kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সমতা বিধানে নারীর ক্ষমতায়ন ও মানবাধিকার

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সমতা বিধানে নারীর ক্ষমতায়ন ও মানবাধিকার

প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ নারীদের অধিকার সমুন্নত রাখা ও সমাজে তাদের ভালোভাবে বসবাসের প্রত্যয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করে থাকে। জাতিসংঘ একটি প্রতিপাদ্য সামনে এনে এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে দিনটি পালনের জন্য আহ্বান জানায়, যদিও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব প্রতিপাদ্যও থাকে।

এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে জাতিসংঘ বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোকে আরো কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংস আচরণের মাত্রাগুলো কমিয়ে আনা, তাদের উন্নয়ন, বিকাশ ও অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার অনুরোধ জানায়। উন্নত দেশগুলো, এমনকি আমাদের মতো দেশও মনে করে, উন্নয়নের জন্য নারী-পুরুষ সবার অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন ও জরুরি। এ লক্ষ্যে আমাদের দেশেও গতানুগতিক ধারণার বাইরে ভিন্ন চিন্তা করার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বহুদিন থেকে। লৈঙ্গিক বিচারে নারী-পুরুষের ভিন্নতা স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক, অবধারিত এবং সত্য। নারী দৈহিক সামর্থ্য কিংবা একান্ত কায়িক পরিশ্রমের বিচারে কোনো কোনো কাজ পুরুষের সমান নাও করতে পারে, তবে মেধার কাজে কোনো ব্যবধান থাকার প্রশ্নই ওঠে না। বরং নারীর একাগ্রতায় শিক্ষাসহ অনেক ক্ষেত্রে তারা পুরুষদেরও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।  

নারী-পুরুষের সমতা আনয়নের বড় নিয়ামক নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীর মানবাধিকার সুরক্ষা করার মধ্যে নিহিত রয়েছে। ক্ষমতায়নকে তাত্ত্বিক বিচারে এক কথায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বোঝালেও এ ধরনের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করার পেছনে কাজ করে বহু অনুঘটক। অনুঘটকগুলো অর্জন করতে পারলে একদিকে ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যেমন সহজ হয়, তেমনি সমতা আনয়ন করাও সম্ভব হয়। আমাদের দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছেলেমেয়ে অনুপাত প্রায় সমান। এ হার পর‌্যায়ক্রমে বাড়ছে বৈ কমছে না। মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় সরকারের নতুন নতুন প্রণোদনা তৈরি হচ্ছে। চাকরির ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের অন্তর্ভুক্তিও বাড়ছে। কিন্তু এখানে সমস্যাও দেখা দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারিবারিক সিদ্ধান্তের কারণে নারীকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ঠিক একই কারণে বহু মেয়েকে লেখাপড়ার পাট চুকাতে হয়। এভাবে ক্ষমতায়নের প্রাথমিক ধাপ অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নারী স্বাস্থ্য আজ নিতান্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে কম ধারণা আর অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ নারীকে করছে স্বাস্থ্য ও কর্মহীন। নারীর শিক্ষা হলো, চাকরি হলো; কিন্তু কোনো নিশ্চয়তা নেই ক্ষমতায়নের।

নারীর মানবাধিকার রক্ষায় সেবামূলক ব্যবস্থা যেমন—শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চাকরিতে প্রবেশে ভূমিকা পালন করে, তেমনি প্রয়োজন পড়ে আইন ও নীতিমালা প্রণয়নেরও। যখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ও পরিবেশে আমরা তাদের অধিকারগুলো দিতে পারি না তখনই প্রয়োজন হয় বিধি, নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের মতো কঠিন কাজের। আইনি কাঠামোর মাধ্যমে অধিকার আদায়ে বাধ্য করা হয় অন্যদের। নারীর মানবাধিকার আজ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। একটি ক্ষুদ্র, অধিক জনবহুল ও মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের রয়েছে নিজস্ব আইন এবং এ বিষয়গুলো মোকাবিলা করার নিজস্ব কৌশল। অতীতের যৌতুক নিরোধ কিংবা বাল্যবিবাহ আইনের ধারাবাহিকতায় এবং সময়ের প্রয়োজনে নারী অধিকার ও উন্নয়নে বহুবিধ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালার সর্বশেষ সংযোজন গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা। গৃহকর্মীদের ওপর অমানুষিক নির‌্যাতন আমরা বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ করে আসছি। তাদের কল্যাণের জন্য এ-সংক্রান্ত নীতিমালায় গৃহকর্মীদের কর্মঘণ্টা, তাদের কাজের পারিশ্রমিক, ছুটি ও মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ বহুবিধ বিষয়ে তাদের সুরক্ষার বিষয়টিকে সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রয়েছে গৃহকর্মী নির‌্যাতনকারীর শাস্তির বিধান। আইনগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে সহিংস আচরণ সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসার বিষয়।

নারীর ক্ষমতায়ন ও মানবাধিকার রক্ষার সবচেয়ে বড় বাধা নারীর প্রতি সহিংসতা। শুধু যৌতুকের জন্য মারধরের মতো সহিংস আচরণই নয়, খুন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য সহিংসতা আমরা দারুণভাবে লক্ষ করে আসছি। অথচ দুই দশক আগেও সহিংস আচরণের এ ধরনগুলো এতটা বেশি ছিল না। এখন সময় এসেছে নতুনভাবে চিন্তা করার। নারীর প্রতি সহিংস আচরণের মাত্রা কমিয়ে আনার জন্য সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির আশ্রয় গ্রহণ করার। সহিংস আচরণের শিকার নারীর প্রতি অতিদ্রুত সেবা দেওয়ার। কখনো কখনো দীর্ঘ সময়ব্যাপী সহিংসতার ফল ভোগ করতে হয়। কেউ কেউ এ কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বা ভেঙে পড়েন। আবার কেউ কেউ মানসিক রোগীও হয়ে যেতে পারেন। সব সময়ের জন্য প্রয়োজন পরামর্শদানের। সহিংসতার মাত্রা ছোট কিংবা বড় যা-ই হোক না কেন, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শদানের মাধ্যমে তার উত্তরণ সম্ভব। নিয়মিত পরামর্শদানে নিজেদের মধ্যে সাহস ও মনোবল বৃদ্ধি পায়। বাড়ে পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে চলতে পারার অদম্য সাহস। পাশাপাশি পুনর্বাসনের বিষয়টিও অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নারী-পুরুষ সমতা আনয়নে নিবিষ্ট করতে পারলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর এক বড় প্রভাব পড়তে পারে।   নিরাপদ ও মসৃণ হতে পারে তাদের আগামী দিনের পথচলা ও অদম্য বাসনা। নিশ্চিত হতে পারে তাদের পরিপূর্ণ ক্ষমতায়ন ও মানবাধিকার অর্জন।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com


মন্তব্য