kalerkantho

রবিবার। ২২ জানুয়ারি ২০১৭ । ৯ মাঘ ১৪২৩। ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বিশেষ সাক্ষাৎকার : হাফিজ উদ্দিন আহমদ

নির্বাচন না করে সরাসরি গেজেট প্রকাশ করে দিলেই ভালো হতো

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নির্বাচন না করে সরাসরি গেজেট প্রকাশ করে দিলেই ভালো হতো

হাফিজ উদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য পেয়েছেন বীরবিক্রম উপাধি। তাঁর বাবা ডা. আজহার উদ্দিন আহমদ, মা বেগম করিমুন্নেসা। হাফিজ উদ্দিন আহমদ ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ অনার্স এবং ১৯৬৫ সালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের সদস্য। ১৯৮৬ সালে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে পর পর ছয়টি নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মেজর (অব.) হাফিজ। ১৯৯৬ সালে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে পাট, পানিসম্পদ ও বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। হাফিজ উদ্দিন আহমদ একাত্তরের মার্চে যশোর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে একজন তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ৩০ মার্চ অধীনস্থ বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে তিনি পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে একান্ত সাক্ষাত্কারে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসহ নিজ দলের পাশাপাশি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোলামেলা কথা বলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন শফিক সাফি

 

কালের কণ্ঠ : দেশব্যাপী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন চলছে। আপনার দলও অংশ নিচ্ছে। এ নির্বাচন কিভাবে দেখছেন আপনি?

 

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : নির্বাচন শব্দটাই এখন বিএনপির জন্য আতঙ্কের বিষয়। যে নির্বাচন হচ্ছে এর অর্থ হলো, বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের কেউ যাতে ভোটকেন্দ্রে না যেতে পারে। গেলে রামদার কোপে কিংবা পিস্তলের গুলিতে প্রার্থীদের আহত করা হয়। এমনকি তাঁদের স্ত্রী-সন্তানরাও এ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বলতে গেলে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। এই হচ্ছে নির্বাচন। যেমন সংসদ নির্বাচন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও পৌরসভা নির্বাচনে ভোটাররা ভোট দিতে পারেননি; একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে না। আর নির্বাচন কমিশনের কথা নাই বা বললাম। তারা হচ্ছে সাক্ষীগোপাল; আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাড়া আর কিছুই নয়। নির্লিপ্ত হয়ে সাধুবাবার মতো বসে আছে তারা। অবস্থা এমন যে নির্বাচন না করে সরাসরি গেজেট প্রকাশ করে দিলেই ভালো হতো। আমরাও সেটা মেনে নিতাম। এতে অন্তত আমাদের কর্মীরা মারধর, আহত কিংবা নিহত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেত। সরকারের প্রতি আমার আহ্বান, গণভবন থেকে প্রার্থী সিলেক্ট করে সরাসরি তেজগাঁও প্রিন্টিং প্রেসে পাঠিয়ে দিয়ে নির্বাচিতদের গেজেট প্রকাশ করে দেওয়া হোক।

 

কালের কণ্ঠ : কয়েক দিন আগে বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে আপনার এলাকায় নির্বাচনী অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। আপনার মতামত কী?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : আমার এলাকায় ৯টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে চারটিতে ভোট হচ্ছে। একটির সিটিং চেয়ারম্যান আমার দলের লোক। বাকি তিনটিরও ছিল। কিন্তু ভয় দেখিয়ে তাদের আওয়ামী লীগে যোগদান করতে বাধ্য করা হয়েছে। ওই সিটিং চেয়ারম্যান মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়েছিলেন। তাঁকে টিএনও অফিসে সবার সামনে উত্তম-মধ্যম দেওয়া হয়েছে। তিনি কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছেন। লালমোহনের প্রার্থীকে সবার সামনে নির্বাচনী প্রচারের সময় রামদা দিয়ে কোপানো হয়েছে। এখন তিনি নির্বাচন শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন, যাতে স্বাভাবিক চলাফেরার সুযোগ তৈরি হয়। শুধু আমার এলাকায়ই যে এ অবস্থা, তা নয়। সারা দেশেরই একই অবস্থা। অনেকেই ভয়ে নির্বাচনে দাঁড়াননি। কেউ কেউ ভয়ে বা বাধ্য হয়ে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন কিংবা এলাকাছাড়া হয়েছেন। এ ধরনের নির্বাচন আওয়ামী লীগের আমলেই সম্ভব।  

 

কালের কণ্ঠ : তাহলে কি দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের কর্তৃত্ব ছড়িয়ে দেওয়া হলো?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : অবশ্যই। কারণ এর মধ্য দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বলা হলো, এই আমাদের প্রার্থী। তিনি নৌকা মার্কায় দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের জয়ী করেন। আগে যেটা হতো। থানার ওসি, জেলার ডিসি নির্বাচন পরিচালনা করতেন। এক এলাকায় হয়তো আওয়ামী লীগের তিনজন প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন। কাকে নির্বাচিত করতে হবে সে সম্পর্কে হয়তো তাঁদের ধারণা থাকত না বা তাঁরা ততটা ওয়াকিবহাল ছিলেন না। এখন যেটা হয়েছে, তাঁরা নিশ্চিত হয়ে ওই নৌকা মার্কার প্রার্থীকে জয়ী করছেন। অন্যদিকে ওই ভোট তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেলে বিএনপির জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকত, সেটাও বন্ধ হলো। এটা একেবারেই নিম্নমানের কৌশল।

 

কালের কণ্ঠ : তাহলে এই নির্বাচন করে সরকারের অর্জন কী?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : বাংলাদেশে যেটা চালু হয়েছে সেটা হচ্ছে ভয়ের সংস্কৃতি। সবাইকে ভয় দেখানো হচ্ছে। আমরা গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকব, পারলে আমাদের সরাও। এটা তাদের থিওরি। এভাবেই তারা ক্ষমতায় থাকতে চায়। তারা বুঝতে পেরেছে, নির্বাচনের মাধ্যমে তারা আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। ভোটে গেলে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। জনগণ ভোট দিলে তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০টি আসনও পাবে না। এমনকি আওয়ামী লীগের লোকেরাও তাদের ভোট দেবে না। সে হিসাবে যে কয় দিন এভাবে থাকা যায়। আর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মদদও তো রয়েছেই। নির্বাচনের আগে তাদের সচিব এসে আমাদের বড় বড় নেতাকে বাধ্য করে দিয়ে যান, এমনকি তাঁদের সরাসরি নির্দেশও ছিল, কিভাবে এ দেশের নির্বাচন পরিচালিত হবে। গেল নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের কোনো ভূমিকা ছিল না। এ কারণেই বিএনপির আন্দোলন।

 

কালের কণ্ঠ : তাহলে বিএনপি এই ইউপি নির্বাচনে গিয়ে কী অর্জন করল?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : জনগণের সামনে আওয়ামী লীগের মুখোশ উন্মোচন করতেই বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। বিএনপি জানে তাদের প্রার্থী ও সমর্থকরা কেউ ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে না। তার পরও গেছে, যাতে আওয়ামী লীগের মুখোশ নতুন প্রজন্মের কাছে উন্মোচিত হয়।

 

কালের কণ্ঠ : নেত্রীকে দলের জন্য ক্ষতিকর পরামর্শ দিচ্ছে একটি মহল—এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়!

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : বিষয়টি আমি খুব কাছ থেকে ‘চেক’ করিনি। এখন বিষয়টি হচ্ছে তৃণমূলে যদি শক্তি থাকে, জানবাজি রেখে মাঠে নামে, তাহলে কে কী বুদ্ধি দিল, গুলশান অফিসের কারা কী করল তাতে কিছু আসে-যায় না। এত অন্যায়-অবিচার; কই আমরা তো রাজপথে নামতে পারছি না। বাইরের জেলাগুলোতে দুর্দান্ত আন্দোলন হয়েছে। স্বাধীনতার পর এর চেয়ে বড় আন্দোলন এ দেশে হয়নি। কিন্তু আমরা ঢাকায় কিছু করতে পারিনি। কারণ ঢাকার নেতাদের এখন বয়স হয়েছে, তাঁরা ধনী হয়ে গেছেন। তাই তাঁদের পক্ষে এখন আর মাঠে নামা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকা শহরের দুর্বলতাই আন্দোলন ও বিএনপির জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহসাই এর সমাধান হবে বলে আশা করি।

 

কালের কণ্ঠ : পর পর দুটি আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। এ সংকট উত্তরণের পথ কী?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার একমাত্র সুনির্দিষ্ট কারণ রাজপথে জীবন দেওয়ার মতো কর্মীর অভাব। বাংলাদেশের কোনো আন্দোলন রাজপথের ভূমিকা ছাড়া সফল হয়নি। তারা (আওয়ামী লীগ) যেভাবে সংবিধান সংশোধন করেছে, তাতে এ দেশে ব্যালটের মাধ্যমে আর ক্ষমতা পরিবর্তন হবে না। সুতরাং এই ফ্যাসিস্ট সরকারকে সরাতে হলে রাজপথে ভূমিকা রাখতে হবে। জীবন দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু কর্মী নিয়ে মাঠে নামলে হবে না, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নামতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : আপনি কি তাহলে সহিংস পথে দাবি আদায়ের কথা বলছেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : সহিংস পথে নয়, রাজপথে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দাবি আদায় করতে হবে। আমরা রাজপথে ১০ লাখ লোক বসে গেলেই সরকারের পতন হয়ে যাবে। ১০ লাখ লোকের দরকার নেই, এক লাখ যুবক যদি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত রাস্তায় বসে যায়, তাহলেই সরকারের পতন হয়ে যাবে। এক লাখের ওপর তো আর গুলি চালাতে পারবে না। যদি চালায়ও তাহলে দু-একজন মরবে। পরে যে গুলি চালিয়েছে সেও মরবে। কারণ জনগণ তো বসে থাকবে না। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তর, একাত্তরে তো এমনই হয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন কিভাবে হবে বলে মনে করেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : ইউপি নির্বাচন যেভাবে হচ্ছে আওয়ামী লীগ ঠিক সেভাবেই করবে। মানুষ এত ক্ষিপ্ত এই সরকারের ওপর যে অতীতে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপরও এতটা ছিল না। দেশের সম্পদ লুট হচ্ছে, মা-বোনের ইজ্জতও নিরাপদ নয়। এ অবস্থার অবসান ব্যালটের মাধ্যমে হবে না। দেশের এমন অবস্থা করতে হবে, যাতে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হয়। রিটার্নিং অফিসার কাঁপবেন। যে জনগণ ৯০ হাজার ভোট দিয়েছে রিটার্নিং অফিসার যেন বুঝতে পারেন যে তাঁর পক্ষে সেখানে ৯ হাজার করা সম্ভব হবে না।  

 

কালের কণ্ঠ : নানা ইস্যুতে প্রতিবেশী দেশ আমাদের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে—এমন অভিযোগ বিএনপির পক্ষ থেকে করা হয়। বিএনপি কি প্রতিবেশীর সঙ্গে যে দূরত্ব তা পূরণ করতে পারছে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : না। কারণ হচ্ছে তারা (ভারত) বিএনপিকে আস্থায় নিচ্ছে না। কারণ তারা বিএনপির স্বভাব জানে। তারা জানে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশের স্বার্থই দেখবে, ভারতের স্বার্থ দেখবে না। এটা তাদের উপলব্ধি আছে। আওয়ামী লীগ যেমন তাদের স্বার্থ (ভারত) দেখবে, সেটা বিএনপি দেখবে না।

 

কালের কণ্ঠ : এই বাস্তবতায় বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল কী হওয়া উচিত?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল কী এটা আমার পক্ষে পুরোপুরি বলা মুশকিল। তবে ভারতের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিএনপিকে ক্ষমতায় যদি যেতে হয়, সে ক্ষেত্রে ওই ক্ষমতায় না যাওয়াই ভালো। এটা আমার ব্যক্তিগত মত।

 

কালের কণ্ঠ : জামায়াত জোটে থাকার কারণে এলডিপি, বিকল্প ধারা, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জেএসডিসহ সুধীসমাজের বড় অংশ বিএনপিকে পছন্দ করছে না বলে অনেকে মনে করেন। জামায়াতের কারণে বিএনপি কি লাভবান, না ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনার মতামত কী?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : ১৯৭১ সালে জামায়াত ‘ভুল’ করেছে—এ কথা যদি জামায়াত স্বীকার করে নেয় ও তাদের নেতৃত্ব থেকে ১৯৭১ সালে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের বাদ দিয়ে পরবর্তী নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসে, তাহলে বিএনপি তাদের সঙ্গে আন্দোলন করতে পারে।  

 

কালের কণ্ঠ : তাহলে কি বর্তমান জামায়াত বিএনপির জন্য বোঝা?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : জামায়াতের বিএনপির সঙ্গে থাকার সুবিধা-অসুবিধা দুটিই রয়েছে। অসুবিধা হলো, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের দল বিএনপির সঙ্গে জামায়াত থাকুক, এটা নতুন প্রজন্ম পছন্দ করে না। আবার সুবিধা হলো, তাদের কর্মীরা ডেডিকেটেড ও লড়াকু। বাস্তবতা হলো, সরকারবিরোধী আন্দোলনে তারা ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। আমার বক্তব্য হলো, জামায়াত ভুল স্বীকার করে বক্তব্য দিলে ও তাদের নেতৃত্বে নতুন প্রজন্ম অর্থাৎ যারা যুদ্ধের পরে জন্মগ্রহণ করেছে বা ওই সময় বালক ছিল তাদের আনা হলে আন্দোলন-সংগ্রামে জামায়াত বিএনপির জন্য সম্পদ হবে।

 

কালের কণ্ঠ : সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কি দেবে মনে হয়?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : আমার মনে হয় না। আমরা যদি বাধ্য করতে পারি, তাহলেই কেবল সম্ভব। তারা জেনেশুনে চেয়ার ছাড়বে কেন! 

 

কালের কণ্ঠ : মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু বলুন।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : একাত্তরের মার্চে আমি যশোর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে একজন তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ৩০ মার্চ আমি অধীনস্থ বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি। যশোর ক্যান্টনমেন্টে আট ঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধের পর ২০০ সৈনিকসহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ক্যান্টনমেন্টের যুদ্ধে লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেন শহীদ হন। বৃহত্তর যশোর এলাকায় শত শত ছাত্র-যুবক আমার সেনাদলে যোগ দিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। প্রধান সেনাপতি কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীর নির্দেশে আমি তাদের মধ্য থেকে ৬০০ তরুণকে আমার ব্যাটালিয়নে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলে রিক্রুট করি। মাত্র দেড় মাসের প্রশিক্ষণ পেয়ে তারা মৃত্যুঞ্জয়ী মুক্তিসেনায় পরিণত হয়। একমাত্র কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে আমিই এ সেনাদের অধিনায়ক ছিলাম। জুন মাসে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল পদাতিক ব্রিগেড জেড ফোর্সের অঙ্গীভূত হয়। মেজর জিয়াউদ্দিন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ও মেজর জিয়াউর রহমান ব্রিগেড কমান্ডার নিযুক্ত হন। তরুণ ছাত্র ও যশোরের বিদ্রোহী সৈনিকদের সমন্বয়ে গঠিত নিয়মিত বাহিনীর প্রথম ইস্ট বেঙ্গল বিভিন্ন রণাঙ্গনে অতুলনীয় শৌর্য-বীর্য প্রদর্শন করে সর্বাধিক সাহসিকতা পুরস্কার অর্জন করে। সম্মুখযুদ্ধে তাদের হতাহতের সংখ্যাও সর্বাধিক, তিনজন কর্মকর্তাসহ ১০৫ জন সৈনিক সম্মুখযুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। আমি নিজেও ৩১ জুলাই শেরপুর জেলার কামালপুর শত্রুঘাঁটি আক্রমণকালে আহত হই। আমার বন্ধু ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ এ যুদ্ধে শহীদ হন।

মুক্তিবাহিনীর সশস্ত্র তত্পরতায় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং মনোবল হারিয়ে ফেলে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সব সেক্টরে পরাভূত, পর্যুদস্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়।

৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত নায়ক এ দেশের সাধারণ মানুষ। স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা রণাঙ্গনে যে অতুলনীয় বীরত্ব, ত্যাগ-তিতিক্ষার পরিচয় দিয়েছেন তার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বিস্ময়ে-আনন্দে অভিভূত হয়েছি। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম আমাদের জীবনের পরম গৌরব।

 

কালের কণ্ঠ : দলের সংস্কারপন্থী প্রশ্নে বিএনপিতে বিভাজন রয়েছে এবং বেশির ভাগই এখনো দলের বাইরে। এর কারণ কী?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : যাঁরা সংস্কারপন্থী ইচ্ছা করলেই তাঁরা আওয়ামী লীগে যেতে পারতেন। আওয়ামী লীগও তাঁদের সাদরে বরণ করে নিত। কিন্তু তাঁরা তো যাননি। তাঁদের দলে নিলে বিএনপি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগেরও একটি বিকল্প বিএনপি গড়ার সুযোগ থাকবে না।

 

কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।


মন্তব্য