kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মাংসের গরু ব্রাহমা : আমিষের ঘাটতি পূরণে নতুন আশা

শাইখ সিরাজ

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মাংসের গরু ব্রাহমা : আমিষের ঘাটতি পূরণে নতুন আশা

সারা দেশে জমে উঠেছে কোরবানির হাট। দেশের অধিকাংশ জেলায়ই কৃষক পর্যায়ে গড়ে ওঠা খামারের গরু আসছে হাটগুলোয়।

এবার বছরব্যাপী খামারিদের তাগিদ ছিল দেশি ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণের দিকে। ক্রেতাসাধারণ অনেক সচেতন হয়ে উঠেছে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রোমোটার বা ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগ করে গরু মোটাতাজাকরণের প্রশ্নে। সবাই খুঁজছে প্রাকৃতিক খাবারে বড় হওয়া গরু। খামারিদের মধ্যেও এসেছে সচেতনতা। সংখ্যার হিসাবে কোরবানির গরু ও ছাগলের জোগান মজুদ আছে, বলা হচ্ছে। কিন্তু দেশের বার্ষিক মাংস চাহিদার হিসাবে আমাদের ৪০ শতাংশেরও বেশি পরনির্ভরশীলতার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ঠিক এই প্রশ্নেই নতুন এক আশার সঞ্চার করেছে আমেরিকা থেকে আসা নতুন জাতের গরু ‘ব্রাহমান’, যাকে বাংলায় বলা হচ্ছে ‘ব্রাহমা’।

সু-উচ্চ, তেজি ও আমাদের দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে চলনসই গরু ব্রাহমা। এর আদি নিবাস আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশ। ১৮৫৪ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত ভারত থেকে এ উপমহাদেশের ২৬৬টি ষাঁড় ও ২২টি গাভি সংগ্রহ করে জাত উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় উন্নত একটি জাতই হচ্ছে ব্রাহমা। এটি এখন আমেরিকান জাত হিসেবেই বেশি পরিচিত। এই জাতের গরু পালন হচ্ছে ক্যারিবীয় দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপপুঞ্জ, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর আরো অনেক দেশে। এবার ব্রাহমা জাতটির নতুন ক্ষেত্র বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিফ ক্যাটেল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় প্রথমবারের মতো মাংসের গরু নিয়ে তত্পরতা। এর অংশ হিসেবে ২০০৮ সালে পরীক্ষামূলক ১০ হাজার নমুনা সিমেন বা বীজ আনা হয় বাংলাদেশে। এরপর আনা হয় ৬০ হাজার। এর মধ্যে ৩৭ হাজার সিমেন বা বীজ প্রয়োগ করা হয়েছে এ দেশের বিভিন্ন এলাকার গাভিতে। প্রথম দফায় আনা সিমেন থেকে উত্পাদিত ব্রাহমা জাতের ষাঁড় রয়েছে সাভারের কৃত্রিম প্রজনন ও গবেষণা কেন্দ্রে। এখন এই ষাঁড়ের বীজ বা সিমেন সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে সরবরাহ করা হচ্ছে সারা দেশে। কাছ থেকে বিষয়গুলো দেখার জন্য গিয়েছিলাম সাভারে অবস্থিত কৃত্রিম প্রজনন গবেষণা কেন্দ্রে। এই কেন্দ্রের সঙ্গে আমার যোগাযোগ তা-ও ৩৫ বছরের কম নয়। তখন অনেক স্বপ্ন নিয়ে তত্পর কার্যক্রম চলত ওই কেন্দ্রে। বিদেশ থেকে নানা জাতের গরু আসছে। কৃত্রিম প্রজনন, দুধের উত্পাদন বাড়ানোর নানামুখী কার্যক্রম তখন বেশ আশা জাগায়। এর পরও খুব বেশি আশাজাগানিয়া কোনো খবর এখান থেকে পাইনি। হতাশ হয়েছি, স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও আমাদের দেশি গরুর কোনো জাত আমরা উদ্ভাবন করতে পারিনি। যাহোক, এবার বেশ আশা নিয়েই যাই কৃত্রিম প্রজনন গবেষণা কেন্দ্রে। বিশেষ করে মাংসের গরু উত্পাদনের প্রকল্প সম্পর্কে ভালো করে জানাই লক্ষ্য ছিল। যাহোক জানলাম, বিফ ক্যাটেল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের প্রথম দফায় অর্থাৎ ২০১৪-১৫ সালে দেশের ৩৮ জেলার ৮০টি উপজেলার ১৩০ জন বাছাই করা খামারিকে ২৬০টি গাভিকে দেওয়া হয় ব্রাহমা জাতের সিমেন। এর পাশাপাশি ব্রাহমা জাতের বৈশিষ্ট্যগুলোও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে রাখা হয়েছে এই সাভারের কৃত্রিম প্রজনন গবেষণা কেন্দ্রে। কথা বলেছি প্রাণিসম্পদ অধিপ্তরের বিফ ক্যাটেল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের পরিচালক এস এম এ সামাদের সঙ্গে। তিনি জানান, ৮০টি উপজেলার খামারি পর্যায়ে ব্রাহমা ষাঁড়ের এখন বয়স পৌঁছেছে ১৫ থেকে ১৮ মাসে। এর সূত্র ধরে যাই টাঙ্গাইল জেলার সখীপুরের গড়গোবিন্দপুর গ্রামে। সেখানে বেশ কয়েকজন গৃহস্থের উপযুক্ত গাভি থাকায় পেয়েছেন ব্রাহমা জাতের বীজ। নূরু মিয়ার ব্রাহমা জাতের ষাঁড়টির বয়স এখন ১৭ মাস। উন্নত জাতের মাংসের গরু লালনপালন করে বেশ গর্বিত নূরু মিয়ার ছেলে আনিসুর রহমান। গ্রামের বহু মানুষ জড়ো হয়েছে সেখানে। তাদের দৃষ্টিতেও বেশ গর্ব। কারণ তাদের গ্রামে এমন বিশাল গরু পালন করা হচ্ছে। ভীষণ তেজি, মাংসল গরু ব্রাহমা। ১৭ মাস বয়সে নূরু মিয়ার ষাঁড়টির ওজন দাঁড়িয়েছে ৪৫০ কেজি অর্থাৎ ১১ মণ ১০ কেজি। এই বয়সে আমাদের দেশি গরুর ওজন ৮০ কেজি ছাড়ায় না। এখানেই এই গরুর জাতটির বিস্ময়। নূরু মিয়াসহ অন্যরা বলেন, প্রাকৃতিক সব খাবারই খায় গরুটি, সঙ্গে একটু দানাদার খাদ্য দিলেই চলে। দিনে ওজন বাড়ে প্রায় এক কেজি।

এই এলাকার ভেটেরিনারি সার্জন ডা. শফিকুল ইসলাম মানিক জানালেন, সখীপুর উপজেলায় প্রায় ৩০০ গাভিকে দেওয়া হয়েছে ব্রাহমা জাতের বীজ। গড়গোবিন্দপুর গ্রামের আরেকজন কৃষক আখতার হোসেন। তাঁর বাড়িতেও শোভাবর্ধন করে আছে ব্রাহমা জাতের ষাঁড়টি। মধ্যবিত্ত গৃহস্থ আখতার তাঁর গোয়ালে ষাঁড়টির জন্যই ফ্যান লাগিয়েছেন। জানালেন, এমন জাতের গরু জীবনে প্রথম দেখলেন তিনি। ভালো খাবার খাওয়ালে ও যত্ন নিলে এর শরীরে মাংস বাড়বেই। সখীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এস এম উকিলউদ্দিন বলেন, এই গরুর জাতটি লালনপালনে বেশ সুবিধা। এ পর্যন্ত খামারিদের কাছ থেকে নেতিবাচক কোনো অভিযোগ আসেনি। এমনকি খাবার খরচ বেশি, রোগ-জীবাণু বেশি এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া এই জাতের গরুর আবহাওয়া ও জলবায়ু সহনক্ষমতা বেশি হওয়ায় রোগবালাই একেবারেই কম। স্থানীয় উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান সবুর রেজাও বললেন, এই জাতের গরু কৃষকদের মধ্যে বেশ আশার সঞ্চার করেছে। আখতার হোসেনের পরিবারে দ্রুত বর্ধনশীল ষাঁড়টি পরিণত হয়েছে সবার প্রিয় এক সদস্য হিসেবে। এই বিশালদেহী গরুটিকে ভালোবাসছে সবাই। আখতারের মেয়ে আঁখি এবার এইচএসসি পাস করেছে। তার পড়াশোনা ও ক্লাসের বাইরে পুরো সময়টাই কাটে শান্ত স্বভাবের ষাঁড়টির সঙ্গে। আখতারের ছেলে হাবিব ষাঁড়টিকে গোসল করায় ও আদরযত্ন করে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে একটি ষাঁড় গরুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক। আর সেটি যদি হয় এত বেশি বর্ধনশীল অর্থাৎ মাত্র ১৮ মাসে ৪৬০ কেজি বা সাড়ে ১১ মণ, তাহলে তো কথাই নেই। তাদের সবার চোখেমুখে আশা, আগামী বছরই ষাঁড়টির ওজন হবে ৩০ মণের কম নয়। ব্যাপারটি বিস্ময়করই বটে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বছরে জনপ্রতি মাংসের চাহিদা ৮০ কেজি। সেখানে আমাদের দেশে একজন মানুষের বছরে মাংসের প্রাপ্যতা মাত্র ৯.১ কেজি। অতএব, আমাদের দেশে মাংসের উত্পাদন আরো সাত গুণ বৃদ্ধি করার প্রয়োজন রয়েছে, যা দেশীয় প্রচলিত জাতগুলো দিয়ে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে আয়তনের তুলনায় গবাদি পশুর সংখ্যা অনেক বেশি। আমাদের দেশে যেখানে হেক্টরপ্রতি গরুর সংখ্যা ২.৪৯, সেখানে আমেরিকায় মাত্র ০.৩৮টি। কিন্তু আমেরিকায় জনগণের বছরে জনপ্রতি মাংসের প্রাপ্যতা ১০০ কেজি। সুতরাং মাংসল জাতের গরু পালনের কোনো বিকল্প নেই। সেই চিন্তা থেকেই ২০০৮ সালে আমেরিকা থেকেই মাংসের গরুর বিখ্যাত জাত ‘ব্রাহমা’র সিমেন এ দেশে আনা হয়। এটি একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু ঘুরেফিরে কথা একটাই, মাংসের গরুর জন্য নতুন যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সেটি কতটা গুরুত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে, তা দেখার বিষয়। কারণ আমাদের দেশে দুধের গাভির জাত উন্নয়ন, দুগ্ধশিল্পের উন্নয়নে নানামুখী তত্পরতা চলছে ৪০ বছর ধরে। কিন্তু শুরুতে যে প্রকল্প নেওয়া হয় তা দুগ্ধশিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট ছিল না। প্রকল্পটি ছিল অসম্পূর্ণ। এ কারণে যে গতিতে আমাদের দেশে দুগ্ধশিল্পের বিকাশ ঘটার কথা ছিল, তা ঘটেনি; বরং দুধের প্রশ্নে আমাদের পরনির্ভরশীলতা রয়েই গেছে। একই সময়ে শুরু করে ভারতের আমুল সারা পৃথিবীতে দুগ্ধশিল্পের উন্নয়নে এক বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর আমরা এখনো দুধের প্রশ্নে ৭০ শতাংশ আমদানিনির্ভর রয়ে গেছি। এই কারণেই বলতে চাই, পরিকল্পনা হতে হবে সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি; যার মধ্য দিয়ে খামারি থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রই কাঙ্ক্ষিত উন্নতির দেখা পায়। আশা করি, ব্রাহমা নামের মাংসের গরুর জাতটি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কার্যক্রমে কোথাও ত্রুটি থাকবে না। খামারিরা সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে পাবেন যথাযথ পরামর্শ ও সেবা। একইভাবে দীর্ঘ মেয়াদে জাতটি আমাদের দেশের আবহাওয়া, পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাসসহ সব ক্ষেত্রে সহনশীলতা অর্জন করে স্থায়ীভাবে টিকে যাবে। সেই সঙ্গে মাংসের গরুর একটি দেশি জাত উদ্ভাবনেও মনোনিবেশ করবেন বিজ্ঞানীরা।   

 

লেখক : পরিচালক ও বার্তাপ্রধান, চ্যানেল আই


মন্তব্য