kalerkantho


অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং দূতাবাসগুলোর ভূমিকা

এ কে এম আতিকুর রহমান

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং দূতাবাসগুলোর ভূমিকা

একজন কূটনীতিক যেসব দায়িত্ব পালন করে থাকেন সেগুলোর মধ্যে স্বদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়টি সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাস্তবতাই নির্ধারণ করে দিত কোন মুহূর্তে তাদের কী ভূমিকা থাকবে এবং কোথায় পৌঁছতে হবে।

কূটনীতির প্রাথমিক যুগের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই মানুষ দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে চলে যেত। এভাবেই জাতিতে-জাতিতে, মানুষে-মানুষে সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটে।

বর্তমান যুগে কূটনীতিতে বাস্তবিক অর্থে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাজকর্মকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। উন্নত বিশ্ব ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে তাদের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে থাকে। পৃথিবীর বড় বড় দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, রাশিয়া, এর মধ্যে কেউ কেউ তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে দূতাবাসের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত কাজগুলো দেখভাল করে; আবার কোনো কোনো দেশ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাঠামোতে দূতাবাসের মাধ্যমে বৈদেশিক সম্পর্কসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। তবে কর্মপরিচালনা পদ্ধতি যা-ই হোক না কেন, সব দেশেরই উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। অর্থনৈতিক বিষয়গুলো রাজনীতির সঙ্গে মিশে একাত্ম হয়ে গেছে কূটনীতিতে। অর্থাৎ অর্থনীতি বর্তমানে আলোচিত ‘সমন্বিত কূটনীতি’-এর একটি অন্যতম উপাদান হয়ে এর মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

একজন কূটনীতিককে তাই যেমন বিশ্বরাজনীতি বুঝতে হবে, তেমনি তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ডে অর্থনৈতিক বিষয়টিকে সমন্বিত করতে হবে।

সদর দপ্তরে অর্থাৎ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কাজকর্মে বিজড়িত থাকে। কিন্তু দূতাবাসের ক্ষেত্রে প্রত্যেক কূটনীতিককেই তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্কের দিকটির সঙ্গে একই গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও ধারণ করতে হবে। রাজনৈতিক সম্পর্ক যেমন অর্থনৈতিক সম্পর্ককে দৃঢ় করতে পারে, তেমনি অর্থনৈতিক সম্পর্ক একটি শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বলতে গেলে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এখন আর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় দুটিকে পৃথক করে দেখার অবকাশ নেই। দুটির মিলিত ধারায় এখন কূটনীতিকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। আর সেই সম্মিলিত পথই হচ্ছে বর্তমান কূটনীতিকের কর্মক্ষেত্র।

একজন কূটনীতিককে তাঁর দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির নীতিমালা বাস্তবায়নে যেমন চ্যালেঞ্জ গ্রহণে প্রস্তুত থাকতে হবে, তেমনি তাঁর প্রচেষ্টার ফল মেনে নিতে সাহস থাকতে হবে। বস্তুতপক্ষে কূটনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রের চেয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের কর্মকাণ্ড একজন কূটনীতিককে উদ্ভাবনী কিছু করতে অপার সুযোগ এনে দিতে পারে। আর এসব কাজ করতে হলে প্রয়োজন হয় আগ্রহের এবং কর্মকৌশল সম্পর্কে যথাযথ ধারণার। অনেক সময়ই প্রাথমিক পর‌্যায়ে কাজের ফলাফল আশাপ্রদ না মনে হলেও পরিশেষে তা দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থই সংরক্ষণ করে থাকে। নিঃসন্দেহে এগুলো একজন কূটনীতিকের জন্য খুবই চ্যালেঞ্জের কাজ এবং তাঁকে অবশ্যই তা মনেপ্রাণে ধারণ করতে হবে। একজন কূটনীতিকের সফলতা নির্ভর করে তিনি তাঁর কাজটি কত সুচারুভাবে করে সবচেয়ে বেশি ফল দিতে সক্ষম হয়েছেন তার ওপর।

আন্তর্জাতিক পর‌্যায়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশল অনেকটাই নির্ভর করে নির্ধারিত বাজারে ওই দেশটির রপ্তানি সক্ষমতা ও সম্ভাবনা, প্রাধিকারভুক্ত বাজারের বিবরণ এবং ওই সব বাজারে পণ্য সম্পর্কে তথ্যাদি উপস্থাপনের পদ্ধতি, প্রচার কৌশলের উন্নয়ন এবং লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে সেসব শনাক্তকরণ। দূতাবাসের কাজ হচ্ছে ওই দেশের বাজার সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য নিজ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করা। তথ্যাদি প্রেরণের আগে অবশ্যই তার সঠিকতা যাচাই করে নিতে হবে। এ ছাড়া এসব প্রতিবেদনে দূতাবাসের মতামত ও সরকারের জন্য করণীয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকা বাঞ্ছনীয়। আমার বিশ্বাস, এ ধরনের প্রতিবেদন সরকারের নীতি নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের কর্মীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অভিবাসী কর্মীরা যে রেমিট্যান্স প্রেরণ করে থাকেন, তা আমাদের সবচেয়ে বড় আয়ের উেসর একটি। সংগত কারণেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এ উৎসকে আমাদের অত্যন্ত যত্নসহকারে দেখভাল করা দরকার। আর যেহেতু কর্মী অভিবাসনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিতেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয় আমাদের দূতাবাসগুলোকে, তাই তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ও প্রস্তুতি থাকাও আবশ্যক। যেসব দূতাবাস (বিশেষ করে আমাদের কর্মীদের ঘনত্ব যেখানে বেশি) এদিকটিতে দুর্বল রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের আরো করণীয় আছে বলে মনে হয়। অভিবাসী কর্মীদের সেবা নিশ্চিত করতে হলে দূতাবাসের সেই সেবা-সামর্থ্য অবশ্যই থাকতে হবে।

রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব ছাড়াও যেসব দেশে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নাগরিক কাজকর্মে নিয়োজিত, সেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস স্থাপনে বর্তমান সরকার খুবই গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের দূতাবাসগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি দূতাবাসেই শ্রম শাখা রয়েছে, যেগুলো সাধারণত বাংলাদেশি কর্মীদের দেখভাল করে সেগুলোকেও শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে যেসব দূতাবাসে শ্রম শাখা নেই সেসব দূতাবাসে কূটনৈতিক শাখাই এ কাজ করে থাকে।

আমাদের রপ্তানিযোগ্য পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি, বৃদ্ধি ও অভিবাসী নাগরিকদের দেখাশোনা করার কাজের জন্য দূতাবাসে একটি ‘টাস্কফোর্স’ গঠন করা যেতে পারে। অনেকে বলতে পারেন যে যেসব দূতাবাসে বাণিজ্য শাখা রয়েছে তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকটি আর যেখানে শ্রম শাখা রয়েছে তারা অভিবাসী কর্মীদের বিষয়াদি দেখাশোনা করবে। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দূতাবাসের সবাই মিলিতভাবেই ওই কাজগুলো করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এমনও দেখা গেছে যে সবাই মিলে করলেও কাজের এত চাপ থাকে যে সীমিত লোকবল দিয়ে যথাসময়ে সব কাজ সমাধা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের এই সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এনে দূতাবাস একটি টিম হিসেবে শাখা-নির্বিশেষে দূতাবাসপ্রধানের নেতৃত্বে এসব কাজ করে যেতে পারে। এ ছাড়া যেসব দেশে বাংলাদেশের নাগরিকরা উচ্চ পদে কর্মরত ও বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক, তাঁদেরও দূতাবাস বিভিন্নভাবে কাজে লাগাতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাঁরাও তাঁদের মাতৃভূমির অর্থনৈতিক উন্নয়নে মূল্যবান অবদান রাখতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে দূতাবাসপ্রধান পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করেই পদক্ষেপ নেবেন, যাতে শুভ ফলের পরিবর্তে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো সমস্যার সৃষ্টি না হয়।    

আমাদের দূতাবাসে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে, ওই দেশের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক সম্পর্কটা শক্তিশালী করা। আর দ্বিতীয়টা, অর্থাৎ যেটা আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের হচ্ছে, আমাদের পণ্য ও সেবা রপ্তানির উদ্দেশ্যে বাজার খোঁজা; সহযোগিতা বৃদ্ধি ও বিদ্যমান বাজার সম্প্রসারিত করা। আমাদের কূটনীতিকরা হচ্ছেন এসব বিষয়ে কর্মরত দেশের সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগের সরাসরি মাধ্যম। তাই তাঁদের মনে রাখা প্রয়োজন যে তাঁদের কর্মপ্রচেষ্টার সুফল পেতে হলে সতর্ক ও সুস্পষ্ট প্রস্তুতি থাকা আবশ্যক, যাতে দুই দেশেরই স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। এসব তখনই সহজ হবে যখন আমাদের কূটনীতিকদের ওসব বিষয়ের ওপর যথেষ্ট তথ্য জানা থাকবে। এখানে বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের ও কর্মস্থলের দেশের অর্থনৈতিক গতিধারা সম্পর্কে বাংলাদেশের কূটনীতিকদের খুব ভালো করেই ওয়াকিবহাল থাকার প্রয়োজন পড়ে।

বেশ কয়েকটি দেশেই আমাদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিবাসী রয়েছে। এ ছাড়া অনেক দেশে আমাদের কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনা নিরূপণের জন্য আমাদের দূতাবাসে কর্মরত কূটনীতিকরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তবে আরো চ্যালেঞ্জের সঙ্গে এ কাজ করে যেতে হবে। বাংলাদেশের আশা-আকাঙ্ক্ষা মেটাতে হলে এ বিষয়ে নতুন নতুন কর্মপদ্ধতির কথা চিন্তা করতে হবে। কিভাবে আমাদের দেশ থেকে কর্মী নেওয়ার হার বৃদ্ধি করা যায় তা ওই দেশের অবস্থান বুঝে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণের ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে হূদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নেওয়া ও কর্মরত বাংলাদেশিদের প্রতি তাঁদের আচরণের ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এভাবেই আমাদের দূতাবাসগুলো একদিকে যেমন সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে পারে, অন্যদিকে কর্মরত বাংলাদেশিদের যাবতীয় সমস্যায় পরামর্শ ও সাহায্য করার মাধ্যমে বিদেশে তাঁদের জীবনকে অনেকটাই সহজ ও সহনীয় করে তুলতে পারে।    

আমাদের দূতাবাসের শ্রম শাখায় যাঁরা কাজ করেন তাঁদের অধিকাংশই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। দূতাবাসে তাঁদের মেয়াদকাল সাধারণত চার বছর হয়ে থাকে এবং চাকরিজীবনে তাঁরা একবারই এ সুযোগ পেয়ে থাকেন। আমাদের দেশে কোনো শ্রম ক্যাডার নেই। এমনকি দূতাবাসের শ্রম শাখার জন্য নির্বাচিতদের অভিবাসনসংক্রান্ত তেমন কোনো কার্যকরী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয় না। তাই বলা যেতে পারে যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কোনো কর্ম-অভিজ্ঞতা বা ধারণা ছাড়াই তাঁদের ওই জটিল কর্মটিতে নিয়োগ করা হয়। সংগত কারণেই তাঁদের থেকে আশাপ্রদ ফল পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে অবশ্য তাঁদের কোনো দোষ দেওয়া যায় না। বিষয়টি এভাবেই চলে আসছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে আরো গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয়। তবে যেসব দূতাবাসে শ্রম শাখা নেই, বিশেষ করে যেসব দেশে আমাদের অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা স্বল্প সেসব স্থানে পররাষ্ট্রবিষয়ক ক্যাডারের কূটনীতিকরাই অভিবাসীদের দেখভাল করে থাকেন। তাঁদের অভিজ্ঞতাই তাঁদের দক্ষতার সঙ্গে এ কাজ সম্পন্ন করার শক্তি জোগায়। বাস্তবতার আলোকে এটা না বললেই নয় যে শ্রম শাখার জন্য নির্বাচিতদের কর্মস্থলে যাওয়ার আগেই অভিবাসনসংক্রান্ত একটি বাস্তবমুখী স্বল্পকালীন (কমপক্ষে এক মাসের) প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। আমার বিশ্বাস, এটি করতে পারলে শ্রম শাখায় কর্মরত কর্মকর্তারা আরো দক্ষতার সঙ্গে তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনে সক্ষম হবেন।  

আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যে অভিবাসনসংক্রান্ত কাজগুলো আমাদের নিত্যনতুন কর্মকৌশল উদ্ভাবনের সুযোগ এনে দেয়। সে কারণে আমাদের কূটনীতিকদের কর্মপ্রিয় মন-মানসিকতার অধিকারী হতে হবে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কৌশল বের করে কাজে নামতে হবে, যাতে আশাপ্রদ ফল পাওয়া যায়। এ ছাড়া স্থানীয়, বিশেষ করে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে দৃঢ় ভূমিকা রাখতে পারেন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করতে হবে। এ ধরনের সম্পর্ক একজন কূটনীতিকের কাজকর্মের সফল সম্পাদন অনেকটাই সহজ করে দিতে পারে। এ ছাড়া শুধু শ্রম শাখার কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনে দূতাবাসের সব কর্মকর্তাকেই অভিবাসী কর্মীদের সেবার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে। কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একটি সভার আয়োজন থাকবে, যেখানে দূতাবাসের সব কাজকর্ম ও যার যার দায়িত্বের সম্পাদিত কাজের হিসাবসহ সমস্যাদির সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ধারা অনুসরণ করতাম। প্রতি সোমবার (ছুটির দিন বা জরুরি কাজে ব্যস্ত থাকলে পরের সুবিধাজনক দিন) সকাল ১০টায় আমার দূতাবাসের সব কর্মকর্তাকে নিয়ে সাপ্তাহিক মিটিং থাকত। ওই মিটিংয়ে দূতাবাসের চলতি ও ভবিষ্যৎ কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা করতাম। যে যার মতামত খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করতেন। ফলে আমার সিদ্ধান্ত নিতে ও দিকনির্দেশনা দেওয়া অনেকটাই সহজ হতো। এ ছাড়া বিশেষ অবস্থায় দূতাবাসের কর্মচারীদের নিয়েও সভা করে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও দিকনির্দেশনার ব্যবস্থা করতাম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এতে বেশ সুফল পাওয়া গেছে। হয়তো আমার মতোই আমাদের অনেক রাষ্ট্রদূত এ ধরনের সভা করে থাকেন।

বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে আমাদের দূতাবাসগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি দিয়ে সহযোগিতা করা। এ ছাড়া দূতাবাসের গৃহীত কাজকর্মে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের সমর্থন ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা আবশ্যক। আমাদের কূটনীতিকদের, বিশেষ করে রাষ্ট্রদূতদের শুধু কার্যসম্পাদনে নৈপুণ্যের অধিকারী হলেই চলবে না, দায়িত্বের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। সরকারের উচ্চস্তর থেকে রাষ্ট্রদূতদের কার‌্যাবলি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার বিষয়টিতে আরো জোর দেওয়া যেতে পারে। দূতাবাসে পদায়নের সময় মনোনীত রাষ্ট্রদূত ওই দেশে আমাদের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন কি না তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক দূতাবাসে পাঠাতে হবে। বাংলাদেশের এতটা আর্থিক সংগতি নেই যে এ বিষয়ের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো রাষ্ট্রদূতকে প্রেরণ করে। অর্থনৈতিক কূটনীতিতে  বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আমরা অসীম আর অফুরন্ত সুযোগের মধ্যে বসবাস করছি। এসব সুযোগের সদ্ব্যবহার করার কৌশল রপ্ত করতে হবে। আমাদের কূটনীতিকদের জ্ঞান, মেধা, বিশ্বতথ্য কাঠামোতে প্রবেশের অভিজ্ঞতা আমাদের লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারবে—এ বিশ্বাস আমার আছে। তবে এ জন্য যেদিকগুলোয় আমাদের একটু নজর দেওয়া দরকার বলে মনে হয় তা হচ্ছে—ক. উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তাকে ভালোভাবে জানা; খ. ওই সময়ের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করা; গ. ওই সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ; ঘ. ব্যক্তিগত জ্ঞানের ও শিক্ষার পরিধির উন্নয়ন ও ব্যাপ্তি ঘটানো; ঙ. অর্পিত দায়িত্বে সুফল আনার জন্য নতুন কৌশল উদ্ভাবন করা বা জানা কৌশলের ব্যবহার করা; চ. দূতাবাসপ্রধানের নেতৃত্বে সবাই মিলে একটি টিম হিসেবে কাজ করা এবং ছ. প্রতিদিনের প্রতিটি কাজ উত্তমভাবে সম্পন্ন করায় বদ্ধপরিকর থাকা। আমার বিশ্বাস, এগুলো অনুসরণ করে আমাদের কূটনীতিকরা সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য আরো সুনাম ও সফলতা বয়ে আনতে সক্ষম হবেন।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব


মন্তব্য