kalerkantho


মুক্তি ও স্বাধীনতা,স্বাধীনতা ও মুক্তি

করুণাময় গোস্বামী

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মুক্তি ও স্বাধীনতা,স্বাধীনতা ও মুক্তি

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণায় বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে সে এক মহাঘোষণা।

কেননা বঙ্গবন্ধু একই ঘোষণায় মুক্তি ও স্বাধীনতাকে এক করে বিবেচনা করলেন। এর আগে কোথাও কখনো স্বাধীনতা ও মুক্তিকে একত্র করে, এক করে, বলা যেতে পারে, অবিভাজ্য করে ঘোষণা আকারে নিয়ে আসা হয়নি

 

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি জয় লাভ করে। মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলার রাজধানী কলকাতায় স্থানান্তরিত হয় ১৭৭৩ সালে। কিন্তু তার আগে থেকেই ব্রিটিশ মডেলের প্রশাসন গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়ে যায়। রবার্ট ক্লাইভ (১৭৬০-১৭৬৭) বাংলাকে কেন্দ্র করে সারা ভারতে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। তাঁর এ চেষ্টাকে আরো সফল করে তোলেন ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭২-১৭৮৫), লর্ড কর্নওয়ালিস (১৭৮৬-১৭৯৩)। বাংলা-বিহারকে কেন্দ্র করে অবিলম্বেই সারা ভারত ব্রিটিশ অধিকারে ও তাদের শাসন প্রতিষ্ঠার কৌশলে এসে পড়ে এবং এ কথা অবধারিত হয়ে পড়ে যে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ পাকা হয়ে গেল। পলাশীর যুদ্ধ যখন চলছে, আমবাগান থেকে দূরে মাঠে কৃষকরা কাজ করছিল, তাদের উদ্বেগ ছিল জমি সঠিক চাষ করা হচ্ছে কি না, ফসল কেমন ফলবে—এসব নিয়ে। নবাব পরাজিত হচ্ছেন, দেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি তাদের শাসন নিয়ে চেপে বসছে—এ ব্যাপারে তাদের কোনো উদ্বেগ ছিল না।

এ যুদ্ধ কী এবং কেন, এ ব্যাপারে তাদের কোনো ধারণাও ছিল না।

পলাশীর যুদ্ধ যখন হয়, রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবুর বয়স ১৬ বছর। কলকাতা শহর তখন গড়ে উঠছে। এ শহর গড়ে তোলার কাজ শুরু হয় ১৬৯০ সাল থেকে। গৃহশিক্ষকের কাছে নিধুবাবু লেখাপড়া শিখেছিলেন, যাজক-গৃহশিক্ষকের কাছে তিনি কাজ চালানোর মতো ইংরেজিও শিখেছিলেন। অর্থাৎ ঐতিহাসিকরা যেমন মনে করেন, রামনিধি গুপ্ত সেকালের গড়পড়তা বাঙালির তুলনায় যথেষ্ট অগ্রসর মানুষ ছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যের মানবকেন্দ্রী ভাবধারার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। সে জন্যই ঈশ্বরকেন্দ্রী গান রচনার যুগে তিনি মানবকেন্দ্রী গান রচনায় উদ্বুদ্ধ হতে পেরেছিলেন। তিনিই প্রথম প্রকৃত অর্থে বাংলায় রক্ত-মাংসের নর-নারীর প্রেমের গান রচনা করেছিলেন, তিনি নিজে এর নাম দিয়েছিলেন হৃদয়সংগীত। কিন্তু দেশের শাসন যে কম্পানির হাতে চলে যাচ্ছে, বাংলাকে দিয়ে শুরু করে ভারত যে ব্রিটিশ উপনিবেশ হতে চলেছে, এ ব্যাপারে তাঁর কোনো উদ্বেগ নেই। কোনো রচনায় এই ঐতিহাসিক ক্ষমতা বদলের কোনো ছায়াপাত নেই। মুর্শিদাবাদের কৃষক থেকে কলকাতার কবি পর্যন্ত এ বিষয়ে একেবারেই উদাসীন, যাকে পরবর্তীকালে বলা হয়েছে রাজনৈতিক। ক্রমে ‘রাজনৈতিক’ বিষয়টি উঠে আসে বাংলা সাহিত্যে এবং সাহিত্য থেকে সে বিষয়টি সংক্রমিত হয় সাধারণভাবে আমরা যাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বলি, তাতে।

ভারতে, বাংলায় সর্বপ্রথম রাজনৈতিক চিন্তা ও কর্মকাণ্ড কিভাবে শুরু হলো, কেন শুরু হলো সে বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, সে একটা সংঘর্ষের পরিণাম। এ কোনো শারীরিক সংঘর্ষ নয়, মানসিক সংঘর্ষ, বোধশক্তির সংঘর্ষ। সংঘর্ষ ইংরেজত্ব ও ভারতীয়ত্বের মধ্যে। বলেছেন, জাতিবৈর সম্পর্কের কথা। ইংরেজ তার শ্রেষ্ঠতর যুদ্ধশক্তি, পরাভূত করার শ্রেষ্ঠতর কৌশলশক্তি, অধীনস্থ করে রাখার জন্য শ্রেষ্ঠতর কূটবুদ্ধি ও শ্রেষ্ঠতর সাহিত্য-বিজ্ঞানশক্তি নিয়ে এসে দাঁড়াল ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির মাধ্যমে। বিজেতা ও বিজিতের মধ্যে একটা বৈর সম্পর্ক আভাসিত হতে থাকল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে। এই বৈর সম্পর্ক আভাসিত হলো সাহিত্যে, ক্রমে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রচারের ভেতর দিয়ে তা স্বাধীনতাসংগ্রামে এসে উপনীত হলো। বঙ্কিমচন্দ্র জন্মধন্যতার কথা বলেছিলেন। ইংরেজ, তুমি ভালো, তোমার ভালো নিয়ে তুমি থাকো, আমরা আমাদের ভালো-মন্দ নিয়ে আমাদের মতো করে আমাদের পরিচয়ে বসবাস করি। আমরা তোমাদের শাসন চাই না, আমরা তোমাদের শোষণ চাই না, আমরা স্বাধীনতা চাই। এই ডাক যিনি দেওয়ার আয়োজন করলেন বা ডাক দেওয়ার প্রেরণা জোগালেন, তিনি কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, (১৮১২-১৮৫৯) এক অসামান্য ভাবশিষ্যমণ্ডলীর পরম গুরু। তিনি শুরু করেছিলেন মাতৃভাষা দিয়ে, মাতৃভূমি দিয়ে, মাতৃভূমির গৌরব দিয়ে। পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যেই তাঁর শিষ্যরা সেটিকে স্বাধীনতার দাবিতে পর্যবসিত করেন। অবাক হওয়ার কথা বটেই! ভারতের কোথাও বলা হচ্ছে না, আমরা স্বাধীনতা চাই, আমরা পরাধীন থাকব না, ইংরেজের শাসনে থাকা দাসত্বের মতো। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরুই হয়নি। তখন রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন, স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়। দাসত্বশৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়। সেই থেকে দাবি উঠল, সাহিত্যে অন্তত আমার স্বাধীনতা চাই। এর ২০ বছর পরে বোম্বে শহরে কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন বসল, ২১ বছর পরে কলকাতায়, ১৮৮৬। রবীন্দ্রনাথ নিজে সেই অধিবেশনের উদ্বোধনী গান গাইলেন।

সে থেকে সময় যত এগোল, দাবি জোরদার হতে থাকল যে আমরা স্বাধীনতা চাই, রাজনৈতিক স্বাধীনতা। এর সঙ্গে মুক্তির ধারণাও যুক্ত হলো অনেক পরে, অত্যন্ত কার্যকরভাবে, রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলার গভীর মানবিক ধারণা হিসেবে। ইংরেজ শাসন শুধু দাসত্ব নয়। সে এক ভয়ংকর শোষণ—এ ধারণা বাংলা নাটকে, গানে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ভাবশিষ্যরা মর্মবদ্ধ করেছিলেন। তবে পরবর্তীকালে মুক্তির ধারণাটি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরিপূরক হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মুক্তি মিলেমিশে এক হয়ে যায়। যেমন ১৯৪৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত উদয়ের পথে সিনেমায় গাওয়া হয়েছে বিখ্যাত সেই গান, মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে। রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে এই রচনায় মুক্তি বলে স্বীকার করা হচ্ছে। দেশাত্মবোধক গানের সংকলন বেরিয়েছে, নাম দেওয়া হয়েছে মুক্তির গান। আবার বলা হয়েছে শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা মুক্তি নয়। মুক্তির জন্য শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা চাই, মূলধনী বিনিয়োগ যেন গরিব শ্রমিকদের শোষণের উপায় না হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ যেন মানুষের সমতাকে স্বীকার করে, মানুষের ঐক্যকে স্বীকার করে, রাষ্ট্রব্যবস্থা যেন সব নাগরিককে স্বীকার করে, সবার জন্য উদার স্থান রচনা করে অগ্রসর হয়। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন মুক্তি বিষয়টির ওপর যথেষ্ট জোর দেয়। ১৯৪৩ সাল থেকে কলকাতাকে কেন্দ্র করে যখন সমাজতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে তখন বলা হতে থাকে যে মুক্তি ব্যাপারটা অনেক বড়, শোষণমুক্তি একটা বড় শর্ত বটে; কিন্তু শোষণের বাইরেও অনেক বন্ধন আছে। সেসব থেকেও মুক্তি চাই। রাজনৈতিক স্বাধীনতা চাই সর্বাগ্রে নিশ্চয়ই। তবে ভোটের অধিকারই শেষ কথা নয়। ভালোভাবে বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সমাজতান্ত্রিক ধারণার বাইরেও এই মুক্তিকে স্বীকার করা হয় সামাজিক আদর্শ হিসেবে, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সফল রূপায়ণের সুমহান স্তম্ভ হিসেবে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণায় বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে সে এক মহাঘোষণা। কেননা বঙ্গবন্ধু একই ঘোষণায় মুক্তি ও স্বাধীনতাকে এক করে বিবেচনা করলেন। এর আগে কোথাও কখনো স্বাধীনতা ও মুক্তিকে একত্র করে, এক করে, বলা যেতে পারে, অবিভাজ্য করে ঘোষণা আকারে নিয়ে আসা হয়নি। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণাকে যুক্ত করেই অগ্রসর হতে হবে। ৭ মার্চের ভাষণেই কেন তিনি মুক্তির কথা বলতে গেলেন? সামনে ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। ১৯৬৬ সাল থেকে রাজনৈতিক সংগ্রাম সেভাবেই এগোচ্ছিল পূর্ব বাংলায়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন এর পুরোভাগে। তবে প্রশ্ন যখন এসে দাঁড়াল ঘোষণা আকারে দেশের সামনে, পৃথিবীর সামনে বলার যে আমরা স্বাধীনতা চাই, তখন বঙ্গবন্ধু এ কথা বলার তাগিদ অনুভব করলেন যে মুক্তির কথাটিও আসবে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে। তা না হলে ঘোষণাটি পরিপূর্ণ হয় না। সে জন্য এখন যেমন আমরা বলছি, ভবিষ্যতে আরো জোরদারভাবে বলা হবে যে বঙ্গবন্ধু তাঁর রাষ্ট্রস্বপ্নকে প্রকাশিত করেছেন এই ঘোষণার মাধ্যমে।

১৯৪৭ সাল থেকে ধরলে বঙ্গবন্ধু তাঁর ২৪ বছরের রাজনৈতিক-সামাজিক অভিজ্ঞতার আলোকে এবারের সংগ্রামকে মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রাম বলেছেন। তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন যে মাউন্ট ব্যাটেন বিদায় নিলেন বটে; কিন্তু পাকিস্তানে উপনিবেশবাদের একটি নতুন পাঠ রচনা করা হলো। এই নতুন উপনিবেশ পাঠ পূর্ববর্তী উপনিবেশ পাঠের চেয়ে কম ভয়ংকর নয়। এখানেও সেই আধিপত্যবাদের ধারণা, সেই শোষণপ্রক্রিয়া চালু রাখার ঘটনা। সংখ্যালঘিষ্ঠ গায়ের জোরে সংখ্যাগরিষ্ঠকে সর্বতোভাবে অবদমিত রাখতে চাইছে। বঙ্গবন্ধু নিজের চোখের সামনে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেন। তাঁর প্রেরণায় কাজ করল ইতিহাস, অতীতের ও ভবিষ্যতের। তিনি যে ইতিহাসকে দেখে এসেছেন ২৪ বছর ধরে এবং যে ইতিহাস তাঁর স্বাধীন বাংলাদেশে রচিত হোক বলে তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি প্রত্যয়বদ্ধ ছিলেন যে মুক্তি যদি স্বাধীনতাকে শক্তি না দেয়, তাহলে স্বাধীনতা বলীয়ান হয় না।

আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে বঙ্গবন্ধুর সেই মুক্তি-স্বাধীনতাস্বপ্নকে আমাদের স্মরণ করতে হবে। এই দেশ গড়ে উঠবে মুক্তিকামী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে। এই দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হবে মুক্তির বোধ। এই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সেই মুক্তির আদর্শকে অনুসরণ করবে। এই কলকারখানা যাঁরা চালাবেন তাঁরা মনে রাখবেন যে সস্তাশ্রমকে শোষণ করে তাঁরা বিত্তবান হয়ে উঠবেন—ব্যাপারটা তেমন নয়। তাঁরা মনে করবেন যে শ্রমিকে-মালিকে মিলেমিশে কাজ করছেন একসঙ্গে সবার পরিস্থিতির বিকাশ ঘটাবেন বলে। এমন ধারণা যেন দানা বাঁধতেই না পারে যে সবাই সমান নয়, সবার অংশগ্রহণ সমান মূল্যায়ন নয়। পৃথিবীতে আজ নানা ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হচ্ছে। পৃথিবীর সব সম্পদের অর্ধেকের মালিক ৬২ জন ব্যক্তি। সেও এক দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশে যদি এমন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় যে এ দেশের অর্ধেক সম্পদের মালিক কয়েকজন ব্যক্তি নয়, এই দেশের সব সম্পদের মালিক পুরো দেশবাসী, তাহলে সে এক অবাক করা দৃষ্টান্ত হবে পৃথিবীর জন্য। সেই অবাক করা দৃষ্টান্ত স্থাপনের পথে বাংলাদেশ সাফল্য লাভ করলে মুক্তি ও স্বাধীনতার পরিস্থিতি বলবান হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ


মন্তব্য