kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ ভাবনা

ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ ভাবনা

প্রকৃতিপ্রদত্ত সম্পদের যুক্তিসম্মত অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করার নামই হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন। টেকসই উন্নয়ন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনা করে।

আর উন্নত পরিবেশ টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি রচনা করে। কাজেই প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও লালন করা, আরো উন্নত করা, বৃদ্ধি করা আমাদের দেশের জন্য আজ অত্যন্ত জরুরি জাতীয় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে একমাত্র দ্বীপ ও নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুর ছাড়া আমাদের দেশই পৃথিবীতে সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ। বিপুলসংখ্যক মানুষের নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অপরিকল্পিত তথাকথিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে আমাদের দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের  অপূরণীয় ক্ষতি এরই মধ্যে হয়ে গেছে। মিষ্টি পানির জলাধারগুলোর বেশির ভাগ মরে গেছে; পানি, বায়ু ও মাটি দূষিত হয়ে গেছে। বড় বড় বনাঞ্চল নিঃশেষ হয়ে গেছে। বহু প্রজাতির উদ্ভিদ, গাছপালা, তরুলতা ধ্বংস হয়ে গেছে। একই পরিণতি মত্স্য ও প্রাণিকুলের ক্ষেত্রে ঘটেছে। সুপেয় মিষ্টি পানির আধার আর অবশিষ্ট নেই। এমনকি মাটির নিচের জলাধারগুলোও আর্সেনিকের বিষাক্ত উপাদানে দূষিত হয়ে গেছে। অথচ বিগত শতাব্দীর সত্তরের দশকেও ওগুলোর পানি মত্স্যসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদে ভরপুর ছিল। এ অবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না। পরিত্রাণ জরুরি। উত্তরণ আমাদের ঘটাতেই হবে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কিছু জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। পয়ঃপ্রণালি এবং ফুটপাত সমন্বয় করে সাশ্রয়ী বিজ্ঞানসম্মত করতে হবে। অর্থাৎ গোটা পয়ঃপ্রণালি সড়কের পাশ দিয়ে নিতে হবে এবং তার ওপর অন্তত দেড়-দুই ফুট উচ্চতার স্লাব দিয়ে ফুটপাত গড়ে তুলতে হবে। এটা করলে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে এবং মানুষ ফুটপাত ব্যবহারে অবশ্যই অভ্যস্ত হবে।

আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলে জৈব ও অজৈব বর্জ্যের জন্য পৃথক ডাস্টবিনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো অবস্থায়ই ডাস্টবিন উন্মুক্ত হবে না। অবশ্যই বদ্ধ সেফটি ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো প্রকার দুর্গন্ধ ছড়াতে না পারে। এ ছাড়া প্রতিটি পরিবারকে প্রতিদিন দুটি করে পলিথিনের বড় কালো ব্যাগ সরবরাহ করা যেতে পারে : একটি জৈব এবং অন্যটি অজৈব বর্জ্যের জন্য। লন্ডন শহরে এ ধরনের ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চালু আছে। লন্ডনের পাঁচ বা ছয়বারের নির্বাচিত অত্যন্ত জনপ্রিয় মেয়র কেন লিভিং স্টোন এ ব্যবস্থাসহ আরো অনেক যুগান্তকারী ব্যবস্থা চালু করে গেছেন, যার ফলে লন্ডন শহর আজকের অবস্থায় আসতে পেরেছে। বর্জ্য রিসাইকেল করার ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে। জৈব বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও সার উত্পাদিত হবে এবং অজৈব বর্জ্য থেকে রকমারি সব পণ্য উত্পাদিত হবে। এর ফলে গোটা মহানগরী বর্জ্যের ভাগাড় থেকে মুক্ত হবে, দুর্গন্ধমুক্ত হবে, পরিচ্ছন্ন হবে।

লন্ডন শহরের আদলে গণশৌচাগার (পাবলিক টয়লেট) ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটাও লিভিং স্টোনের সময় হয়েছিল। এ ধরনের গণশৌচাগার গড়ে তোলা ছাড়া সম্পূর্ণ দুর্গন্ধমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন আধুনিক ঢাকা গড়ে তোলার স্বপ্ন শুধু কল্পনাই থেকে যাবে। লন্ডনের মতো এত সুন্দর ও কার্যকর গণটয়লেট ব্যবস্থা পৃথিবীর কোথাও নেই। এ ক্ষেত্রে লন্ডনের অভিজ্ঞতা অবশ্যই কাজে লাগানো যেতে পারে।

সড়কগুলো যতটা সম্ভব প্রশস্ত করতে হবে। বিদ্যুতের খুঁটিগুলো মাঝখানে স্থানান্তর করতে হবে এবং সবচেয়ে ভালো হবে যদি তারগুলো মাটির নিচ দিয়ে টানা হয়। দীর্ঘ মেয়াদে এটা নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হবে।

খালগুলো অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে। ওগুলো গভীর করে খননপূর্বক দুই তীর কংক্রিটে বাঁধাই করে দিতে হবে। এগুলোর সঙ্গে পয়ঃপ্রণালি ব্যবস্থার সংযোগপূর্বক সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

নদীগুলোর তীর মুক্ত করে সুদৃশ্য ওয়াকওয়ে নির্মাণ করতে হবে। কোনোক্রমেই ফেলে রাখা যাবে না। দীর্ঘসূত্রতা এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবে না। খালগুলোর সঙ্গে সঙ্গে নদীগুলোও গভীর করে খননপূর্বক সংযোগ প্রদানপূর্বক সুসমন্বিত এক নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রেও লন্ডনসহ উন্নত আরো অনেক দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।

দেশের সব লেভেলক্রসিংয়ে ওভারপাস নির্মাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। অতি ঘনবসতির ঢাকায় এটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করতে হবে জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে।

মেগাসিটি ঢাকার পরিবহন সমস্যা সমাধানে দীর্ঘ মেয়াদে অবশ্যই কলকাতার আদলে পাতাল রেলব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ঘনবসতির এ দেশে পরিবহন সমস্যার সমাধানে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে হবে।

ইচ্ছা থাকলে অর্থায়ন সমস্যা হবে না। রাজধানীর উন্নতি তথা গোটা দেশের উন্নতির বিষয়ে দল-মত-নির্বিশেষে আমাদের সবার একমত হওয়ার সময় এসেছে। এ ব্যাপারে আমরা ঐকমত্য হতে না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারময় হবে, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কর বৃদ্ধি করব না, নতুন কর বসাব না—এসব সস্তা সেকেলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গদি দখলের প্রতিযোগিতা থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণ চায় পরিচ্ছন্ন, সুস্থ, জঞ্জালমুক্ত, নৈরাজ্যমুক্ত পরিবেশ। অতএব, জনগণ করও  দেবে। উন্নত সেবার বিনিময়ে উচ্চতর করহার—জনগণের মধ্যে এ সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। ব্যাংক হিসাব ও  বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের টিকিটের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ লেভি আরোপ করা যেতে পারে। কর ও লেভি মিলে অর্থায়নের একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। বিদেশি ঋণ ও অনুদান আরেকটি উৎস হতে পারে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলো সিন্ডিকেট করে অর্থায়নের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উৎস হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। আরেকটি ব্যবস্থা হতে পারে যে নির্দিষ্ট চুক্তিতে বিদেশিদের দিয়ে দেওয়া। তারা নির্মাণ করে নির্দিষ্ট সময়ের আয়টা নিজেরা নেবে। এর পরে আমাদের সরকারকে বুঝিয়ে দিয়ে যাবে। অর্থাৎ এর পর থেকে আমরা মালিক হব। অবশ্যই চুক্তি করার সময় লিজের সময়টা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। এ ধরনের চুক্তিতে চীনারা পৃথিবীর বহু দেশে কাজ করছে।

পরিকল্পনা কমিশনকে তার ১৯৭২ সালের মর্যাদায় আবার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এর খোলনলচে বদলে ফেলতে হবে। দেশের সেরা বিশেষজ্ঞদের এখানে নিয়ে আসতে হবে। একে সম্পূর্ণরূপে আমলাতান্ত্রিকতামুক্ত করতে হবে। সব বিভাগীয় শহরে এর শাখা খুলতে হবে এবং ওগুলোতেও বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিতে হবে। আমাদের দেশের সব সম্পদের সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য