kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


‘এ দায় এড়াতে পারবে না পাকিস্তান’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘এ দায় এড়াতে পারবে না পাকিস্তান’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট নামে যে নিধনযজ্ঞ চালানো হয়েছে তার দায় কোনো দিন এড়াতে পারবে না পাকিস্তান। শত বছর পরে হলেও তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এখনো সেই কালরাতের কথা স্মরণ করলে মনে হয় আবারও মুক্তিযুদ্ধের জন্য গর্জে উঠি। কিন্তু এখন আর সেই কালো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আমরা চাই না। তবে সেই রাতের হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানাতে হবে। স্বাধীনতাযুদ্ধে বীর বাঙালির যে অবদান রয়েছে তা সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে। ’ শুক্রবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময় টিভির সমসাময়িক বিষয় নিয়ে পর্যালোচনাভিত্তিক টক শো ‘সম্পাদকীয়’তে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

সাংবাদিক মুজতবা দানেশের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো আলোচনা করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল ইসলাম ও ১৯৭১ সালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে দায়িত্ব পালনকারী ওয়্যারলেস অপারেটর মো. শাজাহান মিয়া।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সঞ্চালক জানতে চান, ‘মহান স্বাধীনতা দিবস এলে আমরা একাত্তরের সেই কালরাতের শহীদদের শ্রদ্ধার সঙ্গে নতুন করে স্মরণ করি। কিন্তু আমাদের এ দেশীয় দোসরদের পক্ষে পাকিস্তান সরকারের সেই প্রেতাত্মারা এখনো খবরদারি করে। তাদের পক্ষে পাকিস্তান থেকে সাফাই গায়। আজ সেই কালরাত। যেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের এ দেশীয় মেধাবী সন্তানদের হত্যা করার মধ্য দিয়ে নিধনযজ্ঞ শুরু করেছিল। কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?’

জবাবে মফিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই ওই রাতের সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। ২৫ মার্চ ১৯৭১। হঠাৎ করে থেমে গেল ঢাকা। নেমে এলো কবরের নিস্তব্ধতা। দানবের অশুভ শক্তির পদভারে কাঁপছে পুরো দেশ। মানুষের রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল সোঁদা মাটি। গন্ধ মিলিয়ে গেল হাসনাহেনার। চারদিকে রক্তের গন্ধ। বাঁচার জন্য নারী-পুরুষের আকুতি। কোনো কিছুতেই পাকিস্তানি দানব, পশুশক্তির সৈন্যদের মন গলে না। ঘরে ঘরে চলে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড। ২৫ মার্চ বাঙালির জীবনে এক দগদগে ঘা, যা ইচ্ছা করলেও কোনো দিন মুছে ফেলা যাবে না। স্বাধীনতার লাল টুকটুকে সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনবে বলে বাংলা-মায়ের দামাল ছেলেরাও সেদিন বেরিয়ে পড়ে। রাত ১টায় শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত উন্মত্ততা। ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের নাম অপারেশন সার্চলাইট। পালিয়ে ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ঘুমন্ত নিরস্ত্র জনতার ওপর হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ। কাপুরুষোচিত ক্র্যাকডাউনের পরপরই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এর কিছুক্ষণ পরই পাকিস্তানি বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সেখান থেকে পরে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধুকে। অন্যদিকে এই দিনেই বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে আগত জনতার উদ্দেশে বলেন, বিশ্বের কোনো শক্তিই পূর্ব বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ন্যায়সংগত দাবিকে নস্যাৎ করতে পারবে না। তিনি বলেন, শক্তির দাপটে যদি কেউ জনতার দাবিকে রক্তচক্ষু দেখায়, আমরা তা বরদাশত করব না। দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে উজ্জীবিত বাঙালি ২৫ মার্চের পর নতুন করে উজ্জীবিত হয়। প্রস্তুত হয় পৃথিবীর ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে। ঝাঁপিয়ে পড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে আনে প্রিয় স্বাধীনতা। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। ’

আলোচনার এ পর্যায়ে শাজাহান মিয়া বলেন, ‘সেই সময় আমরা দেখেছি কিভাবে আমাদের ওপর পাকিস্তানি হানাদাররা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞ থেকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও রেহাই পাননি। আমরা সেই রাতে অনেক বাঙালিকে হারিয়েছি। পুলিশ সদস্যদের অনেকে সেই রাতে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ছিল বহুমাত্রিক। দেশের ভেতরে ও বাইরে শরণার্থী ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করা, চাঁদা তোলা, ওষুধ, খাবার, কাপড় সংগ্রহ করা, ক্যাম্পে ক্যাম্পে রান্না করা, সেবা করা, চিকিৎসা করা, অস্ত্র শিক্ষা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রহরী হিসেবে কাজ করা, এমনকি সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করার কাজেও অংশ নিয়েছিলেন বহু নারী। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা, মুক্তির গানের শিল্পীরা গানের মাধ্যমে, লেখার মাধ্যমে জাগিয়ে তুলেছিলেন দেশের ভেতরের অবরুদ্ধ, পীড়িত, নির্যাতিত নারী-পুরুষকে। আজ মুক্তিযোদ্ধাদের জবানি পড়লে বোঝা যায়, নারীদের সাহায্য ছাড়া গেরিলাযুদ্ধ চালানো দুরূহ হয়ে উঠত। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সেদিন বঙ্গবন্ধুর ডাক না পেতাম, তবে আমাদের পক্ষে পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ করা কঠিন হতো। ’


মন্তব্য