kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গ্যাসের দাম বৃদ্ধি কেন এবং কার স্বার্থে

ড. এম শামসুল আলম

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



গ্যাসের দাম বৃদ্ধি কেন এবং কার স্বার্থে

গত বছর ২৭ আগস্ট বিইআরসি এক আদেশে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধি করে এবং তা কার্যকর হয় ১ সেপ্টেম্বর থেকে। তাতে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের মূল্যহার হয় গড়ে প্রায় ১৭৩ টাকা।

অর্থাৎ ২.২ ডলার। ভারতে গ্যাসের মূল্যহার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এখন সে মূল্যহার ২.৪ ডলার। তবে  সিএনজির বিদ্যমান মূল্যহার ৯৭২ টাকা। অর্থাৎ ১২.৩ ডলার। ভারতে ১০.৩ ডলার।

গত ৭ আগস্ট থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত বিইআরসিতে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ কম্পানিগুলোর গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি হয়েছে। তাতে ভোক্তা পর্যায়ে ভারিত গড়ে ৯৪.৮৯ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। পরে সংশোধিত প্রস্তাবে আইওসি গ্যাসের ক্রয়মূল্য পরিশোধে ঘাটতি সমন্বয়ের কথা বলে ভোক্তা পর্যায়ে পেট্রোবাংলা ৬৫.৪৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। তাতে ভোক্তা পর্যায়ে ভারিত গড়ে মূল্যহার ১৭৩ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হবে ২৮৬ টাকা। অর্থাৎ ৩.৬ ডলার। ভারতের মূল্যহার অপেক্ষা ৫০ শতাংশ বেশি। মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব পর্যালোচনায় যে আলোচনা করেছে তা উল্লেখ করা যাক।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের হিসাবে দেখা যায়, ২৭ হাজার ২৫৫.৯৬ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস বিদ্যমান মূল্যহারে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি বাবদ আয় হয়েছে ১৬ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এ অর্থ থেকে সরকার পায় এসডি-ভ্যাট ৫৫ শতাংশ, লভ্যাংশ ২ শতাংশ, আগাম করপোরেট কর ৩ শতাংশ, সম্পদমূল্য মার্জিন ১৫.৯৬ শতাংশ ও জিডিএফ মার্জিন ৫.১৪ শতাংশ। মোট ৮১.১০ শতাংশ। অর্থাৎ গ্যাস খাত থেকে সরকার ওই বছরে সরাসরি পেয়েছে ১৩ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। কম্পানির নিট মুনাফা থাকে প্রায় ৫ শতাংশ। অর্থাৎ ৮৩১ কোটি টাকা। মূল্যহার ৬৫.৪৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব কার্যকর করা হলে পিডিএফ মার্জিন ১২.১৪ শতাংশ থেকে যতটুকু বৃদ্ধি (৩ শতাংশ!) হবে শুধু ততটুকুই আইওসি গ্যাস ক্রয়মূল্য পরিশোধে ঘাটতি সমন্বয়ে ব্যবহৃত হবে।  

লিটারপ্রতি তিন টাকা কমানোর ফলে ডিজেলের মূল্যহার ৬৫ টাকা এবং ১৮ টাকা কমানোর ফলে ফার্নেস অয়েলের মূল্যহার ৪২ টাকা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দরপতন ফার্নেস অয়েল মূল্যহারে আংশিক সমন্বয় হওয়ায় বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমেছে। তবে ডিজেলের মূল্যহার কমানোয় রেল, নৌ ও সড়ক পরিবহনে ভাড়া কমেনি। চাষ ও সেচ খরচ হ্রাস পায়নি। মাঝখান থেকে বছরে সরকারের একদিকে ৯৯১ কোটি টাকা আয় কম হলো, অন্যদিকে আবার সে অর্থ তসরুফ হলো, জনগণের কোনো কাজে এলো না। কমানোর ফলে এক্স-রিফাইনারি মূল্যহার হয় ডিজেলের ৬০ টাকা ও ফার্নেস অয়েলের ৩৯.৬১ টাকা। দরপতন সমন্বয় যৌক্তিক হলে তা হতো যথাক্রমে ২৮.৪৩ টাকা ও ১৯ টাকা। যৌক্তিক না হওয়ায় বছরে বিপিসির বাড়তি মুনাফা হচ্ছে ডিজেলে ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ও ফার্নেস অয়েলে দুই হাজার ২৫০ কোটি টাকা। ব্যক্তি খাত ফার্নেস অয়েল আমদানি করায় বিপিসি বাড়তি মুনাফাবঞ্চিত হচ্ছে প্রায় ৬৭০ কোটি টাকা। ধরা হয়েছে, বছরে ৩৬ লাখ টন ডিজেল ও ১৩ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানি হয়।

১২ কেজি এলপিজির প্রতি সিলিন্ডার বাজারে বিক্রি হয় প্রায় এক হাজার ৫০ টাকা মূল্যহারে। কমিশনের নির্ধারিত মূল্যহার ৭০০ টাকা। যদি সরকার এ খাতকে রাজস্বের উৎস হিসেবে বিবেচনা না করে, তাহলে যৌক্তিক মুনাফা মার্জিনসহ ৪৫০ টাকা মূল্যে বাজারে তা সহজলভ্য করা সম্ভব। তবে মূল্যহার এক হাজার ৫০ টাকা হওয়ায় সিলিন্ডারপ্রতি আরো ৬০০ টাকা বাড়তি মুনাফা হয়। সরকারি খাতে ২০ হাজার ও ব্যক্তি খাতে এক লাখ ৮০ হাজার এলপিজি সিলিন্ডার গ্রাহক পরিবার রয়েছে। সে গ্রাহক পরিবার সংখ্যা এক কোটি টাকা এবং মাসে পরিবারপ্রতি এলপিজি সিলিন্ডার চাহিদা একটি ধরা হলে এ খাত থেকে বছরে সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়তি মুনাফা লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ মুনাফা যৌক্তিক করে মূল্যহার নির্ধারিত হলে এলপিজি শুধু আবাসিকেই নয়, শিল্প, পরিবহন ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বিকল্প হতে পারে। ফলে গ্যাসের চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় গ্যাস সংকট তথা জ্বালানি সংকট উপশম হবে।

গণশুনানিতে উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তে জানা যায়, আবাসিক চুলার সংখ্যা ৩৪ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৩। অবৈধ সংযোগ থাকার কারণে বাস্তবে এ সংখ্যা অনেক বেশি। অধিকাংশই দুই বার্নারের চুলা। এক বার্নারের চুলা নেই বললেই চলে। প্রতি চুলার জন্য মাসিক বিল ৬৫০ টাকা। প্রতি চুলায় গ্যাস খরচ ধরা হয় ৯২ একক। ভোক্তারা বলেছে, বাস্তবে গ্যাস খরচ হয় ৪৫ এককের বেশি নয়। ফলে চুলাপ্রতি মাসে ৪৭ একক গ্যাস হিসেবের বাইরে থেকে যায়। এ হিসাবে ভোক্তার ব্যবহৃত চুলাপ্রতি গ্যাসের মূল্য দাঁড়ায় এক হাজার ৪২৪ টাকা। বছরে হিসাববহির্ভূত গ্যাসের পরিমাণ এক কোটি ৯৩ লাখ একক; যা শিল্পে ব্যবহৃত হলে রাজস্ব আসত এক হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। অভিযোগে বলা হয়েছে, আবাসিক সংযোগে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ছোট ছোট কারখানা চলছে। বর্তমানে দিনে সরবরাহকৃত গ্যাসের পরিমাণ দুই হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যসূত্রে বলা হয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে গ্যাস চুরির পরিমাণ দিনে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব ৩১.১৯ শতাংশ। অথচ সরকার বিশ্ববাজারের দরপতন সমন্বয় যৌক্তিক না করে জ্বালানি তেলে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন অব্যাহত রাখায় গত সেপ্টেম্বরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। আবারও গ্যাসের দাম বাড়লে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়বে। তাতে বিদ্যুৎ খাতে রাজস্ব ঘাটতি কমলেও উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে। ফলে ভ্যাট বাবদ সরকারের একদিকে রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় দেশের ১২ কোটিরও বেশি স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে। এভাবে রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল সঠিক ও যৌক্তিক নয়।

সার উৎপাদনে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব ৩৫.৬৬ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দরপতন ও তার সমন্বয় সুবিধা থেকে কৃষি বঞ্চিত হয়েছে। গতবারে বিদ্যুৎ ও সিএনজির দাম বাড়ায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এখন আবারও গ্যাস ও সিএনজির দাম বাড়লে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং পরিবহনে চাঁদার পরিমাণও বাড়বে। কৃষি ও কৃষক বিপন্ন হবে। এমন অবস্থা সরকারের কাম্য হতে পারে না।

শিল্প ও বাণিজ্যে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব যথাক্রমে ৫৫.৭৯ শতাংশ ও ৬৭.২৫ শতাংশ এবং ক্যাপটিভ পাওয়ারে ১২৭.২৭ শতাংশ। অবৈধ ও অপরিকল্পিত গ্যাস সংযোগ উভয় গ্রাহককে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে রেখেছে। উৎপাদন ও বাণিজ্য ব্যাহত এবং বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি বিঘ্নিত। এ পরিস্থিতিতে এসব গ্রাহক ক্ষতিপূরণের দাবিদার। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আর্থিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে এ দুটি খাতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। অথচ তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে জ্বালানি তেলের দরপতন সুবিধা থেকে একদিকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে  ঘন ঘন বেশি বেশি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করে অসহনীয় অভিঘাত মোকাবিলা করতে বাধ্য করা হচ্ছে; যা অন্যায় ও অবিচারের শামিল।

সিএনজির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব ৪৮.১৫ শতাংশ। গতবার বৃদ্ধি হয় ৪৬ শতাংশ। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। তাতে সিএনজিতে চলা পরিবহনের ভাড়া সরকার ১০ শতাংশ বাড়ালেও পরিবহন মালিকরা বাড়িয়েছে ৫০ শতাংশ। সঙ্গে সঙ্গে তেলে চলা পরিবহনেরও ভাড়া বেড়েছে, তাল মিলিয়ে তেলের দাম না বাড়লেও। আবার জ্বালানি তেলের দাম কমানো হলেও পরিবহন ভাড়া কমেনি। সিএনজির মূল্যহার আবার বৃদ্ধি হলে আগের মতোই জ্বালানি ভেদে নয়, ঢালাওভাবে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি হবে। সিএনজির মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করার ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় না নেওয়া অন্যায় ও অবিচারের শামিল।   

সব গ্যাস কম্পানির প্রতি ব্যয় সাশ্রয়ী নির্দেশনাসহ কমিশনের যেসব নির্দেশনা ছিল, তা প্রতিপালিত হয়নি। বরং কম্পানিগুলোর আয় হ্রাস হলেও জনবল ও উন্নয়ন ব্যয়বৃদ্ধি এবং নানাভাবে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্ব-স্ব কম্পানির মার্জিন বৃদ্ধির জন্য মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে জনবল নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা যৌক্তিক কি না, সেসব কমিশনের খতিয়ে দেখা দরকার ছিল। সে জন্য কমিশন কর্তৃক এনার্জি অডিট হওয়া দরকার। জনবল নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে কমিশনের পূর্বানুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া অবশ্যক ছিল। সে জন্য কম্পানির মার্জিন হ্রাস-বৃদ্ধি হতে পারত মোক্ষম হাতিয়ার।

গ্যাস বিতরণ কম্পানির পক্ষ থেকে ক্যাপটিভ পাওয়ার ও আবাসিকে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্যহার ও সিএনজির মূল্যহার বৃদ্ধির পক্ষে বলা হয়েছে, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় এসব খাতে গ্যাস ও সিএনজির ব্যবহার অনুৎসাহিত করা দরকার। সে জন্য মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব। কিন্তু ভোক্তারা বলেছে, গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধি এ সমস্যা সমাধানের একটি ব্যর্থ প্রয়াস। বরং গ্যাস ও সিএনজির বিকল্প জ্বালানি এলএনজি ও ফার্নেস অয়েলের বাজার অসাধু ব্যবসামুক্ত করে প্রতিযোগিতামূলক করা হলে গ্যাসের পরিবর্তে এলপিজি ক্যাপটিভ পাওয়ার, শিল্প,  আবাসিক ও পরিবহনে এবং ফার্নেস অয়েল বিদ্যুৎ ও শিল্পে ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। ফলে জ্বালানি মিশ্রণে এলপিজি ও ফার্নেস অয়েলের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে এবং গ্যাসের ওপর চাপ প্রশমিত হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

আমদানি ব্যয়বৃদ্ধিতে ঘাটতি বাড়ায় জ্বালানির দাম বাড়ে। তাতে বিদ্যুতের দামও বাড়ে। ঘাটতিতে না থাকলেও সমতা রক্ষায় বিকল্প জ্বালানির দামও বাড়ে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে। আবার আমদানি ব্যয় হ্রাসে যে মুনাফা হয় তা সমন্বয় করে জ্বালানির মূল্যহার যৌক্তিক করায় জীবনযাত্রার ব্যয় কমে। এটাই নীতি ও নায্যতা। অথচ রাজস্ব (শুল্ক-ভ্যাট, কর ও লভ্যাংশ) বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে একদিকে দরপতন সমন্বয় যৌক্তিক না করে বিদ্যুতে কৃত্রিম ঘাটতি বজায় রেখে তরল জ্বালানিতে মুনাফা আহরণ অব্যাহত রাখা হয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সিএনজির দাম ঘন ঘন বেশি বেশি বাড়ানো হচ্ছে। অভন্তরীণ কয়লার দামও বাড়ছে। তাতে ভোক্তার ভোগব্যয় বাড়ায় সরকারের ভ্যাট বাবদ রাজস্ব বাড়ছে।  

অতীতে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় উচ্চ মূল্যের জ্বালানি তেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করার কারণে বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয় অতি মাত্রায় একদিকে যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি বিদ্যুতের মূল্যহারও বৃদ্ধি পায়। তখন সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল যে ২০১৪ সাল নাগাদ সরকার বিদ্যুতের মূল্যহার কমিয়ে আনবে। সে ব্যাপারে সরকারের একটি রোডম্যাপও ছিল। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি প্রতিপালিত হয়নি। সরকার সে রোডম্যাপ ধরে অগ্রসর হয়নি। অগ্রসর হয়েছে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে লাভ ও লোভের রোডম্যাপ ধরে। তাই আমদানি ব্যয় হ্রাসে অর্জিত মুনাফা যথাযথ সমন্বয় করে তরল জ্বালানির মূল্যহার যৌক্তিক না করে সরকার একদিকে পর্যাপ্ত মুনাফা আহরণ অব্যাহত রেখে রাজস্ব বাড়াচ্ছে; অন্যদিকে গ্যাস, সিএনজি ও বিদ্যুতের মূল্যহার অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। রাজস্ব আহরণের এমন কৌশল অন্যায় ও অনৈতিক।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যক্তি খাত বিনিয়োগকারীর জন্য অবাধ মুনাফা আহরণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সে সুযোগ আরো সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণের একক আইনি এখতিয়ার কমিশনের হলেও এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে সে মূল্যহার নির্ধারণ করে জ্বালানি বিভাগ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যক্তি খাত বিনিয়োগকারী একদিকে শুল্ক-ভ্যাট মুক্ত সুবিধা পেয়ে সরাসরি তরল জ্বালানি আমদানির সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে তার ওপর ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জও দেওয়া হচ্ছে। আবার তারা ৬০-৭০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তেল খরচের পরিমাণ বাড়িয়ে তেলে যেমন মুনাফা করছে, তেমন ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদ আগের মতোই নির্ধারিত মাসিক পেমেন্ট পাচ্ছে। ভারত থেকে আনা কম দামি বিদ্যুৎ পশ্চিমাঞ্চলে ব্যবহার না করে ইস্ট ওয়েস্ট ইন্টারকানেক্টর দিয়ে সিস্টেম লস মেনে নিয়ে একদিকে ইস্টে আনা হচ্ছে, অন্যদিকে ওয়েস্টে বেশি দামি তেল বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করে সেখানকার চাহিদা মেটানো হচ্ছে। আবার বিধানমতে, মেঘনাঘাটে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েল ব্যবহারের জন্য কমিশনের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ব্যবহৃত হচ্ছে দামি ডিজেল।

ভোক্তা পর্যায়ে সিএনজি, আবাসিক ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। ওই তিনটি খাতে গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজিকে দেখা হচ্ছে। তাই ব্যক্তি খাত এলপিজির বাজার সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং এলপিজি সিলিন্ডার প্রতি ৩০০ টাকা ভর্তুকির বিষয়ও ভাবা হচ্ছে। এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্যহার নির্ধারণের এখতিয়ার কমিশনের হলেও বলা হচ্ছে তা নির্ধারণ করবে বাজার। অর্থাৎ এলপিজি ব্যবসায়ীরা।

এর পরও কি বলার অপেক্ষায় আছে যে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি কেন এবং কার স্বার্থ?

লেখক : জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

eeesa@daffodilvarsity.edu.bd


মন্তব্য