kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো

ইসলামে উম্মাহ বা জাতীয়তাবাদের চেতনা

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ইসলামে উম্মাহ বা জাতীয়তাবাদের চেতনা

১৯. মানুষ ছিল একই জাতি। পরে তারা মতভেদ সৃষ্টি করে।

(মতভেদকারীদের পরকালে শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে) তোমার প্রতিপালকের পূর্ব ঘোষণা না থাকলে তারা যে বিষয়ে মতভেদ করে তার মীমাংসা (দুনিয়ায়ই) হয়ে যেত। (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ১৯)

তাফসির : আলোচ্য আয়াতের প্রথম অংশ থেকে জানা যায়, পরিপূর্ণ আলোর মধ্যেই দুনিয়ায় মানবজীবনের সূচনা হয়েছে। আদিতে বনি আদম হেদায়েত ও সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তখন তারা একই জাতি ও একই দলভুক্ত ছিল। সবাই একজন স্রষ্টায় বিশ্বাস করত। সবাই আল্লাহর ইবাদত করত। পরে মানুষ নতুন নতুন পথ ও বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে থাকে। হাদিসের ভাষ্য মতে, ধর্মপ্রবণতা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। জন্মগতভাবে সব মানুষের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের যোগ্যতা আছে।

ধর্মীয় বহু বিভক্তির পরও সাধারণ মানুষ যদি নিজের বোধ, বিবেক ও বিচার শক্তিকে কাজে লাগায় তাহলে সত্য ও সঠিক ধর্ম বেছে নেওয়া সম্ভব। প্রশ্ন হলো, সঠিক ধর্ম যদি একটাই হয়, তাহলে অন্যদের ব্যাপারে চূড়ান্ত মীমাংসা হচ্ছে না কেন? অবিশ্বাসীদের আজাব দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয় না কেন? এই আয়াতের দ্বিতীয় অংশে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, দুনিয়া হলো মানুষের জন্য পরীক্ষাকেন্দ্র। আল্লাহ আগেই ঘোষণা দিয়েছেন যে দুনিয়ায় মানুষের ভালো কিংবা মন্দ কাজের চূড়ান্ত ফয়সালা হবে না। সব কিছুর চূড়ান্ত ফয়সালা হবে পরকালে। তবে দুনিয়ায় মানুষকে পাপের শাস্তিস্বরূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আজাব দেওয়া হয়, যাতে তারা সতর্ক হতে পারে। এমনকি পরকালের চূড়ান্ত মীমাংসার আগে কোনো কোনো জাতিকে দুনিয়ায়ই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্ত হলো তিনি অন্য নবীর উম্মতের মতো এই উম্মতকে সমূলে ধ্বংস করে দেবেন না। ফলে এ উম্মতের পাপীরা পাপ করেও দুনিয়ায় পার পেয়ে যায়। কিন্তু পরকালে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ইসলামে উম্মাহ বা জাতীয়তাবাদের চেতনা

উম্মত বা উম্মাহর শাব্দিক অর্থ জাতি। ইমাম রাগেব ইস্পাহানি (রহ.) তাঁর ‘মুফরদাতুল কোরআন’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘উম্মাহ বলা হয় এমন মানবগোষ্ঠীকে, যাদের মধ্যে কোনো বিশেষ কারণে সংযোগ ও ঐক্য বিদ্যমান। সে ঐক্য মতাদর্শ, বিশ্বাস, দেশ, বংশ, বর্ণ ও ভাষার সমতার কারণেও হতে পারে। ’ কিন্তু সব তাফসিরবিদ এ বিষয়ে একমত যে কোরআনে যে জাতীয়তা বা ঐক্যের কথা বলা হয়েছে সেটি হলো ধর্মীয় ঐক্য ও জাতীয়তা। বংশ, বর্ণ, দেশ ও ভাষার সীমানা পেরিয়ে এ ঐক্য হতে পারে। তাই কেউ আরবের লোক না হয়েও মুসলিম হতে পারে। আরবিতে কথা না বলেও মুসলিম হতে পারে। যেহেতু পৃথিবীর সব মানুষের পক্ষে একই ধর্মের অনুসরণ বর্তমানে সম্ভব নয়, তাই ইসলাম চেয়েছে গোটা পৃথিবীর মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় ঐক্য বজায় থাকুক। এ ঐক্যের মূল উৎস তাওহিদ বা একত্ববাদের বিশ্বাস। এটা মুসলমানদের ইমান ও বিশ্বাসের ঐক্য। কাবা শরিফের দিকে মুখ করে গোটা পৃথিবীর মুসলমানরা নামাজ পড়ে। মক্কায় গিয়ে হজ আদায় করে। এটা তাদের ইবাদতের ঐক্য। পৃথিবীর সব মুসলমান একই কোরআন পাঠ করে। একই নবী মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসরণ করে। এটা তাদের আদর্শিক ঐক্য। এভাবে মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়। এভাবে তাদের মধ্যে উম্মাহ বা জাতীয়তাবাদের চেতনা ফুটে ওঠে। সে অর্থে মুসলমানরা পৃথক একটা জাতি। অন্যদিকে ইসলামের শিক্ষা হলো, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সব মানুষ আদম সন্তান। তাই সব ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার প্রতি ইসলাম সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। মুসলিম ও অমুসলিম দুটি পৃথক জাতি হয়েও মানুষ হিসেবে তারা এক। যেভাবে নারী-পুরুষ, শাসক-শাসিত, ধনী-গরিব, কর্মকর্তা-কর্মচারী, যুবক-বৃদ্ধ স্বদেশি-বিদেশি প্রমুখ পৃথক জাতি ও শ্রেণিভুক্ত হয়েও মানুষ হিসেবে তারা সবাই এক ও অভিন্ন।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য