kalerkantho


‘বঙ্গবন্ধু’ বলতে না পারার হীনম্মন্যতা

এ কে এম শাহনাওয়াজ   

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘বঙ্গবন্ধু’ বলতে না পারার হীনম্মন্যতা

মাস কয়েক আগের কথা। আমন্ত্রিত হয়ে এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম।

কলেজপড়ুয়া কৌতূহলী এক ছাত্র নানা প্রশ্ন করছিল আমাকে। ওর একটি প্রশ্ন আমার কাছে খুব শাণিত মনে হলো। আবির নামের ছেলেটির প্রশ্ন—আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও এ দেশের বেশির ভাগ মানুষই শেখ মুজিব বলার আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে, আর শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলে ‘জননেত্রী’; কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে দেশনেত্রী বলেন না। আবার বিএনপির নেতা-নেত্রীরা খালেদা জিয়াকে দেশনেত্রী বলেন; কিন্তু শেখ হাসিনাকে জননেত্রী তো বলেনই না, শেখ মুজিবকেও বঙ্গবন্ধু বলেন না। আমাদের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা এমন আচরণ কেন করেন! আমি জানি একটি সরল উত্তর ওদের জানা আছে। তা হচ্ছে—‘জননেত্রী’ আর ‘দেশনেত্রী’ যার যার দলীয় উপাধি। আমজনতা এ উপাধিতে নেত্রীদের সম্বোধন করতে পারে আবার নাও করতে পারে। এতে দোষের কিছু থাকবে না। তবে ‘বঙ্গবন্ধু’ না বলতে পারাটা অবশ্যই হীনম্মন্যতা। এ উপাধি অনেক আবেগ আর ভালোবাসা থেকে জনগণ দিয়েছে। তাই একমাত্র জনবিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীই বঙ্গবন্ধু উচ্চারণে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। এ প্রসঙ্গ নিয়ে মূল আলোচনা একটু পরে করছি।

রাজনীতি বোধ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখন অনেক বেশি সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এখন নেতাকর্মীরা ক্ষমতাবান দলীয় নেতৃত্বের শাসনে এতটাই শঙ্কিত থাকে যে স্বতঃস্ফূর্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতাও যেন হারিয়ে ফেলেছে। আমি একবার আওয়ামী লীগ সমর্থক-নেতা আমার এক বন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলাম—এই যে মাঝে মাঝে দেখি আওয়ামী লীগের ছোট-বড় সব নেতা-নেত্রী শেখ হাসিনার নাম বলার আগে ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী’ কথাটা বলে নেন; অন্তত ‘জননেত্রী’ কথাটা তো বলবেনই। সতর্ক থাকেন যাতে ভুল না হয়। একই বক্তৃতায় বারবার বিশেষণ না বললে কী হয়? তিনি হাসতে হাসতে বললেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন এতে অনেক কিছু হয়। দলীয় নেত্রীর প্রতি আনুগত্য কতটা বেশি তা প্রকাশ করাটা জরুরি। হয়তো শেখ হাসিনা নিজে বিষয়টি নিয়ে ভাবেনওনি। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক সংকটে পড়ে নেতা-নেত্রীদের এমন করে ভাবতে হয়। খালেদা জিয়াকে ‘দেশনেত্রী’ বলার পেছনেও মনস্তাত্ত্বিক কারণ সম্ভবত একই। বিএনপির ভেতরে আরেকটি হাস্যকর বিষয় ছিল এক সময়। এক দশকেরও বেশি আগের কথা বলছি। তখন বিএনপির শাসনামল। তারেক জিয়াকে সামনে আনার প্রক্রিয়া চলছে। এ সময় ছাত্রদলের তরুণদের ওপর একটি লাইন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বক্তৃতা শেষ করার আগে ওদের বলতে হবে ‘শহীদ জিয়া জিন্দাবাদ, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ, আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারুণ্যের অহংকার তারেক জিয়া জিন্দাবাদ। ’ আমি তখন একটি হলের প্রভোস্ট। হলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে থাকতে হয়। ছাত্রদলের তেমন একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। অনুষ্ঠানের সভাপতি ছাত্রদল নেতা বক্তৃতা শেষে গত্বাঁধা লাইনটি বলতে গিয়ে ভুলবশত দেশনেত্রী খালেদা জিয়া পর্যন্ত বলে বক্তৃতা শেষ করলেন। মঞ্চে বিছানো কার্পেটে বসতে গিয়ে মনে করতে পারলেন ভুলটি। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের গতিতে উঠে গেলেন। চট করে স্পিকার টেনে নিয়ে ‘আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারুণ্যের অহংকার তারেক জিয়া জিন্দাবাদ’ বলে আবার আসনে বসলেন। একটি মৃদু হাস্যরোল উঠল। তিনি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। পরে আমার প্রশ্নের উত্তরে ছাত্রদলের সদস্য আমার এক ছাত্র বলেছিল, এটি না করে তাঁর উপায় ছিল না। বিশেষণসহ তারেক জিয়া নামটি না বলার অপরাধে আগামী কমিটিতে তিনি পদ নাও পেতে পারতেন।

এবার আসি ‘বঙ্গবন্ধু’ বলাটা কেন অনেকটাই অপরিহার্য। বয়সীদের কাছে কথাগুলো নতুন নয়। আমার বলা নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে। বারবার যাঁদের ইতিহাস থেকে টেনে বিচ্ছিন্ন করতে চায় অপশক্তি। বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে কালেভদ্রে ক্ষণজন্মা মানুষের জন্ম হয়। সময়ের প্রয়োজনেই যেন প্রকৃতি এই জন্মের আয়োজনটি করে দেয়। বাংলার ইতিহাসে এমন উজ্জ্বল উদাহরণ অনেক আছে। কখনো ধর্ম রক্ষার প্রয়োজনে, কখনো রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে আবার কখনো সমাজ সংস্কারের প্রয়োজনে ইতিহাসের পাতায় এসে দাঁড়াতে দেখেছে ইতিহাস অনুসন্ধিত্সু মানুষ। প্রাচীন বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মকে স্বমর্যাদায় দাঁড় করাতে বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছিলেন শীলভদ্র, শান্তিরক্ষিত ও শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর। মধ্য যুগে হিন্দু সমাজ ও ধর্ম রক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন শ্রী চৈতন্য। ইংরেজ শাসন যুগে ইউরোপীয় আধুনিকতার জোয়ার যখন বাংলার বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ল, তখন সনাতন হিন্দু সমাজ রক্ষণশীলতার অচলায়তন ভেঙে এগিয়ে আসতে পারল না। এভাবে তারা সভ্যতা এগিয়ে চলার নিয়ম ভাঙতে ব্যর্থ হলো। মুসলমানরা তো পরাজয়ের ক্ষোভ ভুলতে না পেরে অভিমান করে চলে গেল আরো অন্ধকারে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাঙালি সমাজ অবধারিতভাবে আত্মপরিচয় ভুলে যেত। তাই সমাজ সংস্কার ছাড়া বিকল্প ছিল না। ফলে এই দুই সমাজকে উদ্ধার করার জন্য প্রকৃতির দায় পড়েছিল ক্ষণজন্মা বাঙালিকে প্রকাশ করা। তাই উনিশ শতকে মঞ্চে আবির্ভূত হলেন রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁরা রক্ষা করেছিলেন বাংলার হিন্দু সমাজকে। একটু দেরিতে হলেও বোধোদয় হয় মুসলমান নেতৃত্বের। নিজ সমাজ রক্ষায় আধুনিক শিক্ষায় নিজ সম্প্রদায়ের যুক্ত হওয়া যে জরুরি তাঁরা তা উপলব্ধি করলেন। তাই সমাজ সংস্কারে এগিয়ে এলেন নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী, হাজী মুহম্মদ মুহসীন প্রমুখ। এভাবে তাঁরা রক্ষা করলেন মুসলমান সমাজকে। এসব ব্যক্তিত্ব অতুলনীয়। তাই নিজ ঔজ্জ্বল্যেই তাঁরা ইতিহাসের উচ্চাসনে সমাসীন।

তবে শেখ মুজিবের বেড়ে ওঠাটা একটু আলাদা। যুগের বা সময়ের প্রয়োজনে প্রকৃতি থেকে হঠাৎ জন্ম নেওয়া নয়। বাঙালির মুক্তির অগ্রদূত হতে তিলে তিলে তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন। জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তানের উর্দুভাষী শাসকগোষ্ঠী সংকট তৈরি করেছিল। যে বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতা অর্জনে সোচ্চার হয়েছিল, চার মাসের মাথায় তাদেরই মোহভঙ্গ হলো। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে স্লোগান তুলতে হলো ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে।

বাঙালির প্রতিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে তরুণ শেখ মুজিব শুরু থেকেই নিজেকে যুক্ত করেছেন। তিল তিল করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ সৃষ্টির সঙ্গে ১৯৪৯ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগ জন্মের মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনেকটা অভিন্ন। মুসলিম লীগ জন্মের অনেক আগেই ব্রিটিশ ভারতের হিন্দু-মুসলমানের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। কিন্তু ১৯০৩ সালে সরকারের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার কথা ঘোষিত হলে কংগ্রেসের প্রভাবশালী হিন্দু নেতারা এর বিরোধিতা করেন। কংগ্রেসের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের প্রশ্নে মুসলিম নেতাদের মনে সন্দেহ তৈরি হয়। তাই মুসলমানের অধিকার সংরক্ষণে নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন তৈরির অভিপ্রায়ে ঢাকায় জন্ম নেয় ‘মুসলিম লীগ’।

পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র জন্মের পরপরই ভাষার প্রশ্নে দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালির অধিকার সংরক্ষণের প্রশ্ন আওয়ামী মুসলিম লীগ জন্মের নিয়ামক ছিল। তরুণ শেখ মুজিব কিন্তু এর আগেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। পরের বছর আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি নিজ যোগ্যতায় এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদকের পদ লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ দলটি অসাম্প্রদায়িক ঘোষণা করে দলের নতুন নামকরণ হয় আওয়ামী লীগ। ততক্ষণে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক পরিপক্বতা একটি বিশেষ মানে পৌঁছে গেছে। আর এর স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যায় তিনি ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

মোহভঙ্গ বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রশ্নে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইতিমধ্যে শেরেবাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে কৃষক প্রজা পার্টি। ষাটের দশকের শুরুর দিকেই আইয়ুব খানের শোষক চরিত্র স্পষ্ট হয়ে পড়ে বাঙালির কাছে। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে শেখ মুজিবের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল। ধীরে ধীরে নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চলে আসেন শেখ মুজিব। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ছাত্রলীগও পাশে এসে দাঁড়ায়।

এরই মধ্যে ১৯৬৩ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুবরণ করেন। আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগের হাল এবার শক্ত করে ধরেন শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগের এই যোগ্য সাধারণ সম্পাদক এলিট শ্রেণির সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হন। আইয়ুব খান ঘোষণা করেন মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে মৌলিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছিল। পল্টনের জনসভায় শেখ মুজিব ও মওলানা ভাসানী সমস্বরে আওয়াজ তোলেন ‘মৌলিক গণতন্ত্র নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার চাই। ’ নেতৃত্বের আপসহীন মনোভাবের মুখে আইয়ুব খান ভিন্ন পথ ধরলেন। বাধিয়ে দিলেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।

শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হলো। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ‘কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি’ বা ‘কপ’ গঠিত হলো। এই ‘কপ’ গঠনের উদ্যোক্তা ছিলেন শেখ মুজিব। কপের পক্ষ থেকে ফাতেমা জিন্নাহকে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হলো। নির্বাচনের প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন শেখ মুজিব। নির্বাচনের সার্বিক তদারকির জন্য তাঁকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নির্বাচনে আইয়ুব খান জয়ী হয়েছিলেন। এর অন্যতম কারণ ছিল কতিপয় বাঙালি নেতৃত্বের শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী তত্পরতা থেকে অজ্ঞাত কারণে পিছিয়ে আসা। আইয়ুব খান জয়ী হয়েছিলেন বটে, কিন্তু এই নির্বাচনে যে আইয়ুববিরোধী মোর্চা গড়ে ওঠে তা ভবিষ্যতে আইয়ুবের পতনের প্রধান কারণ হয়।

নির্বাচনে জয়লাভের পর আইয়ুব সরকার বাঙালির ওপর অত্যাচার বহু গুণে বাড়িয়ে দেয়। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে মুজিব তাঁর বিখ্যাত ছয় দফা উত্থাপন করেন। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক শোষণ-নিপীড়ন ও অত্যাচারে বাঙালির জীবন যখন অতিষ্ঠ, তখনই ছয় দফা উপস্থাপিত হয়। চরম নিপীড়নের সে সময়টিতে ছয় দফার মতো কর্মসূচি জনগণের সামনে ব্যাপক প্রচারের জন্য নৈতিক সাহসের প্রয়োজন ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান সেই সাহস নিয়েই অগ্রসর হয়েছিলেন।

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি হন শেখ মুজিব। ততক্ষণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছয় দফা ব্যাপক প্রচারিত হতে থাকে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ তার জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে যায়। আইয়ুব শাসনের বড় সময়েই শেখ মুজিব কারারুদ্ধ ছিলেন। প্রথমে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত এবং পরে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবকে নিঃশর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মুক্তির পরদিন অর্থাৎ ২৩ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আহ্বান করে। এ সভায়ই তাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। লাখো মানুষ করতালির মাধ্যমে তা অনুমোদন করে।

ছয় দফার ভেতরেই জেগে ওঠে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। এর শেষ পরিণতি ছিল মুক্তিযুদ্ধ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে শেখ মুজিব সুযোগ-সুবিধায় আবির্ভূত কোনো নেতা নন। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ইতিহাসের সোপান বেয়ে বাঙালির ভালোবাসা থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়েছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে, অপবাদ ছড়িয়ে ইতিহাসকে আড়াল করা সম্ভব নয়। ইতিহাস সৃষ্টি হয় অনেক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। বাংলার মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ ইতিহাসে তাঁর অমরত্বকেই নিশ্চিত করেছে। এককালে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে মুখে ফেনা তুলেছিলেন যাঁরা—এখন নষ্ট রাজনীতির ভেতরে থেকে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করতে পারছেন না। এই না পারাটা যে বাংলার মানুষের আবেগ আর ভালোবাসার সঙ্গে বেইমানি করা। এ সত্যটি মানতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য