kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জঙ্গি দমন ইস্যুতে সরকারের করণীয় কী

ফারুক উদ্দিন আহমেদ

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জঙ্গি দমন ইস্যুতে সরকারের করণীয় কী

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তথা বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোটেই পছন্দ করে না। হলি আর্টিজান ও কল্যাণপুরের সন্ত্রাসীদের একজন ছাড়া সবাই নিহত হয়েছে।

এটা নিছক পুলিশ বা সেনাবাহিনীর ইচ্ছা ছিল না। মনে রাখতে হবে, এটা ছিল এ দেশেরই জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন এবং তা ঘটিয়েছেন পুলিশ, র্যাব ও সেনা সদস্যরা, যাঁরা এ দেশেরই জনগণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এ দেশেরই সাধারণ মানুষের সন্তান। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ভালো করেই জানেন দেশের মানুষ কী চায়। কোনো দেশে যখনই কারো দ্বারা এমন কিছু করা সম্ভব নয়, যা সাধারণ মানুষ চায় না। একাত্তরে পাকিস্তান যেমন এ দেশেকে জোর করে দখল করে রাখতে চেয়েছিল; কিন্তু পারেনি। অবশ্য এ জন্য জাতীয় নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর মতো প্রবাদ পুরুষের উপস্থিতি যেমন ছিল অপরিহার্য, তেমনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর মতো অসাধারণ নেত্রীর সহৃদয় ও সর্বাত্মক সহযোগিতা ছিল অতি আবশ্যক।

বাংলাদেশের মানুষ যে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ও সন্ত্রাস মোটেই পছন্দ করে না তার উত্কৃষ্ট প্রমাণ হলো, গুলশানে বা কল্যাণপুরে নিহতদের নিকটাত্মীয়স্বজনও বাদ—এমনকি ওদের মা-বাবাও দেখতে বা লাশ শনাক্ত করতে যাননি। বরং ওই সন্ত্রাসীদের মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজন ওদের আপনজন হওয়ায় নিজেদের ধিক্কার দিয়ে বলছে, ‘এমন কুসন্তান যেন আর কোনো মা-বাবার ঘরে জন্ম না নেয়। ’ বাংলাদেশের নব্য রাজাকাররা একাত্তরের মতো আবারও বাংলাদেশকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র বানানোর কথা বলছে বলে শোনা যায়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম সংবিধান মতে, ‘ইসলাম’, এ দেশের ৮৫-৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। তার পরও এ দেশকে মুসলিম রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা একটি ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশের সংবিধানে সব মানুষের ও ধর্মাবলম্বীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা আছে। এ দেশে মুসলমানরা যেমন তাদের ধর্মীয় ক্রিয়াকর্ম নির্বিবাদে পালন করে—হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরাও তেমনি তাদের সব আচার-উৎসব যথারীতি পালন করে। কিছু ধর্মান্ধ ব্যক্তি এসব ব্যাপারে কিছুটা বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল সত্য; কিন্তু সরকার ও বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর চ্যালেঞ্জের মুখে তারা দাঁড়াতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না, ইনশাল্লাহ। সবচেয়ে জঘন্য লাগে, কিছু দুষ্কৃতকারী তাদের অপকর্মের সঙ্গে ইসলামকে সংযুক্ত করতে চায়। কিন্তু তারা জানে না ইসলাম এসব হিংসা, ঘৃণা ও খুনখারাবি শুধু অপছন্দই করে না, বরং এসবকে ‘হারাম’ অর্থাৎ নিষিদ্ধ ও কবিরা গুনাহ বলে ঘোষণা করেছে। দেশের শীর্ষ এক লাখ ইমাম ও আলেমের স্পষ্ট ঘোষণাও যেন এদের কানে পৌঁছেনি। ইদানীং সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন দল ও সদস্য বিভিন্ন জায়গায় ধরা পড়ছে। এতেই বোঝা যায়—সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এবং জনগণ এদের বরদাশত করে না এবং করবেও না দেশের ১৭ কোটি নিরীহ শান্তিপ্রিয় ধর্মপরায়ণ মানুষের স্বার্থে। এ দেশের মুসলমানরা যেমন নির্দ্বিধায় মসজিদে যেতে চায় এবং যায়। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরাও তাদের যার যার উপাসনালয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। কোনো ধর্মান্ধতা তাদের কাউকে বাধা দিতে পারবে না, বরং চেষ্টা করলে হলি আর্টিজান ও কল্যাণপুরের মতো নিজেরাই নিশ্চিহ্ন হবে। এ সত্য তাদের বুঝতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইদানীং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হচ্ছে। শুধু যে আইএস নামের জঙ্গি সংগঠনের উদ্ভট অত্যাচারে মধ্যপ্রাচ্যের, বিশেষত সিরিয়া ও ইরাকের জনগণ বিপর্যস্ত হচ্ছে তা নয়, ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশেও নানা জঙ্গি কর্মকাণ্ড হয়েছে ইদানীংকালে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের জঙ্গি তত্পরতা সর্বকালের সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ম্লান করে দিয়েছে। আর সে জন্য ওই জঙ্গিরাই শুধু দায়ী নয়, সেখানকার জনগণ ও সরকারও বহুলাংশেই দায়ী। তারা আগে থেকেই এসব সন্ত্রাসীকে চিহ্নিত করলে এবং দেশে বিদেশি অস্ত্র প্রবেশ রুখতে পারলে আইএসের বাড়াবাড়ি এত জঘন্য, মর্মান্তিক হতো না। এর ফলে লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে পথে পথে প্রাণ দিতে হয়েছে—ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সহায়-সম্বলহীনভাবে আশ্রয় নিতে হয়েছে। আইএস যা চায়—ধর্মের তথা ইসলামের নামে ক্ষমতা দখল, জুলুম-খুনখারাবি, ধর্ষণ, নারী-শিশুদের প্রতি অত্যাচার, তা স্থানীয় জনগণ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করলে এদের বাড়াবাড়ি এত জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছত কি না সন্দেহ আছে। এখন যেহেতু স্থানীয় ও বিশ্বজনমত সজাগ হয়েছে, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ এদের রোখার সর্বাত্মক ব্যবস্থা (গ্রাউন্ড ও এয়ার অ্যাটাকসহ) নিয়েছে, আইএস অনেক জায়গায়ই কোণঠাসা হয়েছে এবং পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। এত প্রাণ ও রক্তক্ষয়ের পরও যদি বিশ্বশক্তির সহায়তায় এই সংঘর্ষ বন্ধ হয়, তাহলে আল্লাহর শোকর আদায় হবে। ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার নামে এরই মধ্যে আইএস মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। এখন মধ্যপ্রাচ্য ও বহির্বিশ্বের সবার সহযোগিতায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও শান্তির সুবাতাস বয়ে যাক—এটাই সারা বিশ্বের সব শান্তিকামী মানুষের একান্ত কাম্য। মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা লাগিয়ে রাখলে পশ্চিমা বিশ্বেরও যে শেষ পর্যন্ত কোনো ফায়দা হবে না—এটা তাদের বুঝতেই হবে। সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক—এটাই আমাদের কামনা।

অনেকেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের কথা বলে বাংলাদেশেও অব্যাহত অশান্তির আশঙ্কা করেন, যা সম্পূর্ণ অমূলক। মনে রাখতে হবে, আইএস মধ্যপ্রাচ্যে মোটেই ব্যাপক জনসমর্থনপুষ্ট নয়। তাই তাদের অনেক ভাঁওতাবাজি এত দিনে ধরা পড়েছে। যেমন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোনো একটি সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেই তারা দায়িত্ব স্বীকার করে মিথ্যা বাণী ছাড়ত। আসলে এসবই ছিল ভুয়া। মধ্যপ্রাচ্যসংলগ্ন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে তালেবানরাও অনেক উত্পাত করেছে; কিন্তু তাদেরও দিন শেষ হয়ে আসছে বলে মনে হয়। উপরোক্ত দুটি দেশের কিছু লোক প্রথমত, তালেবানদের সমর্থন দেওয়ায় একবার তো তারা আগফানিস্তানে সরকারও গঠন করেছিল। পরে জনসাধারণ প্রশ্রয় না দেওয়ায় তারাও এখন পলায়নের পথে। বাংলাদেশে স্থানীয় কিছু বিভ্রান্ত যুবক-যুবতী তাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতিমধ্যেই বুঝতে পেরেছে, এসবই ভুল। মুসলিমপ্রধান এ দেশের মানুষকে নতুন করে ইসলামী আদর্শ শেখানোর স্পর্ধা সাধারণ মানুষ মোটেই পছন্দ করে না, এমনকি ওই সব বিভ্রান্ত ছেলেমেয়ের মা-বাবাও না! এমনিতেই বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক দূরে এবং এ দেশের মানুষ ধর্মপরায়ণ, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়—হবু সন্ত্রাসীরা নিশ্চয়ই এত দিনে বুঝেছে। তবু আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনসাধারণকে সদাসতর্ক থাকতে হবে।

আমাদের সরকারের ঘোষিত সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমও অব্যাহত রাখতে হবে। কবি নজরুলের কবিতা মনে রাখতে হবে, ‘আবু বকর ওসমান ওমর আলী হায়দর—দাঁড়ি যে এ তরণীর নাই ওরে নাই ডর...কাণ্ডারী হুঁশিয়ার...’।

লেখক : অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংক


মন্তব্য