kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


মনের কোণে হীরে-মুক্তো

সুষ্ঠু বিচার প্রশাসন ও মামলা ব্যবস্থাপনা ন্যায়বিচারের প্রকৃষ্ট সহায়ক

ড. সা’দত হুসাইন

২৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সুষ্ঠু বিচার প্রশাসন ও মামলা ব্যবস্থাপনা ন্যায়বিচারের প্রকৃষ্ট সহায়ক

আমরা সবাই আমাদের প্রাসঙ্গিক জনপদে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। যে জনপদে একাধিক ব্যক্তি বাস করে, সেখানে বিবাদ-বিসংবাদ, সংঘাত-সংঘর্ষ ঘটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। সৃষ্টির আদিযুগ থেকেই সংঘাত-সংঘর্ষ ঘটেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমরা হাবিল-কাবিলের গল্প শুনেছি; হিন্দু পুরাণে, গ্রিক পুরাণে কিংবা চীনা রূপকথায় সংঘাত-সংঘর্ষের কাহিনী পড়ে বড় হয়েছি। সভ্যতা অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘অ্যারিওপ্যাগাস’, কাজির অফিস ও বিচারকের আদালত রাজা-বাদশাহর দরবারের মতোই ধারাবাহিক স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। রাজা-বাদশাহদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ ও রাজার সরাসরি নির্দেশে সংঘটিত হত্যা, শারীরিক নিগ্রহ, অগ্নিসংযোগ, সম্পত্তি দখল ইত্যাদি ব্যতিরেকে অন্যান্য অপরাধের প্রতিকারের আশায় নাগরিকরা বিচারকের আদালতে অভিযোগ নিয়ে হাজির হতো। বিচারক তাঁর নিজস্ব বুদ্ধি-বিবেচনা ও প্রচলিত বিচার পদ্ধতি অনুসরণ করে মামলার রায় ঘোষণা করতেন। নাগরিকরা সাধারণত বিনা বাক্য ব্যয়ে রায় মেনে নিত। এই আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সময়োত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচারালয়গুলো টিকে আছে।

উপমহাদেশের বিচারব্যবস্থা মোটামুটিভাবে যুক্তরাজ্যের বিচারব্যবস্থার আঙ্গিকে গড়ে উঠেছে। ভারত ও পাকিস্তানে ফেডারেল শাসনব্যবস্থা প্রচলিত থাকার কারণে উচ্চ আদালতের স্তরবিন্যাসে প্রশাসনিক কাঠামোর আদল দৃশ্যমান। প্রাদেশিক পর্যায়ের উচ্চতম আদালত হচ্ছে হাইকোর্ট। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে রয়েছে শীর্ষ আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট। এককেন্দ্রিক (Unitary) বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট দ্বি-স্তরবিশিষ্ট; এর শীর্ষ স্তরে রয়েছে ‘অ্যাপিলিয়েট ডিভিশন’ এবং অব্যবহিত নিম্নধাপে রয়েছে ‘হাইকোর্ট ডিভিশন’। ‘অ্যাপিলিয়েট ডিভিশন’ ও ‘হাইকোর্ট বিভাগ’ সংবলিত সুপ্রিম কোর্ট সামগ্রিকভাবে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিজন মাননীয় বিচারপতির নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলি সংবিধানের অনুশাসন দ্বারা সংরক্ষিত। সুপ্রিম কোর্ট তথা বিচার বিভাগ সরকারের অংশ নয়, সরকারের আওতাধীন কোনো সংস্থাও নয়। এটি সরকারের তিনটি স্বতন্ত্র অঙ্গের অন্যতম। অন্য দুটি অংশ হচ্ছে সংসদ ও নির্বাহী বিভাগ। এর মধ্যে নির্বাহী বিভাগের স্বাধীনতা সবচেয়ে কম। তার ওপর সংসদ ও বিচার বিভাগের অনুধাবনযোগ্য নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। মাঠপর্যায়ের বিচারালয়গুলো সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি কার্যার্থক (operational) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ব্যক্তিক প্রশাসনের (Personnel Administration) ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগি করে চলতে হলেও বিচারিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিম্ন আদালতগুলোর ওপর সুপ্রিম কোর্টের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ-নির্দেশ-অনুশাসন নিম্ন আদালতগুলোকে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে চলতে হয়। আপিল পদ্ধতির মাধ্যমে নিম্ন আদালতের রায় বা মামলা বিষয়ক অন্তর্বর্তীকালীন সিদ্ধান্তগুলো পুনঃপরীক্ষণ অথবা পুনর্বিচারের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আসে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পুনর্বিচার করে প্রথমে ‘হাইকোর্ট ডিভিশন’ রায় বা সিদ্ধান্ত দেন। পরবর্তীকালে আপিল হলে ‘অ্যাপিলিয়েট ডিভিশন’ চূড়ান্ত রায় বা সিদ্ধান্ত দেন। এ রায় দেশের সব নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের জন্য শিরোধার্য; সবাই তা মেনে চলতে বাধ্য।

আমরা যখন মামলা সম্পর্কে কথা বলি তখন বিচারিক কাঠামোর মাধ্যমে পাওয়া রায়, বিশেষ করে চূড়ান্ত রায়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। মামলার রায়ের ব্যাপারে দেশের মানুষ সাধারণভাবে সন্তুষ্ট। নগণ্যসংখ্যক মামলা বাদে রায়ের ব্যাপারে তাদের তেমন কোনো সংক্ষোভ নেই। যে বিয়ষটি অনেকের দৃষ্টিতে আসে না, তা হচ্ছে মামলার দুটি অংশের পৃথক অস্তিত্ব ও পৃথক অবস্থান। একটি হচ্ছে মামলার Substantive বা মৌল অংশ এবং অপরটি হচ্ছে Procedural বা পদ্ধতিবিষয়ক অংশ। Procedural অংশের বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে বিচার প্রশাসন ও মামলা ব্যবস্থাপনা। Procedural অংশে রয়েছে অভিযুক্তের জামিন, অভিযুক্তকে রিমান্ডে প্রেরণ, তাকে কারাগারে ডিভিশন প্রদান, মামলার তারিখ ও ক্ষেত্রে বিশেষ স্থান নির্ধারণ, পলাতক আসামির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, মামলার তদন্তের গতি মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের মামলার তারিখে আদালতে হাজির করানো, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা ও তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, মামলার সাক্ষীদের সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বা সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বারিত করা, কোর্টের আদেশের সত্যায়িত কপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিতরণ করা, কেস সমাপ্তকরণের সময় নির্ধারণ, কেস ভিন্ন কোর্টে স্থানান্তর, বিচারক নির্দিষ্টকরণ ও বিচারক বদলীকরণ ইত্যাদি। বাদী ও অভিযুক্তের জন্য মূল মামলার চেয়ে মামলার Procedural অংশ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তির স্বাচ্ছন্দ্য, সুবিধা-অসুবিধা, তাঁর যন্ত্রণা-পীড়ন, হয়রানি, ব্যথা-বেদনা নির্ভর করে Procedural অংশে তিনি কেমন আচরণের সম্মুখীন হচ্ছেন তার ওপর।

প্রভাবশালী গোষ্ঠী, বিশেষ করে শাসক গোষ্ঠীর দৃষ্টি থাকে মামলার Procedural অংশের দিকে। সেই মোনায়েম খানের সময় থেকে দেখছি শাসক গোষ্ঠী Procedural অংশের জাঁতাকলে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী তথা বিরোধী দলকে পিষ্ট করার চেষ্টা চালায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন-সহযোগিতা নিয়ে সরকার সমর্থক এনএসএফের পেটোয়া বাহিনী বিরোধী দলের ছাত্রদের ওপর আক্রমণ চালাত। তাদের আহত করে তাদের বিছানা-বইপত্র পুড়িয়ে দিত। সবচেয়ে অন্যায় ও দুঃখজনক ব্যাপার ছিল, এরপর বিরোধী দলের ছাত্রদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা ঠুকে দিত। মামলাগুলো সরকারের খয়ের খাঁ বা বশংবদ বলে পরিচিত ম্যাজিস্ট্রেট আফসার উদ্দিনের কোর্টে যেত এবং এই ম্যাজিস্ট্রেট অভিযুক্ত ছাত্রদের নানাভাবে অপমান-নির্যাতন করতেন। প্রায় সবাইকে জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়ে দিতেন। এভাবে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় মোনায়েম সরকার দমন-পীড়ন করত। সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও নিরীহ ব্যক্তিকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধের ভিত্তিতে রিমান্ড মঞ্জুর করা, ঘন ঘন মামলার তারিখ নির্ধারণ করে প্রতিবারই তারিখ পেছানো, ক্ষেত্রবিশেষে যথাযোগ্য কারণ ছাড়া মামলা বিলম্বিত করা, সমন-ওয়ারেন্ট অভিযুক্ত বা বিবাদীর কাছে যথাযথভাবে না পাঠিয়ে তাঁকে বিপদে ফেলা, দুর্বোধ্য কারণে অতিদ্রুত খুনের আসামিকে জামিন মঞ্জুর করা, মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের ব্যাপারে উদাসীন থাকা, রায় বা নির্দেশের কপি সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানোর ব্যাপারে অযথা বিলম্ব করা অথবা যথাযথভাবে না পাঠানো সম্পর্কিত অজস্র কাহিনী পত্রপত্রিকায় আমরা দেখতে পাই। মামলার Procedural অংশে স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার (Discretionary Power) অযৌক্তিক প্রয়োগ ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা মামলা প্রার্থীরা যে হয়রানি ও যন্ত্রণার সম্মুখীন হন, মূল মামলায় ন্যায়ানুগ রায়ের মাধ্যমে তা উপশম করা সম্ভব হয় না। মামলায় প্রভাবশালী পক্ষ তাই Procedural অংশের হাতিয়ারগুলো ব্যবহার করে দুর্বল ও অসহায় প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার প্রয়াস পায়। Procedural অংশের প্রশাসনিক দুর্বলতা সামগ্রিক বিচারিক কাঠামোর ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এরপর আসি মামলা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে। বিভিন্ন  চ্যানেলে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে সারা দেশে প্রায় ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন আছে। সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি আওতাধীন মামলা রয়েছে প্রায় তিন লাখ। এত বিপুলসংখ্যক মামলার ব্যবস্থাপনা একটি জটিল ও দুরূহ ব্যাপার। মামলার ব্যবস্থাপনা বলতে প্রথমে মামলার সংখ্যা নির্ধারণ, অতঃপর বয়স, প্রকৃতি, ভৌগোলিক অবস্থান ইত্যাদি। প্রকৃতি অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করে মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি, নির্ভুল পরিশৃঙ্খল রেকর্ড সংরক্ষণ, প্রাসঙ্গিক ব্যক্তিদের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ সাধন, অযৌক্তিক বিলম্বের জন্য চিহ্নিত ব্যক্তিদের দায়বদ্ধতার আওতায় আনা ও সুচারুরূপে দ্রুত নিষ্পত্তির সঙ্গে সম্পৃক্তদের পুরস্কৃত করা। এগুলো মূলত প্রশাসনিক কাজ। প্রশাসনিক দক্ষতা ছাড়া এ কাজগুলো যথাযথভাবে সম্পাদন করা সম্ভব নয়। এ জন্য উৎসাহী মনোভাব ও লাগসই প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

আমাদের বিচারিক কাঠামোতে মামলা ব্যবস্থাপনা যথার্থ গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হয় না। সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে এক বছর প্রশিক্ষণকালে আমাদের ফৌজদারি আইন, দেওয়ানি আইন, সাক্ষ্য আইন ও রাজস্ব আইনের ওপর অতি উচ্চমানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মামলা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। সত্যি বলতে কি, এ ব্যাপারে আমাদের কোনো ধারণাই দেওয়া হয়নি। কোনো আলাপ-আলোচনাও হতো না। আইন পেশা ও বিচার কাঠামোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে যে মামলা ব্যবস্থাপনাকে তাঁরা আইনশাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বলে মনে করেন না। এ বিষয়টি তাঁরা মামুলি বিষয় ধরে নিয়ে একে কারণিক (Clerical) বলে আখ্যায়িত করতে পছন্দ করেন। তাঁদের অনেকের ধারণা, এসব আপনাআপনি হয়ে যাবে এবং সাধারণ মানের যেকোনো শিক্ষিত লোক এ কাজ সম্পন্ন করতে পারে। একজন আইনজ্ঞ কিংবা বিচারকের পক্ষে এ কাজে তাঁর মূল্যবান সময় নষ্ট না করাই সমীচীন হবে। এভাবেই পুরো বিচারিক কাঠামোতে মামলা ব্যবস্থাপনা অবহেলা-উপেক্ষার শিকার হয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে মামলার ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অবহেলা করার বিস্বাদ ফল আমরা এখন ভোগ করছি। আদালতে লাখ লাখ মামলা জমে আছে। কবে নাগাদ মামলার জট সন্তোষজনকভাবে কমানো যাবে, নিশ্চিত করে কেউ তা বলতে পারে না। রেকর্ড সংরক্ষণ ও প্রশাসনিক সংযোগের দুর্বলতার জন্য এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে যে সাজাপ্রাপ্ত আসামি সাজার মেয়াদ শেষ না হওয়ার আগেই বেরিয়ে আসছে, রায়ের কপি কারাগারে না পৌঁছানোর কারণে খালাস পাওয়া আসামি বিনা দোষে অযথা বছরের পর বছর কারাগারে আটক থেকেছে, কারাগার থেকে ভুল লোককে বিচারের তারিখে আদালতে হাজির করা হয়েছে। কারাগারে আটক মূল আসামিকে বিচারের তারিখে আদালতে হাজির না করাতে মামলা পিছিয়ে যাচ্ছে, ভুয়া আদেশ-কাগজপত্র দেখিয়ে আসামিকে কারাগার থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে অথবা কোর্ট থেকে তার জামিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় না পাওয়ায় সংক্ষুব্ধ পক্ষকে মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর আপিল করার সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে। বাঁধা-ধরা নিয়ম না থাকায় মামলার তারিখ নির্ধারণের বা তারিখ জানার জন্য আদালতের কর্মচারীদের কৃপার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মামলা ব্যবস্থাপনার এসব দুর্বলতার কারণে নিরীহ সাধারণ মানুষের কাছে আদালতপাড়া একটি ভয়াল চত্বর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার দিকটিও যথাগুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অবশ্য এখানে একটি মৌলিক সমস্যা রয়ে গেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা স্বীকৃত হলেও নিম্ন আদালতের বিচারকদের ব্যক্তিক ব্যবস্থাপনার (Personnel Management) বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একক নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বিচার প্রশাসন ও মামলা ব্যবস্থাপনার সংহতি ক্ষুণ্ন হবে। সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের ফলে বিচারকদের রেকর্ড সংরক্ষণ, শৃঙ্খলা বিধান, পদোন্নতি, পদায়নসহ গুরুত্বপর্ণ বিষয়ে সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হয়, যা মামলা ব্যবস্থাপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা মামলা ব্যবস্থাপনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে অবহেলা করলে বিচার প্রশাসন তথা সামগ্রিক বিচারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পত্রপত্রিকায় এ বিষয়ে নানা ধরনের সীমাবব্ধতা ও দুর্বলতার কাহিনী প্রকাশিত হচ্ছে।

এ লেখার শুরুতে আমি বলেছিলাম যে মামলার মূল অংশের ব্যাপারে সাধারণ জনগণের তেমন একটা আপত্তি নেই। সে অংশের ওপর মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছি। তবে মামলার অপর অংশ, বিশেষ করে বিচার প্রশাসন ও মামলা ব্যবস্থাপনার নানা ধরনের দুর্বলতা দূরীকরণ আবশ্যিক হয়ে পড়ছে। এর জন্য প্রয়োজন হবে বড় রকমের সংস্কার। বিচার প্রশাসন ও মামলা ব্যবস্থাপনা সুসংহত করার প্রয়োজনে একটি শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠন করতে হবে। এ ইউনিটই হবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। এই সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনা হবে সম্পূর্ণ আধুনিক পদ্ধতির। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে শক্তিশালী আইটি ডিভিশন (IT Division)। সচিবালয়টি যাতে পদোন্নতি ও পদায়নের আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে না ওঠে সেদিকে অনমনীয় সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। যাঁরা আইটির তথ্যাদি ব্যবহার করবেন তাঁদের মানসিকতা আইটিবান্ধব হতে হবে। Procedural অংশের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা কমিয়ে সিদ্ধান্তগুলোকে ছকবদ্ধ ফর্মুলায় নিয়ে আসতে হবে। এক কথায় এই সচিবালয়কে আধুনিক আঙ্গিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। আইটিসমৃদ্ধ সচিবালয় বিচার প্রশাসনের স্বচ্ছতা বাড়াবে। বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি কমলে বিচার প্রশাসন ও মামলা অঙ্গনের ভাবমূর্তি অধিকতর সমুন্নত হবে সন্দেহ নেই।   

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও

পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান


মন্তব্য