kalerkantho


তথ্যপ্রযুক্তি, বিপিও ও তরুণদের নতুন ঠিকানা

ফিরোজ চৌধুরী

২৫ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০



সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মুখে একটি শব্দ বেশ উচ্চারিত হচ্ছে। শব্দটি হচ্ছে ‘বিপিও’ বা বিজনেজ প্রসেস আউটসোর্সিং। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এটি এক নতুন সম্ভাবনার নাম। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিপিওর বাজার বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলার। সেখানে ‘বিলিয়ন’ তো দূরের কথা, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত দখল করতে পেরেছে মাত্র ১৮০ মিলিয়ন ডলার! সুতরাং চোখে আঙুল দিয়ে না দেখালেও বিষয়টি স্পষ্ট যে বিপিও খাতে একটা বিশাল বাজার পড়ে আছে। বাংলাদেশ যদি এই খাতে নজর দেয়, তাহলে তৈরি পোশাক শিল্পের পরই ‘বিপিও’ হবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় খাত।

‘ক্যারিয়ার অপরচুনিটিজ ইন বিপিও ইন্ডাস্ট্রি’ শীর্ষক বিভিন্ন সেমিনারে আমরা দেশের ২০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি। সবখানেই তরুণদের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখেছি, তা আশা জাগানিয়া। আমরা লক্ষ করেছি, সব শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবনেই আয়মূলক কিছু না কিছু করতে চায়। সেমিনারের পরে অনেকে বলেছে, টিউশনি ছেড়ে তারা আউটসোর্সিংয়ের কাজ শুরু করবে। কেউ বা বলেছে, আউটসোর্সিং নিয়ে তার দীর্ঘদিনের আগ্রহ; কিন্তু কোথাও সুযোগ করে উঠতে পারছে না। আমাদের সামনে এখন কর্তব্য হচ্ছে, এসব উজ্জ্বল তরুণের জন্য সঠিক কাজের সুযোগ করে দেওয়া।

বিপিও খাতে সমৃদ্ধ দেশের তালিকায় রয়েছে ভারত, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা। ছোট্ট দেশ শ্রীলঙ্কার আয় ইতিমধ্যেই ছাড়িয়ে গেছে তিন বিলিয়ন ডলার। ভাবতে অবাক লাগে, একই রকম জল-হাওয়ায় বেড়ে উঠে শ্রীলঙ্কা যদি বিপিও খাতে সফল হতে পারে, ভারত যদি সফল হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না? এর উত্তর সহজ। এ জন্য এখনই চাই সঠিক পরিকল্পনা। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের নেতৃত্বে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ অনেক সৃজনশীল কাজ করে চলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া দরকার নানা বেসরকারি উদ্যোগ।

শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই সত্য, বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনসংখ্যার ১১ কোটির বেশি তরুণ (অনূর্ধ্ব-৩৫)। মোট জনসংখ্যার হিসাবে এ সংখ্যা ৬৫ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে, আমাদের এই বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী কোনো না কোনোভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। তাই বলা চলে, প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের রয়েছে অফুরান সম্ভাবনা। তবে সতর্কতার সঙ্গে এটাও জেনে রাখা ভালো, ১৯৭০ সালে নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া একই ধরনের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছিল। এতে দক্ষিণ কোরিয়া অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশে পরিণত হয়েছে, কিন্তু নাইজেরিয়া সেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কাজে লাগাতে না পারায় এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। তবে আমাদের তরুণদের প্রতি আমরা আস্থা রাখতে চাই, তাদের রয়েছে অফুরান সম্ভাবনা, তারা সফল হবেই।

আমাদের দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নারী। প্রথাগত চাকরির ক্ষেত্রে তাদের যুক্ত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বিপিও খাত তাদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। বিপিও খাতের উদ্যোক্তাদের উচিত হবে, শিক্ষিত নারীদের বিপিও খাতে আরো বেশি সংখ্যায় যুক্ত করা। পাশাপাশি আমাদের নারী ও শিশুদের জন্য ইন্টারনেট যেন নিরাপদ হয়, তার জন্যও আমাদের কাজ করতে হবে।

১৬ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ১৩ কোটির হাতে আছে মোবাইল সেল ফোন। এর মধ্যে আবার ছয় কোটি ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তরুণরা শুধু বিনোদনের কাজেই ব্যবহার করে না, তারা নানা উদ্ভাবনীমূলক কাজে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। এখন আমাদের নীতিনির্ধারকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘বিপিও’কে আরো জনপ্রিয় করা। কারণ ইউএসএ, ইংল্যান্ড ও জাপানে আগামী পাঁচ বছরে ২০ লাখ প্রোগ্রামার প্রয়োজন হবে। কিন্তু তাদের দেশে পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ফলে ওই তিনটি উন্নত দেশের তরুণদের সংখ্যা আরো সীমিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ কি পারবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে?

বিপিও খাতে বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও বিপরীতে রয়েছে দক্ষ জনবলের অভাব। দক্ষতার দিকে আমাদের তরুণদের নজর দিতে হবে। আউটসোর্সিংয়ে ভালো করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায়ও দক্ষতা বাড়াতে হবে।

শত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ‘নিম্ন মধ্যম’ আয়ের দেশের কাতারে ঢুকে পড়েছে। এখন লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশের আসন স্থায়ী করা। এ ক্ষেত্রে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বিপিও ইন্ডাস্ট্রি।

বাংলাদেশে গার্মেন্ট খাত এখন প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাত, যার বার্ষিক আয় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের আর কোনো খাত থেকেই ‘বিলিয়ন ডলার’ আয় হয় না। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেই কেবল সেই সম্ভাবনার আলো উঁকি দিচ্ছে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পাঁচ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে শুধু বিপিও খাতেই অর্জিত হবে এক বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের তরুণদের সম্ভাবনার প্রতি আস্থা রেখে বলতে চাই, এ লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব কিছু নয়। আজকের তরুণ প্রজন্ম সফল হলেই সফল হবে বাংলাদেশ।

লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিকতা বিভাগ,

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ


মন্তব্য