kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ব্যক্তি, আদর্শ, রাজনীতি সবই ঘৃণিত হলো

মফিদুল হক

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ব্যক্তি, আদর্শ, রাজনীতি সবই ঘৃণিত হলো

তাদের  মতাদর্শ সমাজে কী নিষ্ঠুরতা ঘটাতে পারে তা আমরা এসব প্রমাণের মধ্য দিয়ে দেখলাম। ফলে এই রায়ে ব্যক্তি যেমন অভিযুক্ত হয়েছে, তেমনি ঘৃণার মতাদর্শও অভিযুক্ত হয়েছে।

পাশাপাশি এই মতাদর্শের যে রাজনৈতিক সংগঠন তারাও অভিযুক্ত হয়েছে

 

আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাজা বহাল থাকল একাত্তরের আলবদর নেতা মীর কাসেম আলীর ওপর। ১৬ মাস আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দুই অভিযোগে মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড ও আট অভিযোগে সব মিলিয়ে ৭২ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। আপিলেও সর্বোচ্চ আদালত মীর কাসেমের সর্বোচ্চ সাজার রায় বহাল রাখলেন।

এই রায়ের ফলে ন্যায় ও সত্যের জয় হলো। এখানে দুটি বিষয় খুব চোখে ভাসে। প্রথমত, যে চরম নৃশংসতা তারা ঘটিয়েছে, আদালত যেটাকে বলেছেন যে ডেথ সেন্টার পরিস্থিতি ছিল ডালিম হোটেলে। এই ডালিম হোটেলটাই ছিল তাদের মূল আস্তানা। এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়, এই ডালিম হোটেলটাই ছিল ‘মহামায়া হোটেল’। এটা ছিল হিন্দু সম্পত্তি। সেটা যদিও বিচারে আসেনি। কিন্তু এখানে এটাও লক্ষ করার বিষয় যে এই আলবদর বাহিনী কিভাবে এই দেশের একটা সম্প্রীতির সমাজকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধারা দেশের মূল্যবোধের, সম্প্রীতির সমাজের যোদ্ধা। আলবদর বাহিনী জসিমকে যে নৃশংসতায় হত্যা করেছে, তাঁকে যেভাবে টর্চার করা হয়েছে—সেটা আদালতে উঠে এসেছে। নানা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা তা জানতে পেরেছি। আবার এই নৃশংসতাকারীরাই হত্যা করার পর লাশগুলো কর্ণফুলী নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। স্বজনরা তাদের কোনো লাশই পায়নি। বদর বাহিনী যাদের মেরেছে, তাদের কোনো চিহ্ন রাখেনি। কোনো ডেডবডি পাওয়া যায়নি। এই কথাগুলো আমাদের আগে এমনভাবে জানা ছিল না। রায়ের সাক্ষ্য-প্রমাণের মধ্যে একটা অসাধারণ সত্যের উদ্ভাসন ঘটেছে।

আরো একটি বাস্তবতা উঠে এসেছে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে, তা হলো আলবদরের মতাদর্শ হলো ঘৃণিত মতাদর্শ। এই মতাদর্শ সমাজে কী নিষ্ঠুরতা ঘটাতে পারে তা আমরা এসব প্রমাণের মধ্য দিয়ে দেখলাম। ফলে এই রায়ে ব্যক্তি যেমন অভিযুক্ত হয়েছে, তেমনি ঘৃণার মতাদর্শও অভিযুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি এই মতাদর্শের যে রাজনৈতিক সংগঠন তারাও অভিযুক্ত হয়েছে। সুতরাং শুধু ব্যক্তি নয়, একটি পুরো দল, তাদের রাজনীতি, মতাদর্শ—সবই ঘৃণিত, পরিত্যাজ্য হয়েছে।

এই ডেথ স্কয়ারের যিনি হোতা, কিলার বা জল্লাদ, যাই বলি না কেন, তাঁর যে জার্নি গত চার দশক ধরে চলেছে, তিনি এই ঘৃণার আদর্শ বহন করেছেন এবং রাজনৈতিকভাবে তা ব্যবহার করছেন। তিনি সমাজে বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। এই যে তাঁর পথচলা সেটাও কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ক্ষমতা ও প্রতাপের একটি নজির আমরা দেখলাম রায়ের সময় তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়ে গেলেন বিদেশি আইনজীবী। তিনি টাকা দিয়ে জোরদার লবিস্ট নিয়োগ করলেন। এসব কিছু চুরমার করে বাংলাদেশে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠা পেল। আদালত সব তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ন্যায়ের পক্ষকেই সমর্থন দিলেন। অর্থের কাছে, ক্ষমতার কাছে বিচার পরাজিত হলো না। মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্য আমরা রাখতে পারলাম। আমরা সবাই আরো একবার জয়ী হলাম।

চূড়ান্ত রায় হওয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়ার পর মীর কাসেম আলীর বিচারটার দিকে যখন তাকাই, তখন আমার খুব মনে পড়ে আজকের মীর কাসেম আলীকে; আর যেদিন তাঁকে আদালতে আনা হয়েছিল সেদিনের তাঁকে। মীর কাসেম আলী আদালতে প্রবেশ করলেন, যেভাবে তিনি বসলেন কাঠগড়ায় তাঁর সেই মূল্যবান ব্লেজার, চায়নিজ কলারের শার্ট, তাঁর চকচকে জুতা। তিনি আদালতে বসে পা নাড়তে লাগলেন উচ্চ আদালতকে উপেক্ষা করে। বিচার যত অগ্রসর হতে লাগল, সাক্ষীরা যত তাঁদের বয়ান দিতে লাগলেন ততই দেখা গেল যে তাঁর দেহের ভঙ্গি, চেহারা নিচু হতে লাগল। তাঁর উজ্জ্বলতা কমতে লাগল। তিন এক সময় আদালতকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, কিন্তু আজ আমরা জয়ী।

মীর কাসেমের সাক্ষ্য-প্রমাণের জন্য অনেক বড় বড় মানুষকে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা কেউ সাক্ষ্য দিতে আসেননি। সাক্ষ্য দিয়েছেন আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ। আজ গোটা জাতি কৃতজ্ঞ থাকবে এই সাধারণ মানুষের সাক্ষীর প্রতি। যাঁরা ১৯৭১ সালে আলবদর বাহিনী, মীর কাসেমের নৃশংসতা, হিংস্রতা দেখেছিলেন। প্রত্যক্ষ করেছিলেন তাঁর নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলো। এই সাধারণ মানুষ অকাট্য সাক্ষ্য আদালতে পেশ করেছেন। তাঁরা সব বাধা, ভয়ভীতি উপেক্ষা করে দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁদের বক্তব্য আদালতে তুলে ধরেছিলেন। তাঁরা তদন্তকারী ও প্রসিকিউশন দুই স্থানেই তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। আসামি প্রবল প্রতিপক্ষ ছিল।

আসামিপক্ষের লোকজন বহু সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্টও করেছে। বহু নৃশংসতার উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণও সংগ্রহ করা যায়নি; কিন্তু নিষ্ঠুরতার স্বরূপ ও প্রকৃতি দেখে অনেক কিছুই প্রমাণ করা গেছে। জাতি এসব প্রত্যক্ষ বিবরণের মধ্য দিয়ে আলবদর বাহিনী ও তাদের দোসরদের হিংস্রতা, নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করল।  

ধন্যবাদ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকারকে। যারা বিচারের জন্য যথাযোগ্য আয়োজন ও ব্যবস্থা নিয়েছে। পুরো জাতি কৃতজ্ঞ থাকবে আমাদের বিচারব্যবস্থার প্রতি, সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি, যারা সব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে ন্যায় ও সত্যকে তুলে ধরলেন।

লেখক : ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর


মন্তব্য