আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ভাবনা-333459 | মুক্তধারা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ভাবনা

আয়শা খানম

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ভাবনা

১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশের নারী আন্দোলন এই দিবস পালন করে আসছে। ২০১৬ সালের ৮ মার্চ আজ। আমাদের ভাবা দরকার ৪৪ বছরে বাংলাদেশের আজ এই নারীর অর্জন, নারীর এগিয়ে চলা—এগুলোতে ৮ মার্চের প্রতিজ্ঞা কতটুকু কাজে লেগেছে। আরো কী করা দরকার সে বিষয়ে অঙ্গীকার করা প্রয়োজন। আমার কর্মজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, আমার বিবেচনায় এই দিবসের অঙ্গীকার ব্যক্তি, সমাজ, সরকার সবাইকে প্রণোদনা জোগাচ্ছে।

মাবিয়া সীমান্ত, কলসিন্দুরের ১৪ অনূর্ধ্ব কিশোরীরা, বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দল একে একে তারা রোকেয়া সাখাওয়াতের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে চলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারী প্রগতি সম্পর্কে বিভ্রান্তকারীরা বলে আসছেন নারী দৈহিকভাবে দুর্বল, নারী অনেক কিছুই পারবে না, যা পুরুষ পারবে। একই সময়ে পাশাপাশি এই উপমহাদেশের ও বিশ্বের নারী অধিকারবাদী ও সমাজচিন্তকরা বলে আসছেন, সুযোগ পেলে নারী সবই পারবে। এই উপমহাদেশের রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, ‘যাহা যাহা পুরুষ পারিবে তাহাই নারী পারিবে।’

বাংলাদেশের নারীরা আজ প্রতি ক্ষেত্রে তার প্রমাণ রাখছেন। রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে আইলা মোকাবিলা, পিস কিপিংয়ে নেতৃত্ব দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কয়েক হাজার নারী যোগ দিয়ে তাঁরা তাঁদের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। প্যারাসুট জাম্পিং, ইউনিয়ন পরিষদে হাজার হাজার নারী অংশ নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ শিগগিরই মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকের সিংহভাগ ভূমিকা রয়েছে। খাদ্যে স্বনির্ভর আজকের এই বাংলাদেশে গ্রামীণ কৃষক নারীর রয়েছে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতোই একসময় রাজনৈতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে যে নারীরা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, আজ তাঁরা সাহসের সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।

সহস্র সহস্র নারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, শিক্ষা, অফিস-আদালত সর্বত্র মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে পেশাজীবী এক নারীগোষ্ঠী তৈরি করেছেন বাংলাদেশে। ব্যাংক, কলকারখানায় আজ ৮০ শতাংশ নারী কাজ করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরো বেশি। কূটনৈতিক মিশনে এর মধ্যেই বেশ কয়েকজন নারী নিযুক্ত হয়েছেন। এসব পেশায় আরো নারী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনেও বাংলাদেশের নারীরা কাজ করছেন। এই যে নারীর উল্লেখযোগ্য অর্জন, সেই অর্জনকে স্থায়ী, কার্যকর ও তাঁদের ভূমিকা ফলপ্রসূ করে তোলার লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ৮ মার্চ আমাদের শপথ নিতে হবে। জাতীয় সংসদে ৫০ জন সদস্যের মধ্যে কয়েকজন নির্বাচিত ও বাকিরা মনোনীত। বাংলাদেশের নারী আন্দোলন আজ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকার ও রাষ্ট্রের কাছে এই দাবি ও সুপারিশ রাখছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে রাজনীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় আপামর নারী জনগোষ্ঠীকে একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে হলে প্রয়োজন সর্বোচ্চ পর‌্যায় থেকে তৃণমূল পর‌্যায় পর্যন্ত সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। রাজনৈতিক দল ও সরকারও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্রমান্বয়ে এক-তৃতীয়াংশ নারীর অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এই দাবি কেবল বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের দাবি নয়, এটাই ছিল ১৯৯৫ সালের চতুর্থ নারী সম্মেলনে গৃহীত বৈশ্বিক অঙ্গীকার; যেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরাও একই অঙ্গীকার করেছিলেন।

২০১৬ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের পক্ষ থেকে আমি আবার উল্লেখ করতে চাই, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে মহাজোট ঘোষিত ইশতেহারে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে বলে অঙ্গীকার করা হয়েছিল। আজ ২০১৬; এখনো কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ সরকার ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি।

আজ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটিরও বেশি। আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব, জাতীয় সংসদের মোট সদস্য সংখ্যা ৪৫০ করা হোক। এর ১৫০ জন হবেন নারী সদস্য। এর ফলে নারীরা একটি নির্দিষ্ট ও স্থায়ী এলাকা পাবেন, যে এলাকাকে কেন্দ্র করে তাঁদের রাজনৈতিক তত্পরতা হবে। এবং তাতে নারী রাজনৈতিক সংগঠন ও নেত্রীরা নিজেরা একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে উঠবেন। অবশ্য এর জন্য শাসনতন্ত্র সংশোধন করতে হবে। শাসনতন্ত্র সংশোধনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে, যা বর্তমান সরকারের পক্ষে অনায়াসে করা সম্ভব। আমি মনে করি, পদক্ষেপ নিলে ২০২৬ সালে তথা বাই টোয়েন্টি থার্টি বাংলাদেশের সংসদে ও রাজনীতিতে এক নতুন নারী চরিত্রের সৃষ্টি হবে। যাঁরা পায়ের নিচে রাজনৈতিক ভিত নিয়ে, শক্তি নিয়ে, নারীর অধিকারের প্রশ্নে, দেশের উন্নয়নের প্রশ্নে অর্থপূর্ণ ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারবেন।

জাতীয় সংসদ থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত একই ধারায় এই প্রক্রিয়া চালু হলে রোকেয়ার স্বপ্নের দেশ গড়ে উঠতে সময় লাগবে না। যে শত-সহস্র প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আজকের বাংলাদেশে গণনারীরা উন্নয়ন, নারী প্রগতি তথা সমাজ প্রগতির পতাকা বহন করে এগিয়ে আসছেন, সম্মানিত গণনারীর সেই যাত্রাকে আরো এগিয়ে দেওয়ার জন্য চাই আরো রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, পারিবারিক সহযোগিতা।

এই উজ্জ্বল অগ্রসরমাণ বাংলাদেশের আরেকটি চিত্র প্রতিদিন আমাদের বিমর্ষ ও উদ্বিগ্ন করে তোলে। তা হলো নারী ও মেয়েশিশুদের প্রতি সহিংসতা। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, ৮৭ শতাংশ নারী গৃহে শারীরিক, মানসিক সহিংসতার শিকার হয়। নানা পাশবিক, সন্ত্রাসী আচরণ, মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায় কখনো কখনো, দৈহিক আঘাত মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানায়। চোখ তুলে নেওয়া হচ্ছে, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে মেরে ফেলা হচ্ছে, গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে। মেয়েদের প্রতি বর্বর আচরণ করা হচ্ছে। আজকের বাংলাদেশকে জাতীয়ভাবে অঙ্গীকার নিতে হবে। আর কোনোমতে এই বর্বরতা চলতে দেওয়া যাবে না। নারীর প্রতি সহিংস আচরণের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসতে হবে তরুণসমাজ, পুরুষসমাজ, নারীসমাজ—সবাইকে।

১৯৭১ সালে যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, সেসব নীতিমালা, যা ১৯৭২ সালের শাসনতন্ত্রে লিপিবদ্ধ হয়েছিল, তা আজ ক্ষতবিক্ষত। আমাদের আজ রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকার নিতে হবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নির্বিশেষে সব নারী-পুরুষের সম-অধিকার, সমমর‌্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার। এটা অসাম্প্রদায়িক নারী-পুরুষের ক্ষমতাপূর্ণ একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমেই নিশ্চিত ও নিরাপদ করা যাবে। সমতা প্রতিষ্ঠায় আজ এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

প্রস্তাবাবলি

১. সিডও সনদের ২ ও ১৬.১-এর (গ) ধারা থেকে বাংলাদেশ সরকারের সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে সনদে পূর্ণ অনুমোদন দিতে হবে। ২. সিডও সনদের ধারাগুলো দেশের আইনে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৩. সিডও সনদের যেসব ধারায় সরকার অনুমোদন দিয়েছে সেসব ধারার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৪. দেশের বিদ্যমান আইনের বৈষম্যমূলক ধারাগুলো চিহ্নিত করে সেসব আইন সংস্কার করতে হবে, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং তার বাস্তবায়ন নিশ্চিতকল্পে ব্যবস্থা নিতে হবে।

৫. হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইনে বিদ্যমান ত্রুটি দূর করতে হবে এবং বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করতে হবে। ৬. পারিবারিক (সুরক্ষা ও প্রতিরোধ) আইন ২০১১ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে এবং এই আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে।

৭. বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ৮. সম্পদ-সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমতা বিধানের জন্য উপযুক্ত নীতিমালা, আইন ও কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। ৯. নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। ১০. বাল্যবিবাহ বন্ধ করার লক্ষ্যে মেয়েদের বিয়ের বয়স ন্যূনতম ১৮ বছর বহাল রাখতে হবে। ১১. সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য ন্যায্য বিচার ও সংবেদনশীল সেবাপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। ১২. বিচার বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিতে হবে। ১৩. পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। ১৪. নারীর প্রতি প্রচলিত নেতিবাচক প্রথা, রীতিনীতি ও অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য গণমাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। ১৫. নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। ১৬. রাজনৈতিক দলের সব পর‌্যায়ের নীতি নির্ধারণে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ১৭. ঘরে-বাইরে সর্বত্র নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। ১৮. কর্মজীবী নারীদের জন্য পর‌্যাপ্ত আবাসিক হোস্টেল, পরিবহন, শিশু দিবাযত্নকেন্দ্রের ব্যবস্থা করতে হবে। ১৯. প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ২০. নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ২১. কৃষক নারী, শ্রমিক নারী, প্রতিবন্ধী ও আদিবাসী নারীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। ২২. চলমান সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার না হয়ে সব ধরনের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও বিকল্প সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

 

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

মন্তব্য