kalerkantho


আদালতে প্রবেশ নিষেধ, ‘বেশি স্বাধীনতা’ ও সৎসাহস

চিন্ময় মুত্সুদ্দী

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আদালতে প্রবেশ নিষেধ, ‘বেশি স্বাধীনতা’ ও সৎসাহস

সাম্প্রতিক সময়ে মিডিয়া নিয়ে কয়েকটি ঘটনা আমাদের চিন্তিত করে তুলেছে। যেমন নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের মামলার শুনানির সময় আদালত থেকে সাংবাদিকদের পিপি কর্তৃক বের করে দেওয়া হয়েছে।

ঘটেছে এ রকম আরো কয়েকটি ঘটনা। তবে আশার বাণী শুনিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি বলেছেন, সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে যেকোনো আক্রমণ গণতন্ত্রের জন্যও মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

আদালতে মিডিয়া আবার নিষিদ্ধ

আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে। ২০০৪ সালের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। ওই বছর ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচন স্থগিতের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে শুনানির সময় আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন আপিল বিভাগের তত্কালীন বিচারপতি মো. রুহুল আমিন। নিষেধাজ্ঞা জারি করে তিনি বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকদের আদালতে কিছু করার নেই। ’  আদালতের নির্দেশের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন সেদিন বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশে প্রকাশ্য আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির নজির নেই। ’

শুনানির সময় এজলাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলেও পরদিন সাংবাদিকদের সুপ্রিম কোর্ট ভবনেই ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়।

প্রতিবাদে সাংবাদিকরা সুপ্রিম কোর্ট ভবনের সামনে হাত বেঁধে অবস্থান নেন। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ঘটনাটিকে অনভিপ্রেত বলে আখ্যায়িত করে সাংবাদিকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি বেঞ্চ থেকে প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এতে বিশেষ বেঞ্চ ভেঙে যায় এবং পরবর্তী শুনানি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুরু হলে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেনের নির্দেশে সাংবাদিকরা  শুনানির সময় এজলাসে প্রবেশের সুযোগ পান।

এই আপিল নিয়ে একটা লুকোচুরি চলছিল। আপিল আবেদনের জন্য দাখিল করা নথিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ সাঈদ স্বাক্ষর করেননি বলে সাংবাদিকদের জানানো হয়। কিন্তু আদালতে উপস্থাপিত নথিতে তাঁর স্বাক্ষর আছে বলে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে অবহিত করেন। আদালতে উপস্থাপিত নথিতে স্বাক্ষর করা না করার ঘটনায় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে কমিশনের কর্মকর্তারা সে সময় বিব্রতকর অবস্থায় ছিলেন।       

নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অন্য রকম। এখানে আদালত প্রকাশ্যে কোনো আদেশ দেননি। তবে আদালতের নির্দেশ রয়েছে বলে পিপি সাংবাদিকদের জানান। মামলার কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে আসামি নূর হোসেনের আইনজীবী খোকন সাহাও আদালতে উপস্থিত সাংবাদিকদের বের হয়ে যেতে বলেন। পরে এক প্রশ্নের জবাবে মিডিয়াকে  পিপি ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। বিচারকের নির্দেশে আমি আদালতকক্ষে শৃঙ্খলা রাখার জন্য আইনজীবী বাদে বাকিদের কিছুক্ষণের জন্য বাইরে থাকতে বলেছিলাম। ’ আইনমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘পিপি এটা বলতে পারেন না। পিপির এ ক্ষমতা নেই। ’ (কালের কণ্ঠ/প্রথম আলো, ১ মার্চ ২০১৬, পৃ. ১) কিন্তু মন্ত্রণালয় পিপির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হয়নি। এখানেও কি কোনো লুকোচুরির আশ্রয় নিতে চান কেউ? প্রকাশ্য বিচারে কেন সাংবাদিকদের আদালতে থাকতে না দেওয়ার চেষ্টা!

সাংবাদিক সমিতি থেকে বহিষ্কার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি থেকে সমিতির এক সহসভাপতিকে বহিষ্কার করা হয়েছে নীতিগত কারণে। এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম। দৈনিক সমকালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সেক্রেটারির দায়িত্ব গ্রহণ করায় সমিতির সাধারণ সভায় সদস্যরা এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সমিতি মনে করছে, সাংবাদিক সমিতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে কোনো ছাত্রসংগঠনের পদ গ্রহণ সমিতির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করবে এবং স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করবে।

কোনো সাংবাদিকের রাজনৈতিক দলের সমর্থক হওয়ার মধ্যে আইনগত কোনো বাধা নেই। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে সংবাদপত্রে বা টিভিতে কোনো দলের পক্ষে মতামত প্রকাশ করা তাঁর অধিকারের মধ্যে পরে। এমনকি পেশাজীবী হিসেবে দলের সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিলেও তেমন আপত্তি করা যায় না। তবে  সাংবাদিক সমিতি বা ইউনিয়নের দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দল বা এর সঙ্গে যুক্ত সংগঠনের নির্বাহী পদে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সম্ভব হয় না দলের প্রতি আনুগত্য থাকার কারণে।

ভারতীয় জনতা পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব কিছুদিন আগে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা এসেছে। ’ রাম মাধবের সফরসঙ্গী দলের মুখপাত্র বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাবেক সম্পাদক এম জে আকবর সাংবাদিকতা বিষয়ে বলতে গিয়ে অবশ্য বলেছেন, ‘সাংবাদিকদের রাজনৈতিক দল করা উচিত নয়। আর রাজনীতি করলে সাংবাদিকতা করা উচিত নয়। ’

সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতাদের রাজনৈতিক দলের প্রধানের উপদেষ্টা হওয়া বা কোনো মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ও বরখাস্তের ক্ষমতাসম্পন্ন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হওয়া কতটা যৌক্তিক? সাংবাদিকের পেশাগত সংকট দেখা দিলে তখন ইউনিয়ন নেতার ভূমিকা প্রশ্নের মধ্যে পড়ে। কারণ তখন কার স্বার্থ দেখেন তিনি? ইউনিয়ন নেতাদের এ ধরনের ভূমিকার জন্য সাংবাদিক সমাজ ক্রমেই মানুষের কাছে শ্রদ্ধা ও আস্থা হারাচ্ছে।  

প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকাটাও জরুরি

একাধিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রধান বিচারপতির মিডিয়ার ‘বেশি লিবার্টি’ ও ‘স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা’ প্রসঙ্গে বক্তব্য নানাভাবে এসেছে। তাই বোঝা যাচ্ছে না আসলে তিনি কী বলেছেন। তিনি বিচার বিভাগে ডিজিটালাইজেশন-প্রক্রিয়ার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গে কথা বলেন।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, কোনো কোনো সংবাদপত্র (৩ মার্চ ২০১৬) অনুষ্ঠানের মূল বিষয়ক বক্তব্য বাদ দিয়ে মিডিয়ার লিবার্টির বিষয়টিকে শিরোনামে এনেছে,  যেমন ‘মিডিয়ার বেশি লিবার্টি মঙ্গল বয়ে আনে না’। মূল বিষয়টি শিরোনামে এসেছে এভাবে, ‘বিচার বিভাগ ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া শুরু’। লিবার্টি প্রসঙ্গটি শিরোনামে এনে মূল বিষয়টি সম্পর্কে পাঠকদের জানানো হচ্ছে চতুর্থ প্যারায়। প্রথম প্যারা বা ইন্ট্রোতে এবং দ্বিতীয় প্যারায় বিস্তারিতভাবে মিডিয়ার স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি স্থান পেয়েছে। অনেক সময় আমরা দেখি, সামাজিক কোনো বিষয়ের সেমিনারের প্রধান অতিথিকে সেমিনার শেষে সাংবাদিকরা চলমান কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক বিষয়ে প্রশ্ন করে সেটিকেই রিপোর্টের প্রধান বিষয় করে ফেলেন। এতে সেমিনারের উদ্যোক্তারা মিডিয়ায় স্পেস পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। বাংলাদেশে প্রভাবশালী সাংবাদিকরা মিডিয়া এথিক্স নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান বলে মনে হয় না। সাংবাদিকরা যে অনুষ্ঠান কাভার করতে যান সেই বিষয়টিই শিরোনামে আনা উচিত কি না তা মিডিয়া এথিক্সের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

প্রধান বিচারপতির বক্তব্য হিসেবে কোথাও লেখা হয়েছে, ‘আমাদের দেশের মিডিয়া আজকে যথেষ্ট স্বাধীনতা লাভ করেছে। মিডিয়ায় রাতে টক শোসহ অন্য আলোচনা হয়। কিছু কিছু প্রিন্ট মিডিয়ায় বিচার বিভাগ নিয়ে আলোচনা হয়। সবাইকে বলতে চাই যে আমাদের মিডিয়া বা আমাদের লিবার্টি আছে। বেশি লিবার্টি বাংলাদেশ কিংবা বিশ্বের কোনো দেশের জনগণের জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। এটার সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত। ’

আবার অন্যখানে আছে, ‘আমাদের দেশে মিডিয়া যথেষ্ট স্বাধীনতা লাভ করেছে। আজ আমরা অনেক মিডিয়ায় বিভিন্ন কিছু দেখি। রাত হলেই টক শোতে আলোচনা হয়। প্রিন্ট মিডিয়ায় বিচার বিভাগ নিয়ে আলোচনা হয়। আমি আজ সবাইকে বলতে চাই, আমাদের মিডিয়ায় কথা বলার স্বাধীনতা আমাদের আছে। স্বাধীনতা আছে কিন্তু আর্টিকেলের ৩৯-এ আনলিমিটেড লিবার্টি দেয়নি। আমাদের দেশ বা বিভিন্ন দেশে বেশি স্বাধীনতা কিন্তু মঙ্গল নিয়ে আসে না। স্বাধীনতার একটি সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত। কতটা স্বাধীনতা থাকবে, এই স্বাধীনতার সঙ্গে কিন্তু আইনের একটা সংযোগ আছে। জাস্টিসের সম্পর্ক আছে। ’

লিবার্টির কমবেশি বা সীমাবদ্ধতা মানে কী হতে পারে? লিবার্টি নিজেই দায়িত্বপূর্ণ আচরণ নির্দেশ করে। একজনের লিবার্টির সীমা হলো অন্যের লিবার্টি খর্ব না হওয়া পর্যন্ত। সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি স্পষ্ট করা আছে। সংবিধান যে সীমারেখা টেনেছে সেটাই মেনে চলতে হবে। সংবিধানে প্রদত্ত কিছু অধিকার বা লিবার্টি ‘সাবজেক্ট টু স্ট্রিনজেন্ট লিমিটেশন’। তাই বেশি লিবার্টি বা কম লিবার্টি সংবিধানের ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত করা না হলে তা ভুল বার্তা বহন করে। সংবিধানের ৩৯-এ ধারাটির প্রসঙ্গ উল্লেখ না থাকায় প্রথম রিপোর্টটি পাঠকদের কাছে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য আসলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বোঝা যাবে না ‘বেশি’ শব্দটি কোন পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেছেন। দ্বিতীয় রিপোর্টটি প্রধান বিচারপতির বক্তব্য স্পষ্ট করেছে। কিন্তু পাঠকের প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে প্রধান বিচারপতি আসলে কী বলেছিলেন? সংবিধানের ৩৯-এ ধারাটির প্রসঙ্গ কোথাও আছে কোথাও নেই কেন? কোন পত্রিকার রিপোর্টটি সঠিক বলে ধরে নেবেন পাঠক?

আশার বাণী

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের দুটি মন্তব্য সময়ের প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে যেকোনো আক্রমণ গণতন্ত্রের জন্যও মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে এসব অপশক্তিকে মোকাবিলা করতে হবে। ’ তাঁর আরেকটি বক্তব্য হলো, ‘সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার সৎসাহসই পারে একজন সাংবাদিককে পেশাগত উত্কর্ষের শীর্ষে নিয়ে যেতে। ’

রাষ্ট্রপতি যথার্থই বলেছেন। মিডিয়াজগতের নানা অঘটনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির এ বক্তব্য আমাদের আশান্বিত করে; যদিও তিনি অপশক্তিকে চিহ্নিত করেননি। সাংবাদিকতা সত্য প্রকাশের দায়িত্ব হলে সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার সৎসাহস থাকতেই হবে। কিন্তু নানাভাবে মিডিয়ার ওপর আক্রমণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, নিষেধের বেড়াজালে আটকে দেওয়া, মামলা দিয়ে হয়রানি করা, দলীয় ভিত্তিতে মিডিয়ার লাইসেন্স অনুমোদন এবং রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রত্যাশী মালিক ও সাংবাদিক, দূতাবাসে সরকারি চাকরির জন্য তদবিরকারী কিংবা সুস্থ হয়েও অসুস্থ-অসহায় হিসেবে সরকারি অর্থ সাহায্যপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। গণতন্ত্রের জন্য যা অশনিসংকেত।  

রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের আলোকে সরকার, মিডিয়া মালিক ও সাংবাদিকরা তাঁদের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করলেই কেবল মিডিয়ার স্বাধীনতা অর্থবহ হবে। সাংবাদিকরা পেশাগত উত্কর্ষের শীর্ষে যেতে পারবেন। গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হবে।  

লেখক : সাংবাদিক, মিডিয়া বিশ্লেষক


মন্তব্য