kalerkantho


বাস্তুচ্যুত আরব শরণার্থী, পথচ্যুত বিশ্ববিবেক

মুহাম্মদ রুহুল আমীন

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাস্তুচ্যুত আরব শরণার্থী, পথচ্যুত বিশ্ববিবেক

দুর্ভাগ্যের নৌকাযাত্রীদের দুর্ভোগের কথা কি মনে আছে কারো? মিয়ানমারের রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু এবং বাংলাদেশের চাকরি-অন্বেষী ভুখানাঙ্গা মানুষরা বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগরসহ অন্যান্য জলরাশিতে যখন নৌকাযাত্রায় দুর্ভাগ্যের বিষাদ শর্বরীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, সে কথা কি ভুলে গেছি আমরা? পাশাপাশি আফ্রো-এশিয়ার আরব হতভাগারা, যারা তুরস্ক পাড়ি দিয়ে গ্রিস হয়ে একটুখানি আশ্রয়ের জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবর্ণনীয় দুঃখ-যন্ত্রণার শিকার হচ্ছে, তাদের কথা কি ভাবছি আমরা? জাতিসংঘসহ বিশ্ব ফোরামে যখন মানবাধিকার নিয়ে বিশ্ব মোড়লরা মুখে ফেনা তুলছেন, শরণার্থীদের অধিকারসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সংবিধান এবং জাতিসংঘের রীতিনীতিতে স্পষ্ট আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও আমরা কি কখনো শরণার্থীদের সে অধিকার রক্ষায় চিন্তা করছি?

ইইউ কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্স টিমারম্যান্স কয়েক মাস আগে শরণার্থীদের অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার হলেও ইইউ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক সম্প্রতি ইউরোপের ছয়টি দেশ ভ্রমণ করে শরণার্থীদের ব্যাপারে রক্ষণশীল নীতির ঘোষণা দিয়েছেন। শরণার্থীদের তিনি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে ইউরোপে আসতে নিষেধ করেছেন। তিনি কি ভেবেছেন ওই শরণার্থীরা এখন কোথায় যাবে? ২০১৬ সাল শুরু হতে না হতেই গ্রিস, তুরস্ক, ব্রিটেন, ফ্রান্স, এমনকি জার্মানিসহ অন্যান্য উদার ইউরোপীয় দেশ আরব শরণার্থীদের ব্যাপারে নির্লজ্জ বক্তব্য ও মনোভাব ব্যক্ত করছে। প্রথমেই আমরা ইউরোপমুখী আফ্রো-এশীয় আরব শরণার্থী ইস্যুটির প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে আলোচনা করব এবং শরণার্থী সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করব।

আফ্রো-এশিয়ার দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও যুদ্ধবিক্ষত রাষ্ট্রগুলোর অসহায় মানুষ পার্শ্ববর্তী ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোয় আশ্রয় লাভ করলেও শেষ পর্যন্ত সে দেশগুলোর নানা সমস্যার কারণে ইউরোপে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছে। সর্বজনীন মানবাধিকারের মূলনীতিতে ওই ভাগ্যান্বেষী নিরীহ আদমসন্তানদের সমস্যা সমাধানের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা নানামুখী অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং এভাবে ‘ইউরোপে শরণার্থী সংকট’ বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

২০১৪ সালে প্রায় চার কোটি মানুষ পার্শ্ববর্তী তুরস্ক, ইরান, জর্দান, লেবানন, পাকিস্তান, কেনিয়া, চাদ ও ইথিওপিয়া প্রভৃতি দেশে ক্ষণিকের জন্য ঠাঁই নিয়েছিল এ আশায় যে তাদের দেশে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা দূর হলে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবে। সুদূর ইউরোপে আশ্রয় খুঁজেছিল প্রায় সোয়া ছয় লাখ হতভাগা মানুষ এবং প্রায় ৯৫ লাখ মানুষ পৃথিবীর অন্যত্র ছড়িয়ে যায়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ সালে প্রায় তিন লাখ আরব নাগরিক কেবল ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছে। জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টমাস ডে ম্যাজেয়ার বলেছেন, এ বছর শরণার্থীর সংখ্যা পাঁচ থেকে ১০ লাখে পৌঁছবে। তিনি জানিয়েছেন, এরই মধ্যে লিবিয়ায় প্রায় ১০ লাখ শরণার্থী ভূমধ্যসাগর পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।

সিরিয়া, লিবিয়া ও ইরাক থেকে আগত শরণার্থীরা পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশগুলোয় ব্যাপক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করলেও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলো তা সহ্য করে আসছিল। কিন্তু ইউরোপে শরণার্থী প্রবেশ শুরু হওয়া মাত্রই বিশ্বব্যাপী হইচই পড়ে যায় এবং ইউরোপে ভুখানাঙ্গা শরণার্থীরা নানা ভোগান্তির শিকার হয়। প্রথমত, সেঙ্গেন চুক্তিভুক্ত মুক্ত সীমান্ত নীতি বাতিল করে আবার সীমান্ত তল্লাশির চাপ বাড়তে থাকে ইউরোপে। যুক্তরাজ্য অভিবাসী ও শরণার্থী সমস্যা ঠেকাতে আইন করতে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ইউরোপের বর্ণবাদী, ধর্মবাদী ও অভিবাসীবিরোধী দলগুলো বিক্ষোভ কর্মসূচিসহ নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তৃতীয়ত, ইউরোপের অনেক দেশকে শরণার্থীদের কারণে সৃষ্ট ব্যয়ভার মেটাতে হচ্ছে নিজ নিজ দেশের করদাতাদের অর্থে। উদাহরণস্বরূপ জার্মানির একজন করদাতাকে গত বছর নিদেনপক্ষে ২০ ইউরো বেশি কর দিতে হয়েছিল এবং আশঙ্কা করা যাচ্ছে এ বছর এ করের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। এ তিনটি কারণে ইউরোপে আগত এবং গমনেচ্ছু শরণার্থীরা মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, ইউরোপে হঠাৎ করে শরণার্থীরা কেন ভিড় করল? বিভিন্ন গবেষণা, বিশেষত ইউরোপে অভিবাসী ও শরণার্থীবিষয়ক সংগঠনগুলো এর পেছনে পাঁচ-ছয়টি কারণ উল্লেখ করেছে। প্রথমত, সিরিয়া, লিবিয়া ও ইরাকে আত্মঘাতী জাতিগত গৃহযুদ্ধ বৃদ্ধি পাওয়া; দ্বিতীয়ত, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও যুদ্ধরত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিরতার আশা ক্ষীণ হওয়া; তৃতীয়ত, প্রতিবেশী দেশগুলো শরণার্থী গ্রহণে সৃষ্ট অপারগতা; চতুর্থত, তুরস্কের শরণার্থীদের বের করে দেওয়ার আশঙ্কা; পঞ্চমত, আশ্রয়দানকারী দেশগুলোর অর্থনৈতিক বিপর্যয়।

উপরোক্ত কারণে ইউরোপের শরণার্থী সমস্যাটি এখন আর ইউরোপীয় নয়, বরং তা বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আর এ সমস্যা সমাধানে এখনই আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ না করলে অনতিবিলম্বে তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রতি দুর্বার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে বলে আশঙ্কা করা যায়। ইউরোপের শরণার্থী সংকট বিষয়ে স্বয়ং ইউরোপে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। আগেই উল্লেখ করেছি যে যুক্তরাজ্যে শরণার্থী নিয়ন্ত্রক আইন পাস হতে যাচ্ছে, ইউরোপে মুক্ত সীমান্ত নীতি বাতিল করার পাঁয়তারা চলছে এবং সর্বোপরি করভারের আশঙ্কায় ইউরোপীয়রা শরণার্থীদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে। অতএব, নেতিবাচক অবস্থার মধ্যেও শরণার্থীদের প্রতি সুবিচার ও সহানুভূতির পরিবেশও তৈরি হচ্ছে।

 

 

ইইউ কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্স টিমারম্যান্স দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, ‘যাদের সুরক্ষা দরকার তাদের আমরা তাড়িয়ে দিতে পারি না। ’ গত ২৯ আগস্ট জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ইউরোপের শরণার্থী সংকট নিরসনে নিরাপদ ও আইনগত সুযোগ সৃষ্টি করতে তিনি সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোকে অনুরোধ করেছেন। ইইউয়ের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো শরণার্থী সংকট সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী ম্যাত্তিও রেনজি ২৮টি ইউরোপীয় দেশকে শরণার্থীদের ভাগাভাগি করে আশ্রয় দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী শরণার্থীদের যথোপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদাসহকারে আশ্রয়দানের আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ তারা যুদ্ধ, অত্যাচার, নির্যাতন থেকে পালিয়ে এসে ইউরোপে মানবিক আশ্রয় প্রার্থনা করছে। গত ৩০ আগস্ট পোপ ফ্রান্সিস ওই সব অপরাধের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যেগুলো মানবতাকে বিপন্ন করে।

ব্যক্তিগত বিবৃতি ছাড়াও ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি অনতিবিলম্বে ইইউভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ও সুবিচার মন্ত্রণালয়কে শরণার্থী-সংক্রান্ত যৌথ আলোচনা অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণে তত্পর হতে আহ্বান করেছে। বেদনাদায়ক হলো, এরই মধ্যে হাঙ্গেরিসহ কিছু পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্র শরণার্থীদের প্রতি নানা অমানবিক আচরণ প্রদর্শন করছে। গত ৩১ আগস্ট রয়টার্স ও এএফপি প্রচারিত ছবিতে শরণার্থী শিশুরা যেসব প্ল্যাকার্ড বহন করে তাতে লেখা ছিল : ‘I want to go to Germany’, ‘I want to live in security’, ‘We don't want to stay in Hungary’। শরণার্থী অসহায় মানুষদের নানা বিড়ম্বনার কথা পৃথিবী জানে। কয়েক দিন আগে বঙ্গোপসাগরসহ অত্রাঞ্চলে নৌকার যাত্রীদের দুর্ভোগ নিয়ে আমরা অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে দেখেছি। নৌকা ট্র্যাজেডিগুলো এখন নতুনরূপে ট্রাক ট্র্যাজেডিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী ব্যস্ত হাইওয়ের একটি ট্রাক বা লরি থেকে ৭১ জন নিহত সিরীয় শরণার্থীর খবর বিশ্বময় প্রচারিত হলেও তা বিশ্ববিবেককে তেমন নাড়া দিয়েছে বলে তো মনে হচ্ছে না। সমসাময়িক সময়ে ভূমধ্যসাগরের জাহাজের ফাটল ১১১টি নিরীহ জীবন মর্মন্তুদভাবে কেড়ে নিয়েও বিশ্ব নিয়ন্ত্রক শক্তিগুলো এ-সংক্রান্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অধিকন্তু হাঙ্গেরি গত ২৯ আগস্ট থেকে সার্বিয়া সীমান্ত পর্যন্ত ১৭৫ কিলোমিটারজুড়ে ন্যাটোর আদলে তিন ভাঁজের রেজর তারের বেড়া তৈরি করতে শুরু করেছে। অধিকন্তু পাহারা কুত্তা ও 4X4 অস্ত্রের সাহায্যে সীমান্ত প্রহরা জোরদার করা হয়েছে।

শরণার্থী সমস্যাটি যখন কেবল আফ্রো-এশিয়ায় সীমান্ত ছিল তখন বিশ্ব নীরবে তা দেখেছে। কেউ উচ্চবাচ্য করেনি। কেবল দায়সারা গোছের নিছক কূটনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষায় কিছু সেমিনার, বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে বিশ্ব মোড়লরা হম্বিতম্বি দেখিয়েছেন। কিন্তু সমস্যাটি যখন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরস্থ ইউরোপে আছড়ে পড়তে শুরু করেছে তখন বিশ্ব মিডিয়া একটু সোচ্চার হয়েছে। আমার অন্তরে যে চোখ আছে, তা দিয়ে আমি যতটুকু দেখতে পাচ্ছি, তাতে আমি এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলতে পারি। সমস্যাটি এখন কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং তা বৈশ্বিক পরিসরে বিস্ফোরিত হওয়ার মুহূর্তে টাইম বোমার মতো অপেক্ষা করছে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করেন তাঁরা শরণার্থী, অভিবাসী ও মানবপাচার প্রভৃতি ইস্যুকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সমস্যা (non-traditional security threats) হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।   সমস্যাটি দ্রুত সমাধান করতে না পারলে তা দ্রুত বিস্তার লাভ করে অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি করবে। সম্ভবত বিষয়টি অনুধাবন করেছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী এবং সে কারণে তিনি ২৮টি ইউরোপীয় দেশকে ভাগাভাগি করে শরণার্থী সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইতিমধ্যে বিশ্বময় নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে এ সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে যে সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাকসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, সংঘাতের ফলে ইউরোপে শরণার্থী সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক এমনও প্রশ্ন রেখেছেন যে যাদের কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে, যে কারণে এ সমস্যা ঘনীভূত হয়েছে, সে বিষয় নিয়ে পৃথিবীতে তেমন কোনো আলোচনা হচ্ছে না। এ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আমি একাত্ম হয়ে স্পষ্ট করে বলছি, শরণার্থী সংকট তৈরি হয়েছে আফ্রো-এশীয় অঞ্চলে কায়েমি স্বার্থান্ধ মহলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ হাসিলের নিরন্তর উদ্যোগের ফলে। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় যে স্বার্থ-লড়াই শুরু হয়েছিল, তা আজ স্নায়ুযুদ্ধোত্তরকালে বিস্ফোরিত হয়েছে মাত্র। এখন অত্রাঞ্চলে জবরদখলতত্ত্ব (hegemonic stability theory) টিকিয়ে রাখতে বর্তমান বিশ্বের প্রতাপশালী রাষ্ট্রগুলো সেখানে গোত্রীয় দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় বিবাদ, গোষ্ঠী-লড়াই, সীমান্ত-লড়াই প্রভৃতি নিরন্তর দ্বন্দ্ব চাঙ্গা করে রাখছে। আমরা গত দু-তিন বছরে শান্ত-সুনিবিড় স্বস্তিময়-সমৃদ্ধিময় রাষ্ট্র লিবিয়াকে আজনবি অস্থিরতায় ছটফট করতে দেখেছি। অমিততেজ সিরিয়াকে গৃহযুদ্ধে ন্যুব্জ হতে দেখেছি, প্রবল পরাক্রমময় ইরাককে ভেঙে তছনছ হতে দেখেছি। অথচ এ রাষ্ট্রগুলো ছিল একসময় এশিয়া-আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোর রুটি-রুজির আশ্রয়, বাঁচার ঠিকানা, আশার আলো। ইয়েমেন, কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরবসহ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোও আজ বিশ্ব-তাঁবেদার শক্তির শাণিত পর্যবেক্ষণে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশের এমন পরিস্থিতিতে এখন অত্রাঞ্চলে বিশ্ব মোড়লদের নীতি পর্যালোচনার উপযুক্ত সময়। শরণার্থী সমস্যা সমাধানে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। এ নীতির স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য হলো, ইউরোপের সীমানাগুলোয় ‘মুক্তনীতি’ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সে জন্য ইইউকে আইন করতে হবে। হাঙ্গেরির মতো অন্য কোনো দেশ যেন কাঁটাতারের বেড়া না দেয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শরণার্থীদের পূর্ণ মানবীয় মর্যাদা দিয়ে প্রবেশাধিকার দিতে হবে এবং ইউরোপে তাদের বসবাস ও কাজকর্ম করার অনুমতি দিতে হবে। মিডিয়ার মাধ্যমে জেনেছি যুক্তরাষ্ট্রও নানা ধাপে বিশেষ সংখ্যায় শরণার্থী গ্রহণে রাজি হয়েছে। খবরটি সুখকর। কারণ স্নায়ুযুদ্ধোত্তরকালে আফ্রো-এশীয় শরণার্থী সূত্র দেশগুলোর স্বার্থ-লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাই মুখ্য। এ কথা আরো স্পষ্ট করলে বলতে হয় যে মধ্যপ্রাচ্যের তেল, গ্যাস, পানি সম্পদ নিয়ে যে লড়াই চলছে এবং সম্ভাব্য যে লড়াইগুলো অপেক্ষা করছে, তাতে মূল নেতৃত্ব ও নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এবং অত্রাঞ্চলের যেকোনো যুদ্ধ-দ্বন্দ্বের ফলে সৃষ্ট স্ট্র্যাটেজিক সুবিধার সিংহভাগ যাবে যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। সংগত কারণে শরণার্থী সংকট নিরসনে মুখ্য ভূমিকা পালনে যুক্তরাষ্ট্রকেই তত্পর হতে হবে। একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যে মর্যাদা ও দায়িত্বে অভিষিক্ত করেছে, তার যথাযথ বাস্তবায়নের যোগ্যতাও যুক্তরাষ্ট্রের আছে। শুধু জবাবদিহি ও দায়িত্ববোধের নতুন চেতনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শরণার্থী সমস্যাসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ইস্যু সমাধানে নিষ্ঠাবান হলেই শরণার্থীকেন্দ্রিক যে বৈশ্বিক নিরাপত্তা-ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা স্তিমিত হবে শিগগিরই।

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

mramin68@yahoo.com


মন্তব্য