kalerkantho


বিচার ও নির্বাহী বিভাগের অম্ল-মধুর সম্পর্ক

মো. জাকির হোসেন

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিচার ও নির্বাহী বিভাগের অম্ল-মধুর সম্পর্ক

আধুনিক শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ অন্যতম। বিচার ও নির্বাহী বিভাগের টক-ঝাল-মিষ্টির সম্পর্ক বিশ্বব্যাপী আলোচিত-সমালোচিত। ভারতীয় উপমহাদেশেও বিচার ও নির্বাহী বিভাগের অম্ল-মধুর সম্পর্কের টানাপড়েন ইতিহাসে নন্দিত-নিন্দিত হয়েছে। একসময় বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন। তীর চালনার সময় একদিন সুলতানের একটি তীর হাত ফসকে এক রাখাল ছেলের বুকে বিঁধে আর তাতেই তার মৃত্যু হয়। রাখাল ছেলের বিধবা মা কাজির আদালতে সুলতানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। কাজি সুলতানের নামে পরওয়ানা পাঠান আদালতে হাজির হওয়ার জন্য। সমন পেয়ে সুলতান যথাসময়ে কাজির আদালতে হাজির হন। কাজি সুলতানকে দেখে অন্যান্য দিনের মতো রাজকীয় সম্মান দেখালেন না, বরং গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ করেন আসামির কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়াতে। সুলতান কাজির আদেশমতো কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ালে কাজি সুলতানকে বিধবা মহিলার অভিযোগ পড়ে শোনান এবং জানতে চান এ অভিযোগ সত্য কি না। সুলতান বিধবার অভিযোগ স্বীকার করেন। সুলতানের বক্তব্য শুনে কাজি বললেন, যেহেতু আপনি অপরাধী, সেহেতু আপনার সামনে দুটি পথ খোলা আছে। হয় ইসলামিক ফৌজদারি আইনের বিধান মতে আপনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিধবার সঙ্গে সমঝোতায় আসুন, নয়তো হত্যাকারী হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের জন্য প্রস্তুত হোন। সুলতান ইসলামী আইনের বিধান অনুযায়ী বিধবার সঙ্গে সমঝোতা করেন। বিচারিক প্রক্রিয়ায় কাজি বিধবার কাছে জানতে চান, সুলতানের বিরুদ্ধে তাঁর এখনো অভিযোগ আছে কি না? সুলতানের বিরুদ্ধে বিধবার আর কোনো অভিযোগ নেই—এ কথা জেনে কাজি সুলতানকে বলেন, বিধবা যেহেতু তাঁর অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, তাই আপনাকে আমি মুক্তি দিলাম। মুক্তির আদেশ শোনার পর সুলতান কাঠগড়া থেকে নেমে পোশাকের ভেতর থেকে হঠাৎ একটি তলোয়ার বের করে কাজিকে বললেন, হয়তো অবাক হয়ে ভাবছেন পোশাকের ভেতর আমি কেন তলোয়ার লুকিয়ে এনেছিলাম। তার কারণ হলো, আপনি যদি ন্যায়বিচার না করে আমার প্রতি কোনোরূপ পক্ষপাতিত্ব দেখাতেন, তবে এ তলোয়ারের এক আঘাতেই আপনার মাথা ধুলায় লুটিয়ে পড়ত। সুলতানের কথা শেষ হতেই কাজি তাঁর আসনের নিচ থেকে একটি চাবুক বের করে বললেন, তাহলে আপনিও জেনে রাখুন মহামান্য সুলতান, পদমর্যাদার গর্বে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে আপনি যদি ন্যায়বিচারের অমর্যাদা করার চেষ্টা করতেন, তবে এ চাবুকের আঘাতে আপনার পিঠ আমি জর্জরিত করে ফেলতাম। আল্লাহকে হাজারো শুকরিয়া, তেমন দুর্বুদ্ধি আপনার হয়নি।

আবার এ সুলতানি আমলেই ১২৪৮ খ্রিস্টাব্দে সুলতান নাসির-উদ-দিন প্রধান বিচারপতির (কাজি-উল-কুজাত) ওপর রুষ্ট হয়ে প্রধান বিচারপতিরও ওপরে সদর জাহান নামে আরেকটি পদ সৃষ্টি করে কাজি মিনহাজ সিরাজকে ওই পদে নিয়োগ দান করেন এবং প্রধান বিচারপতির সব ক্ষমতা সদর জাহান বরাবরে ন্যস্ত করেন। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসনামলে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের সম্পর্ক বারবার আলোচনায় এসেছে। এমনকি নির্বাহী ও বিচার বিভাগের সম্পর্কের টানাপড়েন নিষ্পত্তি করতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একাধিকবার আইন প্রণয়ন পর্যন্ত করতে হয়েছে। কম্পানি শাসন আমলে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের সম্পর্কের টানাপড়েন প্রথম আলোচনায় আসে ব্রিটিশ রাজা কর্তৃক ১৭২৬ সালে জারি করা চার্টারের (অধ্যাদেশ) অধীনে প্রতিষ্ঠিত মেয়র আদালত যখন তাদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার ঘোষণা দেন। এ সময় বেশ কয়েকটি মামলায় কম্পানির সরকার তথা গভর্নর ও তাঁর পরিষদের (মন্ত্রীদের) সঙ্গে মেয়র আদালতের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উল্লেখযোগ্য দুটি মামলা হলো ১৭৩০ সালের বোম্বে কেইস ও ১৭৪৬ সালের শপথ কেইস। বোম্বে মামলায় একজন হিন্দু মহিলা ধর্মান্তরিত হয়ে রোমান ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করলে তাঁর ১২ বছর বয়সী পুত্র তাঁকে ছেড়ে চলে যায় ও তাঁর হিন্দু আত্মীয়দের সঙ্গে বসবাস শুরু করে। মহিলা সন্তানকে ফিরে পেতে তাঁর সন্তানকে জবরদস্তিমূলক আটক রাখার অভিযোগে আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মেয়র আদালত সন্তানকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার রায় দেন। এ রায়ে ক্ষুব্ধ গোত্রপ্রধান কম্পানির গভর্নর কাউয়ান ও তাঁর পরিষদের কাছে মেয়র আদালতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। কম্পানির গভর্নর ও তাঁর পরিষদ ভারতীয়দের ধর্ম ও বর্ণ সম্পর্কিত স্পর্শকাতর বিষয়ে এখতিয়ার প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করে। মেয়র আদালত এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে ধর্ম ও বর্ণ সম্পর্কিত বিষয়ে তাঁদের এখতিয়ার রয়েছে দাবি করেন। গভর্নর ও তাঁর পরিষদ পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পরিষদের সচিবের পদ থেকে মেয়রকে অপসারণ করে। আর শপথ মামলায় মেয়র আদালত দাবি করেন যে হিন্দু আইনের ব্যাখ্যাকারী আইন কর্মকর্তা ও হিন্দু সাক্ষীদের ধর্মগ্রন্থ গীতার পরিবর্তে গরু ছুঁয়ে শপথ করতে হবে। এ নিয়ে গভর্নর ও তাঁর পরিষদের সঙ্গে মেয়র আদালতের বিরোধ শুরু হয় যখন সপরিষদ গভর্নর গীতা-শপথের পক্ষ নেন। আদালত ও নির্বাহী বিভাগের এ বিরোধ দূর করতে ব্রিটিশ রাজা ১৭৫৩ সালে একটি চার্টার জারি করেন। চার্টারের বিধান অনুযায়ী মেয়র আদালতের বিচারক নিয়োগ ও অপসারণের একচ্ছত্র ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগ তথা গভর্নর ও তাঁর পরিষদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণরূপে নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করা হয়। কম্পানি শাসনামলে বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের মিত্রতা ও নজিরবিহীন তিক্ততার সম্পর্ক সৃষ্টি হয় ১৭৭৩ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট প্রণীত রেগুলেটিং আইনের আওতায় ১৭৭৪ সালে কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার পর। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন কম্পানি সরকারের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের বাল্যবন্ধু স্যার এলিজা ইম্পে। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে হেস্টিংসের এ বন্ধুত্ব সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাসে সমালোচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে ভারতের জমিদার রাজা নন্দকুমারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর থেকে এটি জুডিশিয়াল মার্ডার হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। হুগলির অধিবাসী মোগলদের দ্বারা মহারাজা খেতাবপ্রাপ্ত নন্দকুমার বাংলার অত্যন্ত প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন। কিছুসংখ্যক নেতৃস্থানীয় জমিদার ও মুন্নী বেগমের (মীরজাফরের স্ত্রী) কাছ থেকে হেস্টিংস যে উেকাচ গ্রহণ করেছিলেন, তা নন্দকুমার ফাঁস করে দেন। এ ঘটনার পর ক্রুদ্ধ হেস্টিংস নন্দকুমারকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ খুঁজছিলেন। হেস্টিংস নন্দকুমারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনেন। ষড়যন্ত্রের মামলায় নন্দকুমারকে অভিযুক্ত করা কঠিন হবে ভেবে জনৈক মোহনপ্রসাদকে প্ররোচিত করে হেস্টিংস নন্দকুমারের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনেন। সুপ্রিম কোর্ট নন্দকুমারের বিচার করেন। ১৭৭৫ সালের ৮ জুন শুরু হয়ে ১৫ জুন গভীর রাত অবধি টানা আট দিন বিচার শেষে ১৬ জুন সকালে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। ১৭৭৫ সালের ৫ আগস্ট তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারক স্যার এলিজা ইম্পের সহযোগিতায় হেস্টিংস এ ‘আইনি হত্যা’র আয়োজন করেন বলে অভিযোগ ওঠে। যেসব কারণে এ অভিযোগ, তার মধ্যে অন্যতম হলো—এক. অপরাধ সংঘটনের চার বছর পর প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট নন্দকুমারের ওপর ব্যক্তিগত ও আঞ্চলিক এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও তাঁর বিচার করেছেন। দুই. ভারতের কোনো আইনে জালিয়াতির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ছিল না। ব্রিটেনের জন্য প্রণীত ১৭২৮ সালের ব্রিটিশ জালিয়াতিবিরোধী আইন ভারতে নন্দকুমারের ওপর প্রয়োগ করে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিন. সুপ্রিম কোর্ট আগে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগের বিচারে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন; কিন্তু পরে ভারতীয় আইনে জালিয়াতির জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকায় এবং এ ব্যক্তি ব্রিটিশ নাগরিক না হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড থেকে কোর্ট তাঁকে অব্যাহতি দেন। নন্দকুমারের ক্ষেত্রে এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা হয়নি। চার. ব্রিটেন যে আইনব্যবস্থা অনুসরণ করে, তাতে বিচারকরা আম্পায়ারের মতো ভূমিকা পালন করেন আর দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে আইনি যুদ্ধ চলে। অথচ এ মামলায় সব বিচারপতি নন্দকুমারের সাক্ষীকে এমনভাবে জেরা করেছেন যে সাক্ষীরা ভীত হয়ে পড়েন। পাঁচ. মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রিভি কাউন্সিলে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হলে সুপ্রিম কোর্ট সে আবেদন খারিজ করে দেন। ব্রিটেনের রাজার কাছে নন্দকুমারের প্রাণভিক্ষার অবেদনও সুপ্রিম কোর্ট প্রেরণ করেননি।

রাজা নন্দকুমারের মামলার কয়েক মাসের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাহী বিভাগের মৈত্রী বৈরিতায় রূপ নেয়। ১৭৭৫ সালে কামালউদ্দিনের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের জামিন আদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় নির্বাহী বিভাগ এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কামালউদ্দিনকে জামিনে মুক্তি না দিয়ে অন্তরিন রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ১৭৭৭ সালের কসিজুরাহ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাহী বিভাগের সম্পর্ক চরম শত্রুতায় রূপ নেয়। গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের নেতৃত্বে নির্বাহী বিভাগ সুপ্রিম কোর্টের আদেশ-নির্দেশ বাস্তবায়নে বাধা দিতে সামরিক শক্তি পর্যন্ত প্রয়োগ করে। মেদিনীপুরের অন্তর্গত কসিজুরাহর জমিদার রাজা সুন্দরনারায়ণ কাশিনাথবাবু নামে এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে বিরাট অঙ্কের অর্থ ঋণ নেন। বারবার তাগাদা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে কাশিনাথবাবু সুন্দরনারায়ণের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে টাকা উদ্ধারের মামলা দায়ের করেন। সুপ্রিম কোর্ট সুন্দরনারায়ণের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। জমিদার সুন্দরনারায়ণ গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে যান। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির রাজস্ব আদায় ব্যাহত হয়। গভর্নর জেনারেল ও পরিষদ অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে পরামর্শ করে সাধারণ বিজ্ঞপ্তি জারি করে যে জমিদাররা সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারাধীন নয়, তাই তাঁদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ-নির্দেশ মানার প্রয়োজন নেই। পালিয়ে থাকার কারণে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল না হওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট সুন্দরনারায়ণের সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেন। ক্রোকাদেশ তামিল করতে সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা শেরিফের নেতৃত্বে একদল লোক সুন্দরনারায়ণের বাড়িতে গেলে নির্বাহী বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী কর্নেল আহমুটি দুই প্লাটুন সৈন্য প্রেরণ করে ক্রোকাদেশ তামিলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং শেরিফসহ ক্রোকাদেশ তামিলের জন্য আগত সবাইকে বন্দি করে কলকাতা কারাগারে প্রেরণ করেন। এ অবস্থায় কাশিনাথবাবু গভর্নর জেনারেল ও পরিষদ সদস্যদের এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। গভর্নর জেনারেল ও পরিষদ সদস্যরা আদালতের সামনে হাজির হতে অস্বীকার করেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেলকে আটক করে কারাগারে প্রেরণ করা হয় এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে কাশিনাথবাবু সব মামলা প্রত্যাহার করে নেন। সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাহী বিভাগের বিরোধের অবসান এবং সুপ্রিম কোর্টের কাজে বাধাদানের ফলে সৃষ্ট নির্বাহী বিভাগের দায়মুক্তির জন্য অবশেষে ১৭৮১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্যাটেলমেন্ট অ্যাক্ট নামে একটি আইন পাস করা হয়।

স্বাধীনতার পর আমাদের বিচার ও নির্বাহী বিভাগের সম্পর্ক শান্ত ঝিলের জলে দুষ্ট বালকের ঢিল ছোড়ার মতো মাঝেমধ্যে তরঙ্গ তুললেও সমাজ বা রাজনীতিতে এর বহুমাত্রিক প্রভাব তেমনভাবে অনুভূত হয়নি। বিচার বিভাগ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে ১৯৯১ সালে, যখন তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তত্কালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। রাজনীতি তথা নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের নতুন আত্মীয়তার এ সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয় ১৯৯৬ সালে। এ সময় সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ, যা একে অপরের প্রতিবেশী হয়ে ছিল, যুগ যুগ ধরে তাদের এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা হলো। ত্রয়োদশ সংশোধনীতে বলা হলো, সরকারের মেয়াদান্তে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। রাজনীতির সঙ্গে বিচার বিভাগের এ অতি সখ্য দিয়েই বিচার ও নির্বাহী বিভাগের সম্পর্ক এক বিনাশী রূপ ধারণ করল। তত্ত্বাবধায়ক সখ্যের সূত্র ধরে বড় রাজনৈতিক দলগুলো বিচার বিভাগের বিচারিক চরিত্র পাল্টে একে রাজনীতির রঙে রাঙানোর এক ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠল। উচ্চ আদালতে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মানসে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করার সুপ্রতিষ্ঠিত প্রথা ভাঙা হলো। প্রশ্নবিদ্ধ বিচারক নিয়োগ দেওয়া হলো, জ্যেষ্ঠতার নিয়ম লঙ্ঘিত হতে থাকল। বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে কেবল উচ্চ আদালতের বিচারকদের বয়স বাড়ানো হলো। আদালত অঙ্গনের পবিত্রতা নষ্ট করে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ হলো। এজলাসের দরজায় লাথি মারা হলো। আইনজীবীরা বিভক্ত হয়ে আইনের শাসনের চেয়ে দলীয় আদেশ-নির্দেশের প্রতি বেশি অনুরক্ত হয়ে পড়লেন। উচ্চ আদালত প্রাঙ্গণ অসুস্থ রাজনীতির অবাধ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হলো। বিচারপতিদের নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘আমাদের লোক’ ধারণার জন্ম নিল। এরই ধারাবাহিকতায় বিচার বিভাগ ও বিচারপতিদের নিয়ে কখনো বিএনপি, কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো বা সরকারের মন্ত্রীরা লাগামহীন বক্তব্য দিতে কসুর করছেন না। ভাগ্যিস, বিচারপতি খায়রুল হক বিচারকদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন, তা না হলে আরো কত কী যে হতো কে জানে!

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

zhossain@justice.com


মন্তব্য