মিডিয়ার স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার-330630 | মুক্তধারা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


মিডিয়ার স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার ঐতিহ্য

চিন্ময় মুত্সুদ্দী

১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মিডিয়ার স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার ঐতিহ্য

১৯৫৩ সাল থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকতায় একটি নতুন ধারার সূচনা করে। এ ধারায় সাহসের সঙ্গে সত্য উচ্চারণ আর মাথা নত না করার অঙ্গীকার ছিল। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটায়। অনেকেই বলেন, বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। পূর্ব পাকিস্তানের সব সংবাদপত্র দিনটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে আন্দোলনের পরের বছর থেকেই। বায়ান্ন সালেই ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত ঘটনার কথা পরদিনই সংবাদপত্রে প্রধান শিরোনাম হয়। পরের বছর ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ শিরোনামে আসে সব সংবাদপত্রে। পরদিন বিবরণ ছাপা হয় দিবসটি পালনের জন্য আয়োজিত নানা ঘটনার। এ ধারা এখনো অক্ষুণ্ন আছে। ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণার পর সংবাদপত্র বন্ধ থাকায় বিবরণ ছাপানো হতো ২৩ ফেব্রুয়ারি। এখন অবশ্য সংবাদপত্রে ছুটি থাকলেও বিশেষ ব্যবস্থায় পরদিন পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

শুরুর দিকের শিরোনাম ছিল ‘আজ একুশে ফেব্রুয়ারি’ বা ‘আজ অমর একুশে’। এখনো এ শিরোনামটা ব্যবহৃত হয়, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছোট অক্ষরে। এর পরিবর্তে বাংলা ভাষা বা ভাষাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ষাটের দশকের শেষ দিকে পর পর কয়েক বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক পাকিস্তান ৮ কলামে ব্যানার শিরোনাম করল ‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী সে সবার কীবা রীতি নির্ণয় ন জানি।’ এ সময় বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা শুরু হয়। এর আগে নিয়মিত সংখ্যায় ছাপানো হতো বিশেষ প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ। ভাষা আন্দোলনের নানা ঐতিহাসিক তথ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার আঙ্গিকে প্রকাশের ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত রয়েছে। কর্মসূচি ও উদ্যাপনের খবরের বাইরে ইতিহাসনির্ভর রিপোর্ট ও ফিচার প্রকাশের মাধ্যমে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসকে একুশের সাংবাদিকতায় নিয়ে আসে দৈনিক পাকিস্তান ষাটের দশকের শেষ দিকে। তখন এর বার্তা সম্পাদক তোয়াব খানের পরিকল্পনায় ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘আমরা বরকতের ভাই আমরা সালামের ভাই’ শিরোনামে প্রথম পাতায় এক কলামের রিপোর্ট প্রকাশ শুরু হয়। এটি ছিল পাঠকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। ভূঁইয়া ইকবাল এ রিপোর্ট লেখেন প্রথমে, পরে লিখেছেন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। শেষের পাতায় ক্রমান্বয়ে ছাপানো হয়েছে নানা আঙ্গিকের ফিচার। স্বাধীনতার পর সিঙ্গেল কলামের এ রিপোর্টের ধরনটি অন্য পত্রিকা অনুসরণ করে। এখনো এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। ভাষাশহীদদের নামে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে সিঙ্গেল কলাম রিপোর্ট এখন প্রায় সব দৈনিকের স্থায়ী পরিবেশনা। বাংলা একাডেমির বইমেলা শুরুর পর থেকে মেলার খবর একুশের সাংবাদিকতায় ক্রমেই প্রধান একটি বিষয়ে রূপ নিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভাষণ প্রকাশের ব্যাপারটি আমাদের মিডিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য প্রক্রিয়া। সে হিসেবে একুশে পদক বিতরণের খবরটি এখন ১ ফেব্রুয়ারির একটি প্রধান খবর হিসেবে স্থান পেয়েছে, বিশেষ করে সরকারপ্রধানের ভাষণের পরিপ্রেক্ষিতে। বাংলা একাডেমির বইমেলার উদ্বোধনের খবরটিও একই কারণে মিডিয়ায় গুরুত্ব পায়।

একুশের প্রথম সংকলন হিসেবে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ আমাদের কাছে পরিচিত ছিল। সম্প্রতি জানা গেল প্রথম স্মরণিকা আসলে ‘ওরা প্রাণ দিল’। সম্পাদক হিসেবে নাম ছাপানো হয় ‘সহকমী’। এটি ছিল ছদ্মনাম। তার আসল নাম প্রমথ নন্দী। ভাষাসৈনিক ফজলুল করিম তাঁর স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থে (বায়ান্ন’র কারাগার) সে কথা বলেছেন, যা সংবাদপত্র বৃহত্তর পাঠকসমাজকে অবহিত করেছে।

সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনার আলোকে বা জাতিগত পরিচয়ের বিতর্কে কিংবা ভাষাচর্চার সংকটে একুশকে অবলম্বন করে নতুন নতুন বিষয়-ভাবনা স্থান করে নিয়েছে একুশের সাংবাদিকতায়। একুশের বিশেষ সংখ্যা এখন সকল সংবাদপত্রের একটি নিয়মিত প্রকাশনা, টেলিভিশন এবং অনলাইন মাধ্যমেরও নিয়মিত কর্মসূচি ‘একুশ’। একুশের সাংবাদিকতায় সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের প্রক্রিয়া দ্রুততর করার চাপ দিয়ে যায় বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসে। ষাটের দশকের শেষদিকে আইয়ুব-মোনায়েমবিরোধী আন্দোলনে ঊনসত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের দৃপ্ত শপথ নেওয়ার মহান অনুপ্রেরণা। এদিন আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে ওঠে। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। আবার দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসানে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচিত সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলে, ওই বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি প্রায় সব দৈনিক সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে গণতন্ত্রের অভিযাত্রাকে স্বাগত জানিয়ে। এ অভিযাত্রার মূল প্রেরণা হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি স্থান করে নিয়েছে একুশের সাংবাদিকতায়। গণতন্ত্র আর একুশ আরো একবার সমার্থক হয়ে ওঠে। ‘...নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে বিজয় অর্জিত হয়েছে, গণতন্ত্রে উত্তরণ ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, এর মূলেও একুশের চেতনা নিঃসন্দেহে বড় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে’ (দৈনিক বাংলা ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১)। ‘একাত্তরের বিজয়ের পর আত্মস্বার্থসন্ধানী আয়োজন স্বগৃহে বিবাদ ডেকে এনেছিল। শত্রুরা সাহসী হয়েছিল। কিন্তু নব্বইয়ের প্রজন্ম এসে সেই আত্মবৈরী ফাঁদ থেকে আমাদের মুক্তি দিয়েছে’ (সংবাদ, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১)।

১৯৯১-এর একুশ-পরবর্তী বছরগুলোতেও একুশের সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে সামগ্রিকভাবে। ভাষা আন্দোলনের ৬০তম বছরে (২০১২) সংবাদপত্রগুলো দেশের রাজনৈতিক সংঘাত ও অনিশ্চয়তার চাপের মধ্য দিয়ে গেলেও একুশে ফেব্রুয়ারি বরাবরের মতো ছিল তাদের উল্লেখযোগ্য বিষয়। এ সময় তরুণদের দায়িত্ব সচেতন করার প্রয়াস লক্ষ করা যায় মিডিয়ায়। ভাষাসৈনিকরাও সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার সফল করে তোলার ব্যাপারে তরুণদের ওপর তাঁদের ভরসার কথা বলেন জোর দিয়ে। নবীন ভাষাপ্রেমীরাও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবি তোলেন। এ বছর বায়ান্নর ভাষাসৈনিকদের হাত ধরে, মশাল জ্বেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষার বিকৃতি রোধের শপথ নেন নতুন প্রজন্মের ভাষাপ্রেমীরা। একুশের চেতনা পরিষদের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবিতে ৩১ জুলাই ২০১০ ভাষাসৈনিক আহমদ রফিকের নেতৃত্বে এ শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এখানে একটি প্রশ্ন বড় করেই উচ্চারিত হয় ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে বাধা কোথায়?’ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন বলবৎ থাকলেও জাতীয় জীবনের কোথাও এর প্রয়োগ নেই। দেশের প্রায় ৮০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিতেও অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে বিষয় হিসেবে বাংলা পড়ানো হয় না। নতুন শতকের প্রথম দিকে প্রাইভেট এফএম চ্যানেলগুলোতে বিকৃত বাংলা উচ্চারণ ও অহেতুক ইংরেজির ব্যবহার এতটাই বেড়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। অবশ্য এটি সরকারের কাজ নয় বলে কেউ কেউ মন্তব্য করলেও সরকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। শুধু এফএম চ্যানেলে উচ্চারণ ঠিক করে বা স্যাটেলাইট টেলিভিশনে অনুষ্ঠানের নাম ইংরেজিতে না রাখা হলেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা যাবে না। এ প্রসঙ্গে স্যাটেলাইট টিভি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলব বাংলাদেশের টিভি অনুষ্ঠানের নাম ইংরেজিতে রাখার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। অনুষ্ঠানের নামকরণ ইংরেজিতে কম হওয়াটাই শোভনীয়। তবে এটা ঠিক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের খবরদারিতে এর সমাধান হবে না। এখানে মিডিয়ারও দায়বোধ রয়েছে। নাগরিকসমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ ব্যাপারটি মানুষের জীবনযাপনের অংশ। একুশের সাংবাদিকতায় এ বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই স্থান পায়।

একুশ নিয়ে বাণিজ্যায়নের যে প্রয়াস লক্ষ করা যায় তাতেও আমরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসন্ধান করতে পারি। বর্ণমালায় সাজানো পোশাক, বিভিন্ন ব্যবহার সামগ্রী, উপহারদ্রব্য আসলে একুশের উজ্জ্বল উত্তরাধিকার। এক দিনের উদ্যাপন থেকে সারা মাস একুশ বিস্তৃত হয়েছে বইমেলাকে কেন্দ্র করে। এ মাসটি গ্রন্থ প্রকাশের প্রধান সময় হয়ে উঠেছে। প্রকাশকদের জন্য এটি বাণিজ্যের মাস। মিডিয়া বিষয়টিকে সে রকম ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছে। সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনের ক্ষেত্রে এ বাণিজ্যায়ন সামাজিক প্রভাব ফেলছে।

এ বছরও ২১ তারিখে মিডিয়া সরব ছিল। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন—সবাই ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সমসাময়িক জীবনধারার দিকগুলো তুলে ধরেছে। ভাষার বিকৃতি নিয়ে প্রধান শিরোনাম হয়েছে। ‘আজ অমর একুশে’ এ বাক্যে ব্যানার শিরোনামও এবার দেখা গেল। চার থেকে আট পৃষ্ঠার বিশেষ সংখ্যা হয়েছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় গুচ্ছ গুচ্ছ বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছে। এখানে পরিমাণ বেড়েছে তবে গভীরতার দিকটি খুঁজে পাওয়া যায় না।

একুশ মানে মাথা নত না করা। এ আদর্শকে ধারণ করেই বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং নব্বইয়ের গণতন্ত্রের সংগ্রামে আমরা সফল হয়েছি। মিডিয়া বরাবর জনগণের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছে, গণমুক্তির আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সহযোগী হয়েছে। শত রক্তচক্ষু মিডিয়াকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। দেশে গণতন্ত্রের অর্থবহ ভিত মজবুত করার লক্ষ্যে, মানুষের কথা বলা ও স্বাধীন চিন্তার অধিকার রক্ষায়, মিডিয়ার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন্ন রাখতে আজকের মিডিয়া একুশের সাংবাদিকতার ঐতিহ্য রক্ষা করবে, স্বার্থান্বেষী মহলের কাছে কখনো মাথা নত করবে না—এ বিশ্বাস আমাদের অটুট।

লেখক : সাংবাদিক, গণমাধ্যম বিশ্লেষক

মন্তব্য