kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


গণতন্ত্রের দাবিদার বিএনপিতেই গণতন্ত্র নেই

হায়দার আকবর খান রনো

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



গণতন্ত্রের দাবিদার বিএনপিতেই গণতন্ত্র নেই

বিএনপির সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সম্মেলনে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যে নীতিনির্ধারণী বক্তৃতা দিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশের সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর প্রস্তাব করেছেন। তাঁর বক্তৃতা থেকে মনে হয়, তিনি যেন উপলব্ধি করেছেন যে বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনার প্রস্তাব তিনি করেছেন। প্রস্তাবটি কতখানি আন্তরিক ও উপলব্ধিগত, তা এখনো দেখার বিষয়।

এ কথা সত্যি যে আমাদের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। এমনকি ১৯৭২ সালের সংবিধানেও তাই ছিল। মধ্যে কিছুকাল আমরা রাষ্ট্রপতি শাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি। সেখানেও রাষ্ট্রপতি একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। এখন রাষ্ট্রপতির বদলে প্রধানমন্ত্রীকেই সেই একক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই নিবন্ধে আমি সংবিধানের চুলচেরা বিশ্লেষণে যাচ্ছি না। তবে এ কথা সব সংবিধান বিশেষজ্ঞ স্বীকার করবেন যে বাংলাদেশের সংবিধানে কোনো চেক অ্যান্ড ব্যালান্স নেই। খালেদা জিয়া যদি কখনো ক্ষমতায় যান, তখন তিনি সংবিধানে পরিবর্তন আনবেন (যদি দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভ করেন অথবা বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনীর জন্য প্রয়োজনীয় ভোট সংসদে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়)। কিন্তু সেসব তো অনেক পরের কথা।

আপাতত যেটা তাঁর হাতের মধ্যে রয়েছে সেখানে তো তিনি একক কর্তৃত্ব ও একচ্ছত্র ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বা ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে পারতেন। আমি বলছি, তাঁর দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের কথা। তিনি দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে একক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিরুদ্ধে। খুব ভালো কথা। কিন্তু দলের অভ্যন্তরেও কি তিনি সেই নীতি প্রয়োগ করবেন?

ইংরেজিতে একটা কথা আছে—Charity begins at home। কয়েক দিন আগে যে দলের কাউন্সিল অধিবেশন হয়ে গেল, সেখানে তো চেয়ারপারসনের হাতেই সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখা হয়েছে। সেখানে তো কোনো ভারসাম্য রাখা হয়নি। চেয়ারপারসন ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে ক্ষমতার ও দায়িত্বের ভাগাভাগি করা যেত। না, সে পথে তিনি যাননি। দলের মধ্যে গণতন্ত্র নেই অথচ দেশের গণতন্ত্রের জন্য তিনি সোচ্চার। দলের মধ্যে সামান্যতম গণতন্ত্র নেই, সেখানে একচ্ছত্র নেতৃত্ব তাঁকে তৃপ্ত করছে অথচ তিনি ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস করার প্রস্তাব করছেন। হাসিও পায়। দুঃখও হয়। আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর এমন স্ববিরোধিতা ও প্রতারণামূলক আচরণ রাজনীতিকে কলুষিতই শুধু করছে না, নিকৃষ্ট মাত্রায় পরিবারতন্ত্রের জন্ম দিচ্ছে।

বিএনপির কাউন্সিল একটা লোক দেখানো ব্যাপার মাত্র। তিন হাজার ডেলিগেট এসেছেন। গ্রামগঞ্জ থেকে এসে ঢাকায় মাত্র এক দিনের জন্য জমায়েত হয়েছেন। যাঁদের কাজ ছিল নেতা-নেত্রী (প্রধানত মা ও ছেলের) গুণগান করা ও স্লোগান দেওয়া। কোনো রাজনৈতিক আলোচনা নেই। কোনো রাজনৈতিক রিপোর্টও নেই। ২০০৮ সালের পর জাতীয় সম্মেলন হচ্ছে। এ সময়কালে পার্টির কাজের কোনো পর্যালোচনা নেই। কোনো পার্টির কংগ্রেস বা সম্মেলন বা কাউন্সিলে সাধারণত দুটি কর্তব্য সম্পন্ন করতে হয়। এক. রাজনৈতিক পর্যালোচনা ও রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণ। দুই. কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচন। বিএনপির মতো দলে এসবের কোনো কিছু দরকার হয় না।

প্রথমে নেতৃত্বের কথাটি দেখা যাক। দলের প্রধান দুটি পদে আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন দুজন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান—মা ও ছেলে। এবং অন্যান্য পদেও যে কাউন্সিলে নির্বাচন হবে না, সে কথা আগেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগেও একক নেতৃত্ব রয়েছে। সেখানেও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র খুবই সংকীর্ণ। অথবা প্রায় নেই বললেও চলে। তবু বিএনপির চেয়ে কিছুটা ভালো এই অর্থে যে সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রায়শই প্রধান নেত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছার বাইরে কার্যত কেউ সাধারণ সম্পাদক হতে পারেন না। তবু তো কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদকের মতো পদে নির্বাচনের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বিএনপির ক্ষেত্রে কি দেখছি। এত বছরেও তাদের কোনো সাধারণ সম্পাদকই নেই। বিএনপি ভাগ্যবান যে তারা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো একজন বিচক্ষণ, প্রাজ্ঞ, রাজনৈতিক ঐতিহ্যসম্পন্ন উপযুক্ত সাধারণ সম্পাদক পেয়েছে, যিনি দলের জন্য ত্যাগ করেছেন, বারবার জেল খেটেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। কিন্তু বছরের পর বছর তিনি ভারপ্রাপ্তই রয়ে গেলেন। এখনো তিনি ভারমুক্ত হলেন না। শোনা যায়, তাঁর ব্যাপারে নাকি মা ও ছেলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। থাকতে পারে। কিন্তু কাউন্সিলরদের মতামত কি নেওয়া যেত না। সেখানে কি ভোটের মাধ্যমে সাধারণ সম্পাদক কে হবেন, তা নির্বাচন করা যেত না? আসলে চেয়ারপারসনের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই রয়েছে একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আওয়ামী লীগের জোটের সঙ্গীরা ছাড়া আর কেউ করেননি। দক্ষিণ, মধ্যম, বাম—ছোট-বড় সব দলই বয়কট করেছিল। আমি নিজে কমিউনিস্ট পার্টি করি। সিপিবি মতাদর্শগতভাবে বিএনপির একেবারে বিপরীতে অবস্থান করে। বরং অতীতে দেখা গেছে, এক সময় সিপিবি আওয়ামী লীগের সঙ্গেই মিত্রতা করেছিল। সেই সিপিবিও নির্বাচন বয়কট করেছিল। খালেদা জিয়াও করেছেন। আমরা চাই, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রকৃত গণতান্ত্রিক নির্বাচন। যেখানে অর্ধেকের বেশি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়, সেই নির্বাচনকে আমরা সত্যিকারের নির্বাচন বলে মানি না। কিন্তু খালেদা জিয়া দলের মধ্যে কি সে ধরনের সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছেন? সব পদই অনির্বাচিত।

গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে দৃষ্টিকটু হচ্ছে, সাধারণ সম্পাদকের পদকে অবমূল্যায়ন ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নামে একটি বিশেষ ক্ষমতাবান পদ সৃষ্টির ঘটনাটি। সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টের বিশেষ পদটি দখল করে রেখেছেন খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। তিনিই সবচেয়ে প্রভাবশালী দ্বিতীয় ব্যক্তি। তাঁর মতো রাজনৈতিকভাবে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি যদি দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করে থাকেন, তাহলে সেই দলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশই হতে হবে। তারেক রহমানের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব, অভিজ্ঞ, পোড় খাওয়া এবং দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই এমন দক্ষ নেতা বিএনপিতে আছে। কিন্তু তাঁদের সবার ওপর দিয়ে বসানো হলো স্বীয় পুত্রকে, যিনি আসলেই অযোগ্য। এটা কি নিকৃষ্ট ধরনের পরিবারতন্ত্র নয়?

দলের মধ্যে যিনি স্বৈরাচারী, গণতন্ত্রবিরোধী ও পরিবারতন্ত্রের সমর্থক, তিনি যখন দেশে গণতন্ত্র উপহার দেবেন বলে ঘোষণা দেন, তখন তা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারে না।

জাতীয় কাউন্সিলে অতীতের রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। সাংগঠনিক শক্তির দিক দিয়ে ছোট; কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির মতো আদর্শভিত্তিক দলের কংগ্রেসের অন্তত দুই-তিন মাস আগে কেন্দ্র থেকে প্রণীত রিপোর্ট ও রাজনৈতিক লাইনসংক্রান্ত প্রস্তাব দলের সর্বস্তরে পাঠানো হয় মুদ্রিত আকারে। তা নিয়ে নিম্নতর সব পর্যায়ে আলোচনা, বিতর্ক ও মতামত সংঘটিত হয়। এমনকি ভিন্ন মতও উঠে আসে। রাজনৈতিক লাইন ও নেতৃত্ব নিয়ে নির্বাচনও হয়। কিন্তু বিএনপি-আওয়ামী লীগের মতো বড় বুর্জোয়া দলে এসব নেই। কর্মী ও কাউন্সিলরদের নেতানেত্রীর পক্ষে হাত তোলা ও স্লোগান দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো কাজ নেই।

এত বছর পর বিএনপির সম্মেলন হলো। মাত্র এক দিনের সম্মেলন। এটাকে সম্মেলন না বলে একটা জনসভা বলাই ভালো। যেখানে গ্রামগঞ্জ থেকে আসা কাউন্সিলররা নেত্রীর বক্তৃতা শুনবেন ও চলে যাবেন। কোনো রাজনৈতিক রিপোর্ট নেই। এমনকি নেত্রীর বক্তৃতার কোনো পর্যালোচনা নেই। এই সময়কাল তারা জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছে। এরা ব্যর্থ হয়েছে। কেন ব্যর্থ হলো তার কোনো বিশ্লেষণ নেই। কোনো আত্মসমালোচনা নেই।

বিএনপি এখনো বড় পার্টি। তার প্রচুর সমর্থক আছে। শাসক আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী বাম ও উদারপন্থী দল না থাকায়, এসটাবলিশমেন্ট-বিরোধী ভোটাররা বিএনপিকে বেছে নিতে বাধ্য হন। এটাই বিএনপির শক্তি। দলের মধ্যে মতাদর্শ নেই। রাজনৈতিক চিন্তায় কোনো ঐক্য নেই। একটি পাঁচ মিশালি জগাখিচুড়ির দল। বুর্জোয়া দল এমনই হয়ে যায়। তবু জনগণের মন জয় করার জন্য বিভিন্ন দেশে এমন বুর্জোয়া দলও জনগণের দাবি নিয়ে আন্দোলন করে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, গরিব কৃষকের ও মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক দাবি নিয়েও আন্দোলন করে। বিএনপির কর্মসূচিতে জনগণের আর্থসামাজিক কোনো কর্মসূচি নেই। কিন্তু তারা দূরবর্তী ভিশন তুলে ধরেছে। এর আগে আওয়ামী লীগও একইভাবে ডিজিটাল ভিশন তুলে ধরেছিল। কিন্তু কিভাবে তা কার্যকর হবে তার কোনো ব্যাখ্যা দুই দলের কেউই দেয়নি।

আসলে দুই দলের কেউই জনগণের দল নয়। জনগণের পক্ষের কর্মসূচি নেই। খালেদা জিয়া নিজের বাড়ি নিয়ে আন্দোলন করেছেন, কিন্তু গৃহহারা, বাস্তুহারা ও দারিদ্র্য-পীড়িত মানুষের দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেননি। তাই তাঁর আন্দোলনে জনগণও জানবাজি রেখে রাস্তায় নামেনি। হয়তো ভোট দেবে, যা প্রধানত নেগেটিভ ভোট, কিন্তু সংগ্রামে-আন্দোলনে তারা মানুষকে সমেবত করতে পারছে না।

দলটি সম্পর্কে আরো একটি কথা বলা দরকার। একদা বিএনপি একটি মধ্যপন্থী বুর্জোয়া দল হিসেবে ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল। সেনানিবাস থেকে জন্ম হলেও পরবর্তী সময়ে রাস্তার ধুলোমাটি মেখেই আশির দশকে দলটি একটি গণতান্ত্রিক উদারনৈতিক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছিল। সেদিনও খালেদা জিয়া নেতৃত্বে ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে এবং ক্রমাগত দক্ষিণে সরে গিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল দলে পরিণত হয়েছে। নারীবিদ্বেষী চরম দক্ষিণপন্থী হেফাজতকে দিয়ে ক্ষমতা দখলের বা আন্দোলনের স্বপ্ন দলটির অধঃপতনের পরিচয় বহন করে। যত দিন দলটি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকবে এবং জামায়াতি রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত থাকবে, তত দিন জনগণের সমর্থনও পাবে না, এমনকি বিদেশেও জনমত তাদের বিরুদ্ধে যাবে।

দলটি এখনো বড়। কিন্তু যদি দলের মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে, জামায়াতের ভূত কাঁধ থেকে নামাতে না পারে এবং নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, জনগণের আর্থসামাজিক দাবি নিয়ে সংগ্রামে নামতে না পারে, তাহলে দলটি আজকের বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। পরিবারতন্ত্র ও পরিবারপ্রীতি ত্যাগ করতে হবে। গণতান্ত্রিক চর্চাকে উৎসাহিত করতে হবে। গণমানুষকে নিয়ে, মানুষের দাবি নিয়ে সুশৃঙ্খল আন্দোলন করতে হবে। সেই জায়গায় কি দলটি যেতে পারবে?

লেখক : রাজনীতিবিদ


মন্তব্য