দণ্ডের সঙ্গে বিতর্কেরও অবসান হয়েছে-333862 | মুক্তধারা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


দণ্ডের সঙ্গে বিতর্কেরও অবসান হয়েছে

মুনতাসীর মামুন

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দণ্ডের সঙ্গে বিতর্কেরও অবসান হয়েছে

মীর কাসেম আলীকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন নানা কানাঘুষা চলছিল। বলা হচ্ছিল, সবাইকে দণ্ড দিতে পারলেও তাঁকে দণ্ড দেওয়া যাবে না। বিচারকাজের প্রতিটি পর্যায়েই এ ধরনের কথা হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়ায় যদিও অনেক অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে। সব পক্ষই উত্তেজনাভরে নানা কথাই বলেছে। কিন্তু সব শেষে এ মামলার রায় প্রদানের মাধ্যমে আদালত অন্তত এটি প্রমাণ করেছেন যে মীর কাসেমের অর্থ রায় কিনতে পারেনি

 

মীর কাসেমের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় শীর্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের রায়ের পর্ব শেষ হয়েছে। কেননা যে ১২ জনকে আমরা শীর্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধী বলি, তাদের বিচারের যে কটি ধাপ ছিল এখন সে কটি ধাপ শেষ হয়েছে। তবে আরো বাকি পাঁচ বা ছয়জনের রিভিউ প্রক্রিয়া, চূড়ান্ত রায় ইত্যাদি বাকি আছে। যদিও সেগুলো এখন শুধু প্রক্রিয়া মাত্র। কেননা মূল রায় দেওয়া হয়ে গেছে। মীর কাসেমের রায় নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। যদিও সেটা খুবই স্বাভাবিক। কেননা মীর কাসেম প্রচণ্ড অর্থশালী। যিনি ২৫ মিলিয়ন ডলারে লবিস্ট নিয়োগ করতে পারেন, তাঁর ক্ষমতা সহজেই অনুমেয়। আমাদের সমাজে তা যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক, অর্থ খুবই শক্তিশালী। শুধু আমাদের দেশে কেন, পৃথিবীর সব দেশেই অর্থ খুবই শক্তিশালী নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বদর বাহিনীতে মীর কাসেমের স্থান ছিল তৃতীয়। তিনি এক সময় ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা ছিলেন। তাঁর প্রধান কর্মক্ষেত্র ছিল চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের ‘ডালিম হোটেল’-এ যাঁরা তাঁর হাতে নির্যাতিত হয়েছেন, নিহত হয়েছেন তাঁদের পরিবার জানে মীর কাসেম কী ছিলেন! আজ মীর কাসেমের যে চেহারা আমরা দেখি, তা দেখে তাঁর আগের সেই অবস্থা কল্পনা করা যায় না। এই লোকটি কত কৌশলী, কত হিংস্র, কত নিষ্ঠুর! ১৯৭১ সালের ভুক্তভোগীরাই তা বলতে পারবেন।

মীর কাসেম পালিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশে ফেরেন এবং বিশাল অর্থসম্পদের মালিক হন। আমরা শুনেছি, কে আরি, নামে যে পরিবহনটি আছে, যেটি কক্সবাজার টু টেকনাফ যাতায়াত করে, কে আরি ডেভেলপমেন্ট কম্পানি, ইসলামী ব্যাংক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা। এ ছাড়া নয়া দিগন্ত নামে পত্রিকা, নয়া দিগন্ত নামের টেলিভিশন চ্যানেলটিও তাঁর। অর্থাৎ তিনি শুধু অর্থ উপার্জনই করেননি, অর্থের একটা সাংগঠনিক রূপ দিয়েছিলেন। বিভিন্নভাবে তিনি তা করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, জামায়াতে ইসলামীর পুরো কর্মকাণ্ডের প্রধান অর্থ জোগানদাতা মীর কাসেম। যিনি ২৫ মিলিয়ন ডলার বাইরে দিতে পারেন, তাঁর ভেতরে কত আছে তা অনুমেয়! দ্বিতীয়ত, তিনি কত শক্তিশালী ছিলেন যে ২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। এটা প্রমাণসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেককে মানি লন্ডারিং আইনে অভিযুক্ত করে। কিন্তু আমরা দেখেছি মীর কাসেমের ব্যাপারে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য প্রতিষ্ঠান কোনো কথা বলেনি। কারণটা সহজেই বোধগম্য। যখন মানি লন্ডারিং করে এমন একটি ব্যাংক এবং এই ব্যাংকের কার্যক্রম মীর কাসেম নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছিলেন, তখন বিএনপির এক এমপি তাঁকে বলেছিলেন যে ‘দেখেন আপনি যাই করেন এটা অন্তত করবেন না, তাহলে আপনাকে বাঁচানো মুশকিল হয়ে যাবে। আমি আপনার সুহূদ হিসেবে এ কথা বলে গেলাম।’ এটা শোনা কথা। কিন্তু এই যে ২৫ মিলিয়নের কথা বারবার বলা হচ্ছে, কেউ কিন্তু তাঁকে কিছু বলার সাহস পায়নি। এমনকি অনেক সময় আদালত অবমাননার কথাও বলছি, কিন্তু ২৫ মিলিয়ন দিয়ে যে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছেন মীর কাসেম, সেই লবিস্টের একজন, ক্যাজবেন নামের এক আইনজীবী তিনি বিভিন্ন কথা বলে যাচ্ছেন, এগুলো কিন্তু কম আদালত অবমাননা নয়! এই উদাহরণগুলো দিলাম এ কারণে যে তিনি কতটা শক্তিশালী এটা বোঝানোর জন্য। তাঁর গণ্ডিটাও যে শক্তিশালী এসবের মধ্য দিয়ে সেটা বোঝানোর জন্য।

সুতরাং মীর কাসেম আলীকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, সেই প্রথম থেকেই এটা নিয়ে নানা কানাঘুষা চলছিল। বলা  হচ্ছিল, সবাইকে দণ্ড দিতে পারলেও নাকি তাঁকে দণ্ড দেওয়া যাবে না। বিচারকাজের প্রতিটি পর্যায়েই এ ধরনের কথা হয়েছে। বিচারের প্রক্রিয়ায় যদিও অনেক অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে। সব পক্ষই উত্তেজনাভরে নানা কথাই বলেছে। কিন্তু সব শেষে এ মামলার রায় প্রদানের মাধ্যমে আদালত অন্তত এটি প্রমাণ করেছেন যে মীর কাসেমের অর্থ রায় কিনতে পারেনি। এটি আমাদের জন্য বিরাট পাওয়া। এই রায়ের ফলে অনেক সন্দেহ, বিতর্কের নিরসন হলো। এই বিতর্কগুলো আর উঠবে না বলেই আমরা মনে করি।

মীর কাসেমের দণ্ড হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই জামায়াতের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেটি আমাদের জন্য ইতিবাচক। মীর কাসেম দণ্ডিত হয়েছেন, জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও হয়তো দণ্ডিত হয়েছেন এরই মধ্যে। আরো কারো কারো বিচারপ্রক্রিয়া চলছে। অনেকেই মনে করছেন, এদের দণ্ড না হলে অন্যদের আর বিচারের দরকার কী! কিন্তু আমরা মনে করি, যে খুনি সে কত সংখ্যায় খুন করল সেটি বড় বিষয় নয়। খুন যে করেছে সেটা বিচার্য, বাঞ্ছনীয়। এখন যাদের বিচার হচ্ছে, অনেকেই বলছেন, তাদের নাম জানি না। কিন্তু বিচার শুরু হলে, সাক্ষ্য-প্রমাণ এলে তাদের অপরাধ বিচার করে দেখা যাচ্ছে যে তারা একই ধরনের অপরাধে অপরাধী। আমি বলতে চাই, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিটি লোক কোনো না কোনোভাবে এ ধরনের কাজে নিযুক্ত ছিল। তাই তাদের যতজনের সম্ভব বিচার করাটা বিধান হয়ে দাঁড়ায়। তাই আদালত যা করে যাচ্ছেন তা করাটাই বাঞ্ছনীয়।

আমরা জামায়াতে ইসলামীর নিষিদ্ধকরণ চেয়েছি। আমরা জামায়াতের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের হাতে তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছি, তা হবে কি না আমরা জানি না। অনেকে মনে করতে পারেন যে মীর কাসেমের দণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ডের একটা বড় কাজ হয়ে গেল। এখন আর এটি নিয়ে মাতামাতি করা কেন? কিন্তু আমি মনে করি, মীর কাসেমের দণ্ড বা অন্য যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড বা জামায়াতে ইসলামীর অপরাধীদের দণ্ড দেওয়ার মধ্যেই কিন্তু আমাদের আন্দোলনের সমাপ্তি হয় না। কেননা গত ৩০ বছর যুদ্ধাপরাধীরা সমাজের বিভিন্ন জায়গায় আর্থিক ভিত্তি, সামাজিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে। তাদের অপরাজনীতি এখনো বন্ধ হয়নি। জামায়াত নাম বদল করতে পারে, কিন্তু তাদের অপরাধ বন্ধ হবে না। সুতরাং আমরা মনে করি, আমাদের প্রধান কাজটি হবে এই মানবতাবিরোধী অপরাধীরা যে রাজনীতি শুরু করেছিল, যাকে আমরা খুনের রাজনীতি বলতে পারি, সেই অপরাজনীতি, সেই চরমপন্থী রাজনীতির প্রতিবাদ করাই হবে অন্যতম কাজ। আমরা সব সময় একটি কথা বলে এসেছি যে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের পর, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয় তবে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে। কেননা তারা এই সম্পদ শহীদের রক্তের ভিত্তিতে যে দেশ তৈরি হয়েছে সেখান থেকে হরণ করেছে। তাই তাদের সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে সেটি মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারগুলোতে বিতরণ করতে হবে। আমাদের এই দাবি এখনো আমরা বহাল রাখব। মীর কাসেমের মতো ধনকুবেরের সম্পত্তির ভিত্তি যদি থেকে যায় তাহলে সে যে অপরাধ করেছিল সেই অপরাধের কর্মকাণ্ড কিন্তু বহাল থাকবে।

সব শেষে আমি বলব, যত বিতর্কই হোক না কেন মীর কাসেমের এই বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউটর, তদন্ত সংস্থা, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকবৃন্দ ও যাঁরা মীর কাসেমের ফাঁসির দাবি তুলেছেন তাঁরা সবাই যৌথভাবে একটি কাজ করেছেন যে তাঁরা একজন অপরাধীর দণ্ড দিতে সক্ষম হয়েছেন। আমি মনে করি, এটাই আমাদের জন্য বিরাট পাওয়া। এখন এই রায়ের মধ্য দিয়ে সব বিতর্কের অবসান হবে।

 

লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : শারমিনুর নাহার

মন্তব্য