kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জামায়াত বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্য চায় না বিএনপি

কাজী সিরাজ

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জামায়াত বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্য চায় না বিএনপি

জঙ্গিবাদ-মৌলবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল বিএনপি। খোদ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এ আহ্বান জানিয়েছিলেন।

জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্য হয়ে গেছে বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যত বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রস্তাব নাকচই করে দেন। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর বলা হয়েছিল, সরকারের সাড়া না মিললে বিএনপির উদ্যোগেই সরকারবিরোধী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল ও শক্তি নিয়ে জঙ্গিবাদ-মৌলবাদবিরোধী একটি ঐক্যমোর্চা গঠন করা হবে। শুরুও হয়েছিল একটি প্রক্রিয়া। বলা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যেসব দল ও শক্তি সরকারের সঙ্গে নেই, তাদের সবাইকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চা-চক্রে আমন্ত্রণ জানাবেন এবং জঙ্গিবিরোধী জোট গঠনের প্রাথমিক আলোচনা সেরে নেবেন। ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারা, আ স ম রবের জেএসডি, কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, সিপিবি ও খালেকুজ্জামান ভূঁইয়ার বাসদ আমন্ত্রণের তালিকাভুক্ত ছিল। দল হিসেবে কোনোটাই খুব বড় নয়; কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় এদের নিয়ে ঐক্যমোর্চা গড়ার একটি তাত্পর্য অবশ্যই আছে। এরা নিজেরা মিলে একটি জোট গড়ার তাত্পর্য একরকম, আবার এরাই যদি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয় তার তাত্পর্য দাঁড়ায় ভিন্ন রকম—জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারক। অন্যদিকে এই দলগুলো যখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয় তখন মানুষ তাকে স্বাভাবিকই মনে করে; ভাবে এরা তো একসঙ্গেই থাকার কথা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এসব নতুন-পুরনো দলের সব নেতাই আওয়ামী লীগের ‘ওমে’ শরীরে তা দিয়েছে। এরাই যদি বিএনপির সঙ্গে ঐক্য গড়ে, তা অধিকতর রাজনৈতিক তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হওয়ার কথা। আওয়ামী লীগ এদের সঙ্গে ঐক্য গড়ে মাঠের শক্তিতে বা ভোটের পাটিগণিতে যে খুব একটা লাভবান হয় তা নয়, উল্টো লাভ হয় অন্যদের। তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে মোটাতাজা হয়। যেমন—এখন ১৪ দলীয় জোটে যাঁরা আছেন তাঁরা এমপি-মন্ত্রী হওয়া তো দূরের কথা, এককভাবে নৌকা মার্কা ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হতেও অনেক কষ্ট পাবেন। তাঁদের নিয়ে ঐক্য গড়ার অর্থ মুক্তিযুদ্ধের সব সপক্ষ শক্তি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই আছে—জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এই রাজনৈতিক মূল্যটা অর্জন করা। শক্তি ও ভোট সব আওয়ামী লীগেরই। এই শক্তির একটি পরিচিত ও স্বীকৃত অংশ যখন বিএনপির সঙ্গে ঐক্য গড়তে সক্ষম হয় তখন মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের ‘সোল এজেন্সিশিপটা’ আর অটুট থাকে না। আওয়ামী লীগের এ-সংক্রান্ত বাহাদুরি খর্ব হয়। আওয়ামী লীগের প্রভুত্ব বর্জন করে এই শক্তি আলাদা একটা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয় ঠিক, তাতে অধিকতর লাভবান হয় বিএনপি। ১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা, মানবতাবিরোধী অপরাধী জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে মন্ত্রী বানিয়ে তাঁদের বাড়িতে-গাড়িতে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর লাখো মা-বোনের লুণ্ঠিত সম্ভ্রমে মাখা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিয়ে যে গর্হিত অপরাধ করেছে বিএনপি এবং জামায়াতের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণে নিজ দলের ঘোষিত আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে যে দুর্নাম কামিয়েছে, তা কাটিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল বিএনপির সামনে। জামায়াতে ইসলামীকে বর্জন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের স্বীকৃত দল ও শক্তি, এমনকি প্রভাবশালী ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে ঐক্য গড়লে বিএনপির জনসমর্থন আরো বাড়ত। অনেক পর্যবেক্ষক বহুদিন ধরেই এই মত প্রকাশ করে আসছেন যে রাজনৈতিক ফায়দার পাশাপাশি ভোটের হিসাবও বদলে যাবে, যদি বিএনপি জামায়াত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁদের মতে, জামায়াতের সঙ্গে ‘প্রীতির বন্ধন’ গড়ার পর বিএনপির অনেক সক্রিয় নেতাকর্মী, সংগঠক, শুভানুধ্যায়ী ও সমর্থক নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। সমর্থন প্রত্যাহার করেছেন, ক্রোধে কেউ কেউ নৌকায়ও ভোট দিয়েছেন। অনেক মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী আছেন, যাঁরা রাজনৈতিক-সাংগঠনিক নানা বিরোধের কারণে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন না। নব্বইয়ের নির্বাচনেও বিএনপি এসব ভোট পেয়েছিল। আওয়ামী লীগকে ভোটে হারাতে বিএনপিকে তখন জামায়াতের সঙ্গে জোট করতে হয়নি। সে ভোট এখন আর বিএনপি পায় না জামায়াতের কারণে। জামায়াত ছাড়লে আবার সেসব ভোট বিএনপির পাওয়াটা নিশ্চিত হয়। ধারণাটা এমন, জামায়াতের যে ভোট কমবে, ধানের শীষে ভোট বাড়বে তার চেয়ে বেশি। কিন্তু এসব কিছুই বিএনপির বিবেচনায় নেই।

বিএনপি যে জামায়াতের সঙ্গে ‘বিচ্ছেদ-বিরহ’ সইতে পারবে না, দলের মহাসচিব কর্তৃক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদকে ‘শাসানোর’ পরও বোঝা গেছে ২০ দলীয় জোটের প্যাডসর্বস্ব কিছু দলের প্রতিক্রিয়ায়। নামোল্লেখ করে তাদের গুরুত্ব বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। তারা বিএনপির নেতৃত্বে নতুন কোনো জোট গঠনের পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করে ২০ দলীয় জোট অটুট-অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ বিএনপি যাতে জামায়াতকে বাদ দিয়ে কিছু করার চিন্তা না করে সে ব্যাপারে খালেদা জিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এ ব্যাপারে পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ হচ্ছে, বিএনপির জামায়াতপন্থীরাই তাদের দিয়ে এ কাজ করিয়েছে নতুন জোট গঠন পরিকল্পনা থেকে সরিয়ে আনার জন্য খালেদা জিয়ার ওপর মনস্তাত্ত্বিক একটা চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। জোটে আগ্রহীদের হতাশ করে দেওয়াও ছিল তাদের আরেকটি উদ্দেশ্য। খালেদা জিয়া যাদের সঙ্গে চা-চক্রের পরিকল্পনা করেছিলেন তাদের কাছে বিএনপির জামায়াতপন্থীরা এই বার্তাই দিতে চেয়েছিল যে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য থাকবেই এবং অন্য কেউ বিএনপির সঙ্গে জোট করতে চাইলে তা হবে ২০ দলীয় জোটের এক্সটেনশন। জেনে-শুনেই তারা এ কাজ করেছে। তারা জানে, জামায়াতে ইসলামী থাকলে খালেদা জিয়া যাদের নিয়ে নতুন জোট গড়তে আগ্রহী, তারা কেউ তাতে রাজি হবে না। কাজটি তারা কিন্তু বিএনপির স্বার্থে করেনি, করেছে সম্পূর্ণ জামায়াতে ইসলামীর স্বার্থে। ২০ দলীয় জোটের খুচরা-খাচরা কিছু দল আছে, যাদের কোনো ঠিকানা নেই, কেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ কোনো কমিটিও নেই। বাইরে প্রচার আছে, এরা অর্থাৎ ২০ দলীয় জোটের কোনো কোনো দল জামায়াতের পেইড, তাদের ‘ডামি দল’। তারা তো জামায়াতের পক্ষে দাঁড়াবেই। কিন্তু বিস্ময় জেগেছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জিয়ার সহচর কর্নেল (অব.) অলি আহমদের ভূমিকায়। প্রথমে তাঁর দলের এক ব্যক্তি নতুন জোট গঠনের বিরোধিতা করে একটি বিবৃতি দেন। কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত মতামত। কিন্তু দিন তিন/চারেক পর খোদ কর্নেল (অব.) অলি আহমদও একই কথা বললেন। যাদের নিয়ে ঐক্যের ভাবনা চলছিল, সেসব দলের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাব প্রকাশ করে তিনিও বললেন, ২০ দলীয় জোট অটুট থাকলে বিএনপি আর খালেদা জিয়ার অন্য কিছুর দরকার নেই। নিজের দলের শক্তির কথা তাঁর তখন মনে ছিল কি না জানি না, তবে তিনিও বুঝিয়ে দিলেন জামায়াত ছাড়া যাবে না। অথচ তাঁর নির্বাচনী এলাকার দ্বিতীয় আসনটি নিয়ে [যেটা থেকে তাঁর স্ত্রী তাঁর ছেড়ে দেওয়া আসনে এমপি হয়েছিলেন। পাশাপাশি দুটি আসনেই সপ্তম সংসদে জিতেছিলেন কর্নেল (অব.) অলি] জামায়াতের সঙ্গে তাঁর বিরোধ হয়। বিএনপি আসনটি জমায়াতকে ছেড়ে দেয়। তাতে ক্ষিপ্ত, ক্ষুব্ধ হয়েই তিনি বিএনপি ছাড়েন এবং নতুন দল গড়েন এলডিপি নামে। এখন তাঁর নিজের মূল আসনেই জামায়াত ফ্যাক্টর হয়ে গেছে। এককভাবে তারা জিতবে না; কিন্তু কর্নেল (অব.) অলিকে জিততে হলে জামায়াতের সমর্থন দরকার। সমালোচকরা বলছেন, নিজের আসনে ভোটে জেতা কনফার্ম করার লক্ষ্যেই জামায়াতের কাছে জাতীয় রাজনীতির স্বার্থ বিকিয়ে দিলেন মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম। কী দুর্ভাগ্য এ দেশের রাজনীতির। ক্ষমতার জন্য কি না করতে পারেন ক্ষমতার কাঙালরা।

কর্নেল (অব.) অলির অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে যে বিএনপি কোনো অবস্থায়ই জামায়াতকে ছাড়ছে না। জামায়াত সঙ্গে থাকলে বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির স্বপ্নের জঙ্গিবাদ-মৌলবাদবিরোধী ঐক্য আর হয় কী করে? বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণার পর বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে যে বিএনপি মুসলিম লীগের জুতা পরে হাঁটতেই বোধ হয় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। মূল নেতৃত্ব কাঠামো দেখে অনেকেই এমন মন্তব্য করছেন। এই বিএনপির সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোন পাগল যাবে ঐক্য করতে? কাজেই বিএনপির ঐক্যমোর্চা গড়ার প্রক্রিয়ার যবনিকাপাত। এখন আবার এটাও দেখার বিষয় যে জামায়াত কী করে। কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের নতুন আমিরের নাম জানা যাবে। গঠিত হবে নতুন কমিটিও। এটা নিশ্চিত যে তাতে একাত্তরের কোনো যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধী থাকছেন না। তখন সেই জামায়াত সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হয়, তার ওপরও নির্ভর করবে জামায়াতের মিত্র-অমিত্র নির্ধারণ কৌশল। আগামী নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়ে জামায়াতই যদি বিএনপিকে ‘বিসর্জন’ দেয়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বিএনপির তখন একুলওকুল দুই কুলই যেতে পারে। লাভের গুড় খাবে পিঁপড়ায়। নতুন ঐক্যপ্রক্রিয়া বন্ধ করে দিয়ে বিএনপি ভুলই করল বলে মনে হয়। জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থা যেন না হয় ‘না পায় গোর, না পায় শ্মশান’-এর মতো। শিগগিরই জমবে রাজনীতির এ খেলা। তখন দেখা যাবে বিএনপি জামায়াত ছাড়বে, না জামায়াত বিএনপি ছাড়বে!

লেখক : সাংবাদিক


মন্তব্য