জনপ্রশাসনের নীতিনির্ধারণী স্তরে-333460 | মুক্তধারা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৮ জিলহজ ১৪৩৭


জনপ্রশাসনের নীতিনির্ধারণী স্তরে নারীর ক্ষমতায়ন

ফরিদা নাসরীন

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জনপ্রশাসনের নীতিনির্ধারণী স্তরে নারীর ক্ষমতায়ন

প্রশাসন সার্ভিসে নারী কর্মকর্তার আবির্ভাব ঘটে স্বাধীনতার ১১ বছর পর ১৯৮২ সাল থেকে; যদিও অন্য কয়েকটি ক্যাডারে (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি) নারী কর্মকর্তাদের আগমন ঘটেছিল, তবে সংখ্যার দিক দিয়ে তা ছিল খুবই কম। সেই থেকে ২০১৬ সাল—এই সুদীর্ঘ ৩৪ বছর পরও প্রশাসনের ওপরের পদগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে নারী শূন্যই রয়ে গেছে। বিশ্বে যেখানে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, সেখানে আমাদের দেশের সিভিল সার্ভিসে নারীর সংখ্যাগত চিত্রটি হতাশাব্যঞ্জক। এ চিত্র নারীর ক্ষমতায়নের সফল বহিঃপ্রকাশের পরিচয় বহন করে না। প্রশাসন সার্ভিসের নীতিনির্ধারণী পর‌্যায়ে নারী কর্মকর্তাদের সংখ্যা এত কম যে এই স্বল্পসংখ্যক কর্মকর্তা দিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা দুরূহ। এই শূন্যতা পূরণ করতে আরো অধিক সংখ্যায় নারী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদান করে সুষম প্রশাসন নিশ্চিত করা আজ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা সামান্য বেশি। যদি ধরে নেওয়া হয় যে পুরুষ ও নারীর সংখ্যা সমান, তাহলেও সমাজের সব স্তরে পুরুষ ও নারী সমানসংখ্যক হারে প্রতিনিধিত্ব করা উচিত। প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর সচিব পদে প্রথম নারী কর্মকর্তা দিয়ে পূরণ হয় ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে একজন, ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে একজন, ২০০৩ সালে একজন, ২০০৭ সালে একজন, ২০০৯ সালে একজন, ২০১০ সালে দুজন ও ২০১১ সালে দুজন নারী সচিব নিযুক্ত হন; কিন্তু ২০১২ ও ২০১৩ সালে কোনো নারী সচিব নিযুক্ত হননি। ২০১৪ সালে দুজন, ২০১৫ সালে তিনজন ও ২০১৬ সালে একজনসহ মোট এ পর্যন্ত মাত্র ১৪ জন নারী সচিব নিযুক্ত হন। যাঁদের মধ্যে আটজন এর মধ্যেই অবসরে গেছেন এবং আরো একজন এ মার্চেই অবসরে যাচ্ছেন।

বর্তমানে সিভিল সার্ভিসে নারী কর্মকর্তাদের সংখ্যা হলো—সচিব পর‌্যায়ে নারী পাঁচজন, পুরুষ ৬৯ জনসহ মোট ৭৫ জন; যার মাত্র ৮ শতাংশ নারী। অতিরিক্ত সচিব পর‌্যায়ে নারী ৫৬ জন ও পুরুষ ২৫৩ জনসহ মোট ৩০৯ জন। যুগ্ম সচিব পর‌্যায়ে নারী ১০৬ জন ও পুরুষ ৭৮৭ জন মিলে মোট ৮৯৩ জন। উপসচিব পর‌্যায়ে নারী ১৮৬ জন ও পুরুষ এক হাজার ১১৩ জন মিলে মোট এক হাজার ২৯৯ জন। সিনিয়র সহকারী সচিব পর‌্যায়ে নারী ৩১৫ জন ও পুরুষ এক হাজার ৭৬ জন মিলে মোট এক হাজার ৩৯১ জন। সহকারী সচিব পর‌্যায়ে নারী ৪২২ জন ও পুরুষ ৯৮৩ জন মিলে মোট এক হাজার ৪০৫ জন।

দেখা যাচ্ছে, নারী কর্মকর্তারা যে হারে সিভিল সার্ভিসে যোগদান করে আসছেন, সে হারে পুরুষের তুলনায়  যুগ্ম সচিব হতে সচিব পদে অর্থাৎ নীতি নির্ধারণ পর‌্যায়ে পদায়ন/নিয়োগ/পদোন্নতি হয়নি। উপরন্তু অতিরিক্ত সচিব থেকে সচিব পদে পদোন্নতি উল্লেখযোগ্য হারে কম হয়েছে।

এ ছাড়া সচিব পর‌্যায়ে ২০১৬ সালে ২১ জন অবসরে যাবেন, তাঁদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ, একজন নারী; ২০১৭ সালে ১৬ জন, তাঁদের মধ্যে ১৩ জন পুরুষ, তিনজন নারী; ২০১৮ সালে ১৬ জন, তাঁদের মধ্যে ১৫ জন পুরুষ, একজন নারী; ২০১৯ সালে ১১ জন, তাঁদের মধ্যে ১০ জন পুরুষ, একজন নারী অবসরে যাবেন। এতে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ে নারী সচিব থাকবেন যথাক্রমে পাঁচ, দুই, এক ও একজন এবং এই সময়ের মধ্যে আর কোনো নারী সচিব হিসেবে নিয়োগ না পেলে ২০১৯ সাল থেকে সচিব পদটি নারীশূন্য হয়ে পড়বে।

রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু মহান জাতীয় সংসদ। এখানে ৩০০ আসনের মধ্যে ২১ জন নারী ও ২৭৯ জন পুরুষ নির্বাচিত সংসদ সদস্য রয়েছেন। নারীদের অনগ্রসরতার কথা বিবেচনায় এনে বর্তমান সরকার দ্বারা পরিচালিত পূর্বোক্ত টেনিয়রে নারী সংরক্ষিত আসন প্রথমে ৩০, পরে ৪৫ থেকে বাড়িয়ে বর্তমানে ৫০-এ উন্নীত করেছে। এতে বর্তমানে মোট ৭১ জন নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন, যা মোট সংখ্যার ২০ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, নারীদের অনগ্রসরতার বিষয়টি অতিক্রম করার লক্ষ্যে এবং সমান অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সরকার প্রতি উপজেলায় একজন করে নারী ভাইস চেয়ারম্যান ইতিমধ্যে নির্বাচিত করেছে। অথচ বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে নীতি নির্ধারণ পর‌্যায়ে ৭৫ জন সিনিয়র সচিব, সচিব, দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত সচিবদের মধ্যে মাত্র ছয়জন নারী সচিব রয়েছেন।

সিভিল সার্ভিসে যে সংখ্যায় সব পর‌্যায়ে নারীরা কর্মরত রয়েছেন সে সংখ্যার হারে পদোন্নতি হচ্ছে না। সব পর‌্যায়ে এর মধ্যেই ২০ শতাংশ পদ নারী কর্মকর্তাদের দ্বারা পূরণে প্রাপ্যতা অর্জিত হয়েছে। এ বিবেচনায় বর্তমানে ছয়জন নারী সচিবের স্থলে কমপক্ষে ২৫ জন নারী সচিব পদায়নের দাবি রাখেন। এ ছাড়া সংবিধানের পার্ট-২-এর (১০), পার্ট-৩-এর ২৮-এর (২), (৩) ও (৪) অনুচ্ছেদ মোতাবেক প্রজাতন্ত্রের যেকোনো অনগ্রসর গ্রুপের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্পেশাল প্রভিশন প্রণয়ন করতে কোনো কিছুই প্রতিবন্ধক হিসেবে গণ্য হবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সব পর‌্যায়ে নারী কর্মকর্তাদের সংখ্যাগত চিত্র অনগ্রসরতা হিসেবে বিবেচনায় এনে সিভিল সার্ভিসের সব পর‌্যায়ে পদোন্নতি প্রদান করে সংবিধানের ওই বৈষম্য দূরীকরণ বিধান প্রণয়ন ও কার্যকর করা যেতে পারে। যেহেতু স্পেশাল প্রভিশন প্রণয়নে কোনো বাধা বিবেচনায় না আনার বিধান রয়েছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত সচিব থেকে সচিব পদে পদোন্নতির হার যেহেতু উল্লেখযোগ্য হারে কম, সেহেতু সংবিধানের উল্লিখিত অনুচ্ছেদ মতে, প্রয়োজনে সব পর‌্যায়ে বিশেষত যুগ্ম সচিব থেকে সচিব পদে প্রাথমিকভাবে ২০ শতাংশ ও পর‌্যায়ক্রমে তা বাড়িয়ে ৩০ ও ৪০ শতাংশ এবং সর্বোপরি ৫০ শতাংশ হারে নারী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদানের প্রভিশন প্রবর্তন করা যেতে পারে।

সচিব পর‌্যায়ে নারী কর্মকর্তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি না করা হলে আগামী ২০২১ সালে এমডিজি নম্বর ৩ ও এসডিজি নম্বর ৫ জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন, জেন্ডার ক্ষমতায়ন অর্জন দুরূহ হয়ে পড়বে।

লেখক : অতিরিক্ত সচিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক

বিভাগ (ইআরডি), অর্থ মন্ত্রণালয়

fnasreen.erd@gmail.com

মন্তব্য