kalerkantho

25th march banner

মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের জনগণ

এমাজউদ্দীন আহমদ

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের জনগণ

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যময় প্রকৃতি এটিই সত্যি বটে, কিছুসংখ্যক বিপথগামী এই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে; কিন্তু শক্তি বলতে যা বোঝায়, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের তেমন শক্তি তখনো ছিল না। পরবর্তী সময়েও সুসংহত হয়ে শক্তির পর্যায়ে কোনো দিন তারা আবির্ভূত হয়নি। বরাবরই জনগণের তীব্র ঘৃণার কুয়াশায় তারা আচ্ছন্ন থেকেছে। পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা এবং পৈশাচিক নৃশংসতার মাধ্যমে টিক্কা খান কিভাবে জনজীবনে দোজখের অভিশাপ নামিয়ে এনেছিলেন

 

‘সরে দাঁড়াও। পিছু হটো। আমাদের যুদ্ধ আমাদেরই করতে দাও।

তোমরা আমাদের বিজয় ছিনিয়ে নেবে না।

আমরা মুক্ত হবোই। আমরা স্বাধীন হবো।

সৃষ্টিকর্তা এবং ন্যায়নীতি আমাদের প্রতীক এবং পতাকা। ’

[‘Hands off ! Stand back ! Leave us alone !
You shall not rob us our victory !
We will be free ! We will be free !
God and Right our Standard be.’]

১৮৮১ সালের বুয়ার্সের রণসংগীতের প্রথম চারটি লাইনে যে কথাগুলো উচ্চারিত হয়েছে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের যেসব সূর্যসন্তান প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধক্ষেত্রে ছুটে গিয়েছিলেন, তাঁদের আকুতি কি এর চেয়ে ভিন্ন কিছু ছিল? না। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলেন নিজেদের যুদ্ধ নিজেরা করে শক্ত হাতে নিজেদের বিজয় ছিনিয়ে আনার দৃঢ় সংকল্প নিয়েই। এ জন্যই তো বিজয় দিবসের আবেদন এই সমাজে এত হৃদয়স্পর্শী। এ কারণেই রক্তসিক্ত ১৬ ডিসেম্বর এ জাতির ইতিহাসে এত গৌরবদীপ্ত। একদিকে তা জাতীয় স্বার্থে রক্তদানের আকুতির প্রতীক, অন্যদিকে আত্মশক্তির মহান প্রতিশ্রুতি। গৌরবময় বিজয়ের স্পর্শধন্য এক রেড লেটার দিবস।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃতি যেমন স্বতন্ত্র, এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রকৃতিও তেমনি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃতি বলতে যা বুঝেছি তা হলো দক্ষিণ এশিয়ার দুটি বৃহৎ রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম অবস্থানের জন্য এ দেশের সাধারণ জনগণের সচেতন উদ্যোগ। এবং এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন পূর্ব বাংলার জনগণ, ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-মজুর, অখ্যাত পল্লীর দুরন্ত তরুণ, নগর-মহানগরীর যুবশক্তি, মিল-ফ্যাক্টরির কর্মী, বিভিন্ন পেশার প্রশিক্ষিত নাগরিকরা। জাতীয় জনসমাজ বলতে যা বোঝায়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তারাই অংশগ্রহণ করে। অংশগ্রহণ করে কোনো দলের সদস্য হিসেবে নয়, নয় কোনো দলের আদর্শে অনুপ্রাণিত অথবা অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে অথবা কোনো নেতার অনুসারী হয়ে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষায়তন ছেড়ে, কৃষকদের একাংশ চাষাবাদ ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। অনেকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের নৈতিক ও ব্যবহারিক সমর্থন দান করে জাতীয় কর্মকাণ্ডে গর্বিত অংশীদার হন। শিল্পী-সাহিত্যিকদের শিল্পকর্ম ও রচনাসম্ভার একই লক্ষ্যে উৎসর্গীকৃত হয়। দীর্ঘদিন পর জাতীয় পর্যায়ে জনগণের যে সার্বিক উদ্যোগ ও আত্মত্যাগের মহোৎসব, তা-ই মূর্ত হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধে। বিজয় দিবস তারই গর্বিত ফসল।

মুক্তিযুদ্ধের তাত্পর্য ব্যাখ্যা করে ওই সময়ে ঢাকার সাপ্তাহিক Forum সম্পাদকীয়তে লেখে : ‘পলাশীর যুদ্ধের পরে এই সর্বপ্রথম বাংলা মুক্ত হলো। ... এইবারই প্রথম বাংলাদেশের জনগণ রাজনীতি ও অর্থনীতির গতি কোনো বিদেশী কায়েমী স্বার্থকে উপেক্ষা করে নিজেরাই নির্ধারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ’[‘For the first time since the Battle of Palasey, Bengal is free. For the first time in two centuries, decisions are made by the people of Bangladesh, directing the course of their politics and economics without reference to the vested interest of alien ruling groups.’]। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যময় প্রকৃতি এটিই সত্যি বটে, কিছুসংখ্যক বিপথগামী এই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে; কিন্তু শক্তি বলতে যা বোঝায়, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের তেমন শক্তি তখনো ছিল না। পরবর্তী সময়েও সুসংহত হয়ে শক্তির পর্যায়ে কোনো দিন তারা আবির্ভূত হয়নি। বরাবরই জনগণের তীব্র ঘৃণার কুয়াশায় তারা আচ্ছন্ন থেকেছে।

কথাগুলো বলছি এ জন্য যে দীর্ঘ ৩১ বছর পরেও মাত্র সেদিন ভারতের গুজরাটের প্রাদেশিক নির্বাচনে ভোট প্রার্থনার এক সভায় ভারতের উপপ্রধানমন্ত্রী এল কে আদভানি তত্কালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হলেও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কাশ্মীরে ভারতের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেন না। ‘হিন্দুত্ববাদী’ ভারতীয় জনতা পার্টির নেতাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে উদার ও সংবেদনশীল মনের অধিকারী, সেই ব্যক্তিটি অর্থাৎ ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়িও আদভানিকে সমর্থন করে তার দুই দিন পর আরেক জনসভায় বলেন, তখন আজাদ কাশ্মীরকে ভারতের দখলে আনা জরুরি ছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবনের জন্য তাই প্রয়োজন পাকিস্তান ও ভারতের নেতারা তখন কী ভাবছিলেন, তাঁদের লক্ষ্য কী ছিল, এই যুদ্ধের পরে তাঁরা কী পেতে চেয়েছিলেন এবং আমরা কেন যুদ্ধে গিয়েছিলাম তা সঠিকভাবে জানা।

পাকিস্তানের সেনানায়করা পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন জনগণকে নিশ্চিহ্ন করে শুধু চেয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানকে, পূর্ব পাকিস্তানের মাটিকে। পাকিস্তানের রক্তপিপাসু জেনারেল টিক্কা খানের ঔদ্ধত্যপূর্ণ দাবি ছিল, ‘আমাকে ৭২ ঘণ্টা সময় দেওয়া হোক, আমি সন্ত্রাসীদের’ (মুক্তিযোদ্ধাদের) নির্মূল করে পূর্ব পাকিস্তান ফিরিয়ে দেব। ’ [‘Give me seventy-two hours time and will give back East Pakistan free of all shades of miscreants.’]।

পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা এবং পৈশাচিক নৃশংসতার মাধ্যমে টিক্কা খান কিভাবে জনজীবনে দোজখের অভিশাপ নামিয়ে এনেছিলেন সে সম্পর্কে জেনারেল এ কে নিয়াজি হামিদুর রহমান কমিশনের কাছে বলেন, “পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর তত্পরতার মূল ভিত্তি ছিল শক্তি প্রয়োগ এবং অনেক স্থানেই নির্বিচারে শক্তির প্রয়োগ করা হয়। জনগণকে সামরিক বাহিনীর প্রতিপক্ষরূপে দাঁড় করানো হয়। তাই (মুক্তিযুদ্ধের) প্রাথমিক পর্যায়ে যে ক্ষতি হয় তা আর কখনো পূরণ করা সম্ভব হয়নি এবং সামরিক বাহিনীর নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তারা ‘চেঙ্গিস খান’ অথবা ‘পূর্ব পাকিস্তানের কসাই’ অভিধা লাভ করেন। ” [“Military action was based on  the use of force primarily, and at many places indiscriminate use of force was resorted to which alienated the public against the army. Damage done during those early days of the military action could never be repaired and earned for the military leaders names such as ‘Chengiz Khan’ and ‘Butcher of East Pakistan’.”]।

শুধু কি তাই, মেজর জেনারেল ফরমান আলী নিজের হাতেই তাঁর নির্দেশনামায় লিখেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ চত্বরকে লাল রঙে রঞ্জিত করে দিতে হবে। ’ [‘The green of East Pakistan will have to be painted red.’]। এসবের অর্থ একটাই হয় এবং তা হলো পূর্ব পাকিস্তানকে স্থায়ীভাবে পাকিস্তানের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখা এবং এ লক্ষ্যে নির্বিচারে সব নির্যাতন চালিয়ে যাওয়া, নৃশংস হত্যাকাণ্ড, নারকীয় ধর্ষণ, লাখ লাখ মানুষকে ঘরছাড়া করা—সবই ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে বন্দি এলাকায় (A captive territory) রূপান্তর করার ষড়যন্ত্রস্বরূপ। একাত্তরের যুদ্ধকে এ আলোকেই দেখেছিলেন তখনকার পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকরা।

এই সংকটকে ভারতের নীতিনির্ধারকরা তখন কী চোখে দেখতেন? অত্যন্ত সচেতনভাবে, ধীরেসুস্থে ভেবেচিন্তে, এই সংকটকালে ভারতীয় নেতারা অগ্রসর হয়েছেন ধীর পদক্ষেপে নিজেদের স্বার্থের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাক্রমে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী রাজ্যসভায় এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘এই মুহূর্তের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা তীব্রভাবে সচেতন। এর সমাধান ক্ষেত্রে কোনো ভ্রান্ত পদক্ষেপ, কোনো ভুল বক্তব্য যেন কোনো প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায় সে সম্পর্কেও আমরা ভীষণভাবে সচেতন। ’ ৩১ মার্চ Indian Institute for Defence Studies and Analysis-‰i cwiPvjK ˆK myeËvþvwbqvg (K. Subrahamanyam) বলেছিলেন, ‘ভারতকে এই সত্য অনুধাবন করতে হবে যে পাকিস্তানকে খণ্ডবিখণ্ড করাই আমাদের স্বার্থের অনুকূল এবং এমন সুযোগ এরপর আর কখনো আসবে না। ’[‘What India must realise is the fact that break-up of Pakistan is in our interest, an opportunity the like of which will never come again.’]। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ‘Bangladesh and India’s National Security : the options of India’ শিরোনামে লিখিত একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন এবং লেখেন যে ‘মুক্ত বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য কোনো বামপন্থী বিপ্লবী সরকার যেন সেখানে অধিষ্ঠিত হতে না পারে তেমন সামরিক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যেতে পারে। ’ [‘By such pre-emptory military moves, India could ensure her security by preventing a radically left-oriented leadership from being installed in power in Bangladesh.’]।

শুধু কি তাই, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ যেন সার্বভৌম বাংলাদেশে পরিণত না হয় সেদিকেও ভারতের নীতিনির্ধারকদের সচেতন দৃষ্টি ছিল। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী (Joint Command) গঠনের জন্য যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় সেই চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ; কিন্তু ভারতের পক্ষে স্বাক্ষর করেন ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর চেয়ারম্যান শ্যাম মানেক শ ও নীতিনির্ধারণী কমিটির চেয়ারম্যান ডি পি ধর। অন্য কথায় স্বাধীন বাংলাদেশ ভারতীয় প্রশাসনিক কাঠামোয় ছিল একটি বিভাগতুল্য। খুব জোর একটি প্রদেশের মতো। তাই এমন দলিলে ভারতের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে কেন? একাত্তরের যুদ্ধ এমনই আলোকে ধরা পড়েছিল ভারতের নীতিনির্ধারকদের চোখে।

 লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য