kalerkantho

বুধবার । ২৫ জানুয়ারি ২০১৭ । ১২ মাঘ ১৪২৩। ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৮।


স্বাধীনতার ৪৫ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়ন

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



স্বাধীনতার ৪৫ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়ন

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে চাই আয়-উপার্জনের সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ। শিক্ষা কর্মদক্ষতাকে, স্বাস্থ্যসেবা কর্মক্ষমতাকে, কর্মদক্ষতা ও কর্মক্ষমতা উত্পাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসার ঘটাবে—এটাই প্রত্যাশা।

সর্বত্র সেই পরিবেশের সহায়তা একান্ত অপরিহার্য, যেখানে সীমিত সম্পদের ও সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব। একটাকে উপেক্ষা মানে যুগপত্ভাবে অন্য অনেক সমস্যাকে ছাড় দেওয়া। সমস্যার উেস গিয়ে সমস্যার সমাধানে ব্রতী হতে হবে। এ কাজ কারো একার নয়, এ কাজ সবার। সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজন সমাধানের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা পরিপোষণের জন্য নয়। যেকোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য জনমত সৃষ্টিতে, আস্থা আনয়নে ও একাগ্রতা পোষণে গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। সংস্কার বাস্তবায়ন কোনোমতেই সহজসাধ্য নয় বলে সর্বত্র দৃঢ়চিত্ততা আবশ্যক। এখানে দ্বিধান্বিত হওয়া, দ্বিমত পোষণ কিংবা প্রথাসিদ্ধবাদী বশংবদ বেনিয়া মুত্সুদ্দি মানসিকতার সঙ্গে আপস করার সুযোগ থাকতে নেই

 

 

 

বিদেশি শাসনের নিগড়ে আর্থসামাজিক শোষণ-বঞ্চনা আর বণ্টনবৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার বাঙালির ঐতিহাসিক মুক্তির সংগ্রাম দীর্ঘদিনের পথপরিক্রমায় ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অধিকার অর্জনে চূড়ান্ত বিজয়ে বিভূষিত হয়। সমতটের এই ভূখণ্ড ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রকৃতির মিশ্র সহযোগিতাপ্রাপ্ত একটি দেশ। কর্কট ক্রান্তিরেখার ওপর বাংলাদেশের অবস্থান হয়েও মাথার ওপর হিমালয় পর্বত ও পায়ের নিচে বঙ্গোপসাগর থাকায় বাংলাদেশ মরুভূমি নয়, বরং মৌসুমি বায়ুমণ্ডল ও নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া-বলয়ের কারণে সুজলা-সুফলা। প্রকৃত অর্থে এমন দেশটি (অন্য) কোথাও খুঁজে পাওয়ার নয়। ছিলও না। এ কারণেই দেশটির প্রতি বিদেশি বর্গি, হার্মাদ, হায়েনার আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা অতীতে প্রবল ছিল তো বটেই, হাজার বছরের ঔপনিবেশিক শাসন তার প্রমাণ। দেশটির আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা-ব্যবস্থায় বিদেশিদের বিদ্যমান আগ্রহ ও ভূমিকা সে নিরিখেই।

গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের বিচিত্র খেয়ালেরও শিকার—বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, সিডর, আইলা, গোর্কির গোলক ধাঁধায় এর জীবনায়ন অর্জনে ঘটে থাকে নানা দুর্বিপাক। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জলবায়ুর পরিবর্তন আর পরিবেশদূষণের কবলে পড়ে হিমালয়ও এখন এ দেশের জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে ক্রমেই হয়ে উঠছে অকাল বন্যা আর খরার কারণ। এসবের প্রভাবে এ দেশের জনগণ, তাদের মূল্যবোধ, কর্মস্পৃহা ও জীবনযাত্রা প্রকৃতির এই মিশ্র স্বভাবে সিদ্ধ। এ দেশের জনগণ সরলমনা, ভাবুক, কিছুটা পরিশ্রমী ও অল্পে তুষ্ট। শারীরিক গঠন খাদ্যাভ্যাসের কারণে কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী কায়িক পরিশ্রমে অপারগ এ দেশের জনগণ প্রকৃতির খেয়াল-খুশির ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। সঞ্চয়ের অভ্যাস তাই কম। এ দেশের অর্থনীতিও তাই প্রকৃতির এই মিশ্র স্বভাবে প্রভাবিত।

বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতি রাষ্ট্রীয় সীমানা ভূ-রাজনৈতিক অবকাঠামো অবস্থানের দ্বারাও বিশেষভাবে প্রভাবিত। বাংলাদেশের ৭৫ শতাংশ সীমান্ত ভারতীয় উন্মুক্ত ভূমি, নদী ও পাহাড়ে পরিবেষ্টিত, ৫ শতাংশ সীমান্ত মিয়ানমারের সঙ্গে পাহাড়ি পথ এবং বাকি ২০ শতাংশ সীমান্ত বিশ্বের সেরা ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনসহ সমুদ্র উপকূল-বঙ্গোপসাগর বিধৌত। বৃহতের পাশে ক্ষুদ্র একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পক্ষে স্বাধীন স্বয়ম্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা কিংবা মুক্তবাজার অর্থনীতির নির্দেশনা ও প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সংরক্ষণব্যবস্থা গ্রহণে যেসব প্রতিকূলতা সচরাচর ঘটে থাকে বাংলাদেশ তার থেকে ব্যতিক্রম নয় কোনো দিক দিয়েই।

বলাবাহুল্য বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিপ্রধান। বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদনের ২৯ শতাংশ আসে কৃষি ও তদসংশ্লিষ্ট খাত থেকে। সমতলভূমির মোট জমির ৯২ শতাংশ ব্যবহার করা হয় কৃষিকাজে আর কৃষিকে অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করে ৬৪ শতাংশ মানুষ। কৃষি খাতে দেশের সিংহভাগ ভূমি ব্যবহৃত হয় এবং এ খাতেই কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস। এ পরিপ্রেক্ষিতে কৃষিব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ, উচ্চ ফলনশীল শস্যের উত্পাদনে সহায়তাকারী বীজ, উপকরণ, সার ইত্যাদি সরবরাহ, কৃষককে সহজ শর্তে মূলধন জোগান ও তার উত্পাদিত পণ্য ন্যায্য মূল্যে বিপণনব্যবস্থা তদারকি করে কৃষিব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং কৃষি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে কৃষিকেই দেশের জিডিপির অন্যতম জোগানদাতা হিসেবে পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠা ও কৃষির উন্নয়নকামী পদক্ষেপ; নদীমাতৃক দেশে পানিসম্পদের সদ্ব্যবহার ও নদী শাসন ও নৌযোগাযোগ; জনবহুল জনপদের জনশক্তিকে সম্পদে রূপান্তর ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশীয় কাঁচামালের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশজ সম্পদের সমাহার ঘটিয়ে উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণে স্থানীয় সঞ্চয়ের বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ, ব্যক্তি তথা বেসরকারি খাতের বিকাশ, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সম্ভাবনার বিকাশ বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নয়নের অন্যতম, বাঞ্ছিত ও কাঙ্ক্ষিত উপায়। স্বয়ম্ভর স্বদেশ ও এর অর্থনীতির ভিত গড়তে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণের যৌক্তিকতা এভাবেই উঠে আসে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ ও অনিষ্টকারী প্রভাব ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করে কৃষিব্যবস্থাকে সম্ভবমতো নিরাপদ সাফল্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ আশানুরূপ হলেই বাংলাদেশের সমৃদ্ধি সাধনে অনিশ্চয়তা ও ভবিতব্যের হাতে বন্দিত্বের অবসান ঘটবে। গবেষণার মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল শস্যের উত্পাদনে প্রযুক্তির বিবর্তন ঘটাতে হবে, শুধু রাসায়নিক সার ব্যবহার করে সাময়িকভাবে উত্পাদন বাড়ানোর ফলে জমির উর্বরা শক্তির অবক্ষয় ঘটতে থাকলে আখেরে চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। খাদ্যশস্যের বর্তমান চাহিদা মেটাতে গিয়ে বিশেষ করে কৃষি ও সার্বিকভাবে পরিবেশের ভবিষ্যৎ যাতে বিপন্ন না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশের নদী শাসনের উদ্যোগ কার্যকর তথা পানিপ্রবাহ যথাযথ রেখে নদীর নাব্যতা বজায় রাখা আবশ্যক হবে। পানি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়া হলে কৃষিকাজ তো বটেই, সুপেয় পানির অভাবসহ পরিবেশ বিপন্নতায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারাতে পারে বাংলাদেশ। অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষের মাধ্যমে কৃষিজমির যথেচ্ছ ব্যবহার দুঃসহ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। নৌপথে যোগাযোগের যে নেটওয়ার্ক নদীমাতৃক বাংলাদেশের, তা অত্যন্ত স্বল্পব্যয়ের হওয়া সত্ত্বেও উপযুক্ত পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অভাবে সেটিও ক্রমেই হাতছাড়া যাতে না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দেওয়ার এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। দ্রুত ও সহজ যোগাযোগের উপায় হিসেবে সড়ক নেটওয়ার্কের তুলনামূলক উপযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় আসার অর্থ এই হতে পারে না যে নৌপথ বিলুপ্তির মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত হতে হবে। নৌপথের ন্যায্য বিকাশ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ছাড়াও মৌসুমি বলয়ে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্যও অতি জরুরি। মাছ-ভাতের বাঙালির প্রধান দুই উপজীব্যের অস্তিত্ব ও বিকাশও তো দেশের অগণিত খাল-বিলের নাব্যতার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে প্রকৃত বিনিয়োগক্ষেত্র হলো কৃষি। এই কৃষি থেকে খাদ্য (ভাত, মাছ, সবজি ও শর্করা), বস্ত্র, বাসস্থানের সব ব্যবস্থা হয়। কৃষি খাতকে টেকসই করে তোলার মাধ্যমে অপরাপর সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণও স্বাভাবিক হতে পারে। বাংলাদেশের স্বয়ম্ভর উন্নয়ন ভাবনা এই চিন্তাচেতনাকে অবলম্বন করে হওয়ার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য।

দেশীয় শিল্প সম্ভাবনাকে উপযুক্ত প্রযত্ন প্রদানের মাধ্যমে স্বয়ম্ভর শিল্প ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব। দেশজ কাঁচামাল ব্যবহার দ্বারা প্রয়োজনীয় ফিনিশড প্রোডাক্ট তৈরিতে দেশের শিল্প খাতকে সক্ষম করে তুলতে হবে এবং এর ফলে বিদেশি পণ্যের ওপর আমদানিনির্ভরতা তথা মহার্ঘ্য বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে। শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ আর বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহারে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশিত অগ্রগতির হিসাবসংক্রান্ত তুলনামূলক সারণিগুলোর সঙ্গে বিশ্ব-অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্পর্কের শুমার ও বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশ অর্থনীতির অগ্রগতি ও গতিধারা শনাক্তকরণে অসুবিধা হয় না। দেখা যায় আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণ জিডিপির অংশ হিসেবে ক্রমেই বৃদ্ধি পেলেও রপ্তানির মিশ্র প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। অস্থিতিশীল ও ভিন্নমাত্রিক ট্যারিফ স্ট্রাকচারের প্রভাব পড়েছে বহির্বাণিজ্যে ভিন্ন অনুপাতে। এতে বোঝা যায়, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্য সাধারণ সূত্র অনুসরণ করতে দ্বিধান্বিত হয়েছে। উত্পাদন না বাড়লেও সরবরাহ বাড়ার প্রবণতায় মূল্যস্থিতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। আবার ইনফরমাল বর্ডার ট্রেডের ফলে দেশজ উত্পাদনের বিপত্তি ঘটতেই পারে। ইনফরমাল ট্রেড বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্যের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অদৃশ্য এক অন্ধ গলি ও কালো গর্ত হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের আমদানি করা সামগ্রী অন্য দেশে পাচার হয়েছে, আবার কোনো কোনো বিদেশি পণ্যের অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে গিয়ে আরোপিত ট্যারিফে দেশি সামগ্রী উত্পাদনব্যবস্থার স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত হয়েছে।

সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি ও কল্যাণ সৃষ্টিতে মানুষের সার্বিক উন্নতি অপরিহার্য শর্ত। আগে সমাজ, না আগে মানুষ—এ বিতর্ক সর্বজনীন। মানুষ ছাড়া মনুষ্য সমাজের প্রত্যাশা বাতুলতামাত্র। রাষ্ট্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারিত আছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা অধিকার আদায়ের সম্ভাবনা ও সুযোগকে নাকচ করে দেয়। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি না হলে চাহিদা অনুযায়ী ভোগের জন্য সম্পদ সরবরাহে ঘাটতি পড়ে। মূল্যস্ফীতি ঘটে, সম্পদপ্রাপ্তিতে প্রতিযোগিতা বাড়ে। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি করে যে মানুষ, সেই মানুষই ভোক্তার চাহিদা সৃষ্টি করে। উত্পাদনে আত্মনিয়োগের খবর নেই, চাহিদার ক্ষেত্রে ষোলো আনা—টানাপড়েন তো সৃষ্টি হবেই। অবস্থা ও সাধ্য অনুযায়ী উত্পাদনে একেকজনের দায়িত্ব ও চাহিদার সীমারেখা বেঁধে দেওয়া আছে; কিন্তু এ সীমা অতিক্রম করলে বাজার ভারসাম্য বিনষ্ট হবেই। ওভারটেক করার যে পরিণাম দ্রুতগামী বাহনের ক্ষেত্রে, সমাজে সম্পদ অর্জন ও ভোগের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমণে একই পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। সমাজে অস্থিরতা ও নাশকতার যত কারণ এযাবৎ আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে এই সম্পদ অবৈধ অর্জন রোধে অপারগতা, অধিকার বর্জন এ প্রগলভতা ও আত্মত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতি মুখ্য।

বুদ্ধি ও বিবেচনা প্রয়োগ করে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তা বাস্তবায়নে চাই আন্তরিক ও নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস। সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা ঠুনকো কার্যকরণকে উপলক্ষ করে নেওয়া পদক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী ফল বয়ে আনে না। শুধু নিজের মেয়াদকালে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ ও কার্যক্রম গ্রহণ করলে, ধারাবাহিকতার দাবিকে পাশ কাটিয়ে এর আগে গৃহীত কার্যক্রমকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার রেওয়াজ শুরু হলে টেকসই উন্নতির সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য দূরদৃষ্টি রূপকল্প প্রণয়নকারীর প্রগাঢ় প্রতিশ্রুতি ও দৃঢ়প্রত্যয় প্রয়োজন হয়। সমস্যা গোচরে এলে ব্যবস্থা নিতে নিতে সব সামর্থ্য ও সীমিত সম্পদ নিঃশেষ হতে দিলে প্রকৃত উন্নয়নের জন্য পুঁজি ও প্রত্যয়ে ঘাটতি তো হবেই। তেল আনতে নুন ফুরায় যে সংসারে, সেখানে সমৃদ্ধির স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। সমস্যারা পরস্পরের মিত্র, একটির সঙ্গে একটির যেন নাড়ির যোগাযোগ। আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে ব্যক্তি নিরাপত্তার, ব্যক্তি নিরাপত্তার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার, সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে আয়-উপার্জনের সব কার্যক্রমের কার্যকারণগত সম্পর্ক রয়েছে। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে চাই আয়-উপার্জনের সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ। শিক্ষা কর্মদক্ষতাকে, স্বাস্থ্যসেবা কর্মক্ষমতাকে, কর্মদক্ষতা ও কর্মক্ষমতা উত্পাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসার ঘটাবে—এটাই প্রত্যাশা। সর্বত্র সেই পরিবেশের সহায়তা একান্ত অপরিহার্য, যেখানে সীমিত সম্পদের ও সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব। একটাকে উপেক্ষা মানে যুগপত্ভাবে অন্য অনেক সমস্যাকে ছাড় দেওয়া। সমস্যার উেস গিয়ে সমস্যার সমাধানে ব্রতী হতে হবে। এ কাজ কারো একার নয়, এ কাজ সবার। সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজন সমাধানের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা পরিপোষণের জন্য নয়। যেকোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য জনমত সৃষ্টিতে, আস্থা আনয়নে ও একাগ্রতা পোষণে গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। সংস্কার বাস্তবায়ন কোনোমতেই সহজসাধ্য নয় বলে সর্বত্র দৃঢ়চিত্ততা আবশ্যক। এখানে দ্বিধান্বিত হওয়া, দ্বিমত পোষণ কিংবা প্রথাসিদ্ধবাদী বশংবদ বেনিয়া মুত্সুদ্দি মানসিকতার সঙ্গে আপস করার সুযোগ থাকতে নেই। বিগত ছয় দশকে এই ভূখণ্ডে যত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্কার কর্মসূচি কিংবা ধ্যানধারণা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর কমবেশি ব্যর্থতার পেছনে বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে দৃঢ়চিত্ত অবস্থান গ্রহণে অপারগতাই মুখ্য কারণ ছিল।

লেখক : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান


মন্তব্য