kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রকট রামপাল ইস্যুতে

সাজ্জাদুল ইসলাম

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



এখন রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের পক্ষে কথা বললেই আশপাশের মানুষজন খানিকটা বাঁকা চোখে তাকায়। ভাবটা এমন, লোকটা যেকোনো সময় দেশটা বিদেশিদের কাছে বিক্রি করে দেবে।

কিন্তু যতই বাঁকা চোখে দেখুক, আমি দেশের সাধারণ মানুষ। চারপাশের গাছপালা, নদ-নদী, মানুষ, গরু-ছাগল—সবাইকে নিয়েই আমার ‘পরিবেশ’। পরিবেশের কোনো ক্ষতি হোক তা আমি চাই না। আমি রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র চাই। তবে সেটা হতে হবে আধুনিক; পরিবেশের যাতে ক্ষতি না হয় এমন বিষয়কেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে রামপালে। আমার চেয়েও অনেক বেশি এ দেশকে ভালোবাসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে তাঁর গোটা পরিবার। তাঁর দেশপ্রেম পরীক্ষিত। দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে এমন কিছু তিনি চাইবেন না, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

দেশের উন্নয়নে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়নে যখন তিনি হাত দিয়েছেন তখনই কিছু মানুষ এর বিপক্ষে এসে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়ানোটা স্বাভাবিক। কারণ যেকোনো উন্নয়নের বিরোধীপক্ষ থাকবেই। তারা গঠনমুখী সমালোচনা করবে। এতে উন্নয়ন ফলপ্রসূ হয়। কাজে গতি পায়। কিন্তু সেটাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হলে এই বিরোধিতার কোনো ইতিবাচক প্রভাব থাকে না। যেমনটা দেখেছি সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কথায় ও মুভমেন্টে। বেগম জিয়া এখন স্পষ্টভাবেই রামপালের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছেন। আন্দোলন আর রাজনৈতিক ইস্যুতে দেউলিয়া বিএনপি নতুন করে রামপাল ইস্যুকে আঁকড়ে ধরে রাজনীতিতে হারানো অবস্থানটা ফিরিয়ে আনতে চাইছে।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নতুন নতুন বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনায় কাজ করছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটের রামপালে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সুপার থারমাল পাওয়ার প্রজেক্ট বাস্তবায়নে বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষর করে সরকার। বিদ্যুেকন্দ্রটি সুন্দরবনসংলগ্ন হওয়ায় ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’ তা বন্ধে আন্দোলন করে আসছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বাম দলগুলো। ইস্যুটি কাজে লাগাতে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপিও প্রকল্পটি বাতিলের দাবিতে সরব হয়েছে। খালেদা জিয়ার অভিযোগ, রামপালে বিদ্যুেকন্দ্র হলে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রকল্প বাতিলের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনে দেশের স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সরকার পতনের আন্দোলনে একটি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ‘রামপাল’ ইস্যুকে কাজে লাগাতে চাইছে তারা।

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান উপাদান জ্বালানি ও এর পরিবহন, পানি, বাষ্প ও ধোঁয়া নিঃসরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকায় স্থান হিসেবে রামপালকে নির্বাচন করা হয়েছে। সুন্দরবনসংলগ্ন এই জায়গায় বিদ্যুেকন্দ্রের সব উপাদানের সম্মিলন ঘটেছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজন সস্তা পরিবহনব্যবস্থা। সে জন্য কয়লাখনির কাছাকাছি অথবা সমুদ্র উপকূল বা গভীরতাসম্পন্ন নদীর তীরে এই বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করা হয়ে থাকে। রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে পশুর নদের তীরে, অদূরেই মংলা সমুদ্রবন্দর, যা রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের উপযোগিতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রস্তাবিত জায়গায় পৌঁছতে মংলা বন্দর পার হয়ে আরো তিন কিলোমিটার যেতে হয়। মংলা পোর্টে প্রতিদিন নানা রকম মালামাল ভর্তি কার্গো, জাহাজ ইত্যাদি আসে। রামপালের জন্য সর্বোচ্চ যে বাড়তি দুটি জাহাজ আসবে তার জন্য মংলা বন্দরে যা স্পিল মেকানিজম, এখানেও সেই মেকানিজমই প্রযোজ্য। রামপালের যে জায়গাটি নির্বাচন করা হয়েছে সেখানে জনবসতি প্রতি বর্গমাইলে মাত্র ১৮৭ জন, যা বাংলাদেশের অন্য জেলাগুলোতে পাওয়া যায় না। বিদ্যুেকন্দ্রটি নির্মাণের জন্য কাউকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে না। নিচু ও জলাভূমি ভরাট করেই নির্মাণ করা হচ্ছে রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র।

বিদ্যুেকন্দ্রটির অবস্থান সুন্দরবনের কিনারা থেকে ১৪ কিলোমিটার আর ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ পয়েন্ট থেকে ৬৫ কিলমিটার দূরে। সাধারণ বিজ্ঞান অনুযায়ী রামপালে উৎপন্ন কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিতে সুন্দরবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যারা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র করেছে তাদের কাউকে কাউকে প্রকল্পের কাছাকাছি বনায়নও করতে দেখা গেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র

উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করছে। আমেরিকা ৪০ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়া ৭৮ শতাংশ, চীন ৭৯ শতাংশ, জার্মানি ৪১ শতাংশ, জাপান ২৭ শতাংশ, ভারত ৬৮ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকা ৯৩ শতাংশ, মালয়েশিয়া ৩৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎসদন করে কয়লা থেকে। সেখানে বাংলাদেশ কয়লা দিয়ে উৎসদন করে মাত্র ২.০৫ শতাংশ বিদ্যুৎ।

যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বনভূমির কাছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের নজির রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় এক হাজার ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মাউন্ট স্টর্ম পাওয়ার প্লান্টটি ন্যাশনাল পার্কের এক কিলোমিটারের মধ্যে, ভিয়েতনামের কুয়াংনিন বিদ্যুেকন্দ্র বিশ্ব ঐতিহ্য হ্যা লং বের ছয় কিলোমিটার দূরে, জাপানের ইয়াকোহামায় ইসোগো বিদ্যুেকন্দ্র আবাসিক এলাকার কাছে, তাইওয়ানের তাইচু বিদ্যুেকন্দ্র শহরের প্রাণকেন্দ্রে, জার্মানির ক্রাফটওয়ার্ক-মুরবার্গ ও রেইনহফেন ড্যাম্ফক্রাফট বিদ্যুেকন্দ্র শহরসংলগ্ন ও নদীর তীরে। সেখানে বাংলাদেশের রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে সুন্দরবনের প্রান্তসীমা থেকে ১৪ কিলোমিটার ও ইউনেসকো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে।

এ প্রসঙ্গে এক সহকর্মী বন্ধুর কাহিনী বলতেই হয়। ওই বন্ধু তাঁর গ্রামের বাড়িতে পাকা টয়লেট বানানোর কাহিনীটি বলছিলেন, ‘পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ছোট পরিবারে পরিণত হলো আমার বাবার সংসার। নতুন করে ঘর বানাতে হলো। টয়লেটও আলাদা বানাতে হবে। গ্রামে তো টয়লেট বসতবাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু জায়গা স্বল্পতায় বাবা ঘরের মধ্যেই টয়লেট বানানোর পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু প্রচণ্ড রকম বেঁকে বসলেন দাদি। তাঁর কথা যেখানে খাব, ঘুমাব আর সেখানেই প্রাতঃকর্মটি করতে হবে! এটা মেনে নেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে দাদির যুক্তি ছিল, ঘরের মধ্যে টয়লেট বানালে এর দুর্গন্ধে ঘরের পরিবেশ নষ্ট হবে। বাবা তখন দাদিকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন আধুনিক পদ্ধতিতে ঘরের মধ্যে টয়লেট বানালে তাতে দুর্গন্ধ হয় না। কিন্তু দাদির সেই একই কথা, ঘরের মধ্যে টয়লেট বানানো যাবে না। দাদির চরম বিরোধিতার মুখেই বাবা স্বৈরাচারী ভূমিকা নিয়ে টয়লেট বানালেন ঘরের মধ্যেই। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সেই টয়লেটের সুবিধা ভোগ করলেন দাদি।

 

লেখক : সাংবাদিক

nayan@kalerkantho.com


মন্তব্য