kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো

পৃথিবীতে একসময় ধর্মীয় বিভেদ ছিল না

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পৃথিবীতে একসময় ধর্মীয় বিভেদ ছিল না

১৯. (একসময়) মানুষ ছিল একই উম্মত (জাতি), পরে তারা মতভেদ সৃষ্টি করে। [সুরা : ইউনুস, আয়াত : ১৯ (প্রথমাংশ)]

তাফসির : আগের আয়াতে বলা হয়েছিল, উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা নেই প্রতিমার।

আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপাসনার সুযোগ নেই। সেই সূত্র ধরে আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে, পৃথিবীর মানুষ একসময় তাওহিদ বা একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিল। সবাই এক আল্লাহর ইবাদত করত। পৃথিবীতে তখন ধর্মীয় বিভেদ ছিল না। পরে মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রশ্ন হলো, এ সত্য দ্বীন ও ইমানের ওপর সব মানুষের ঐক্য কোন যুগে ছিল এবং তা কোন যুগ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল? তাফসিরকারক সাহাবিদের মধ্যে হজরত উবাই ইবনে কাআব ও ইবনে জায়েদ (রা.) বলেছেন, “এ ঘটনা ‘আলমে-আজল’ বা আত্মার জগতে ঘটেছে। ” অর্থাৎ সব মানুষের আত্মা সৃষ্টি করে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই?’ তখন একবাক্যে সবাই আল্লাহকে প্রভু ও পালনকর্তা হিসেবে স্বীকার করে নেয়। (তাফসিরে কুরতুবি)

মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ‘এই ধর্মীয় ঐক্য সে সময়ের, যখন আদম (আ.) সস্ত্রীক দুনিয়ায় আগমন করেন। একপর্যায়ে তাঁদের সন্তান-সন্ততি জন্ম লাভ করে আর মানবগোষ্ঠী বৃদ্ধি পেতে থাকে।

তারা সবাই তাঁর ধর্ম, শিক্ষা ও শরিয়তের অনুগত ছিল। এই ধর্মীয় ঐক্য চলতে থাকে আদম (আ.)-এর পুত্র কাবিল তার ভাই হাবিলকে হত্যা করা পর্যন্ত। ’ (আত-তাফসিরুল বাসিত লিল ওয়াহিদি)

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘হজরত আদম ও নুহ (আ.)-এর মাঝখানে ১০ শতাব্দী পার হয়েছে। সব শতাব্দীর মানুষ মুসলমান তথা একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিল। এরপর তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। তারা মূর্তি পূজা আরম্ভ করে। ’ (ইবনে কাসির, তাফসিরে মুনির)

প্রকৃতপক্ষে এ তিন মতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। তিনটি যুগই এমন ছিল, যেগুলোতে সব মানুষ একই মতবাদ ও একই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সবাই সত্য ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

দুনিয়ায় অনেক ধর্ম আছে। সব ধর্মের লোক নিজের ধর্মকে সত্য মনে করে। এ অবস্থায় এগুলোর মধ্যে কোন ধর্ম সঠিক আর কোন ধর্ম মিথ্যা তা জানার উপায় কী? আলোচ্য আয়াতে এ প্রশ্নের জবাব দিয়ে বলা হয়েছে, ধর্মীয় বিরোধ ও মতপার্থক্য পরবর্তীকালের সৃষ্টি। গোড়াতে গোটা মানবগোষ্ঠী একই ধর্মের আওতাধীন ছিল। সেটিই ছিল সত্য ধর্ম। সেটির নামই ইসলাম। মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে সেই ইসলাম পূর্ণতা লাভ করে। একসময় ঐক্যবদ্ধ থাকার পর মানুষ বিভিন্ন আকিদা-বিশ্বাস ও ধর্ম রচনা করে। মানুষের উচিত চোখ-কান খোলা রেখে মুক্তমনে সঠিক ধর্মের অন্বেষণ করা।   বুদ্ধি ও চেতনার সঠিক ব্যবহার করে কেবল আল্লাহর সামনে নিজেকে সমর্পণ করা। দুনিয়ার এ জীবন তো পরীক্ষার জন্য। এখানে বুদ্ধি ও বিবেচনার সাহায্যে সত্যকে চিনে নেওয়ার পরীক্ষা হয়ে থাকে। এই মতবিরোধের চূড়ান্ত মীমাংসা হবে পরকালে।

মতবিরোধ, মতভেদ মানবসমাজের অপরিহার্য একটি বিষয়। মানুষ তার ইচ্ছা ও কর্মে স্বাধীন। এটাই মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে নিজস্ব পথ বেছে নেবে, সত্যকে গ্রহণ করবে, অসত্যকে প্রত্যাখ্যান করবে—এটাই মানুষের জন্য গৌরবের বিষয়। বিশ্বাস যদি জোরজবরদস্তির মাধ্যমে হয়, তাহলে তাতে গৌরব ও মাহাত্ম্যের কিছু নেই।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য