দূর করার জন্য যে লো নাইট্রোজেন অক্সাইড টি বার্নার ব্যবহার করার কথা বলছে, তা ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জির তথ্য মতে ৩৭ শতাংশ নাইট্রোজেন অক্সাইড কমাতে পারে। অথচ সরকারি ইআইএ দাবি করেছে ৮৭ শতাংশ কমাতে পারার কথা। এর ফলে যে পরিমাণ নাইট্রোজেন গ্যাস নিঃসরণ হবে তা সুন্দরবনের বর্তমান পরিমাণকে ১২ গুণ বাড়াবে, এমনকি বসতি এলাকার গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়েও তা তিন গুণ বেশি। সালফার ডাই-অক্সাইড দূর করার জন্য যে এসজিডি ব্যবহার করা হবে বলে বলা হচ্ছে, তা বাতাসে সালফার কমালেও পানিতে তার পরিমাণ বাড়াবে। মার্কারি দূষণ রোধ করার জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সালফার দূর করতে গিয়ে যেটুকু মার্কারি দূর হবে তাকেই ৯০ শতাংশ দূর হবে বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ৯০ শতাংশ দূর করার জন্য যে পাওয়ারড অ্যাক্টিভেটেড কার্বন ব্যবহার করতে হয় তার উল্লেখমাত্র কোথাও নেই। আর ১০ শতাংশ মার্কারিও বিপুল দূষণের জন্য যথেষ্ট।

 

লেখক : পরিবেশ গবেষক

প্রতিবেশ আন্দোলনের আহ্বায়ক


মন্তব্য