kalerkantho


‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি অপরাধ’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি অপরাধ’

সাবেক কূটনীতিক ও তথ্য কমিশনার মোহাম্মদ জমির বলেছেন, ‘স্বাধীনতা অর্জন একটি দেশের জন্য সম্মান। সেই সম্মান অর্জনের জন্য যাঁরা শহীদ হয়েছেন, যাঁরা সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাঁদের সম্পর্কে জাতির কাছে সঠিক তথ্য থাকতে হবে। সঠিক তথ্য না থাকলে বা তথ্য বিকৃতি করলে সেটা যেমন অপরাধ, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করাও অপরাধ। এই অপরাধের জন্য আইন করা উচিত। সম্ভবত সরকার সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে। এটা করতে পারলে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা যাবে। ’ তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাস জানার জন্য একটু আগে গিয়ে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করতে চাই। ব্রিটিশরা এই অঞ্চলকে প্রায় ২০০ বছর শাসন-শোষণ করেছে। তাদের হাত থেকে স্বাধীনতার জন্য হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছে, জেল খেটেছে। ১৯৪০ সালে ‘লাহোর প্রস্তাব’-এ ঠিক করা হয়েছিল ভারতবর্ষের যে অঞ্চলগুলোয় মুসলমান বেশি, সে রকম দুটি অঞ্চলকে নিয়ে দুটি দেশ ও বাকি অঞ্চল নিয়ে আরেকটি দেশ তৈরি করা হবে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যে এলাকা দুটিতে মুসলমানরা বেশি সেই এলাকা দুটি নিয়ে দুটি ভিন্ন দেশ না হয়ে পাকিস্তান নামে একটি দেশ এবং ১৫ আগস্ট বাকি অঞ্চল ভারত নামে অন্য একটি দেশে ভাগ করে দেওয়া হলো। পাকিস্তান নামে পৃথিবীতে তখন অত্যন্ত বিচিত্র একটি দেশের জন্ম হলো, যে দেশের দুটি অংশ দুই জায়গায়। এখন যেটি পাকিস্তান, সেটির নাম পশ্চিম পাকিস্তান এবং এখন যেটি বাংলাদেশ তার নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। মাঝখানে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্ব এবং সেখানে রয়েছে ভিন্ন একটি দেশ, ভারত। ” শনিবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভির সমসাময়িক বিষয় নিয়ে পর‌্যালোচনাভিত্তিক টক শো নিটল টাটা আওয়ার ডেমোক্রেসিতে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

সাংবাদিক লুত্ফর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো আলোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও সরকারদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সঞ্চালক জানতে চান, ‘এখন তো স্বাধীনতার মাস। এ মাসেই স্বাধীনতার গোড়াপত্তন ঘটে। এ মাসেই জাতির জনকের ঐতিহাসিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে আমরা বাঙালিরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। এ মাসেই আছে একটি কালরাত। সেই রাত নিয়ে কিছু বলুন। ’

জবাবে সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তো অনেকেই অনেক ধরনের কথা বলেন। বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস জানলেই আসলে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানা যাবে। এ জন্য বেশি দূর যাওয়া লাগবে না। আজ এই সরকার আসার পর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের জন্য যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেবে বা দিচ্ছে তাতে বলার অপেক্ষা রাখে না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর যোগ্য কন্যা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করতে কার্পণ্য করেন না। এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের জন্য যতটা করবে, তাদের প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশাও তেমনি বেড়ে যাবে। ’ তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালিদের ভালোবাসা এবং মমতায় শহীদ দিবস উদ্যাপিত হলো অন্য এক ধরনের উন্মাদনায়। শহীদ মিনারে সেদিন মানুষের ঢল নেমেছে, তাদের বুকের ভেতর এর মধ্যেই জন্ম নিতে শুরু করেছে স্বাধীনতার স্বপ্ন। এরই অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু ঢাকা ও সারা দেশ মিলিয়ে পাঁচ দিনের জন্য হরতাল ও অনির্দিষ্টকালের জন্য অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। সেই অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সরকারকে কোনোভাবে সাহায্য না করার কথা বলেছিলেন এবং তাঁর মুখের একটি কথায় সারা পূর্ব পাকিস্তান অচল হয়ে গেল। ’

আলোচনার এ পর‌্যায়ে আবদুল মান্নান বলেন, ‘গণহত্যার জন্য ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ তারিখটা বেছে নিয়েছিল। কারণ সে বিশ্বাস করত এটা তার জন্য একটি শুভ দিন। ২৫ মার্চের বিভীষিকার কোনো শেষ নেই। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ইকবাল হল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) আর জগন্নাথ হলের ছাত্রদের হত্যা করল। হত্যার আগে তাদের দিয়েই জগন্নাথ হলের সামনে একটি গর্ত করা হয়, যেখানে তাদের মৃতদেহগুলো মাটিচাপা দেওয়া হয়। এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যটি বুয়েটের অধ্যাপক নূর উল্লাহ তাঁর বাসা থেকে যে ভিডিও করতে পেরেছিলেন, সেটি এখন ইন্টারনেটে মুক্তিযুদ্ধের আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে, পৃথিবীর মানুষ চাইলেই তা দেখতে পারে। ২৫ মার্চ ঢাকা শহর ছিল নরকের মতো, যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই আগুন আর আগুন, গোলাগুলির শব্দ আর মানুষের আর্তচিত্কার। ’


মন্তব্য