kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কবিতার জন্য রফিক আজাদ ছিলেন এক বাতিঘর

আসাদ চৌধুরী

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কবিতার জন্য রফিক আজাদ ছিলেন এক বাতিঘর

ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন কিছুক্ষণ আগে (মানে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটের দিকে হবে), হঠাৎই ফোন করে দুঃসংবাদটা দিল। বলল, কিছুক্ষণ আগে রফিক আজাদ মারা গেছেন।

রফিক আজাদ, ঘুনি, জাহিদগঞ্জ—এই ঠিকানায় টাঙ্গাইলে আমি বহু চিঠি লিখেছি। আর তিনিও আমাকে মাঝেমধ্যে লিখতেন। বাংলা বিভাগে পড়তেন। আমার ছোট বোন, আক্তার জাহান বেগমের সহপাঠী ছিলেন। আমরা ঢাকা হলেই ছিলাম। এখন যেটা শহীদুল্লাহ হল। সেই রফিকুল ইসলাম খান একদিন হয়ে গেলেন রফিক আজাদ। বাংলা কবিতায় ষাটের দশক যাঁর হাতে তৈরি, যাঁর হাতে পূর্ণতা পেয়েছে তিনি রফিক আজাদ। এই শতকের প্রধান পুরুষ ছিলেন কবি রফিক আজাদ। তিনি কত বড় সম্পাদক তাঁর প্রমাণ ‘সাক্ষর’, ‘টিপসই’, ‘রোববার’, ‘উত্তরাধিকার’ ইত্যাদি পত্রিকা। উত্তরাধিকারকে একটি আধুনিক পত্রিকায় নিয়ে আসাটাও রফিক আজাদের বিরাট অবদান বলে আমি মনে করি।

আমার নামটা পাল্টে দিয়েছিলেন তিনি। আমার না শুধু, আবিদ আজাদের নামও পাল্টেছিলেন। শুধু আমি বা আবিদ আজাদ নয়, এমন আরো অনেকের নামই তিনি পাল্টে দিয়েছিলেন। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই প্রথম, আমার বলতে খুব খারাপ লাগছে, এই প্রথম আমি অভিভাবকহীন হয়ে পড়লাম। রফিক আমার সঙ্গে যে খুব হাহা হিহি, মাখামাখি—না, এমনটা ছিল না আমাদের। আমাকে তিনি বড় ভাইয়ের মতো মান্য করতেন। এই কিছুদিন আগে কানাডায়, একটা অনুষ্ঠানে; যেখানে টাঙ্গাইলের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কাদের বাহিনীর অন্যতম সংগঠক ডা. নবীর বই বেরোল, বইয়ের নাম ‘জাহানারা ইমামের আমেরিকার শেষ দিনগুলো’—এই বইয়ের প্রকাশনা উত্সব হলো। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করলেন রফিক আজাদ। আমি একজন বক্তা ছিলাম সেই অনুষ্ঠানে। মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলো। তপন সাঈদ তাতে গান পরিবেশন করলেন। তারপর তপনের বাসায় রাতের খাবার খেলাম। দিলারা, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ছিলেন সেখানে। আমরা দুজনে বোধ হয় ওই শেষবার একসঙ্গে কবিতা পড়লাম। কানাডা থেকে ফেরার আগে শেষবারের খাওয়াদাওয়া ছিল রফিকের বাসায়। রফিকের বাসা বলাটা কি ঠিক হবে? অভিন্ন ও অব্যয় তাঁর দুই ছেলে। তারা দুজনেই কানাডার টরন্টোতে থাকে। অভিজাত পাড়ায় বাসা ভাড়া করেছে, মা-বাবা আসবেন বলে। মা-বাবা মানে রফিক আজাদ আর দিলারা জামান। আমি অত উচ্ছল আর কখনো দেখিনি রফিককে। আমার মেয়ে শাওলিও কানাডার বাঙালি পাড়ায় থাকে। সে কী ভাবা যায় না, এত আনন্দিত, উচ্ছল আগে কখনো দেখিনি। এরপর যেটা দেখেছি তা নাই বা বললাম।

পাবলো নেরুদা, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, নাজিম হিকমত (যদিও এলোপাতাড়ি নামগুলো বলছি) এই ধারা, বলা যেতে পারে প্রবন্ধের মতো করে কবিতা—এমনটাই লিখতেন রফিক। একই সঙ্গে উচ্ছল প্রেমের কবিতা, একই সঙ্গে প্রচণ্ড রাজনৈতিক কবিতা—রফিক আজাদ ছাড়া কে লিখেছেন অমন করে! এগুলোকে স্বীকারোক্তিমূলক কবিতাও বলা হয়। আগে যে নামগুলো বললাম, তাঁরাও এই ধারায়ই লিখেছেন; কিন্তু রফিক আজাদের তুলনা হয় না।

প্রথম দিকে তো রফিক মঞ্চে কবিতা পড়তেই চাইতেন না। কানাডার ওই অনুষ্ঠানে পড়া তাঁর শেষ কবিতা ছিল পরিবেশের ওপর। কবিতাটি শোনার পর, ওখানে এমন একজন লোকও ছিল না যাকে স্পর্শ করেনি তাঁর কবিতা। অনেকে পরিবেশ নিয়ে অনেক বক্তৃতা দেন; কিন্তু রফিকের কত যে মমতা ছিল বাংলাদেশের নিসর্গের ওপর, সে কী দুর্বার—কেমন করে আজ সেসব কথা বলি!

তাঁর প্রথম কবিতার বই বেরোনোর কথা মনে আছে। এর পরই বেরোলো নির্বাচিত কবিতা। যখন নির্বাচিত কবিতা বেরোয় তখন আমি বাসায় মিষ্টি কিনে এনেছিলাম। সম্ভবত ১৯৭৫ সালে। আজ অনেক কথাই মনে পড়ছে। মিষ্টি দেখে আমার স্ত্রী খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কখনো তো মিষ্টি আনতে দেখিনি, কী ব্যাপার?’ আমি বললাম, রফিক ও মান্নান (আবদুল মান্নান সৈয়দ)—দুজনের নির্বাচিত কবিতা বেরিয়ে গেছে।

বাংলা কবিতা তাঁর কাছে ঋণী এ জন্য না যে তিনি উত্কৃষ্ট কবিতা লিখেছেন, বরং এ জন্য চিরকাল ঋণ স্বীকার করবে যে তিনি কবিতার পাশাপাশি কবিকে শনাক্ত করতে পারতেন। কবিকে কবি করে আনতে পারতেন। আমি নিজে কী এমন লিখেছি? কিন্তু রফিক সেটা জোর করে বসিয়ে লিখে, ছেপে দিয়েছেন। এই কাজগুলো রফিকই করেছেন। আমার জন্য কেউ আর এটা করেননি। আজকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে এই কথাগুলো বলছি।

রফিক যেখানে গেছেন, ভালো থাকুন সেখানে। আমি ও আমার মতো অনেকেই আশা করেছিল বাংলাদেশ সরকার অনেক কিছু করবে তাঁর জন্য। এ দেশটা রফিক আজাদের সশস্ত্র সংগ্রামের ফল। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল, যখন একুশে পদক পুরস্কারটা নিই তখন রফিক আমাকে টেনে নিয়ে আলাদা করে ছবি তুলেছিলেন। আমরা দুজনে ২০১৩ সালে একুশে পদক পেলাম। আমার কী যে ভালো লেগেছিল, রফিকের আগে আমি পাইনি। বয়সের দিক থেকে দেখলে হয়তো আমারই আগে পাওয়ার কথা; কিন্তু আমরা দুজন একসঙ্গে পেয়ে সবচেয়ে খুশি হয়েছি আমি। যখন দুজনে একসঙ্গে পুরস্কারটা নিলাম তখন দুজনেই একসঙ্গে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছি।

রফিক মুক্তিযুদ্ধের সনদ নেননি। এ দেশে রাজাকাররা গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সবক দিয়েছিল, সে দেশে তিনি মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিতে চাননি। আমি আশা করব, সোমবার তাঁর দাফনটি হবে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়।

এখন সব স্মৃতি। রফিক এখন স্মৃতিঘরের বাসিন্দা। কিন্তু আমার কাছে এখনো কবিতার জন্য রফিক একটি নির্ভরশীল বাতিঘর।  

লেখক : কবি

অনুলিখন : শারমিনুর নাহার


মন্তব্য