kalerkantho


‘শিশুহত্যা রোধে দরকার দ্রুত বিচার’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘শিশুহত্যা রোধে দরকার দ্রুত বিচার’

ঘরে-বাইরে অব্যাহতভাবে নির্যাতন-নৃশংসতার শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। মা-বাবার দাম্পত্য কলহ, অনৈতিক সম্পর্ক, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, অর্থ-বিত্ত-বৈভব ও ক্ষমতা নিয়ে বড়দের দ্বন্দ্ব—এই সব কিছুর বলি হচ্ছে তারা।

মাদকাসক্তরাও শিশুদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। এক কথায়, প্রতিরোধের ক্ষমতা নেই বলে শিশুদের সহজ টার্গেট বানাচ্ছে এক শ্রেণির মানুষ। এ অবস্থা দেশের ভবিষ্যতের জন্য ‘ভয়ংকর’। এর ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিরোধে আইনের দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিয়া রহমান এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। শুক্রবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে পর্যালোচনাভিত্তিক টক শো পূর্বাপর অনুষ্ঠানে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের শিশুহত্যা একটি মহাদুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিরোধে এখনই আমাদের সজাগ হতে হবে। না হলে আমাদের আগামী প্রজন্ম আলোর মুখ দেখবে না। ’

নাজনিন নাসির দোলার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো আলোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক ড. মাহবুবা নাসরিন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সঞ্চালক বলেন, শিশুদের ওপর নৃশংসতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে এবং দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে শিশুদের প্রতি যেকোনো নৃশংসতার দ্রুত বিচার ও রায় হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব বিচার ও রায়ের খবর ফলাও করে প্রচার করা দরকার বলে অনেকে মত দিচ্ছেন। আসলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজের প্রত্যেক মানুষের শিশু ও নারীদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

জবাবে ড. মাহবুবা নাসরিন বলেন, শিশুদের সুরক্ষায়  দেশে আইন থাকলেও এর সঠিক প্রয়োগ নেই। এ ছাড়া আক্রমণকারীদের বেশির ভাগই প্রভাবশালী। ফলে দু-একটি ঘটনায় ভুক্তভোগীরা বিচার পেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বছরের পর বছর ঝুলে থাকে বিচার কার্যক্রম। এ  কারণেই দেশে এই হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালের শিশু আইন রহিত করে শিশু আইন ২০১৩ প্রণীত হয়েছে। কিন্তু এর যথাযথ প্রয়োগ নেই। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে যে কয়টি অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা আমাদের দেশের শিশুরা পায় না। এ ছাড়া আইনের প্রথম মাধ্যম থানা থেকে শুরু করে সর্বশেষ স্তরে শিশু সুরক্ষার বিশেষ সুবিধা নেই। এসব জটিলতার কারণেই অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি হচ্ছে না। তিনি বলেন, শিশুরা নিরীহ, দুর্বল। তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে না। এ সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা। তারা প্রতিপক্ষের ওপর যেকোনো বিষয়ে প্রতিশোধ নিতে শিশুদের নির্যাতন-হত্যা করছে। যেসব মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ নেই, সেসব পাষণ্ডই এসব নির্মম ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।

এ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, গত বছর শিশু রাজন ও রাকিব হত্যার দ্রুত বিচার হয়েছে। দেশের মানুষ এ জন্য সরকারকে সাধুবাদও জানিয়েছে। এভাবে আইনের প্রয়োগে তো কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু অনেক সময় শিশুদের হত্যাকাণ্ডে বা নির্যাতনের বিচারে সেভাবে সাক্ষীই পাওয়া যায় না। কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

জবাবে ড. জিয়া রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন শিশুদের হত্যাকারীদের বিচার হবে। শুধু প্রধানমন্ত্রী নয়, সমাজের সব নাগরিককে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, শিশুদের ওপর প্রতিটি নৃশংসতার বিচার দ্রুত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে বিচারের রায় ফলাও করে প্রচার করলে অন্যরাও ভয় পাবে। কমে আসবে শিশুদের ওপর নির্যাতন ও নৃশংসতা।

জিয়া রহমান আরো বলেন, শিশুদের সঙ্গে সংঘটিত সব অপরাধের বিচার হচ্ছে না। এতে মানুষের মধ্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটনে এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে। অনেকেই মনে করে, অপরাধ করলেও পার পাওয়া যাবে। শিশুদের  বেলায়ও তা-ই হচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেড় মাসে ৪৩টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এ পরিসংখ্যান তৈরি করা হয় গত জানুয়ারি  থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৭ দিনে সারা দেশে শিশুদের ওপর নির্যাতন-নৃশংসতার আলোকে। হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে সংগঠনটি সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়, বেকারত্ব, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, অনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিচারহীনতাকে চিহ্নিত করে। শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজন সবার চেষ্টা ও সচেতনতা। শিশুদের সুরক্ষায় ২০১৩ সালে যে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।


মন্তব্য