রাস্তার খাবার ও জাংকফুড নিরাপদ নয়-332661 | মুক্তধারা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


রাস্তার খাবার ও জাংকফুড নিরাপদ নয়

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রাস্তার খাবার ও জাংকফুড নিরাপদ নয়

আমি যখন হাঁটতে বের হই তখন রাস্তায় অসংখ্য খাবারের দোকান দেখি। রাস্তায় তৈরি ও পরিবেশিত খাবারকে স্ট্রিটফুড বা রাস্তার খাবার বলা হয়। এসব খাবার বিদেশেও স্ট্রিটফুড বা রাস্তার খাবার হিসেবে পরিচিত। উন্নত দেশের স্ট্রিটফুড স্বাস্থ্যসম্মত, উপাদেয় ও আকর্ষণীয় হয়। বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে রাস্তায় যেসব খাবার তৈরি ও বিক্রি হয় তা বিশুদ্ধ, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। খেতে উপাদেয় বা মুখরোচক হলেও এসব স্ট্রিটফুড অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুত ও পরিবেশিত হয় বলে বিভিন্ন জটিল ও মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। ঢাকার প্রায় সব দোকানের খাবার খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত অবস্থায় তৈরি, বিক্রি ও সাজিয়ে রাখা হয়। তাই এসব খাবার পোকামাকড়, মাছি দ্বারা দূষিত হয়। সাধারণত সস্তা, তৈলাক্ত ও ঝাল হওয়ার কারণে রাস্তার খাবারের বেশ কদর রয়েছে। এ-জাতীয় খাবার খেলে মানুষ যেসব রোগে আক্রান্ত হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ, আলসার, হূদরোগ ইত্যাদি। বাংলাদেশে প্রায় ১৩০ পদের রাস্তার খাবার পাওয়া যায়। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে শিঙাড়া, সমুচা, ছোলা ভাজা, বেগুনি, আলুর চপ, ডালপুরি, ফুচকা, চটপটি, ভেলপুরি, পাকুড়া, হালিম, ঝালমুড়ি, জিলাপি, লেবুর শরবত, আখের রস ইত্যাদি। এ ছাড়া বাড়তি খাবার হিসেবে থাকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আলু সিদ্ধ, স্যুপ, পোড়া পেঁয়াজ ও মরিচ, সালাদ, নুডলস ও হরেক রকম মিষ্টান্ন। রাস্তার খাবারের পুষ্টিগুণ থাকে অতি সামান্য এবং শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব থাকে অতি বেশি। এসব রাস্তার খাবারের মূল খরিদ্দার হলো রিকশাচালক, টোকাই, ছিন্নমূল মানুষ, হকার, ছোট ব্যবসায়ী, শিশু, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক, গরিব ও অশিক্ষিত নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের কোনো স্বাস্থ্যসচেতনতা নেই। স্কুল পড়ুয়া ছোট শিশুরাও এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার খায় এবং প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক সময় মা-বাবারাও তাঁদের সন্তানদের এসব খাবার কিনে দেন এবং খেতে উৎসাহিত করেন। বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর আচার ও অজানা-অচেনা ব্র্যান্ডের আইসক্রিম শিশুদের অতিপ্রিয়। কিন্তু ক্ষতিকর এসব খাবার শিশুদের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। মা-বাবাদের প্রতি অনুরোধ, ঘরের বাইরে তৈরি অস্বাস্থ্যকর খাবার খাইয়ে আপনাদের শিশুদের জীবন বিপন্ন করবেন না। শিশুরা অবুঝ বলে হয়তো অস্বাস্থ্যকর খাবার পছন্দ করে ও খায়। কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা কিভাবে নিশ্চিন্তে-নির্দ্বিধায় এসব খাবার প্রতিনিয়ত খেয়ে চলেছে তা আমার বুঝতে কষ্ট হয়। অনেক ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, সস্তা ও উপাদেয় বলে তারা এসব রেডিমেড খাবার খায়। সস্তায় নাশতার বিকল্প না থাকার কারণেও তাদের রাস্তার খাবার খেতে হয়। কথা হলো, সস্তা ও উপাদেয় হলে খাবার স্বাস্থ্যহানির কারণ হবে না তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? সস্তায় খাবার খেতে গিয়ে স্বাস্থ্যের তিন অবস্থা হলে তখন বিপদ সামলাবে কে? প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, একটু চিন্তা করো আর একটু স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়াও। তাহলে জীবন সুন্দর হবে, বিপন্মুক্ত হবে।

রাস্তায় খাবার তৈরি হয় মূলত আটা, ময়দা, বেসন, মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি ও তেল দিয়ে। দিনের পর দিন একই তেল ব্যবহার করা হয় বলে তা পুড়ে যায় এবং এই তেল হূদরোগ সৃষ্টি করে। অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন কাপড়চোপড় পরে ময়লা ও জীবাণুযুক্ত হাতে রাস্তার খাবার তৈরি করা হয় বলে এসব খাবার খাওয়া ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তার খাবার তৈরিতে প্রায়ই ব্যবহার করা হয় দূষিত পানি। খাওয়ার পানিও বিশুদ্ধ থাকে না। ফিল্টার করা পানি ব্যবহার করা হয় না বলে পানিতে ই-কোলাই ও প্রোটিয়াস বেসিলাস-জাতীয় জীবাণু থাকে। যেসব থালা-বাসন বা পাত্রে খাবার পরিবেশিত হয়, সেগুলোতে ক্ষতিকর জীবাণু থাকে। এসব জীবাণুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অ্যাপেডারমিডিস ও সালমোনেলা প্রজাতির জীবাণু। রাস্তায় তৈরি বিভিন্ন ফলের রসে থাকে অসংখ্য জীবাণু। যেসব যন্ত্রপাতি বা আনুষঙ্গিক ব্যবহার্য দিয়ে ফলের রস তৈরি করা হয় এবং যেসব গ্লাস বা পাত্রে তা পরিবেশিত হয়, সেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ময়লা ও জীবাণুতে ভর্তি থাকে। ময়লা ও দুর্গন্ধময় পানি দিয়ে বারবার একই গ্লাস ধোয়া হয়। তবে কোনো কোনো খাবার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তৈরি ও বিক্রি হয়। এর সংখ্যা অবশ্য অতি নগণ্য। রাস্তায় তৈরি খাবারে অনেক সময় নিষিদ্ধ উপকরণ ও রং ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন শহরে তৈরি খাবারের মধ্যে মেটানিল ইয়েলো, কমলা রং ২, রোডামিন বি, অরোমিন অরেঞ্জ জি-জাতীয় নিষিদ্ধ রঙের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। খাবারকে আকর্ষণীয় করার জন্য অনেক বিক্রেতা বস্ত্রশিল্পে ব্যবহূত ক্ষতিকর রং পর্যন্ত ব্যবহার করে থাকে। রাস্তায় তৈরি কোমল পানীয়তে অনেক সময় আলকাতরার রংও ব্যবহূত হয়! এসব খাবারে আরো থাকে তামা, লৌহ ও সিসার মতো ভারী ধাতু, যা শরীরের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

শীতকাল এলে রাস্তায় তৈরি খাবারের ধরন পাল্টে যায়। শীতকালে উল্লিখিত খাবার ছাড়াও তৈরি ও বিক্রি হয় হরেক রকম উপভোগ্য পিঠা। এই পিঠার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ভাঁপা পিঠা, পোয়া পিঠা ও চিতই পিঠা। চিতই পিঠার সঙ্গে থাকে নানা রকম ঝাল চাটনি, গাঢ় আখের রস বা গুড়। খেতে সুস্বাদু হলেও এসব খাবারও তৈরি হয় নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। যারা পিঠা তৈরি ও পরিবেশন করে তাদের পরিধেয় কাপড়চোপড় ও হাত থাকে অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন। যে হাতে টাকা আদান-প্রদান করে, সেই একই হাত দিয়ে তারা পিঠা তৈরি ও পরিবেশন করে। এতে পিঠা জীবাণু দ্বারা দূষিত হয়ে পড়ে। অনেক দরিদ্র মহিলা ফুটপাতে বসে আটার রুটি তৈরি করে সাধারণ তরিতরকারি বা গুড়সহ দিয়ে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে। অনেকে আবার বাসাবাড়ি থেকে ভাত রান্না করে এনে সাধারণ তরিতরকারিসহ বিক্রি করে টু-পাইস উপার্জন করে। এসব খাবারের মূল খরিদ্দার হলো রিকশাচালক, ছিন্নমূল ও স্বল্প আয়ের মানুষ।

বাংলাদেশের কাগজের টাকার নোটগুলো সংক্রামক রোগ বিস্তারের আরেক বড় মাধ্যম। এসব ময়লা নোটে থাকে শত প্রকারের প্রাণঘাতী জীবাণু। নিয়ম হচ্ছে, যারা টাকার নোট স্পর্শ করবে বা আদান-প্রদান করবে তারা খাবার স্পর্শ করবে না। কারণ টাকা আদান-প্রদানের পর খাবার স্পর্শ করলে টাকার অসংখ্য জীবাণু খাবার দূষিত করে ফেলে। এই দূষিত খাবার খেলে যে কেউ মারাত্মক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আমি হরহামেশাই দেখি, আমাদের দেশে যারা টাকা আদান-প্রদান করছে তারাই আবার সেই ময়লা হাত দিয়ে খাবার পরিবেশন করছে। বিদেশে এ ধরনের প্র্যাকটিস দেখাই যায় না। আমাদের স্বাস্থ্যসচেতনতার এত অভাব কেন আমি বুঝি না। এসব ছোটখাটো জিনিস কি বই-পুস্তকে লিখে মানুষকে শেখাতে হবে? এত ছোটখাটো কাজে সাধারণ জ্ঞান কেন কাজ করে না, তা-ও আমার বুঝতে কষ্ট হয়। কাগজের টাকার মধ্যে গ্রাম পজিটিভ, গ্রাম নেগেটিভ—দুই ধরনের জীবাণুই পাওয়া যায়। রিকশাচালক, গণপরিবহনের কন্ডাক্টর, মাছ ও সবজি বিক্রেতাদের দ্বারা টাকা সবচেয়ে বেশি দূষিত হয়। টাকায় বিদ্যমান জীবাণুর মধ্যে রয়েছে, ই. কোলাই, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস, মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকোলোসিস, ভিব্রিও কলেরি, করিনেব্যাকটেরিয়াম, মাইকোকক্কাস, ক্লেবসিলা, সালমোনেলা, সিওডোমোনাস ও বেসিলাস প্রজাতির ক্ষতিকর জীবাণু। এসব ক্ষতিকর জীবাণুর কারণে খাদ্যে বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মের সংক্রমণ, শ্বাস-প্রশ্বাস ও পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাসহ প্রাণঘাতী রোগ মেনিনজাইটিস ও সেপ্টেসেমিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

খাবারের মাননিয়ন্ত্রণ প্রতিনিধি বা বিশেষজ্ঞদের মতে, জাংকফুড হলো স্বল্প পুষ্টিসম্পন্ন অস্বাস্থ্যকর খাবার। প্রচুর চর্বি, লবণ, চিনি ও মনোসোডিয়াম গ্লুুটামেট, টাট্রাজিন-জাতীয় বিতর্কিত খাদ্য উপকরণসমৃদ্ধ খাবারকে সাধারণত জাংকফুড বলা হয়। অন্যান্য দরকারি খাবারের মতো এসব খাবারে প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ ও আঁশজাতীয় খাবারের পরিমাণ কম থাকে। বিশ্ববিখ্যাত ম্যাকডোনাল্ড, বার্গার কিং, কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন (কেএফসি) পিত্জা হাটের হ্যামবার্গার, ফ্রায়েড চিকেন বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইকে জাংকফুড হিসেবে অভিহিত করা হয়।

বহু কারণে মানুষ, বিশেষ করে শিশু-কিশোররা জাংকফুডের প্রতি অতিমাত্রায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। জাংকফুড বা ফাস্টফুড খেতে বেশ সুস্বাদু। এসব খাবার প্রস্তুতে বেশি সময় লাগে না বলে অর্ডার দিলেই অল্প সময়ে সরবরাহ করা সম্ভব। পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের দ্রব্যসামগ্রী কিনতে বাজারে বা দোকানে যেতে হয় এবং রান্না বা প্রস্তুতে সময়ের প্রয়োজন। অনেকেরই এত সময় থাকে না। অল্প বয়সী তরুণ-তরুণীরা রেডিমেড খাবারেই বেশি অভ্যস্ত। এ কারণে পশ্চিমা বিশ্বে দুপুরের খাবারের সময় অসংখ্য মানুষকে জাংকফুড বা ফাস্টফুড খেয়ে দায় সারতে হয়। ওসব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাফেটেরিয়াগুলোতে জাংকফুডের কোনো স্থান নেই। ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশন করা হয়। কোনো কোনো সময় জাংকফুড তুলনামূলক সস্তা দামে পাওয়া যায়। সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রম বা ক্লান্তির পর অনেকের কাছে প্রচুর চিনিসমৃদ্ধ কোমল পানীয়সহ ফাস্টফুড বা জাংকফুড পাওয়া এক অপরিসীম আত্মতৃপ্তির ব্যাপার। আমাদের দেশে আজকাল বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সভা-সমিতি বা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে জাংকফুডের প্রচলন বাড়ছে। ফাস্টফুডের জনপ্রিয়তার পেছনে বিজ্ঞাপনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মুটিয়ে যাওয়াসংক্রান্ত স্বাস্থ্যসমস্যা মোকাবিলায় ২০০৩ সালে ১১৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়। প্রতিবছর অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সারে মারা যায় পাঁচ লাখ মানুষ। অতিমাত্রায় চর্বিসমৃদ্ধ খাবার খেয়ে প্রতিবছর মারা যায় তিন লাখ মানুষ। প্রচুর চর্বি ও চিনিসমৃদ্ধ খাবার খেলে শরীরের ওজন বেড়ে যায়। বাড়তি ওজন শরীরের জন্য কোনো রকমেই ভালো নয়। পশ্চিমা বিশ্বে ক্যান্ডি, আইসক্রিম, প্রচুর চিনিসমৃদ্ধ কোমল পানীয়, তেল ও চর্বিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার কারণে মানুষের, বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওজন বৃদ্ধি এক জাতীয় সমস্যারূপে আবির্ভূত হয়েছে। শরীরের মাত্রাতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে হূদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস-জাতীয় বহু রোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এসব ভয়ংকর প্রাণঘাতী রোগের কথা ভেবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্থূলকায় ব্যক্তিদের ওজন কমিয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অতিরিক্ত চর্বি বা চর্বিজাতীয় খাবার শরীরের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কোলেস্টেরল এক সুপরিচিত লিপিড। শরীরের শিরা-উপশিরার অভ্যন্তরীণ দেয়ালে কোলেস্টেরল, লিপিড বা চর্বিজাতীয় দ্রব্য ও লাইপোফেইজ পুঞ্জীভূত হওয়ার কারণে শিরা মোটা হয়ে যায় এবং সম্প্রসারণ-সংকোচন ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ও হূদরোগে আক্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। শুধু ফাস্টফুডের কথাই বা বলি কেন, আমাদের দেশে বিয়ে-শাদি বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমরা যেসব খাবার পরিবেশন করি বা খাই, তা ফাস্টফুডের চেয়ে কম ক্ষতিকর নয়; বরং আমি বলব বেশি ক্ষতিকর। পোলাও, বিরানি, রোস্ট, গরু বা খাসির মাংসে যে পরিমাণ তেল, ডালডা, চর্বি, ঘি ব্যবহার করা হয় তা কোনোমতেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। গরু বা খাসির মাংসে এমনিতেই প্রচুর চর্বি ও কোলেস্টেরল থাকে। তার ওপর আরো বাড়তি তেল, চর্বি, ঘি দিয়ে খাবারকে সুস্বাদু করা হয় বটে; কিন্তু তা কোনোমতেই স্বাস্থ্যসম্মত হয় না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এ-জাতীয় খাবার খাওয়ার কারণে আমাদের দেশে উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হূদরোগ, ডায়াবেটিসের প্রবণতা মারাত্মক হারে বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ব্যাপারটি এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে বলে আমি মনে করি। সম্প্রতি রেড মিট বা লাল মাংস খাওয়ার ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছেন গবেষকরা। কারণ রেড মিট শরীরে ক্যান্সার তৈরি করে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। সুতরাং অধিক পরিমাণে রেড মিট খাওয়ার ব্যাপারে সবাইকে সাবধান হতে হবে। সুষম স্বাস্থ্যকর খাবার আমাদের শরীর সুস্থ রাখতে বিশেষ অবদান রাখে। পরিমিত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা, প্রোটিন বা আমিষ, লিপিড, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, বিশুদ্ধ পানীয়, আঁশজাতীয় খাবার স্বাস্থ্যকর খাবারের অন্তর্ভুক্ত। উল্লিখিত খাবারের মধ্যে শাকসবজি-ফলমূলের আধিক্য থাকা অবশ্য বাঞ্ছনীয়। শাকসবজি-ফলমূল হলো ভিটামিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, খনিজ পদার্থ ও আঁশজাতীয় দ্রব্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার। আমাদের দেশের শিশু-কিশোররা শুধু মাংস ও তেল-চর্বি জাতীয় খাবার খেতে চায়। ফলমূল, শাকসবজিতে তাদের প্রচণ্ড অনীহা। এ প্রবণতা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। শাকসবজি-ফলমূল, আঁশসমৃদ্ধ সুষম খাবার শরীরের ওজন, হূদরোগ, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই ছোটকাল থেকে শিশুদের শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ানোর অভ্যাস করতে হবে। না হলে পরবর্তী জীবনে তাদের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতে হতে পারে। সারা বিশ্বে মানুষের মধ্যে অন্য একটি অশুভ প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। আমরা ওষুধ কম্পানিগুলোকে ভিটামিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, খনিজ পদার্থের একমাত্র উৎস হিসেবে বিবেচনা করি এবং এসব কেনার জন্য প্রচুর অর্থকড়ি ব্যয় করি। আমাদের মনে রাখা উচিত, প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত ভিটামিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বা খনিজ কম্পানি কর্তৃক কৃত্রিম উপায়ে প্রস্তুত পিল বা ট্যাবলেটের চেয়ে বেশি কার্যকর। স্থূলকায় শিশু-কিশোরদের আইসক্রিম, ক্যান্ডি বা ফাস্টফুডের অপকারিতা সম্পর্কে জ্ঞানদান অত্যন্ত প্রয়োজন। কালেভদ্রে দু-একবার খাওয়া গেলেও জাংকফুডের প্রতি আসক্তি ও প্রতিনিয়তই এসব খাওয়া সবার জন্য সমূহ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সময় থাকতেই অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিহার করে সুষম, পুষ্টিকর স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করে স্বাস্থ্য ভালো রাখুন। আপনি ডায়াবেটিসে ভুগলে প্রচুর চিনিসমৃদ্ধ কোমল পানীয় বর্জন করুন। পানীয় হিসেবে বিশুদ্ধ পানির কোনো বিকল্প নেই। চাইলে কৃত্রিম চিনি বা মিষ্টিকারক দিয়ে তৈরি কোমল পানীয় পান করুন। যদি পারেন এসব পানীয় না খাওয়া আরো উত্তম। আপনি হয়তো জানেন না, পরিশোধিত চিনি হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের অন্যতম এক কারণ।

স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে রোজার সময় খাবার গ্রহণে আমাদের অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। ইফতার ও সেহরিতে ভাজা-পোড়া, তেল ও চর্বি সমৃদ্ধ খাবার পরিহার করে শাকসবজি, ফলমূল ও ঘরে তৈরি পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। রমজান মাসে প্রচুর পানি বা পানীয় গ্রহণ করা দরকার। না হলে পানিশূন্যতায় শরীর আক্রান্ত হতে পারে।

আমাদের সব সময় মনে রাখা উচিত, অসুস্থ হওয়াটা এক বিরাট অভিশাপ। সুস্বাস্থ্যই সব সুখের মূল। সুস্থ থাকার জন্য আমাদের সদা সচেষ্ট থাকা দরকার। কোনোমতেই শরীরের ওপর অত্যাচার করবেন না। যাঁরা বলেন, ‘শরীরের নাম মহাশয় যা করে তা সয়’—কথাটি ঠিক নয়। পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যকর খাবার সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের সবার একটু পড়াশোনা করা দরকার। আপনি ও আপনার পরিবারের সব সদস্যের জন্য একটি স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। সুস্বাস্থ্য আমাদের জীবনে শুধু আনন্দই বয়ে আনে না, সুস্বাস্থ্য আমাদের উপহার দেয় অফুরন্ত কর্মচাঞ্চল্য, উৎসাহ-উদ্দীপনা, শক্তি, যা আপনার জীবনে বয়ে আনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। তাই আসুন, আমরা সবাই খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে সুস্থ থাকতে সচেষ্ট হই।

 

লেখক : অধ্যাপক, ফার্মাসি অনুষদ, ঢাবি

drmuniruddin@gmail.com

মন্তব্য