kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল এই ঈদ

সালেহ চৌধুরী

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল এই ঈদ

স্বাস্থ্যবান গরুই ক্রেতার আকর্ষণ। গরু পালনে তাই যত্নের পরিমাণ বেড়েছে।

কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করার কুফল নিয়ে সচেতনতার বিস্তার ঘটেছে। ক্ষতিকর এ প্রবণতাও লোপ পেতে বসেছে। সত্যিকার অর্থেই এ এক ইতিবাচক অগ্রগতি। ঈদ উন্নত পদ্ধতিতে পশু পালনের যে সূচনা ঘটিয়েছে, তা এখানেই থেমে থাকবে—এমন মনে করার কারণ নেই। এর থেকে পাওয়া ফায়দা অবশ্যই অনুপ্রেরণা জোগাবে বছরভর এ উদ্যোগ অব্যাহত রেখে লাভবান হওয়ার। এতে উন্নতমানের গোশত বা আমিষের সহজলভ্যতাই কেবল নিশ্চিত হবে না, একই সঙ্গে অতিপ্রয়োজনীয় দুধের উত্পাদন বাড়বে। প্রজননের জন্য গাই পুষলে তার দুধ উপেক্ষিত থাকবে না নিশ্চিতভাবেই বলা চলে। এই ঈদকে যদি আমরা এ দৃষ্টিতে দেখি, মানতেই হবে এই ঈদ সামাজিক অগ্রগতিরও অন্যতম সোপান হয়ে উঠতে চলেছে। ত্যাগ বা কোরবানি কখনো বৃথা যায় না। যা দেওয়া হয় তা বহুগুণ হয়ে ফিরে আসে, প্রচলিত বিশ্বাসও এতে প্রমাণিত হচ্ছে। একজন বৈষয়িক মানুষ হিসেবে আমার চোখে ঈদুল আজহার এই প্রত্যক্ষ ফায়দাটাই বড় হয়ে চোখে ভাসছে। আর তা কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় নয়

 

ঈদুল আজহা—কোরবানির ঈদ। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মৃতিবাহী ধর্মীয় উৎসব। আমরা সবাই জানি আল্লাহর আদেশ—প্রিয় জিনিস কোরবান করতে গিয়ে ইব্রাহিম (আ.) পুত্র ইসমাইলকে কোরবান করায় উদ্যত হয়েছিলেন। আল্লাহর তেলেসমাত, ছুরির তলায় ইসমাইলের স্থান নেয় একটি দুম্বা। সেই থেকে ত্যাগের স্মৃতিবাহী এই ঈদে হালাল পশু কোরবান করার রেওয়াজ চলে আসছে।

একটু গভীরে দৃষ্টি দিলেই দেখা যাবে পশু জবাই করাই সারকথা নয়, আদত ব্যাপার হচ্ছে ত্যাগ—ত্যাগের পথে নিজেকে পরিচালিত করা। কল্যাণকর যে ত্যাগ তা আত্মশক্তিকে করবে বলীয়ান।

ঈদ ধর্মীয় উৎসব। তার আনুষ্ঠানিকতা তো অবশ্যই পালন করতে হবে। দায়িত্ব কিন্তু তাতেই ফুরিয়ে যায় না। আনুষ্ঠানিকতার অন্তর্নিহিত শিক্ষাও উপলব্ধিতে আনতে হবে। ত্যাগের তাত্পর্য মনে রেখেই নিজের কোরবানিকে করে তুলতে হবে অর্থবহ। সাদামাটাভাবে বলতে গেলে, প্রথমই খেয়াল রাখতে হবে নিজের শানশওকত প্রদর্শনের মতো অহমিকা বা দাম্ভিকতা যেন আমাদের নিয়তকে কলুষিত না করে। আমার ত্যাগ যেন প্রশস্ত করে কল্যাণের পথ। চিত্তের শুদ্ধতা আত্মশক্তির বুনিয়াদ। কর্মের পরিচ্ছন্নতাই পারে শুদ্ধতার নিশ্চয়তা দিতে।

কোন কোন পশু কোরবানি দেওয়া হবে তার কোনো বাঁধা ধরা নিয়ম নেই। হালাল আর সুস্থ পশু হতে হবে—এই নীতি মেনেই কোরবানির পশু বাছা হয়। সহজলভ্যতা অবশ্যই বিবেচ্য। মরু-মুল্লুকে উটের প্রচলন হলেও আমাদের এই নদী-নালার দেশে গরুই প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে। সেখানকার দুম্বার জায়গা নিয়েছে আমাদের ছাগল-ভেড়া। গরুর বদলে কোথাও কোথাও মোষও কোরবানি করা হয়।

ব্যতিক্রম হিসেবে শুনেছি, চট্টগ্রামের বিত্তবানরা গয়ালও (পার্বত্য এলাকার বুনো গরু) কোরবানি করে থাকেন। বেশ আগে একবার অন্তত ঈদের গরুর হাটে ঢাকায়ও একটা গয়াল দেখেছিলাম। তবে এটা ব্যতিক্রম। গরু-ছাগলই ছিল সাধারণভাবে আমাদের প্রধান নির্ভর। এখনো তা-ই আছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতিতে হাটে কিছু উট আর দুম্বা দেখা দিলে একেও ব্যতিক্রম বলেই ধরতে হবে।

যান্ত্রিক চাষাবাদের প্রসার ঘটায় গরুর ওপর নির্ভরতা ক্রমেই কমছে। আবাদের বিস্তার গোচারণভূমি গ্রাস করায় গবাদি পশু পালন হয়ে উঠছে ক্রমেই কষ্টকর। দেশে গরুর সংখ্যা তাই দ্রুত কমে আসছিল। যা ছিল, তা-ও দেখা যেত হাড়জিরজিরে। কোরবানির গরুর জন্য আমরা তাই প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিলাম। সেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব গরু রপ্তানির পথে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে শঙ্কা দেখা দিয়েছিল এ দেশে কোরবানির পশুর চাহিদা মেটানো নিয়ে। অনেকে আশঙ্কা করছিলেন দেশের গবাদি পশু দিয়ে কোরবানির চাহিদা মেটাতে হলে আদৌ এ দেশে গবাদি পশু থাকবে কি না এ নিয়ে। অবশ্যই ব্যাপারটা একটা হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছিল। বলতে পেরে ভালো লাগছে, ঈদই সে হুমকি কাটিয়ে দিয়েছে। ফুটিয়ে তুলতে শুরু করেছে নতুন আশার ছবি। আর্থসামাজিক উন্নতির ফলে কোরবানির সংখ্যা সংগতভাবেই বেড়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বছর কোরবানির জন্য পশুর চাহিদা কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। এরই মাঝে যেটুকু খবর পাওয়া গেছে তাতে মনে করা হচ্ছে, দেশের গবাদি পশু দিয়েই এ চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে! আমার ব্যক্তিগত ধারণাও তা-ই।

গত মাসে কয়েকবারই ঢাকার বাইরে যেতে হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও গেছি। সড়কপথে আসতে-যেতে যে দৃশ্যটি নজর কেড়েছে তা হচ্ছে এখানে-ওখানে পর্যাপ্ত গরুর উপস্থিতি। কেবল সংখ্যায় নয়, চেহারায়ও উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। ঈদুল আজহা বা ত্যাগের (কোরবানির) আগ্রহই কার্যত এই অগ্রগতি সম্ভব করেছে। ঈদের জন্য গরু চাই। খামারিরা তাই গরু পালনে আর তার পরিচর্যায় অধিকতর মনোযোগী হয়েছেন।

স্বাস্থ্যবান গরুই ক্রেতার আকর্ষণ। গরু পালনে তাই যত্নের পরিমাণ বেড়েছে। কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করার কুফল নিয়ে সচেতনতার বিস্তার ঘটেছে। ক্ষতিকর এ প্রবণতাও লোপ পেতে বসেছে। সত্যিকার অর্থেই এ এক ইতিবাচক অগ্রগতি।

ঈদ উন্নত পদ্ধতিতে পশু পালনের যে সূচনা ঘটিয়েছে, তা এখানেই থেমে থাকবে—এমন মনে করার কারণ নেই। এর থেকে পাওয়া ফায়দা অবশ্যই অনুপ্রেরণা জোগাবে বছরভর এ উদ্যোগ অব্যাহত রেখে লাভবান হওয়ার। এতে উন্নতমানের গোশত বা আমিষের সহজলভ্যতাই কেবল নিশ্চিত হবে না, একই সঙ্গে অতিপ্রয়োজনীয় দুধের উত্পাদন বাড়বে।

প্রজননের জন্য গাই পুষলে তার দুধ উপেক্ষিত থাকবে না নিশ্চিতভাবেই বলা চলে। এই ঈদকে যদি আমরা এ দৃষ্টিতে দেখি, মানতেই হবে এই ঈদ সামাজিক অগ্রগতিরও অন্যতম সোপান হয়ে উঠতে চলেছে। ত্যাগ বা কোরবানি কখনো বৃথা যায় না। যা দেওয়া হয় তা বহুগুণ হয়ে ফিরে আসে, প্রচলিত বিশ্বাসও এতে প্রমাণিত হচ্ছে।

একজন বৈষয়িক মানুষ হিসেবে আমার চোখে ঈদুল আজহার এই প্রত্যক্ষ ফায়দাটাই বড় হয়ে চোখে ভাসছে। আর তা কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় নয়।

আমাদের দুটি ঈদ। দুটিই একই সঙ্গে ধর্মীয় আর সামাজিক উৎসব। উভয়ই উৎসবের চাকচিক্যে সমুজ্জ্বল। নিজেকে সুন্দরভাবে ঈদের জামাতে হাজির করায় সবাই কমবেশি যত্নশীল থাকি। তবু ঈদুল ফিতরে পোশাক-আশাকের ঔজ্জ্বল্য যতটা গুরুত্ব পায় ঈদুল আজহায় ততটা নয়। ঈদুল আজহা ত্যাগের বা কোরবানির মহিমায় দ্যুতিময়। ঈদ উৎসব উদ্‌যাপনে এই ত্যাগের দিকটাকে তাই সামনে রাখতে হবে। ঈদগাহে দ্বেষ-হিংসা আর ভেদাভেদ ভুলে সবার সঙ্গে কোলাকুলি বা মিলনের তাগিদ আছে, জীবনচর্চায়ও তাকে ঠাঁই দিতে হবে।

শেষ করার আগে আবারও বলছি, ঈদ মানে আনন্দ। আর সে আনন্দ ত্যাগের পথ ধরেই পূর্ণতা পেতে পারে। একটি সুপ্রাচীন ঐতিহ্য লালনে তার বাহ্যিক অনুস্মৃতির চেয়ে আত্মিক তাত্পর্যের অনুসরণ অধিকতর জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক


মন্তব্য