kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


৪২ টাকা মণ থেকে ৪৪ টাকা কেজি

চিন্ময় মুৎসুদ্দী

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



৪২ টাকা মণ থেকে ৪৪ টাকা কেজি

১৯৫৯ সালে চালের মণ ছিল ৪২ টাকা। এখন কেজি ৪৪ টাকা থেকে আরো ওপরে।

সে হিসাবে প্রায় ৪০ গুণ বেড়েছে দাম। অবশ্য ধনবানদের সম্পদ হয়তো চার হাজার গুণ বেড়েছে। তখন সারা পাকিস্তানে ধনবান হিসেবে পরিচিত ছিল ২২ পরিবার। এখন বাংলাদেশে এ রকম ধনী পরিবারের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এটা উন্নয়নের একটা মাপকাঠি হয়তো! ষাটের দশকে বাঙালি আন্দোলন করেছিল ২০ টাকা মণ দরে চালের জন্য। কিন্তু সেটা স্বপ্ন থেকে গেছে। এ রকম অনেক স্বপ্ন আমাদের সফল হয়নি। তবে স্বায়ত্তশাসনের দাবি আদায় করতে গিয়ে আমরা স্বাধীনতার যে স্বপ্ন দেখেছিলাম সে স্বপ্ন সফল হয়েছে। আমাদের সবচেয়ে বড় পাওনা স্বাধীন দেশ।

৪২ টাকা মণ দরে চাল বিক্রির সংবাদ ছাপতে গিয়ে দৈনিক সংবাদ যে বিড়ম্বনায় পড়েছিল সে কথা জানা যায় কে জি মুস্তাফার স্মৃতিচারণায়। পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের এক সময়ের সভাপতি কে জি মুস্তাফা ছিলেন তখন সংবাদের বার্তা সম্পাদক। তৃতীয় পৃষ্ঠায় ৩৬ পয়েন্টে ছাপানো সংবাদটি দেখে গভর্নর জাকির হোসেন ও কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী হাফিজুর রহমান পরিচালক আহমদুল কবির ও সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীকে গভর্নর হাউসে (এখন বঙ্গভবন) তলব করে বলে দেন, যদি খবর সঠিক না হয় তাহলে ‘খবর’ আছে! খাদ্যমন্ত্রী নিজেই চলে যান রামগতি এবং বাজারে বাজারে গিয়ে জানতে পারেন এ খবর যেদিন ছাপানো হয় সেদিন রামগতিতে চালের দর ছিল সাড়ে বিয়াল্লিশ টাকা। দোকানিরাই এ তথ্য দেন মন্ত্রীকে। সংবাদ বেঁচে যায় সম্ভাব্য ‘দুর্যোগ’ থেকে। এটা বললাম এ কারণে যে সরকার ও মিডিয়ার সম্পর্ক এ থেকে ধারণা করা যাবে। সরকার সব সময় তার অনুকূলে সংবাদ চায়। বিপক্ষে গেলে ক্রমে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। আর সাংবাদিকরা সব সময় যা সত্য তা লিখতে চান। এখন অবশ্য অবস্থা পাল্টেছে। খবর ঠিক কি বেঠিক, তা যাচাই করার আগেই অ্যাকশন হয়ে যায়। সাংবাদিকরাও কখনো কখনো প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য যা ঘটেনি সে রকম কিছু লিখে দেন। ফলে সরকারের সঙ্গে মিডিয়ার সম্পর্কে এক ধরনের বিশ্বাসহীনতা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি দলের নেতা ও মিডিয়া মালিকদের নানা ধরনের স্বার্থ। মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাও এ কারণে এখন প্রশ্নের মুখে।

১৯৫৯ সালে সংবাদে ছাপানো খবরটির পেছনে একটাই উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সঠিক তথ্যটি জানানো। এ থেকে সংবাদ কর্তৃপক্ষের বা সাংবাদিকদের বৈষয়িক লাভবান হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তখন সংবাদপত্র ছিল অনেকটা মিশন। ইংরেজ শাসকদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে রাজনৈতিক সংগ্রাম হয়েছিল, সেখানে সংবাদপত্র ছিল সহযোগী। সংবাদপত্রের মিশনও ছিল স্বাধীনতা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভাষার জন্য বাঙালিদের আন্দোলনেও সংবাদপত্র ছিল সহযোদ্ধা। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও সংবাদপত্র বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গণ-আন্দোলনের পক্ষে ছিল সহায়ক শক্তি। দলবাজি বা সরকার তোষণ থেকে দূরে ছিল বেশির ভাগ সংবাদপত্র। মালিক-সাংবাদিক উভয়ে ঐক্যবদ্ধভাবেই প্রতিরোধ করেছেন প্রতিক্রিয়াশীলদের অপশক্তিকে। নিজেদের মধ্যে বেতন-ভাতা নিয়ে মনকষাকষি থাকলেও গণ-আন্দোলনের জন্য ব্যক্তিগত ক্ষতি মেনে নিতেন প্রায় সবাই। আজাদ, ইত্তেফাক ও সংবাদ চরিত্রগত দিক থেকে কিছুটা পার্থক্য নিয়েই মাথা নোয়ায়নি শাসকের সামনে। সাহস করেই বলে গেছে নিজের কথা। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অনেকেই আশ্রয় পেয়েছিলেন সংবাদপত্রে। অনেকেই মেধাবী সাংবাদিক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন, আদতে তাঁরা ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। মালিকরা তাঁদের চাকরি দিয়ে পুলিশের চোখে ফাঁকি দিতে সহযোগিতা করেছেন। ধরতে চাইলে বলা হতো সাংবাদিক। অবশ্য এ রকম রাজনীতিবিদ-সাংবাদিক কেউ কেউ জেলে বন্দি হয়েছিলেন। পুলিশ তাঁদের রেহাই দেয়নি। কিন্তু কম পরিচিত অনেকেই পুলিশকে ফাঁকি দিতে পেরেছেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরিস্থিতি আস্তে আস্তে পাল্টে যেতে থাকে। সংবাদপত্র ক্রমেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুন রূপ নিতে থাকে। অনেক পত্রিকাই দলের মুখপত্র কিংবা সরকারের প্রচারপত্র হয়ে ওঠে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভের আশায়। আরো পরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সংবাদপত্র মালিকানায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। বড় পুঁজি বিনিয়োগের পরিপ্রেক্ষিতে মুনাফার প্রতি বেশি মনোযোগ মালিকদের। আবার পেশাজীবী সাংবাদিকরাও প্রকাশক হওয়াটাকে সম্পাদকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। প্রথম সারির দৈনিকের এক সম্পাদক কয়েক বছর পর একই সঙ্গে মালিকানাসহ প্রকাশক হলে বিষয়টি উদ্‌যাপন করা হয়। এ ঘটনা সাংবাদিকদের অবস্থান বরং নামিয়ে দিয়েছে। সংবাদপত্র বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একজোট হয়ে নানা প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। এভাবে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা নিতে হয় অনেক সময়। পিত্জা হাটের খাবারে তেলাপোকা পাওয়ার খবরটি তাই কেউ কেউ ছাপেনি। যাদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ব্যবসায়িক কার্যক্রম, তাদের হাসপাতালের ত্রুটি-বিচ্যুতির সংবাদ ওই সব সংবাদপত্রে আসে না।

গোলটেবিল আয়োজনের নামে জাতীয়, আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিচ্ছে অনেক সংবাদপত্র। এদের পক্ষে ওই এনজিওগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ করা সম্ভব নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী এনজিওগুলোকে ঘায়েল করার মতো রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। এটা যে গোলটেবিল বৈঠকের আয়ের ফলাফল—এটা বুঝতে বাকি থাকে না। গোলটেবিলের উদ্দেশ্য যদি হয় বিষয়ভিত্তিক, আলোচনার মাধ্যমে বিশেষ রিপোর্ট তৈরি করা, তাহলে এতটা ‘ফানফেয়ার’ গুরুত্বপূর্ণ নয়। সম্পাদকের অফিস কক্ষে বা বাসায় ১০-১২ জন ব্যক্তির সমাবেশ ঘটিয়ে আলোচনার সারমর্ম দিয়ে বিশেষ রিপোর্ট হতে পারে। এখনকার গোলটেবিলের ফলাফল নিয়ে কোনো বিশেষ রিপোর্ট হয় না। অর্থ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রচারটাই মূল লক্ষ্য। প্রথম দিন প্রকাশিত রিপোর্টে থাকে আলোচকদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। আর কয়েক দিন পর থাকে মোটামুটি বিস্তারিতভাবে আলোচকদের মতামত। অর্থ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যায় এমন বক্তব্য প্রাধান্য দেওয়া হয় প্রকাশিত রিপোর্টে। এসব ক্লিপিং দেখিয়ে বিদেশি এনজিওগুলো তাদের হেড অফিসের বড় কর্তাদের খুশি রাখে প্রধান প্রধান দৈনিকে ব্যাপক মিডিয়া কাভারেজ প্রাপ্তির কথা বলে। আসলে তাদের এ বক্তব্য বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশিত হলে বিশ্বাসযোগ্যতা পাওয়া যায় না। সে জন্যই পত্রিকার স্পেস কিনে নেওয়া হয় গোলটেবিলের নামে, খবরের আদলে। পাশাপাশি সিভিল সোসাইটির অংশগ্রহণ দেখানো হয়। অথচ আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরাও সম্মানী পেয়ে থাকেন। এটা কারো স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নয়। এক অর্থে এটা পেইড নিউজ। গোলটেবিলের নামে প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাসযোগ্যতা কিনে নেওয়ার চেষ্টা। এটা এক ধরনের প্রতারণা। আর এতে সহযোগিতা করছে প্রথম সারির একটি-দুটি সংবাদপত্র।

টেলিভিশনে বেচে দেওয়া সংবাদ এ রকম আরেকটি অনৈতিক চর্চা। এ কারণে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের নানা ধরনের আবদার রাখতে হয় টিভি কর্তৃপক্ষকে। করপোরেট সংবাদ বা বাণিজ্য সংবাদ শিরোনামে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কর্মকর্তাদের উপঢৌকন বিনিময়ের দৃশ্যও দেখতে হয়; যে খবরের আসলে কোনো মূল্য নেই দর্শকের কাছে, বিনিময়কারী ব্যক্তি ও তাঁদের অধস্তনদের ছাড়া।

মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। কঠিন প্রতিযোগিতা বিজ্ঞাপনের জন্য। এ সুযোগই নিচ্ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। প্রোগ্রাম কেটে যখন-তখন বিজ্ঞাপন, সংবাদ ছেঁটে বিজ্ঞাপন এখন চোখ সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু জাতীয় সংবাদে ব্যাংক-বীমার শাখা উদ্বোধনের গুরুত্বহীন খবর, বিজ্ঞাপনদাতা কম্পানির মালিকের জন্মদিন পালনের খবর টিভি প্রতিষ্ঠানকে দর্শকের কাছে ছোট করে তুলছে।

সংবাদপত্রের পাতায় কোনাকুনি বিজ্ঞাপন, রিপোর্টের মাঝখানে বিজ্ঞাপন, ম্যাগাজিনে ডানদিকের পৃষ্ঠায় বিজ্ঞাপন আমাদের কাছে এ বার্তা পৌঁছায় যে বিজ্ঞাপনদাতারাই নিয়ন্ত্রণ করছেন মিডিয়ার উপস্থাপনা। বিজ্ঞাপন সংবাদপত্রের বা টিভির প্রধান আয়ের উৎস। সংবাদপত্র পাঠক কেনেন। কিন্তু টিভি এখানে এক অর্থে ফ্রি। দর্শকের কাছ থেকে কোনো আয় আসে না। দর্শক কেবলই অপারেটরদের মাসিক ফি দেন।

টিভি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে পারলে, দর্শকদের ধরে রাখতে পারলে বিজ্ঞাপনদাতারা বাধ্য হবেন সেই চ্যানেলে তাঁর পণ্য প্রচারের বিজ্ঞপ্তি তুলে ধরতে। কিন্তু নৈতিক এ পদ্ধতি মানা হচ্ছে না। প্রায় সবাই শর্টকাট পথ হিসেবে ধনবানদের তুষ্ট করার প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করছেন।

সংবাদপত্র বা টিভি এখন আর সাংবাদিকতা ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পাঠক-দর্শকদের পুরোপুরি আকৃষ্ট করতে পারছে না। এ কারণেই তারা বিজ্ঞাপনদাতার খেয়ালখুশিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। মর্যাদাপূর্ণ মিডিয়া গড়ে তোলার জন্য এ প্রবণতা একটা বড় অন্তরায়।

চালের দর ঠিকমতো লেখা হয়েছে কি না তা যাচাই করার জন্য খোদ মন্ত্রী চলে যান মফস্বলে, সেই ১৯৫৯ সালে। কিন্তু নয়া শতাব্দীতে মিডিয়ায় খবরগুলো প্রকাশে ও প্রচারে নৈতিকতা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না তা দেখার কেউ নেই।

লেখক : সাংবাদিক, মিডিয়া বিশ্লেষক

chinmoy35@gmail.com


মন্তব্য