kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


জলবায়ু পরিবর্তন ও নারী

হারুন-অর-রশিদ

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জলবায়ু পরিবর্তন ও নারী

ঢাকার রাস্তায় দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থেকে রিকশাচালক রবিউল ইসলামের জীবনসংগ্রামের কথা জানতে তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতা শুরু করেছিলাম। তাঁর কাছে জানতে পারি, নদীভাঙনে সব কিছু হারিয়ে তিনি পটুয়াখালী থেকে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় এসেছেন। পটুয়াখালীর প্রত্যন্ত একটি গ্রামে রেখে এসেছেন তাঁর স্ত্রী ও তিন কন্যাসন্তানকে। ঢাকার একটি বস্তিতে তাঁর বসবাস। ছোট একটি কক্ষ। ভাড়া দুই হাজার ৫০০ টাকা। সেখানেই তিনিসহ আরো সাতজন গাদাগাদি করে বাস করেন। সারা বেলার ক্লান্ত শরীর নিয়ে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করার খুব একটা সময় হয়ে উঠে না তাঁর। তিনি জানালেন, বস্তিতে তাঁদের প্রতিদিন পানি কিনে হিসাব করে ব্যবহার করতে হয়। তাঁর মতোই সাতক্ষীরা, বরগুনা, ভোলা, বরিশালসহ উপকূলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আরো অনেকের অস্থায়ী ঠিকানা হয়েছে ঢাকার বস্তি। সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যায়, তাহলে উপকূলেরই ১৬টি জেলার প্রায় তিন কোটি মানুষ বাস্তুহারা হতে পারে। আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার (আইওএম) হিসাবে ঢাকার বস্তিগুলোতে বাস করা মানুষের ৭০ শতাংশই রবিউল ইসলামের মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর ঢাকায় আসা জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা প্রায় চার লাখ। ১ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দুই হাজার মানুষ বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসে। এটা নতুন কিছু নয়। দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে বাঁচতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নারী-পুরুষ সবার কাছেই ঢাকা এক আকর্ষণীয় নগরীর নাম। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিরা এই আগমনকে ত্বরান্বিত করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একমাত্র পুরুষ সদস্য দেশের বিভিন্ন স্থানে বা প্রতিবেশী দেশগুলোয় জীবিকা অর্জনের জন্য অভিবাসী হচ্ছে। ফলে অভিভাবকশূন্য পরিবারটির সব দায়িত্ব গিয়ে পড়ছে নারীর ওপর। অনেক সময় অভিবাসী স্বামীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারে না এসব নারী। ফলে দিন দিন তাদের পারিবারিক বন্ধন ক্ষীণ হতে থাকে। তা ছাড়া অনেকে সময়মতো সাংসারিক খরচ বাড়িতে পাঠাতে পারে না। এতে বাড়িতে থাকা নারীকে সংসার সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। নারীর দায়িত্ব তখন শুধু সংসার সামলানোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সন্তানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবন ধারণের জন্য অর্থ উপার্জনের দায়িত্ব ওই নারীকেই নিতে হয়। ফলে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় তাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের প্রতিদিনের খাবার তৈরি ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করার দায়িত্বও পড়ে নারীর ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত লবণাক্ততার জন্য উপকূলীয় অঞ্চলের পানি পানের অনুপযোগী। লবণমুক্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহ করার জন্য প্রতিদিন অনেক নারীকে কয়েক কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয়। এতে করে নারীকে অধিক কায়িক শ্রম করতে হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে কম করে পানি পানের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। আর নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার কারণে শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। আবার অনেক সময় তারা সুপেয় পানির অভাবে লবণাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে তাদের উচ্চ রক্তচাপে ভোগার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় মায়ের লবণাক্ত পানি পানের কারণে শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তা ছাড়া দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারীর নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। সেখানে তাদের জন্য আলাদা কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা  নেই। পুরুষের সঙ্গে সব কিছু ভাগাভাগি করতে হয়। ফলে আশ্রয় নিতে এসে নানা  বৈষম্যের পাশাপাশি অনেক সময় যৌন হয়রানির মতো ভয়ংকর পরিস্থিতির শিকারও হতে হয়। দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে যে ত্রাণ সরবরাহ করা হয় তাও গর্ভবতী নারী ও শিশুর চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে এসব অঞ্চলের নারী ও শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে।

খরা, বন্যা, লবণাক্ততা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, উপকূল ভাঙনসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকার অনেক লোক বেকার হয়ে পড়ছে। এদের বেশির ভাগই কৃষি বা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল মানুষ। পুরুষ শ্রমিকরা কাজের সন্ধানে রাজধানী ঢাকাসহ অন্য বড় শহরগুলোতে চলে গেলে বেশির ভাগ সময় নারী শ্রমিকরা বাড়িতে বেকার পড়ে থাকছে। অর্থ উপার্জনের বিকল্প কোনো পথ না থাকায় তারা তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে ত্রাণ সংগ্রহের কাজে। কিন্তু অপ্রতুল ত্রাণ সরবরাহের কারণে অনেকেই ঘরে ফিরছে খালি হাতে। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে এরপর তারা ছুটছে শহরে। কিন্তু সেখানেও অনিশ্চয়তা। আশ্রয় নেই, কাজ নেই। এই বাস্তুহারা মানুষ কোথায় ঠাঁই পাবে, কী করবে, কী খাবে, কী হবে তাদের ভবিষ্যৎ—তা নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। সরকারি ও  বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক পরিকল্পনা বিদেশি অর্থ সহায়তার ওপরই নির্ভর করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে অর্থ সহায়তা পাওয়া না পাওয়ার  কোনো নিশ্চয়তা নেই।

 

লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

h_o_rashid@yahoo.com


মন্তব্য